...মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে নতুনরূপে আর্বিভূত হবে...

This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Liberation War of Bangladesh and Genocide of Innocent Bengali People in 1971. More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

ফেসবুকে আমরা

সেই ১৯৫ পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী - সাঈদ আহমেদ

সেই ১৯৫ পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী

সাঈদ আহমেদ

সচলায়তন ডট কমে প্রকাশিত




ইবুক ডাউনলোড করে পড়ুন (লিংক) অথবা, অনলাইনে পড়ুন:

স্বাধীনতার পর ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীর ছাড়া পাবার বিষয়টি ইদানিং সবত্রই আলোচিত হচ্ছে। একাত্তরের যুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবার পর এমন প্রশ্নও তোলা হচ্ছে যে, ভারতের নিকট আটক থাকা ঐ ১৯৫ জন পাকিস্তানীই ছিল প্রকৃত অপরাধী, এবং তখন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে এখন স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সম্ভব নয়।


মুলত: কেন এবং কিভাবে সেই ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী ছাড়া পেয়েছিল তা উদ্ঘাটনই এই লেখার উদ্দেশ্য। বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আর্ন্তজাতিক পত্রিকায় ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে এপ্রিল ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবর এবং স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তিপত্র উদ্ধৃত করে মূল ঘটনাপ্রবাহটি তুলে ধরা হয়েছে। লেখাটি তথ্যভিত্তক রাখার জন্য মন্তব্য বা সম্পাদকীয় কলাম যথাসম্ভব পরিহার করে মুলত: খবরাখবরই উদ্ধৃত করা হলো। উল্লিখিত অধিকাংশ খবরই যদিও দেশি-বিদেশি একাধিক পত্রিকাতে ছাপা হয়েছিল, তবু ঘটনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য এখানে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর খবরই বেশি উদ্ধৃত করা হয়েছে।


যুদ্ধবন্দী স্থানান্তর


একাত্তরে পাকিস্তানের পরাজয় যখন নিশ্চিত হওয়া শুরু হয়, তখন থেকেই মুক্তিবাহিনী ও গনহত্যার শিকার সাধারন বাঙালীর ক্ষোভ থেকে রক্ষা পাওয়ার বিষয়টি পাকিস্তানী সৈন্যদের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। যুদ্ধে ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহন পরাজিত পাকিস্তানীদের জন্য শাপে বর হয়ে দেখা দেয়। ভারত যেহেতু আর্ন্তজাতিক জেনেভা কনভেনশনের সদস্য এবং যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহনকারী, সেহেতু পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দী রক্ষা করার ব্যপারে ভারত আর্ন্তজাতিক ভাবে দায়বদ্ধ।


১৯৭১ সালের ১৫ই ডিসেম্বর লে. জেনারেল এএকে নিয়াজীর যুদ্ধবিরতীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ জামসেদজি মানেকশ পরের দিনই নিয়াজীকে আত্নসমর্পণ করার যে চরমপত্র দেন, তাতে পাকিস্তানের সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। [১] এরপর ১৬ই ডিসেম্বর নিয়াজী যৌথবাহিনীর নিকট যে আত্নসমর্পন পত্র স্বাক্ষর করেন, তাতে উল্লেখ করা হয় “আত্নসমর্পনকারী সৈন্যদের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করা হবে এবং আত্নসমর্পনকারী সকল পাকিস্তানী সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে”। [২]


খুলনায় প্রায় আট হাজার পাকিস্তানী সৈন্যের আত্নসমর্পণ তদারককারী ভারতীয় মেজর জেনারেল দিলবর সিং এক সাক্ষাৎকারে জানান যে যুদ্ধ পরবর্তী সপ্তাহগুলিতে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার এবং পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের ভারতের বিভিন্ন শিবিরে স্থানান্তর করাই ছিল তাদের অন্যতম দ্বায়িত্ব। তিনি আরো বলেন, “যেহেতু স্থানীয় সহযোগীরা (যেমন- রাজাকার) জেনেভা কনভেনশনের অন্তর্ভুক্ত নয়, এরা বাংলাদেশ সরকারের দ্বায়িত্বের মধ্যে পড়বে”। [৩]


যুদ্ধাপরাধের বিচার


বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একেএম কামরুজ্জামান ২৪শে ডিসেম্বর ১৯৭১ ঘোষণা করেন যে বাংলাদেশ ইতমধ্যে ৩০ জন শীর্ষস্থানীয় পাকিস্তানী সরকারী কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে এবং গনহত্যায় সহযোগিতার জন্য অচিরেই তাদের বিচার হবে। এর দু’দিন পরই ২৬শে ডিসেম্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে একাত্তরের গনহত্যার শিকার সাতজন বাংলাদেশী কর্মকর্তার পরিবার ভারতের কাছে আবেদন জানান যেন ভারত দোষী পাকিস্তানীদের বিচারে বাংলাদেশকে সহায়তা করে। জবাবে ভারতীয় কুটনীতিক দূর্গা প্রসাদ ধর কিছুটা অনিচ্ছার সাথে শুধু জানান যে “ভারত যুদ্ধবন্দীদের বিষয়ে আর্ন্তজাতিক আইনে তার কী কর্তব্য তা পরীক্ষা করে দেখছে”। [৪]


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারামুক্তির পর দেশে ফিরেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেন। ২৯শে মার্চ ১৯৭২ নিয়াজী এবং রাও ফরমান আলী-সহ ১১০০ পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীর বিচারের সরকারী পরিকল্পনা ঘোষনা করা হয়। [৫] সরকার দুইস্তর বিশিষ্ট একটি বিচার পরিকল্পনা পেশ করে যেখানে কিছু শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীর বিচারে দেশি-বিদেশি জুরি নিয়োগ; এবং অন্যদের জন্য শুধু দেশীয় জুরি নিয়োগের সীদ্ধান্ত হয়। [৬]


আর্ন্তজাতিক চাপ এড়াতে এসময় ভারত শুধু সেইসব পাকিস্তানী সৈন্যদের হস্তান্তর করতে রাজী হয় যাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত অভিযোগের ভিত্তিতে ‘প্রাইমা ফেসিই কেস’ (prima facie case) হাজির করতে পারবে। [৭] এরপর বাংলাদেশ সরকারের সংগৃহীত প্রমানের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭২ সালের ১৪ই জুন ভারত সরকার নিয়াজীসহ প্রাথমিকভাবে ১৫০ জন যুদ্ধবন্দীকে বিচারের জন্য বাংলাদেশের নিকট হস্তান্তরে সম্মত হয়। [৮]


ইন্দীরা গান্ধী ও জুলফিকার আলী ভুট্টর সিমলা চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ১৯শে জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় এই বিচারের কথা স্মরন করিয়ে দেন। ভারত-পাকিস্তান উভয় দেশের ওয়েব সাইটে সিমলার সম্পূর্ণ চুক্তিপত্রটি সংরক্ষিত থাকলেও, এই সিমলা চুক্তিতেই যুদ্ধাপরাধীর বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে অনেকেই ভুল করে থাকেন। [৯] মুলত কাশ্মীর সীমান্তসহ দ্বিপাক্ষিক কিছু বিষয়েই ২রা জুলাই ১৯৭২ সালে ভারত-পাকিস্তান সিমলা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে যুদ্ধাপরাধী বা বাংলাদেশ সম্পর্কে কোন বিষয়ই উল্লেখ করা হয়নি। [১০]


পাকিস্তানে বাঙালী নির্যাতন ও জিম্মি


যুদ্ধের সময় যে ৪ লক্ষ বাঙালী পাকিস্তানে আটকা পড়ে, পাকিস্তান সরকার তাদেরকে জিম্মি করে বাংলাদেশের বিচার বাধাগ্রস্থ করার চেষ্টা করে। প্রায় ১৬ হাজার বাঙালী সরকারী কর্মকর্তা যারা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকা পড়ে এবং পরবর্তীতে চাকুরিচ্যুত হয়, তাদের পাকিস্তান ত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। অনেক কর্মকর্তাকে ক্যাম্পে আটক করে রাখার কারনে বাংলাদেশ তখন আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদও জানায়। [১১]


এসময় পাকিস্তান সরকার পলায়নপর বাঙালীদের ধরিয়ে দেবার জন্য মাথাপিছু এক হাজার রুপি পুরষ্কার ঘোষনা করে। [১২] এধরনের ঘোষনার কারনে অনেক পাকিস্তানীই তখন পালানোর মিথ্যে অভিযোগ তুলে প্রতিবেশী বাঙালীদের ধরিয়ে দেয়া শুরু করে। আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটি (আইসিআর)-এর তৎকালীন একটি প্রতিবেদনে পাকিস্তানে জিম্মি বাঙালীদের দুর্বিষহ অবস্থা ফুটে উঠে। রিপোর্টে বলা হয়, শুধু “পাকিস্তান ত্যাগ করতে পারে এই অভিযোগে বাঙালীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে” এবং “হাজার হাজার বাঙালী বিনা বিচারে জেলে আটক আছে”। আন্তর্জাতিক ভাবে প্রচারিত এই রিপোর্টে আরো বলা হয়-


“হয়রানি এবং বৈষম্যমূলক আচরন নিত্যদিনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বাঙালীদের উপরের শ্রেণীতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি, যাদের এখন “নিগার” বা নিচুজাত হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। কিন্তু যারা ইতমধ্যেই বৈষম্যের চুড়ান্ত সীমায় অবস্থার করছে, ঐ সব সাধারনের উপরে যতটুকু অতিরিক্ত বৈষম্য করা হচ্ছে, তার প্রভাবও অনেক বেশি”। [১৩]


নিগ্রহ আর নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্য শত শত বাঙালী তখন রিক্ত হস্তে আফগানিস্তানের দুর্গম উপজাতি-শাসিত অঞ্চল দিয়ে পালিয়ে বাচার চেষ্টা করে। [১৪]পাকিস্তানে এই বাঙালী নির্যাতন যে শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ রুদ্ধ করার জন্যই, জুলফিকার আলি ভুট্ট পরবর্তীতে তা অংকোচেই প্রকাশ করেছেন।


দ্বিপাক্ষিক প্রচেষ্টা ও জাতিসংঘে ভেটো


প্রায় ৯০ থেকে ৯৩ হাজার পাকিস্তানী বন্দীর ভরন-পোষণ এবং নিরাপত্তা বিধান ভারতের জন্যও একটি সমস্যা হয়ে ওঠে। ইতমধ্যে ভারতের বন্দি শিবিরগুলিতে একাধিকবার বিদ্রহের ঘটনা ঘটে। [১৫] পাকিস্তান একাধিকবার প্রচেষ্টা চালায় যেন ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক ভাবেই বন্দী মুক্তি সম্পন্ন করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের বাধার কারনে তা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের যুক্তি ছিল যে, ঐসব পাকিস্তানী সৈন্য ভারত-বাংলাদেশের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্নসমর্পণ করেছে এবং বাংলাদেশের অনুমতি ছাড়া ভারত তাদের মুক্ত করতে পারে না। কিন্তু ভুট্ট দাবী করেন যে আটক সৈন্যরা মুলত: ভারতের বন্দী এবং যৌথ বাহিনীর কথা বলে আসলে পাকিস্তানের চোখে ধুলো দেয়া হচ্ছে। [১৬]


এই প্রেক্ষিতে ১০ই আগস্ট ১৯৭২ এক সংবাদ সম্মেলনে ভুট্ট বলেন, “বাংলাদেশ ভেবেছে যে আমাদের বন্দীদের মুক্ত করার ব্যপারে তাদের ভেটো ক্ষমতা আছে”, কিন্তু “ভেটো আমাদের হাতেও একটি আছে”। [১৭]


পরবর্তীতে তিনি নিশ্চত করেন যে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক ভাবেই চীনকে অনুরোধ করেছে যেন জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য বাংলাদেশের আবেদনে চীন ভেটো দেয়। [১৮] সদ্যস্বাধীন একটি দেশের উন্নয়ন ও বৈদেশিক সহযোগিতা লাভে জাতিসংঘের সদস্যপদ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য আবেদন করে।


কিন্তু ২৫শে আগস্ট পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক বাংলাদেশের সদস্যপদের বিপক্ষে চীন নিরাপত্তা পরিষদে তার প্রথম ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে। [১৯] জাতিসংঘের মতন একটি আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশকে বঞ্চিত হতে হয় মুলত: একটি বর্বর গনহত্যার বিচার দাবী করার কারনে । কিন্তু এত কিছুর পরেও বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবীতে অটল থাকে।


বিচার ও প্রত্যাবাসন অচলাবস্থা


পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীসহ সকল বন্দীর মুক্তির দাবীতে বাংলাদেশে ও পাকিস্তানে আটক উভয় দেশের কয়েক লক্ষ নিরাপরাধ নাগরিকদের প্রত্যাবাসনসহ দ্বিপাক্ষিক অন্যান্য বিষয়েও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ইতমধ্যে বাংলাদেশ আরো ৪৫ জন পাকিস্তানী সৈন্যের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ যোগাড় করায় অভিযুক্ত পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যা ১৯৫-এ উপনীত হয়। এসময় স্থানীয় ও পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত করন ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ চলতে থাকে।


১৯৭২ সালের নভেম্বরে ভারত আটক পাকিস্তানী সৈন্যদের পরিবারের প্রায় ৬ হাজার সদস্যকে মুক্তি দিলে, পাকিস্তানও আটকে পড়া ১০ হাজার বাঙালী নারী ও শিশুর একটি দলকে বাংলাদেশে প্রত্যাবাসনে সম্মত হয়। [২০] কিন্তু পাকিস্তানে আটক অধিকাংশ বাঙালীর ভাগ্যই অনিশ্চিত থেকে যায়।


অবশেষে এ অচলাবস্থার অবসানের লক্ষ্যে ১৭ই এপ্রিল ১৯৭৩, টানা চার দিনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর, বাংলাদেশ এবং ভারত একটি ‘যুগপৎ প্রত্যাবাসন’ প্রস্তাব দেয় পাকিস্তানকে। এই প্রস্তাব অনুসারে ভারত তার কাছে আটক প্রায় ৯০ হাজার বন্দী পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করবে, এবং বিনিময়ে পাকিস্তান তার কাছে আটক প্রায় দুই লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিককে বাংলাদেশে প্রত্যাবাসিত করবে। এছাড়া, বাংলাদেশে আটক প্রায় ২৬০ হাজার অবাঙালী (বিহারী)-কেও পাকিস্তান ফেরত নিবে। [২১]


তবে এতকিছুর পরেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে অটল থেকে বাংলাদেশ অভিযুক্ত পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের এই প্রত্যাবাসন প্রস্তাবের বাইরে রাখে। [২২]


নিরাপরাধ বাঙালির বিচার


ভুট্ট যদিও ‘যুগপৎ প্রত্যাবাসন’ প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেন, কিন্তু তিনি মাত্র ৫০ হাজার বিহারীকে ফেরত নিতে সম্মত হন এবং বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানী সৈন্যের বিচারের তীব্র প্রতিবাদ করেন। বাংলাদেশ যদি অভিযুক্ত পাকিস্তানীদের বিচার করে, তাহলে তিনি পাকিস্তানে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের একই রকম ট্রাইবুনালে বিচার করবেন বলে হুমকি দেন। ১৯৭৩ সালের ২৭শে মে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে ভুট্ট বলেন-


“(বাঙালীদের)এখানে বিচার করার দাবী জনগন করবে। আমরা জানি বাঙালীরা যুদ্ধের সময় তথ্য পাচার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সুনিদির্ষ্ট অভিযোগ আনা হবে। কতজনের বিচার করা হবে, তা আমি বলতে পারছি না”। [২৩]


ভুট্ট দাবী করেন যে, বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানীর সৈন্যদের বিচার করে, তাহলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ক্যু’র মাধ্যমে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সরকারের পতন ঘটাবে এবং দুই দেশের পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রনের বাইরে নিয়ে যাবে। তিনি দাবী করেন, এই চক্রান্তের জন্য ইতমধ্যেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। [২৪]


ভুট্টর এ দাবী প্রত্যাখ্যান করে ১৯৭৩ সালের ৭ই জুন এক সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন-


“মনবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ভোলা সম্ভব নয়, এই হত্যা, ধর্ষণ, লুটের কথা জানতে হবে। যুদ্ধ শেষের মাত্র তিন দিন আগে তারা আমার বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করেছে। তারা প্রায় ২ লক্ষ নারীকে নির্যাতন করেছে-এমনকি ১৩ বছরের মেয়েকেও। আমি এই বিচার প্রতিশোধের জন্য করছি না, আমি এটা করছি মানবতার জন্য”। [২৫]


তিনি পাকিস্তানে বাঙালীদের বিচারের হুমকির প্রতিবাদে বলেন, “এটা অবিশ্বাস্য… এই মানুষগুলো ডাক্তার, বিজ্ঞানী, সরকারী ও সামরিক কর্মকর্তা যারা বাংলাদেশে ফেরত আসতে চায়”।


তিনি প্রশ্ন করেন, “এরা কী অপরাধ করেছে? এটা ভুট্টর কী ধরনের প্রতিহিংসাপরায়ণতা?” [২৬]


কিন্তু ভুট্ট যে শুধু হুমকিই দিচ্ছেন না, তা প্রমাণের জন্য পাকিস্তান ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীর ‘বদলি জিম্মি’ হিসেবে ২০৩ জন শীর্ষ বাঙালী কর্মকর্তাকে বিচারের জন্য গ্রেফতার করে। [২৭]


স্থানীয় ও পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু


এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় ও পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য পৃথক প্রক্রিয়া শুরু করে। স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ‘বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুন্যাল) অধ্যাদেশ ১৯৭২’ জারি করা হয়।


১৫ই জুলাই ১৯৭৩ বাংলাদেশ সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ৪৭(৩) ধারা সংযুক্ত করা হয় যেখানে “গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য কিংবা যুদ্ধবন্দীকে আটক, ফৌজদারীতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করিবার বিধান” অর্ন্তভুক্ত করা হয়।[২৮]


এর মাত্র পাঁচ দিন পরই ২০ জুলাই ঘোষণা করা হয় ‘আর্ন্তজাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩’ যার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধের জন্য স্থানীয় ও পাকিস্তানী উভয় ধরনের যুদ্ধাপরাধীর বিচারের পথ সুগম হয়। [২৯]


উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনৈতিক ভাষণ [৩০], সংবিধানের ধারা [৩১] ও ট্রাইব্যুনাল আইনে [৩২] আর্ন্তজাতিক ন্যুরেমবার্গ ট্রাইবুনালের ৬(সি) ধারা [৩৩] অনুসরন করে যুদ্ধের সময় সাধারন জনগনের উপর পরিচালিত হত্যা-নির্যাতন বিষয়ক যুদ্ধাপরাধ বোঝাতে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়ে আসছে।


কৌতুহলের বিষয় হলো, পচাঁত্তরের শেষ দিকে দালাল আইন বাতিলসহ অন্যান্য অনেক আইনি এবং সংবিধানিক পরিবর্তন আনা হলেও, কোন সরকারই এ পর্যন্ত সংবিধানের ৪৭(৩) ধারা অথবা ‘আর্ন্তজাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩’ বাতিল করেনি— যা ‘সহায়ক বাহিনীর সদস্য’ অর্থাৎ স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীর বিচারের পথ উন্মুক্ত রেখেছে।


এবার ভারতের উল্টোরথ


ভারতীয় কুটনীতিক দূর্গা প্রসাদ ধরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে আগেই বলা হয়েছে যে যুদ্ধাপরাধের বিচারে ভারত শুরুতে কিছুটা অনাগ্রহী ছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশের অব্যাহত চাপে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের হস্তান্তরে রাজী হলেও, ধীরে ধীরে ভারত বিচার-বিরোধী অবস্থান প্রকাশ করা শুরু করে।


ইতোমধ্যে চিহ্নিত ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর বাইরে যেন আর কোন পাকিস্তানী সৈন্যের বিচারে বাংলাদেশ আগ্রহী না হয়, ভারত সেজন্য চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখে। ১৯৭৩ সনের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ভারতীয় বিশেষ কুটনীতিক পি এন হাস্কর যখন ঢাকা সফরে আসেন, তখন ভারতীয় প্রভাবশালী দৈনিক ‘দি স্টেটসম্যান’-এর এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, “বাংলাদেশকে যে আরো সহনশীলতা ও রাজনৈতিক নমনীয়তা প্রদর্শন করতে হবে, এই কথাটা যেন হাস্কর সাহেব নম্র কিন্তু জোরালো ভাবে বাংলাদেশকে জানিয়ে দেন”। [৩৪]


বাংলাদেশ সফর শেষ করে পি এন হাস্কর জুলাই এর শেষ সপ্তাহে যখন পাকিস্তান সফর করেন, সেখানেও ওই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিষয়টি মুল আলোচ্য বিষয় ছিল। [৩৫]


এদিকে পাকিস্তানী সৈন্যদের বিচারে চীনের অনাগ্রহ ভারতের জন্যও সমস্যার কারন হয়ে দাড়ায়। ফলে আর্ন্তজাতিক ও অভ্যন্তরীণ দাবীর মুখে ভারত দ্রুত পাকিস্তানী বন্দীদের ছেড়ে দেবার জন্য উৎসুক হয়ে ওঠে। এসময় ভারত তার বিচার-বিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করে বাংলাদেশকে জানিয়ে দেয় যে, ‘এই বিচার প্রক্রিয়া উপমহাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে’। [৩৬]


বন্দীত্বের দুইরূপ


উল্লেখ্য, ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭২ সনে সিমলা চুক্তির সময় ভুট্টকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, পাকিস্তান যে কোন একটি বিষয় প্রাথমিকভাবে ভারতের কাছে ফেরত চাইতে পারে- হয় আটক পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীর মুক্তি, অথবা পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু অংশ যা যুদ্ধে ভারতের দখলে চলে গিয়েছিল তার অবমুক্তি। ভুট্ট নির্দিধায় যুদ্ধবন্দীর বদলে ভারতের দখলে থাকা জমি অবমুক্ত করার উপর জোর দেন ফলে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তই সিমলাতে অগ্রাধিকার পায়, যুদ্ধবন্দী নয়। [৩৭]


আপাতদৃষ্টিতে অমানবিক এই সীদ্ধান্তের কারন ভুট্ট সিমলায় তার সঙ্গে থাকা কন্যা বেনজীরকে ব্যাখ্যা করেছিলেন এভাবে- বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবন্দীর খাদ্য, বাসস্থান ও নিরাপত্তা ভারতের জন্য সমস্যা হয়ে দেখা দিবে এবং অনির্দিষ্টকাল এভাবে রাখাটা আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মানবিক হবে না। ফলে ভারতকে যুদ্ধবন্দীদের এমনিতেও ছেড়ে দিতে হবে।[৩৮]


বাংলাদেশের অবস্থান সবসময়ই ছিল অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তিদানের বিপক্ষে, কিন্তু অন্যান্য যুদ্ধবন্দীর প্রত্যাবাসনের বিপক্ষে নয়। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বাদ দিয়ে যুদ্ধবন্দী প্রত্যাবাসনে ভুট্ট তার আপত্তি বজায় রাখেন। তিনি জানতেন পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের ভরন-পোষন ছিল ভারতের জেনেভা কনভেনশনের শর্ত, কিন্তু পাকিস্তানে আটক অধিকাংশ বাঙালীই সাধারন জনগন এবং তারা কোন আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা-বঞ্ছিত। ফলে এসব বাঙালীদের নির্যাতনের খবর খুব একটা প্রকাশিত হবে না। অধিকাংশ বাঙালীই যুদ্ধের পর চাকরী হারান এবং বেকার অবস্থায় আটক থাকায় সর্বস্ব বিক্রি করে দিন চালাচ্ছিলেন। [৩৯] এ অবস্থায় আটক বাঙালীদের পক্ষে আর বেশি দিন টিকে থাকা সম্ভব নয় জেনে ৮ মার্চ ১৯৭৩ সনে শেখ মুজিব জাতিসংঘসহ অন্যান্য আর্ন্তজাতিক প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করেন এ অচলাবস্থার অবসানে এগিয়ে আসার জন্য।[৪০]


অবশেষে প্রত্যাবাসন


অবশেষে দীর্ঘ আলোচনার পর বাংলাদেশ-ভারতের ‘যুগপৎ প্রত্যাবাসন’ প্রস্তাব মেনে নিয়ে পাকিস্তান ২৮শে আগস্ট ১৯৭৩ দিল্লিতে ভারতের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। বাংলাদেশের সম্মতিতে স্বাক্ষরিত এ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অবশেষে পাকিস্তান ও ভারতে প্রায় দুই বছর ধরে আটক ‘প্রায়’ সকল বাঙালী ও পাকিস্তানী বন্দীর মুক্তি তরান্বিত করে। ১৯৭৩ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর শুরু [৪১] এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার প্রথম সপ্তাহেই ১৪৬৮ জন বাঙালী এবং ১৩০৮ জন পাকিস্তানী সৈন্যের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হয়।[৪২]


তবে বাংলাদেশের আপত্তির মুখে ১৯৫ জন পাকিস্তানীকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়। দিল্লি চুক্তিতে সীদ্ধান্ত নেয়া হয় যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে ১৯৫ জন পাকিস্তানীর বিষয়টির নিষ্পত্তি করবে। [৪৩] তবে পাকিস্তানও তার ১৯৫ জন পাকিস্তানীকে ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত দুইশতাধিক বাংলাদেশি নাগরিককে পণবন্দী হিসেবে এই প্রত্যাবাসনের বাইরে রেখে দেয়।


পাকিস্তানের বিকল্প প্রস্তাব


এক কিছুর পরেও যখন বাংলাদেশ সরকার ১৯৫ জন পাকিস্তানীর বিচারের বিষয়ে অনড় থাকে, তখন ১৯৭৩-এর এপ্রিলে পাকিস্তান সরকার একটি বিকল্প প্রস্তাব দেয়। পাকিস্তান এ্যাফেয়ার্স পত্রিকার ১৯৭৩ সালের ১ মে প্রকাশিত এই প্রস্তাবে বলা হয়-


অভিযুক্ত অপরাধ যেহেতু পাকিস্তানের একটি অংশেই ঘটেছে, সেহেতু পাকিস্তান তার যে কোন যুদ্ধবন্দীর বিচার ঢাকায় অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করে। কিন্তু পাকিস্তান নিজে “জুডিশিয়াল ট্রাইব্যুনাল” গঠন করে এসকল ব্যক্তির বিচারে আগ্রহী যা আর্ন্তজাতিক আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে। [৪৪]
কিন্তু টিক্কাখান পাকিস্তানের সামরিক প্রধান থাকা অবস্থায় পাকিস্তানে এসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ভুট্টর প্রস্তাব কতটা বাস্তবসম্মত সে বিষয়ে বাংলাদেশ সন্দেহ প্রকাশ করে। [৪৫] ইতোমধ্যে স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও, পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে করা সম্ভব না-ও হতে পারে, এটা অনুমিত হতে থাকে।


এমতাবস্থায়, যদি পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের প্রত্যাবাসন করতেই হয়, তবে কয়েকটি বিষয় যেন নিশ্চিত করা হয় তাই হয়ে ওঠে বাংলাদেশের প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এজন্য বাংলাদেশ প্রস্তুতি নিতে থাকে যেন ভারত হতে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের হস্তান্তরের আগে অন্তত তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা হয়-


১. বাংলাদেশের নিকট যুদ্ধাপরাধের জন্য পাকিস্তানের নি:শর্ত ক্ষমা প্রার্থনা (দু:খ প্রকাশ নয়);
২. ভবিষ্যতে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ খোলা রাখা; এবং
৩. চীনসহ অন্যান্য দেশে পাকিস্তান যে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারনা অব্যাহত রেখেছে, তার অবসান।


স্বীকৃতি-নাটকের সমাপ্তি


পাকিস্তানের সম্পদ ও দেনার বন্টনসহ বাংলাদেশ-পাকিস্তানের অমীমাংসীত বিষয়গুলি নিয়ে মুজিব-ভুট্ট বৈঠকে দুই দেশই আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু শেখ মুজিব শর্ত দেন যে, পাকিস্তানের স্বীকৃতি ব্যতীত কোন আলোচনা হবে না। অন্যদিকে ভুট্ট শর্তদেন যে, আলোচনার পর স্বীকৃতি দেয়া হবে। এবিষয়ে ভারত শেখ মুজিবকে রাজি করানোর জন্য উদ্যোগী হলে তিনি বলেন, ‘চীনের ভেটো ব্যবহার করে পাকিস্তান বাংলাদেশকে ব্ল্যাকমেইল করেছে। ফলে স্বীকৃতির বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্ত হয়েছে। প্রথমে স্বীকৃতি, তারপর আলোচনা।[৪৬]


এদিকে ১০ই জুলাই ১৯৭৩ সনে পাকিস্তানের সংসদ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য ভুট্টকে শর্তসাপেক্ষ ক্ষমতা প্রদান করে। তবে ভুট্ট বলেন, পাকিস্তানী সৈন্যদের বিচারের দাবী ত্যাগ না করা পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিবেন না।[৪৭]


এদিকে তেল ও মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নিয়ে ২২-২৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ সনে লাহোরে ইসলামিক সম্মেলন অনুষ্ঠানের ক্ষণ ধার্য হয়। মুসলিম জনগোষ্ঠীপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অংশগ্রহনে আরব দেশগুলির আগ্রহের প্রেক্ষিতে ভুট্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে আমন্ত্রণ জানাতে রাজী হন। কিন্তু স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধান হিসেবে আমন্ত্রণ না করে, শেখ মুজিবকে পূর্বাঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর নেতা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর সীদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ১৮ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ শেখ মুজিবুর রহমান এক দলীয় সভায় পাকিস্তানের উদ্দেশে বলেন, আমরা আপনাদের স্বীকৃতির পরোয়া করিনা। তবে সম্মেলনে আগত অধিকাংশ কূটনীতিকদের অভিমত উদ্ধৃতকরে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক রিপোর্টে বলা হয়, সবকিছু বিবেচনা করে বাংলাদেশের পক্ষে এই বিচার করা আর সম্ভব হবে না। [৪৮]


এদিকে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদম মালিক, যিনি বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ভুমিকা রাখছিলেন, এক স্বাক্ষাৎকারে বলেন যে, বাংলাদেশ ১৯৫ পাকিস্তানীর একটি ‘সন্তোষজনক’ সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে যা পাকিস্তানের স্বীকৃতি প্রদানকে সহজ করবে। কিন্তু শেখ মুজিব স্বীকৃতির আগে এমন কোন আশ্বাস দেবার কথা প্রত্যাখ্যান করেন।[৪৯] ফলে ভুট্টও বাংলাদশকে আমন্ত্রন জানানো থেকে সরে আসেন।


অবশেষে সম্মেলনের একদিন আগে সম্মেলনের সাধারন সম্পাদক হাসান তোহামিসহ উচ্চপদস্থ একটি প্রতিনিধিদল ১৯৫ পাকিস্তানীর বিষয়ে শেখ মুজিবকে রাজী করানোর জন্য ঢাকায় আসার সীদ্ধান্ত নেয়।[৫০]


২১শে ফেব্রুয়ারী, সম্মেলনের আগের রাতে, প্রতিনিধিদলটি ঢাকার উদ্দেশ্য যাত্রা করেন যেখানে কুয়েত, লেবানন ও সোমালিয়ার তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আলজেরিয়া, সেনেগাল ও প্যালেস্টাইনের প্রতিনিধিবৃন্দ যোগদেন।[৫১]


এদিকে মুসলিম রাষ্ট্রগুলির মধ্যে প্রধান দাতা দেশ হিসেবে পরিচিত মিশর, সৌদি আরব এবং ইন্দোনেশিয়া অবিলম্বে সমস্যা সমাধানের জন্য উভয় দেশের উপর চাপ প্রয়োগ শুরু করে।
২১শে ফেব্রুয়ারী রাতে ৩৭টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে উভয় দেশকে একটি সমাধানের আসার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়।[৫২]
অবশেষে ২২শে ফেব্রুয়ারী সম্মেলনের শুরুতে লাহোরে অবস্থিত টেলিভিশন স্টুডিওতে দেয়া বক্তৃতায় ভুট্ট বলেন-


“আল্লাহর নামে এবং এদেশের জনগনের পক্ষথেকে আমি ঘোষণা করছি যে, আমরা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছি।… আমি বলছি না যে এটি আমি পছন্দ করছি, আমি বলছি না যে আমার হৃদয় আনন্দিত। এটি আমার জন্য একটি আনন্দের দিন নয়, কিন্তু বাস্তবতাকে আমরা বদলাতে পারিনা”। [৫৩]


তবে ১৯৫ পাকিস্তানীর বিচার ত্যাগ করার বিষয়ে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কোন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এমন কোন দাবী করা থেকে তিনি বিরত থাকেন। শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোন প্রতিশ্রুতি ছাড়াই পাকিস্তানের স্বীকৃতি আদায়ে সমর্থ হলেও, বাংলাদেশে ঐ সকল পাকিস্তানীর বিচার হবে না তা সম্মেলনের সকলেই নিশ্চিত হয়ে যান।


অবশেষে চুক্তি


অবশেষে আন্তর্জাতিক চাপে, পাকিস্তানে জিম্মি অবশিষ্ট বাংলাদেশি নাগরিকদের উদ্ধার, জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ, এবং আর্ন্তজাতিক সাহায্য নিশ্চিতকরনসহ একাধিক কারনে পাকিস্তানীদের বিচারের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ। এরই প্রেক্ষিতে ২৪শে মার্চ ১৯৭৪, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের দুই দিন আগে, পাকিস্তানে জিম্মি সর্বশেষ ২০৬ জন বাংলাদেশী নাগরিককে মুক্তি দেয়া হয়।[৫৪]


তবে, পাকিস্তানের কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনাসহ একাধিক কারনে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ১৯৫ পাকিস্তানীর প্রত্যাবাসন কিছুদিন আটকে রাখে। সমস্যা সমাধানের সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে ১৯৭৪ সনের এপ্রিলে দিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠানের ঘোষনা দেয়া হয়।


দি গার্ডিয়ানের এক রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ভুট্টকে যে ক্ষমতা দিয়েছিল, তা ছিল শর্তসাপেক্ষ- অর্থাৎ ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর মুক্তির পরই তা দেয়া যাবে।


কিন্তু ইসলামী সম্মেলনে যোগদানের সময় পাকিস্তানীদের মুক্তি ছাড়াই বাংলাদেশ স্বীকৃতি আদায় করে নেয়ায় পাকিস্তান জানায় যে, ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ১৯৫ পাকিস্তানীর বিচারের বিষয়টিই আগে নিষ্পত্তি করতে হবে। [৫৫]


৫ই এপ্রিল ১৯৭৪ সনে শুরু হওয়া বৈঠকে কামাল হোসেন, আজিজ আহমেদ ও সেরওয়ান সিং যথাক্রমে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। সেখানে ৬ এপ্রিল বাংলাদেশ ঘোষনা করে যে, পাকিস্তান যদি তার একত্তরের কৃতকর্মের জন্য জনসম্মুখে ক্ষমাপ্রার্থনা করে’ এবং বিহারি প্রত্যাবাসনসহ পাকিস্তানের সম্পদ বন্টনে রাজি হয়, তাহলেই শুধু ১৯৫ পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীর উপর আনীত অভিযোগ তুলে নেয়া হবে। জবাবে, পাকিস্তান জানায় যে, ‘সম্পদ বন্টনহলে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের আর্ন্তজাতিক দেনাও গ্রহন করতে হবে। ভুট্ট যেহেতু অনানুষ্ঠানিক ভাবে একাধিকবার দু:খ প্রকাশ করেছেন, সেহেতু ক্ষমা চাইবার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে সেজন্য বাংলাদেশকেও মার্চ-পূর্ব কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। তাছাড়া, ফেব্রুয়ারীতে মিশরের রাষ্টপ্রধানের মধ্যস্থতায় যে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল, সেখানে বাংলাদেশ পাকিস্তানী বন্দীদের প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল’।[৫৬]


অবশেষে ১০ই এপ্রিল ১৯৭৪ সনে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সম্পন্ন হয় যার মাধ্যমে ১৯৫ পাকিস্তানী বন্দীর বিষয়টি মিমাংসা হয়।


পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনা?


ত্রিপক্ষীয় চুক্তির ১৩ ধারায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে উল্লেখ করা হয় যে-
“পাকিস্তানের ঐসব বন্দী যে মাত্রাতিরিক্ত ও বহুধা অপরাধ করেছে, তা জাতিসংঘের সাধারন পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবনা এবং আর্ন্তজাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গনহত্যা হিসেবে চিহ্নত; এবং এই ১৯৫ জন পাকিস্তানী বন্দী যে ধরনের অপরাধ করেছে, সেধরনের অপরাধের অপরাধীদের দায়ী করে আইনের মুখোমুখী করার বিষয়ে সার্বজনীন ঐকমত্য রয়েছে”।[৫৭]
পাকিস্তান তার পূর্বের কথা অনুযায়ী অভিযুক্ত আসামীদের নিজ দেশে বিচার করবে এই প্রত্যাশায় বাংলাদেশ ‘ক্ষমাসুলভ দৃষ্টকোন’ (clemency) থেকে ১৯৫ পাকিস্তানীর বিচার ঢাকাতেই করতে হবে, এমন দাবী থেকে সরে আসে। তবে বাংলাদেশ লিখিত ভাবে পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনাও আদায় করে নেয়। ১১ই এপ্রিল দি নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ সংক্রান্ত খবরের শিরনাম ছিল “বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমাপ্রার্থনা” (“Pakistan Offers Apology to Bangladesh”)। [৫৮]


ত্রিপক্ষীয় চুক্তির ১৪ নং ধারায়ও মন্ত্রীদের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করা হয়-


“স্বীকৃতিদানের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে বাংলাদেশ সফর করবেন বলে ঘোষনা দিয়েছেন এবং বাংলাদেশের জনগনের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং অতীতের ত্রুটি ভুলে যাবার জন্য আহ্বান করেছেন (appealed to the people of Bangladesh to forgive and forget)”।[৫৯]


বাংলাদেশ যখন একাত্তরের গনহত্যায় জড়িত স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছিল, এবং পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের চেষ্টা করছিল, তখন এভাবেই নিরীহ বাঙালিদের জিম্মিকরে, জাতিসংঘের সদস্যপদ থেকে বঞ্চিত রাখাসহ বাংলাদেশকে বহুমুখী আর্ন্তজাতিক চাপের মধ্যে রেখে পাকিস্তান ১৯৫ পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীকে ভারতীয় বন্দীদশা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।


কিছু প্রশ্নের উত্তর


ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর পর্যালোচনায় এটি নিশ্চিত ভাবে প্রমাণিত যে, পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি খুব সহজে হয়নি এবং এবিষয়ে বাংলাদেশের সবোর্চ্চ প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু এই লেখাটি শুরু হয়েছিল আরো কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর খোজার জন্য—


প্রশ্ন ১. ত্রিপক্ষীয় চুক্তি কি পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ বন্ধ করে দিয়েছে?


উত্তর:


অবশ্যই না। আর্ন্তজাতিক চুক্তির ধারা যা প্রকাশ করে, তাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, এখানে অন্যকিছুও বোঝানো হয়েছে কী-না তা নিয়ে অযথা সন্দেহ প্রকাশের অবকাশ নেই। ত্রিপক্ষীয় চুক্তির যে ধারায় প্রত্যাবসন নিয়ে বলা হয়েছে, তা নিম্নরূপ—


১৫. আলোচ্য বিষয়ের আলোকে, বিশেষত:, বাংলাদেশের জনগনের কাছে অতীতের সব ত্রুটি ভুলে যাওয়া ও ক্ষমা করে দেবার জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আবেদন বিবেচনা করে, বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশ সরকার ক্ষমাশীলতার পরিচয় দিয়ে বিচার চালিয়ে না যাওয়ার সীদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্মত হয় যে, ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীকে দিল্লী চুক্তির অধীন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সাথে প্রত্যাবাসন করা যেতে পারে। (15. In the light of the foregoing and, in particular, having regard to the appeal of the Prime Minister of Pakistan to the people of Bangladesh to forgive and forget the mistakes of the past, the Foreign Minister of Bangladesh stated that the Government of Bangladesh had decided not to proceed with the trials as an act of clemency. It was agreed that the 195 prisoners of war might be repatriated to Pakistan along with the other prisoners of war now in the process of repatriation under the Delhi Agreement.)[৬০]


এখানে ক্ষমাশীলতা শুধু বাংলাদেশ সরকারের চালুকরা তখনকার বিচার না চালিয়ে যাওয়ার জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু গনহত্যায় তাদের অপরাধের ক্ষমার কথা কোথাও বলা হয়নি, বরং ১৩ ধারায় বাংলাদেশের বক্তব্য উদ্ধৃত করে উল্লেখ করা হয়েছে- “পাকিস্তানী বন্দীরা যে ধরনের অপরাধ করেছে, সেধরনের অপরাধের অপরাধীদের দায়ী করে আইনের মুখোমুখী করার বিষয়ে সার্বজনীন ঐকমত্য রয়েছে”।


পাকিস্তানের আদালতে বা আর্ন্তজাতিক আদালতে এদের বিচারকে এই চুক্তি কোন ভাবেই ব্যহত করে না।


তবে পাকিস্তান নিজেও যে এটি জানে, তার সাম্প্রতিক প্রমানও রয়েছে। বাংলাদেশে স্থানীয় যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হওয়া মাত্রই পাকিস্তান তীব্রভাবে এর বিরোধীতা করে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ভুলকরে সিমলা চুক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়টি মিটে গিয়েছে, এমন মন্তব্যও করেন। কিন্তু বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানকে জানায় যে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের জন্য পাকিস্তানেরও উচিত একই সাথে নিজেদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা, পাকিস্তান তখন ‘স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’ বলে দ্রুত তার অবস্থান পরিবর্তন করে।[৬১, ৬২]


প্রশ্ন ২. বাংলাদেশ কি হস্তান্তর পরবর্তী বিচারের দাবী করেছিল?


উত্তর:


হ্যা, হস্তান্তরের পরও বাংলাদেশ সরকার ঐ ১৯৫ পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবী অব্যাহত রাখে। ২৮শে জুন ১৯৭৪ ভুট্টর বাংলাদেশ সফরের সময় বঙ্গবন্ধু তার কাছে যুদ্ধাপরাধের বেশ কিছু প্রমাণ হাজির করেন। এর মধ্যে রাও ফরমান আলীর স্বহস্তে লিখিত একটি নোটও ছিল, যাতে লেখা ছিল-
“পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ রঙ বদলে লাল করে দিতে হবে” (The green of East Pakistan will have to be painted red) [৬৩]


যুদ্ধের পর পাকিস্তান যে হামুদুর রহমান কমিশন গঠন করে, সেখানেও বাংলাদেশ গনহত্যার প্রমাণাদি সরবরাহ করে। ১৯৭৪ সালের ২৩ অক্টোবর দাখিলকৃত কমিশনের সম্পূরক প্রতিবেদনে এর প্রাপ্তি-স্বীকার রয়েছে।[৬৪]


প্রশ্ন ৩. পাকিস্তান কি তাদের সৈন্যদের বিচারের কোন উদ্যোগ নিয়েছিল?


উত্তর:


হামুদুর রহমান কমিশন প্রতিবেদনের দ্বিতীয় ভাগে পাকিস্তানী সৈন্য ও তাদের এদেশীয় দোসরদের যুদ্ধাপরাধের বিস্তারিত উল্লেখপূর্বক সুপারিশমালায় কর্তব্য অবহেলার কারনে বেশ কিছু সামরিক কর্মকর্তার শাস্তির সুপারিশ করে। কমিশন, মার্চ থেকে ডিসেম্বর ১৯৭১ সময়কালীন পাকিস্তান আর্মির নৃশংসতা (atrocities), অবাধ নিষ্ঠুরতা (wanton cruelty) ও অনৈতিকতা (immorality) তদন্তে একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন আদালত অথবা কমিশন গঠনের সুপারিশ করে। এ বিষয় তদন্তের জন্য পর্যাপ্ত প্রমান কমিশনের কাছে আছে বলে জানানো হয়। কমিশন এও সুপারিশ করে যে, যেহেতু বাংলাদেশ সরকারকে পাকিস্তান স্বীকৃতি দিয়েছে, সেহেতু প্রয়োজনীয় প্রমানাদির জন্য ঢাকার সহোযোগিতাও চাওয়া যেতে পারে।[৬৫] উল্লেখ্য, কমিশনের এই সম্পূরক প্রতিবেদন দাখিল করা হয় ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর প্রত্যাবাসন পরবর্তী অতিরিক্ত তদন্তের পর, যেখানে ওই ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর অনেকের স্বাক্ষাৎকারও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।


তবে কেন প্রতিশ্রুতি দেবার পর এবং নিজস্ব কমিশনের সুপারিশের পরও পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত এসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার করেনি, তার ব্যাখ্যা এবং বিচারের দাবী পুনর্ব্যক্ত করার নৈতিক ও আইনি সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের অপরাধ যে ক্ষমা প্রার্থনার ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করে তা ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতেই উল্লেখ করা আছে। ফলে পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টিও আবার তুলে ধরা যেতে পারে।


প্রশ্ন ৪. পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়া পযর্ন্ত স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা কি সঙ্গত?


উত্তর:


১৯৭২ সন থেকেই পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী আর স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আইন, প্রক্রিয়া ও ধারা ভিন্ন রাখা হয়েছে। ভারত থেকে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের প্রত্যাবাসনের পরও স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যহত ছিল। ফলে, এখনও এই বিচার স্বাধীন ভাবে অগ্রসর হতে পারে।


গনহত্যায় পাকিস্তানী এবং স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের সম্মিলিত অংশগ্রহন ছিল। যে অন্যায়ে উভয় পক্ষের অংশগ্রহনই অত্যাবশ্যকীয়, সেসব ক্ষেত্রে উভয় পক্ষকেই আলাদাভাবে দোষী স্বাব্যস্ত করা যায়। স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের সহায়তা ছাড়া যেমন পাকিস্তানীদের পক্ষে বাঙালী বুদ্ধিজীবিদের খুজে বের করা সম্ভব হতো না, তেমনি পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের অবর্তমানে হয়তো স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীরা একাজে অংশ নিত না। কিন্তু এ ধরনের সংঘটনশীল ঘটনার (concurrent case) বিচারে এক অপরাধীর অনুপস্থিতি অন্য অপরাধীর বিচারকে বাধা দেয় না।


যেসকল ক্ষেত্রে উভয় যুদ্ধাপরাধী এক সাথে কোন অপরাধ করেছে, সেসব ক্ষেত্রেও যদি প্রমান করা যায় যে উক্ত অপরাধ এক অন্যের সাহায্য ছাড়াও করতে পারতো, সসব ক্ষেত্রেও (sufficient combined causes) তো অবশ্যই, এমনকি যেসব ক্ষেত্রে পাকিস্তানী অথবা স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীরা স্বাধীন ভাবে হত্যা, ধর্ষন বা অগ্নিসংযোগে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছে (direct causation), সেসব ক্ষেত্রেও যে কোন যুদ্ধাপরাধীর বিচার আলাদা ভাবে করা সম্ভব। ফলে, স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া বা না হওয়ার সাথে সর্ম্পকিত নয়।


ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমান করে যে, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ নাজুক ছিল এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার মতন অনুকূল পরিস্থিতি বাংলাদেশের ছিল না। নানামুখী বাধার কারনে বাংলাদেশকে তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার মুলতবি রাখতে হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের প্রত্যাবসন চুক্তি, স্থানীয় সহোযোগিদের (যুদ্ধাপরাধীদের নয়) শর্তসাপেক্ষ সাধারন ক্ষমা অথবা তাদের বিচারের জন্য সংশোধিত আইন ও সংবিধানে কখোনই ভবিষ্যৎ বিচারের পথ রুদ্ধ করে রাখা হয়নি।


লেখক: সাঈদ আহমেদ
ahamed.syeed@gmail.com


তথ্যসূত্র:

১. “Text of Indian Message”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৬/১২/১৯৭১, পৃ- ১৬

২. Reuters, (১৯৭১), “The Surrender Document” দি নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত, ১৭/১২/১৯৭১, পৃ- ১

৩. “Bengalis Hunt Down Biharis, Who Aided Foe”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২২/১২/১৯৭১, পৃ- ১৪

৪. “India Weighs Bengali Plea To Try Pakistani Officials”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৭/১২/১৯৭১, পৃ- ১

৫. “Bangladesh Will Try 1,100 Pakistanis”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ৩০/০৩/১৯৭২, পৃ- ৩

৬. প্রাগুক্ত

৭. “India opens way for Dacca trials”. দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৮/০৩/১৯৭২, পৃ- ১

৮. “India to Deliver 150 P.O.W.'s To Bangladesh to Face Trial”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৫/০৬/১৯৭২, পৃ- ১১

৯. দেখুন এসংক্রান্ত প্রথম আলো খবর এখানে: http://prothom-alo.com/detail/news/53366

১০. পূর্ণাঙ্গ চুক্তিপত্রটি দেখুন http://mea.gov.in/jk/sim-ag.htm

১১. “Pakistan Denies Charge”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৭/০৪/১৯৭২, পৃ- ৬

১২. “Official Reports 2,000 Bengalis Held in Pakistani Jails”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৩/১২/১৯৭২, পৃ- ৩

১৩. প্রাগুক্ত

১৪. “Wave of Bengalis fleeing Pakistan”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১২/১১/১৯৭২, পৃ- ১০

১৫. “4 Pakistani Prisoners Slain”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৯/০৬/১৯৭২, পৃ- ৩৯

১৬. “Bangladesh Will Try 1,100 Pakistanis”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ৩০/০৩/১৯৭২, পৃ- ৩

১৭. Transcript of President Bhutto's Press Conference on Aug 10, 1972. উদ্ধৃত Burke, S.M. (1971). “The Postwar Diplomacy of the Indo-Pakistani War of 1971”, এশিয়ান সারভে, ভলিউম- ১৩, সংখ্যা ১১, (নভে ১৯৭৩)পৃ-১০৩৯

১৮. Weekly Commentary and Pakistan News Digest, ২৪/১১/১৯৭২. উদ্ধৃত Burke (১৯৭১), প্রাগুক্ত

১৯. “ A Veto By Peking” দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৭/০৮/১৯৭২, পৃ- ই৩

২০. “Pakistan to Allow 10,000 to Return to Bangladesh”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৩/১১/১৯৭২, পৃ- ১৫

২১. “India and Bangladesh Offer Plan For End of Deadlock on Prisoners”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৮/০৪/১৯৭৩, পৃ- ৯৭

২২. প্রাগুক্ত

২৩. “Bhutto Threatens to Try Bengalis Held in Pakistan”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৯/০৫/১৯৭৩, পৃ- ৩

২৪. প্রাগুক্ত

২৫. “Mujib Insists Pakistani P.O.W.'s Will Be Tried”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ০৯/০৬/১৯৭৩, পৃ- ৯

২৬. প্রাগুক্ত

২৭. “India-Pakistan Talks Reach Impasse”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৬/০৮/১৯৭৩, পৃ- ৩

২৮. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ধারা ৪৭(৩), দেখুন-http://bdlaws.gov.bd/bangla_pdf_part.php?id=957

২৯. The International Crimes (Tribunals) Act, 1973 (ACT NO. XIX OF 1973), ২০ জুলাই ১৯৭৩, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

৩০. “Mujib Insists Pakistani P.O.W.'s Will Be Tried”, প্রাগুক্ত

৩১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ধারা ৪৭(৩), প্রাগুক্ত

৩২. The International Crimes (Tribunals) Act, 1973 , প্রাগুক্ত


৩৪. “India acts to end p.o.w. deadlock”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ০৪/০৪/১৯৭৩, পৃ- ৭

৩৫. “India and Pakistan Still Differ, Will Resume Talks in New Delhi” , দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ০১/০৮/১৯৭৩, পৃ- ৪

৩৬. প্রাগুক্ত

৩৭. “India to keep PoWs”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৩/০৭/১৯৭২, পৃ- ৩

৩৮. দেখুন বেনজীর ভুট্ট (১৯৮৯) “Daughter of the East”, হ্যামিস-হ্যামিল্টন প্রকাশনি

৩৯. “Bengalis Held in Pakistan Long for Home” , দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ০৫/০৪/১৯৭৩, পৃ- ২

৪০. “Mujib Asks U.N.'s Help on Pakistan Ties” , দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ০৯/০৩/১৯৭৩, পৃ- ১০

৪১. “Bengalis and Pakistanis Begin Exchange Today”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৯/০৯/১৯৭৩, পৃ- ৬

৪২. “600 Bengalis, Pakistanis Freed and Flown Home”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৪/০৯/১৯৭৩, পৃ- ৯

৪৩. “India to release 90,000 Pakistanis in peace accord”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৯/০৮/১৯৭৩, পৃ- ১

৪৪. Pakistan Affairs, ১ মে ১৯৭৩, উদ্ধৃত Burke, S.M. (১৯৭৩). “The Postwar Diplomacy of the Indo-Pakistani War of 1971”, এশিয়ান সারভে, ভলিউম- ১৩, সংখ্যা ১১, (নভে ১৯৭৩)পৃ- ১০৪০

৪৫. “Light in South Asia”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, 27/04/১৯৭৩, পৃ- 36

[৪৬] “Sheikh Mujib holds out for recognition”, দি গার্ডিয়ান, ১৫/০৯/১৯৭২, পৃ- ৩

[৪৭] “Bhutto Given Authority to Recognize Bangladesh”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১০/০৭/১৯৭৩, পৃ- ৮

[৪৮] “Arabs Come Early to Islamic Parley”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৯/০২/১৯৭৪, পৃ- ৫

[৪৯] “Bhutto's bid to wield the oil”, দি গার্ডিয়ান, ২০/০২/১৯৭৪, পৃ- ১৯

[৫০] “Islamic Mission to Dacca Seeks Bengali-Pakistani Reconciliation”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২২/০২/১৯৭৪, পৃ- ২

[৫১] “Last attempt to coax Mujib”, দি গার্ডিয়ান, ২২/০২/১৯৭৪, পৃ- ৫

[৫২] "Pakistan admits that Bangladesh exists as nation”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৩/০২/১৯৭৪, পৃ- ৬৫

[৫৩] প্রাগুক্ত

[৫৪] “Repatriation Is Completed For Bangladesh Nationals”. দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৫/০৩/১৯৭৪, পৃ- ৮

[৫৫] “Trials of PoWs on agenda”, দি গার্ডিয়ান, ৮/০৩/১৯৭৪, পৃ- ২

[৫৬] “Bangla's had bargain”, দি অবজারভার, ৭/০৪/১৯৭৪, পৃ- ৮

[৫৭] Text of the tri-patriate agreement of Bangladesh-Pakistan-India, ধারা ১৩, দেখুনhttp://www.genocidebangladesh.org/?p=196

[৫৮] “Pakistan Offers Apology to Bangladesh”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১১/০৪/১৯৭৪, পৃ- ৩

[৫৯] Text of the tri-patriate agreement of Bangladesh-Pakistan-India, ধারা ১৪, প্রাগুক্ত

[৬০] প্রাগুক্ত, ধারা ১৫

[৬১] “Pakistan will not interfere in Bangladesh's war crimes trial”, ৬/৪/২০১০,www.pakistannews.net/story/620495

[৬২] “Pakistan won't interfere in war crimes trial”, বিডিনিউজ, ৬/৪/২০১০

[৬৩] হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট, দ্বিতীয় ভাগ, অধ্যায় ২।

[৬৪] প্রাগুক্ত।

[৬৫] প্রাগুক্ত।



.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট