...মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে নতুনরূপে আসছে...

This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Liberation War of Bangladesh and Genocide of Innocent Bengali People in 1971. More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

ফেসবুকে আমরা

দুঃখিত, শর্মিলা বোস, গ্রহন করা গেলনা

দুঃখিত, শর্মিলা বোস, গ্রহন করা গেলনা
জ্বিনের বাদশা

পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করুন অথবা অনলাইনে পড়ুন

[লেখাটি 'হাজারদুয়ারী'র ডিসেম্বর ২০০৭ সংখ্যায় আছে]
******************************************
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পলিটিকাল ইকনমিতে পিএইচডি করা ড. শর্মিলা বোস যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যু্দ্ধের ব্যাপারে উৎসাহিত হয়ে রিসার্চ পেপার বা গবেষণা প্রবন্ধ লিখেন, তখন সেটা পড়তে আগ্রহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তারওপর যখন শোনা যায় যে প্রবন্ধটা কনভেনশনাল আইডিয়াগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছে, তখন মানুষ মাত্রেই জানার কৌতুহলটা জন্মাবে যে তিনি কি লিখেছেন। সেইসূত্রেই তাঁর প্রবন্ধটা পড়া, যেটার শিরোনামটা বেশ বড়,
"Losing the Victims: Problems
of Using Women as Weapons in Recounting the Bangladesh War"
(প্রবন্ধটির ইন্টারনেট লিংক http://www.epw.org.in/uploads/articles/11060.pdf এখানে, কৃতজ্ঞতা@ ব্লগার শিমুল, ইফতেখার)।

সত্যি বলতে কি, প্রবন্ধটা পড়ে আমার মনটা ভালো হয়ে গেল। কেন? কারণ আগেই শুনেছিলাম এতে দাবী করা হয়েছিল যে ১৯৭১ এ বাংলাদেশে পাকিস্তানী বর্বর আক্রমণ "অপারেশন সার্চলাইটে" ২ লাখের বেশী নারী ধর্ষিত হয়েছেন বলে যে ধারনাটা করা হয়, সেটা বিরাট অতিরঞ্জনে অভিযুক্ত। প্রফেসর বোস দাবী করেছেন যে সংখ্যাটা অনেক অনেক কম, কয়েক হাজারের বেশী হবেনা। সেজন্যই খুব ভয়ে ভয়ে প্রবন্ধটা পড়া শুরু করি, এত বড় প্রফেসর, তার ওপর এত সরাসরি তিনি উপসংহার টেনে ফেলেছেন, না জানি কি অকাট্য প্রমাণ দেখিয়েছেন। সেজন্যই মনটা ভাল হয়ে গেল, কারণ, এমন কোন অকাট্য প্রমাণ তো দূরের কথা, অকাট্য কোন যুক্তিও দেখলামনা। সত্যি বলতে কি, মাত্র সাত বছরের গবেষণার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই আমার মুখ থেকে শুনতে খুব "ছোটমুখে বড় কথা" ধরনের শোনালেও, এটা বলতেই হচ্ছে যে প্রফেসর বোসের এই গবেষণাকাজটি কোন গবেষণার পর্যায়েই পড়েনা। কেন সেটাই পয়েন্ট বাই পয়েন্ট ভেঙে ভেঙে আলোচনা করব এখানে।

প্রথমেই একটু "অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও হতে পারে" কথাটুকু বলে নিই। বিজ্ঞানই বলুন আর শাস্ত্রই বলুন, এটাকে আজকাল যাচ্ছেতাই ব্যবহার করা হচ্ছে। এ-ফোর সাইজের কাগজে মোটা মোটা দুকলামে ছোট ছোট অক্ষরে ৫/৬ টা চ্যাপ্টারে ভাগ করে একটা প্রবন্ধ লিখেই মানুষ সেটাকে রিসার্চ পেপার হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে। একটা সাধারণ কথাকেও একাডেমিক ফ্লেভার দিয়ে চালিয়ে দেবার জালিয়াতিটা একাডেমিয়াতে যথেষ্ট আগে থেকেই যে শুরু হয়েছে সেটাও সত্য। তবে ইদানিংকার টেন্ডেন্সীটা আসলেই বিপজ্জনক! সিরিয়াস রিসার্চাররা ধারনা করেন, এক্সিস্টিং একাডেমিক জার্নালগুলোতে যে পরিমাণ পেপার প্রকাশিত হয়, তার শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ ভাগই কোন রিসার্চ ওয়ার্কই না। আমি নিজেও কিছু পেপার রিভিউ করেছি, এবং কথাটা যে কি পরিমাণ সত্য সেটা গভীরে না ঢুকলে বোঝা যায়না। এমনও দেখেছি যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজমের একটা এ্যানালাইটিকাল প্রবলেম যেটা কোন এক পাঠ্যবইয়ের অনুশীলনীতে দেয়া ছিল সেটাকে সল্ভ করে, গ্রাফ-ট্রাফ এঁকে পেপার হিসেবে কনফারেন্স কমিটিতে জমা দিয়ে দিয়েছে!!! অথচ একটা পেপার যথেষ্ট পরিমাণ "একাডেমিক ফ্লেভার" বহন করে, আর যখন এই ফ্লেভারটা কোন নিন্মমানের প্রবন্ধেও লেগে যায়, তখন লোকে দেদারসে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে, আর অধিকাংশ মানুষই লেখাটার "হাইলি একাডেমিক" চেহারা দেখে সেখানেই ভেবে নেয় যা লিখেছে নিশ্চয়ই সত্যিই হবে। গবেষণা বিশ্বের ঠিক এই দূর্বলতাকে ব্যবহার করে যাচ্ছে নানান পদের মানুষ, যেখানে সেখানে, যখন তখন -- একটু ভেবেও দেখছেনা খটকা লাগে কিনা। ভাবটা এমন যে, এরকম পেপারের ফর্মায় প্রকাশিত যাবতীয় লেখাই সত্য। অথচ, সত্যি বলতে শতকরা ৯০ ভাগের বেশীর তো প্রয়োজনই নেই, আর সেই ৯০ ভাগের একটা বিশাল অংশ হলো স্রেফ আবর্জনা। ড. বোসের লেখাটাও তেমন একটা প্রচেষ্টা, সম্ভবতঃ পাকিস্তানী কোনগ্রুপ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একটা নিরর্থক আঁতলামোর অপচেষ্টা।

তবে ড. শর্মিলা বোসের এই পেপারটা নিয়ে একটা মজার "রিভার্স ইফেক্ট" টাইপের ব্যাপার ঘটেছে বাংলাদেশে। ড. বোস পরিস্কারভাবেই এই প্রবন্ধে পাকিস্তানী হানাদারদের ব্যাপারে সাফাই গেয়েছেন, বোঝাতে চেয়েছেন যে তারা যুদ্ধ করেছে, যুদ্ধে সাধারণত যেটুকু ক্ষয়ক্ষতি হয় সেটাই হয়েছে, সিস্টেমেটিকালি কোন ক্ষতি করেনি যেটাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বাংলাদেশে এই বক্তব্যকে একেবারে লুফে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরবে জামাত ইসলামী, যেটা এদেশের একমাত্র সংগঠন যেখানে এখনও যুদ্ধাপরাধীরা একত্র হয়ে আছে, এবং যেখানে তারা এখনও সেই ৭১ এর ব্যাপারে কোন ছাড় দেয়না। এই আচরণ দিয়ে তারাই একমাত্র দল যারা এখনও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানপন্থী বাংলাদেশীদের প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছে সমষ্টিগতভাবে। কিন্তু, ড. বোসের কপাল খারাপ আর আমাদের কপাল ভাল যে, তাঁর নামটা পড়েই জামাতীরা আর প্রবন্ধটা উল্টেও দেখবেনা, যেটা দেশের ভেতরের আরো কিছু "ঘটতে পারত" এমন কন্সপিরেসীকে স্বাভাবিকভাবেই জন্মলাভ করতে দেয়নি।

সূচনাটা বিশাল হয়েই গেল, কিছু করার নেই, প্রবন্ধের সমালোচনা লিখতে বসে কিছুটা আবেগপ্রবন হয়ে পড়েছিই, যেহেতু নিজ দেশের ইতিহাস নিয়ে মিথ্যাচার টের পেয়েছিবাকী অংশে একটা একটা করে কারণ দেখাবো, কেন প্রফেসর বোসের প্রবন্ধ হওয়া সত্বেও রিভিউয়ার হিসেবে এটাকে আমি গ্রহন করতে পারছিনা।

১. ত্রুটিপূর্ণ উপাত্ত সংগ্রহপদ্ধতি (সাক্ষ্য- উপাত্ত)
প্রফেসর বোস তাঁর গবেষণাকাজে কিছু ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ভাসাভাসাভাবে দেখলে, একদম সঠিক পদ্ধতি। কিন্তু একটু গভীরে ঢুকে দেখলেই দেখা যাবে,
বাংলাদেশের মানুষদের সাক্ষাৎকারকে তিনি তার রিসার্চের কোন উপসংহারের সাপোর্টে ব্যবহার করেননি। এমনকি বাংলাদেশের কোথায় কোথায় কতজনের সাক্ষাৎকার তিনি নিয়েছেন সে নিয়ে প্রবন্ধে কোন নির্দিষ্ট তথ্যও নেই! শুধু একটা জায়গাতেই তিনি তাঁর বাংলাদেশে সংগঠিত সার্ভের কথা বলেছেন, যেখানে তিনি দাবী করেছেন যে সাধারণ মানুষ ধর্ষনের কথা বলতে আগ্রহী না। অথচ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকজনের বক্তব্য তিনি নিয়েছেন, তাঁদের নামও তুলে দিয়েছেন, তাঁদের উক্তিও তুলে দিয়েছেন। বোঝা যায়, পাকিস্তানী সাক্ষীদের বেলা তিনি খুব সিস্টেমেটিক উপায়ে গবেষণার উপাত্ত জোগাড় ও প্রকাশ করেছেন।
এখন খেয়াল করে দেখুন, ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে, ঘটনার শিকার বাংলাদেশী সাধারণ মানুষ, ঘটনার অভিযুক্ত পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। একজন পলিটিকাল ইকনমির প্রফেসরকে যদি এরপরও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয় যে, "তোমার গবেষণার জন্য তুমি এই সাবজেক্টদের কাছ থেকে যতবেশী পার তথ্য জোগাড় করো", তাহলে তার গবেষনাকে আমি কিভাবে অনুমোদন করব?

২. ত্রুটিপূর্ণ সূত্র-ব্যবহার পদ্ধতি 
প্রফেসর বোস বেশ কিছু ডকুমেন্টও ব্যবহার করেছেন তাঁর গবেষণায়, তবে এখানেও তাঁকে পরিষ্কার পোলারাইজড হতে দেখা গেছে। কেন? তিনি ডকুমেন্টগুলোকে দুটো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন -- প্রথমটা হলো তিনি তাঁর বক্তব্যের সাপোর্ট হিসেবে কিছু ডকুমেন্টকে উদ্ধৃত করেছেন, আর কিছু ডকুমেন্টের বক্তব্যকে তিনি সমালোচনা করেছেন। এখানেও দেখা যায় তিনি সাপোর্টিং ডকুমেন্ট হিসেবে নিলেন হামুদুর রহমান কমিশনের বক্তব্যকে (!) , অথচ সমালোচনা করলেন ব্রাউনমিলার ও নয়নিকা মুখার্জির সুলিখিত আর্টিকেলের কিছু বক্তব্যের! হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট হলো ৭০ এর দশকে সামরিক শাসক নিয়োজিত সরকারী এক কমিশনের বক্তব্য, যেটার বিশ্বাসযোগ্যতার দূর্বলতা নিয়ে পলিটিকাল ইকনমির প্রফেসরের অজ্ঞতা থাকার কথা না। আচ্ছা, তিনি ব্রাউনমিলার আর মুখার্জির পেপারের সমালোচনা করেছেন, ভালো কথা, কিন্তু একাডেমিক কোন পেপারই কি তিনি পেলেননা যেটাকে তিনি তাঁর গবেষণার কাজে সাপোর্টিং ডকুমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে পারতেন? তাঁকে যেতে হলো হামুদুর রহমান কমিশনের বক্তব্যের কাছে? আমার সোশিও-পলিটিকাল জ্ঞান খুবই সামান্য, তাও সেটা দিয়েই এই পেপারকে আমি নাকচ করে দেব, কারণ হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট যে একটা দূর্নীতিগ্রস্থ দূর্বল রিপোর্ট হবে এটা বোঝার জন্য কারো রকেট-সায়েন্টিস্ট হবার দরকার নেই।
কোন প্রতিষ্ঠিত জার্নাল/সংবাদপত্রের সূত্র না দিতে পেরে তিনি আমাদেরকে গিলতে বলছেন পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্র, দেখুন তিনি তার প্রবন্ধে লিখেছেন,
"The government of Pakistan’s White Paper on East Pakistan in August 1971 listed numerous incidents of atrocities including alleged rape and massacre of non-Bengalis by Bengalis all over East Pakistan"
এরচেয়ে হাস্যকর আর কি হতে পারে?

৩. প্রত্যক্ষ বা সরাসরি মিথ্যাচার
প্রফেসর বোসের এই গবেষণা প্রবন্ধে বেশ কিছু মিথ্যে তথ্য পরিবেশিত হয়েছে, তবে খুব চাতুর্যের সাথে। কারণ, তিনি তথ্যগুলো পরিবেশন করেছেন সূত্র দিয়ে ঠিকই, কিন্তু সেটা সর্বজনবিদিত সূত্রগুলো এড়িয়ে (এই আলোচনার ২য় পয়েন্টে ত্রুটিপূর্ণ তথ্যসূত্রের আলোচনাটা হয়েছে)।
সবচেয়ে বড় মিথ্যে তথ্যটি তিনি পরিবেশন করেছেন ৭১ এ বাংলাদেশে "অপারেশন সার্চলাইটে" নিয়োজিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা নিয়ে। যেখানে সুলিখিত সব সূত্রে এই সংখ্যাকে ৯০ হাজারের উপরে বলে ধারনা করা হয়েছে, সেখানে তিনি সেটাকে ৩৪ হাজারের বেশী মানতে রাজী নন। সেজন্য তিনি বরাত দিয়েছেন তৎকালীন সিআইএ চীফের ৬ মার্চ আর ২৬শে মার্চ মিটিঙে করা মন্তব্যকে, যেখানে একটা সাধারণ ধারনা প্রকাশ করেছেন সিআইএ চীফ। ড. বোস কি আর কোন সূত্র পেলেননা? তাঁর কি ধারনা ২৬শে মার্চের পর এদেশে আর কোন পকিসৈন্য আসেনি? অফিশিয়াল ডকুমেন্টেই বন্দীর সংখ্যা যেখানে ৯০ হাজারের বেশী, অধিকাংশ সূত্রই যেখানে নিয়াজীর বাহিনীকে ৯৩ হাজার সৈন্যসমৃদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করেছে, সেখানে প্রফেসর বোস খুব সুকৌশলে সংখ্যাটিকে ৩০ হাজারের কাছাকাছি রাখতে চান। এখানে যে ব্যাপারটা খেয়াল করতে হবে তা হলো, তিনি এই সংখ্যাটিকে শুধু ইতিহাস বর্ণনার খাতিরে উল্লেখ করেছেন, তা কিন্তু নয়। সুষ্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এ মিথ্যাচারটি এই প্রবন্ধে হয়েছে, এবং সেই উদ্দেশ্যটি হলো তাঁর মূল বক্তব্যের জন্য একটি সংখ্যাতাত্বিক ব্যাখ্যা, যেখানে তিনি দাবী করেন যে ৭১ এ পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের বাঙালী সহযোগী বাহিনী, যেমন রাজাকার, আলবদর, শান্তি কমিটি ও অন্যান্য -- এদের দ্বারা সংঘটিত ধর্ষনের সংখ্যা কয়েক হাজার মাত্র। পাকবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ৩৪ হাজার ও তাদের সহযোগী বাঙালীর সংখ্যা ১০ হাজারের মতো ধরে নিয়ে তিনি দাবী করেন,
"Most commentators on sexual violence in East Pakistan do not appear to realise how small a force was attempting to put down a rebellion in a province with a population larger than all the other provinces in West Pakistan put together" 
অথচ, সংখ্যাতাত্বিক বাস্তবতা বলে, ৯০ হাজারের বেশী পাক হানাদার আর অগুনতি রাজাকার ও অন্যান্য সহযোগীরা মিলে নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালীদের উপর ২ লাখের বেশী ধর্ষণ করার কথা।

প্রফেসর বোসের পরবর্তি মিথ্যাচারটি আরো হাস্যকর। এখানে তিনি তাঁর সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন হামুদুর রহমান কমিশনের বক্তব্য যেখানে হামুদুর রহমান দাবী করেছেন যে ব্রিটিশ-অস্ট্রেলিয়ান মেডিক্যাল টিমটি ঢাকায় মাত্র কয়েকশ গর্ভপাত সম্পন্ন করেছেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ক্রমাগত "২ লাখ" শব্দটির অপব্যবহারের কারণেই এই সংখ্যাটি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
"Hamoodur Rahman Commission’s article says, “The falsity of Sheikh Mujibur Rahman’s repeated allegation that the Pakistani troops had raped 2,00,000 Bengali girls in 1971 was borne out when the abortion team he had commissioned from Britain in early 1972 found that its workload involved the termination of only a hundred or more pregnancies”
অথচ বাস্তবতা হলো, তৎকালীন বাংলাদেশে যে ব্রিটিশ, আমেরিকান, অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তারদের দল এ্যাবরশনের কাজ পরিচালনা করেন তাদের সদস্য, আইপিপিএফ চেয়ারম্যান ওডার্ট ভন শুলজ, ড. জিওফ্রে ডেভিস ও অন্যান্যদের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে শুধু ঢাকার ক্লিনিকগুলোতেই ২৩ হাজার এ্যাবরশন সম্পাদিত হয়। এই সংখ্যাকে হামুদুর রহমান কমিশনের মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে কয়েকশ' হিসেবে ঘোষনা করেছে, আর প্রফেসর বোস সেটাই ব্যবহার করেছেন। তিনি কাদের পক্ষে কথা বলতে চাইছেন? যুদ্ধে নিগৃহিত নারীদের পক্ষে? নাকি, যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী হানাদারদের পক্ষে?

৪. পরোক্ষ বা সূক্ষ্ম মিথ্যাচার
প্রফেসর বোসের এই লেখায় প্রত্যক্ষ মিথ্যাচারের সাথে সাথে কিছু পরোক্ষ মিথ্যাচারও চলে এসেছে। এখানে পরোক্ষ মিথ্যাচার বলতে বোঝানো হয়েছে যে, লেখাটি পড়ে পাঠকের অনুমান একটি মিথ্যের দিকে চলে যাবে। যেমন তিনি বলেছেন,
"The rebellion in then East Pakistan (populated mostly by Bengalis) resulted in war between those who wanted to secede to form the independent country of Bangladesh and those who wished to preserve a united Pakistan. There were Bengalis on both sides of this political divide. Many Bengali members of the armed forces or police defected to the rebel cause, but others remained loyal to Pakistan."এখানে তিনি বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের মূলফ্রন্ট জামাত ইসলামি বাংলাদেশের বক্তব্যের পূর্ণ প্রতিফলন করলেন। এই শিবিরটিও ইদানিং এমন একটি ধুয়া তুলছে যে তখন দেশ দুভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল, যুদ্ধটা ছিল গৃহযুদ্ধ। এটা বলা তখনই সম্ভব হতো, যখন দেশের মানুষ সংখ্যার দিক দিয়ে কাছাকাছি দুটো ভাগে ভাগ হয়ে দুটো পক্ষ নিত। বাস্তবে কি হয়েছে সেটা কি ডক্টর বোস কোথাও খুঁজে পাননি? উপরের উদ্ধৃতিতে তাঁর শেষ বাক্যটি অনুবাদ করলে এমন দাঁড়ায়, "অনেক বাংলাদেশী সেনা বা পুলিশ সদস্যই বিদ্রোহীদের দলে ভিড়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু বাকীরা পাকিস্তানের প্রতি অনুগত ছিলেন" এই বাক্যটি পড়লে হঠাৎ একজনের মনে হওয়া কি স্বভাবিক না যে আমাদের বাঙালীদের বেশীরভাগেরই পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য ছিল? এটা ভীষন রকমের চাতুর্য। এই একটি উদ্ধৃতির মাধ্যমে তিনি পরোক্ষভাবে ৭১ এর প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার পক্ষ আর বিপক্ষ শক্তিকে প্রায় সমান বা কাছাকাছি সংখ্যার বলে পরিবেশন করলেন, যেটা থেকে যুদ্ধটাকে দেশের দুটো রাজনৈতিক ফ্রন্টের মাঝে গৃহযুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করার একটা প্রয়াস যে কেউ পেতে পারে। তদুপরি, উপরের বক্তব্যে তৎকালীন পূর্ব বাংলার জনগনের মতামতের প্রতিফলনও ঘটেনা।

প্রবন্ধের আরেকটি জায়গায় তিনি যুদ্ধে ধর্ষিতা নারীদের কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন,
"The available material shows that the victims of rape were Hindu and Muslim, Bengali, Bihari and West Pakistani" -- যেখানে তিনি সব ভিকটিমকে এককাতারে ফেলে দিয়েছেন। যদিও বিহারী হোক বা পাকিস্তানী হোক আর বাঙালী হোক, ধর্ষণ সমানমাত্রার অপরাধ, কিন্তু এই প্রেক্ষাপটে বক্তব্যটি পড়লে মনে হবে যে ৭১ এ সবপক্ষই সবপক্ষকে "কমবেশী" নির্যাতন করেছে, যেটা তিনি সুচতুরভাবে পাঠকের মনে প্রোথিত করতে চেয়েছেন।

এরকম পরোক্ষ মিথ্যাচার কোনভাবেই প্রত্যক্ষ মিথ্যাচারের চেয়ে কম ক্ষতিকর নয়।

এপর্যন্ত যে চারটি দিক আলোচনা করা হয়েছে তাতে প্রফেসর বোসের ভুলগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হয়েছে। অবশ্যই যেকোন বিষয়েই একজন গবেষক গবেষণাকাজ (পরীক্ষণ, নিরিক্ষণ বা তথ্যসংগ্রহ যেটাই হোক ) শুরু করার আগেই একটি ধারনা মনের মধ্যে পুষে রাখেন, এবং তাঁর সকল ব্যাখ্যাকে তিনি সেই ধারনার দিকে নিয়ে যেতেই পছন্দ করেন। তবে এক্ষেত্রে প্রফেসর বোসের মতো জ্ঞানী ব্যাক্তির মনোভাবকে সেরকম নির্দোষ গবেষকের ভুল হিসেবে গ্রহনের চেয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ধারণা করাই বাস্তবসম্মত বলে মনে করি। তবে প্রফেসর বোস শুধু প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ মিথ্যাচার বা দূর্বল সূত্রের আশ্রয়ই নেননি, প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে পাঁচজন সাক্ষ্যদাতার বক্তব্যকে মিথ্যে হিসেবে দেখাতে গিয়ে তিনি যে যুক্তির আশ্রয় নিয়েছেন সেগুলোর মধ্যেও বেশকিছু যুক্তি খুবই দূর্বল। তদুপরি বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য পড়ে মনে হয়েছে তিনি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত নন, অর্থাৎ সেবিষয়ে যথেষ্ট পড়াশোনা না করেই তিনি প্রবন্ধটি লিখে ফেলেছেন। পরবর্তী পর্বে সেবিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব।
ড. বোস তাঁর প্রবন্ধে পাঁচজন বাংলাদেশী প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ব্যবহার করেছেন, এবং এই পাঁচটি বিবরণকে দূর্বল হিসেবে দেখিয়ে তিনি উপসংহার টেনেছেন যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস সংকলনে যে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য/বক্তব্য নেয়া হয়েছে তার অধিকাংশেরই বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এখানে যে বিষয়টি তিনি অপরিস্কার রেখেছেন, তা হলো, ঠিক কিভাবে তিনি এই পাঁচজনের বক্তব্যকে তাঁর প্রবন্ধের সাবজেক্ট হিসেবে নির্বাচন করেছেন। এটা কি এমন যে তিনি স্বাধীনতার ইতিহাসের সংকলন যাবতীয় বই থেকে যেকোন পাঁচটি সাক্ষ্যকে প্রতঃমে বাছাই করেছেন, এবং তারপর সেগুলোকে পরীক্ষা করেছেন? নাকি তিনি কয়েকশ' সাক্ষ্য পড়ে শুধু এই পাঁচটিতেই অসঙ্গতি পেয়েছেন বলে এগুলোকে তুলে ধরেছেন? যেকোনটিই তো হতে পারে। একজন গবেষক এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে ধোঁয়াটে করে উপস্থাপন করেছেন কেন?
ড. বোসের প্রবন্ধে উপস্থাপিত এই পাঁচটি সাক্ষ্যকে মিথ্যে বা সন্দেহজনক প্রমাণ করতে গিয়ে তিনি যে যুক্তিপদ্ধতি অনুসরন করেছেন সেখানেও আমার আপত্তি আছে। আমরা জানি যে লেখক আর পাঠকের মাঝে একটা "পারসেপশন ডিফারেন্স" সবসময়েই থাকে, এবং সেই ডিফারেন্সটুকুর কারণে লেখক যা বুঝিয়েছেন পাঠক তা নাও ধরতে পারেন। সেজন্যই ৩৫ বছর আগে দেয়া এরকম সাক্ষ্যকে বিচার করতে গেলে তাঁর উচিত ছিল এই সাক্ষ্যদাতাদের অথবা সাক্ষ্যগ্রহীতাদের সাথে যোগাযোগ করে ক্রসচেক করে নেয়া। যেজন্য একথাটি বলছি, তা হলো, ডক্টর বোস তার প্রবন্ধে উপস্থাপিত পাঁচটি সাক্ষ্যপ্রমাণে যে অসঙ্গতিগুলো ধরেছেন তার সবগুলোকেই ঐ "পারসেপশন ডিফারেন্স"-জনিত বলে মনে হয়েছে। এটা এজন্যও হতে পারে যে, সত্যিকারের কোন অসঙ্গতি পাননি বলেই তিনি এরকম সুক্ষ্ম অসঙ্গতিগুলোকে তুলে ধরেছেন, যাতে কনফিউশন তৈরী হয়। অনেকটা গায়ের জোরেই এই পাঁচটি বক্তব্যকে মিথ্যে হিসেবে দেখিয়ে তিনি দাবী করে ফেলছেন যে ৭১ এ রেপভিকটিমের সংখ্যা ২ লাখ তো নয়ই বরং কয়েক হাজার মাত্র!
ঠিক কোন লজিকে পাঁচটি মাত্র বিবরণকে দুর্বল হিসেবে (তাও গায়ের জোরে, এই লেখারই পরবর্তী অংশে সে বইষয়ে বিশদ আলোচনা করা হবে) দেখিয়ে একজন এরকম একটি বিশাল ঘটনার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেন সেটা দূর্বোধ্য।

যে যুক্তিগুলো দিয়ে তিনি পাঁচটি বক্তব্যকে খন্ডন করতে বা দূর্বল হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন, সেই যুক্তিগুলো এখানে আলোচনা করব। পাঠকমাত্রেই বুঝতে পারবেন, এধরনের যুক্তি আদালতে বাজে উকিলরা ব্যবহার করেন সাক্ষ্যদাতা/বাদী/বিবাদীকে মানসিকভাবে দূর্বল করে দিতে; এধরনের যুক্তি একাডেমিয়াতে ব্যবহার করলে সেটা শুধু দুর্গন্ধই ছড়াবে।

৫. রাবেয়া খাতুনের বক্তব্যের সাপেক্ষে দুর্বল যুক্তি
প্রথমজন, রাবেয়া খাতুনের বক্তব্যের ব্যাপারে তিনি লিখেছেন,
"I asked an eminent Bangladeshi and a strong supporter of the liberation movement to read this account and tell me what he made of it. He opined that it was a “fabrication”, commenting that the parts about women hanging by their hair from iron rods for days on end “defied the laws of science”.
Being a busy police headquarters in the capital city, whatever happened at Rajarbag would have had many witnesses.
The language is not what would be used either by illiterate sweepers or by educated Bengalis in everyday conversation."

রাবেয়া খাতুন তাঁর সাক্ষ্যে রাজারবাগ পুলিশ কম্পাউন্ডে সংঘটিত নারী নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দিয়েছেন, যেখানে তিনি বলেছেন যে কলেজপড়ুয়া বা গৃহবধু ধরনের মেয়েদের ধরে নিয়ে আসা হতো, ধর্ষণ করা হতো এবং দিনের বেলা তাদের সবাইকে বারান্দার রেলিঙে চুল বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হতো। অন্য দুজন পুরুষ প্রত্যক্ষদর্শীও একই বক্তব্য দিয়েছেন। প্রফেসর বোস দাবী করেছেন, যেহেতু একটা মানুষকে চুল রেলিঙে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা যায়না, কারণ তাহলে সে কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যাবে, তাই রাবেয়ার বক্তব্য মিথ্যে! হ্যাঁ, হতে পারে, অতিরঞ্জন এ বক্তব্যে আছে সেটা আমিও স্বীকার করি। কিন্তু ব্যাপারটা কি এমন নয় যে এই চুল রেলিঙে বেঁধে ঝুলিয়ে রেখে মেরে ফেলার ঘটনা কয়েকটি ঘটেছে এবং তা দেখে যে মানসিক আঘাত রাবেয়া খাতুন পেয়েছেন সেই আঘাত থেকেই তাঁর বিবরণে ব্যাপারটা ভয়াবহভাবে অতিরঞ্জিতভাবে উঠে এসেছে? একজন মনোবিজ্ঞানী তো ব্যাপারটা সেভাবেই দেখবেন। এই অতিরঞ্জন কোনভাবেই প্রমাণ করেনা যে রাজারবাগ পুলিশলাইনে অসংখ্য নারী নির্যাতিত হয়নি; বরং এই প্রসঙ্গে ড. বোস যে পাকিস্তানী অফিসারের সূত্র ব্যবহার করেছেন সেই অফিসার রাজারবাগ পুলিশ লাইনে মাত্র একরাত ছিলেন কাটিয়েছেন! আর রাবেয়া খাতুন কাটিয়েছেন নয়মাস। কার বক্তব্যকে আপনি গ্রহন করবেন?

প্রফেসর বোস আরো দাবী করেছেন যে রাজারবাগ পুলিশলাইন শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত, তাই এখানে কিছু ঘটলে অনেকেরই জানার কথা। আসলেই কি তাই? তিনি কি একবার এসে ঘুরে গেছেন? বাইরের রাস্তা থেকে এই কম্পাউন্ডের কতটুকু দেখা যায়?সেনাবাহিনী যখন দখল করে বসে, এই কম্পাউন্ডের ভেতরে সাধারণ জনগনের যখন চলাচল নিষিদ্ধ করে, তখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ভেতর কি হচ্ছে তা জানা খুবই কঠিন। আর সেই মুক্তিযুদ্ধের দিনে সাধারণ নিরীহ মানুষ এরকম স্থানগুলোর ব্যাপারে কৌতুহল না দেখিয়ে বরং এড়িয়েছেই বেশী।

প্রফেসর বোস রাবেয়া খাতুনের টিপসই থেকে ধারনা করেছেন যে কেউ একজন মিথ্যে বিবরণ লিখে তাঁর সই নিয়েছেন। আমি যদি উল্টো প্রফেসর বোসকে জিজ্ঞেস করি যে 'একজন লেখাপড়া না জানা লোক তাহলে কিভাবে সাক্ষ্য দেবে?' অথবা, 'সাক্ষ্যপ্রদান করানোর জন্য একজনের কি লেখাপড়া জানতেই হবে?' -- তখন তিনি কি বলবেন? তাহলে এমন খেলো যুক্তি ব্যবহারের উদ্দেশ্যই বা কি?

সবশেষে তিনি বলেছেন, বাকী যে দুজন পুরুষ একই সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের সাক্ষ্য আর রাবেয়া খাতুনের সাক্ষ্যের মাঝে ক্রসচেক করে কোন অমিল না পাওয়া গেলেও, সাক্ষ্যগুলো বলা হয়েছে খুব শুদ্ধ ভাষায়, যেটা সাক্ষ্যদানকারীর কথ্য ভাষার সাথে মিলে যাবার কথা না। ড. বোস, এটা তো সর্বজনবিদিত যে, সাক্ষ্যগ্রহনের পর সেটাকে প্রমিত বাংলায় গ্রহনকারী লিপিবদ্ধ করতেই পারেন। তৎকালীন বাংলাদেশের সরকার বা প্রশাসন তো আর এখনকার কর্পোরেটদের মতো এত টিপটপ ছিলনা যে "সবসাক্ষ্য হেন ফরম্যাটের হতে হবে" টাইপের প্রটোকল ব্যবহার করেছে। যে যেভাবে পেরেছে দিয়েছে সাক্ষ্য, মনের ভালবাসা আর আক্রোশ থেকে, সেটাকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে সত্যকে টিকিয়ে রাখার জন্যআপনি কি পড়তে পড়তে সেটা টের পাননি? আর বাংলাদেশের সরকারী কার্যক্রমে লিখিতভাষার ব্যাপারে একটা কড়াকড়ি এখনও বিদ্যমান, ৩৫ বছর আগে যেটা নিঃসন্দেহে আরো নিয়মতান্ত্রিক ছিল। তাই আমি ধারনা করছি যে সাক্ষ্যগ্রহনকারী সাক্ষ্যদাতাদের বক্তব্যকে শুদ্ধ বাংলায় রূপান্তর করে লিখে রেখেছেন।

৬. ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনীর বক্তব্যের সাপেক্ষে দূর্বল যুক্তি
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনীর বক্তব্যেও তিনি আগের মতই দূর্বল কিছু ডিসক্রিপেন্সী বা অসঙ্গতি তুলে ধরার প্রয়াস দেখিয়েছেন। তিনি তুলে ধরেছেন যে ফেরদৌসী যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী সেনাকর্তাদের মন জুগিয়ে চলেছেন, যেটার ফলাফল হয়েছে পাকিস্তানী সেনাকর্তারা ফেরদৌসীকে উপভোগ করেছেন। বক্তব্যের একটি জায়গায় ফেরদৌসী বলেছেন যে আলতাফ করিম (যিনি ফেরদোয়সীকে প্রেম নিবেদন করেন) নামের একজন মেজরই ছিল শুধু ভদ্র, বাকীরা সব নরপশু। প্রফেসর বোস ফেরদৌসীর লেখার সূত্র ধরে আলতাফ করিমের বসের নাম বের করেন, ব্রিগেডিয়ার হায়াত, এবং দেখান যে ব্রিঃ হায়াতকে যখন আলতাফ করিমের নাম বলা হলো, তিনি এই নামের কোন মেজরকে মনে করতে পারলেননা
আমি নিশ্চিত না একজন ব্রিগেডিয়ার যতজন মেজরের সাথে কাজ করেছেন সবাইকেই মনে রাখতে পারেন কিনা? বিশেষ করে, আমি ধারনা করতে পারি যে ৭১ এর সময় ব্রিঃ হায়াত যথেষ্ট বয়স্ক ছিলেন, ৩৬ বছর পর এখনকার বৃদ্ধের পক্ষে এই মনে করতে না পারাটা কিভাবে এতবড় প্রমাণ হিসেবে একটি একাডেমিক পেপারে স্থান পায়?
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনীর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, অস্তিত্বের সংগ্রামে অনিচ্ছা সত্বেও তিনি পাকিস্তানি সেনাকর্তাদের সাথে সুসম্পর্ক রেখেছেন, অপমান সহ্য করেছেন। এপ্রসঙ্গেই তাঁর আরেকটি বক্তব্যকেও খুব দূর্বলভাবে সন্দেহ করেছেন প্রফেসর বোস, যেখানে তিনি বললেন, (যখন বাংলাদেশ জিতে গেল যুদ্ধে তখনকার কথা)
"She(Ferdousi) was warned by a non-Bengali clerk in her office that she would be killed and should flee. Ferdousi makes much of the threat to her life – but as Bangladesh became independent, only those who were perceived to have willingly fraternised with the Pakistani regime were at risk of the wrath of freedom fighters, not victims of the regime"
এখানে প্রফেসর বোস বলতে চাইলেন যে যদিও স্বাধীন বাংলাদেশে
শুধু স্বেচ্ছায় পাকিস্তানীদের সহায়তাকারীদেরকেই শাস্তি দেয়া হয়েছে, তবুও অনিচ্ছায় পাকিস্তানীদের সাথে থাকা ফেরদৌসী নিজেকে "স্বাধীনতাকামীদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন" হিসেবে দেখিয়েছেন। যেহেতু বাঙালীরা তাঁর কোন ক্ষতি করেনি, সেহেতু তিনি তাঁর বক্তব্যে এই ভয়কে অতিরঞ্জন করেছেন। অতএব এই বক্তব্য গ্রহনযোগ্য না।
এটা কিভাবে সম্ভব?? ফেরদৌসী নিশ্চয়ই সেই মুহূর্তে জানতেননা যে তাঁর বিচার করা হবেনা যেহেতু তিনি অনিচ্ছায় নিরুপায় হয়ে পাকিস্তানীদের সাথে ছিলেন। তাই তিনি তো ভয় পাবেনই, তাঁর এই ভয়ের কথা তো তিনি লিখবেনই। এতে সমস্যা কোথায়?

৭. আখতারুজ্জামান মন্ডলের বক্তব্যের সাপেক্ষে দূর্বল যুক্তি
প্রফেসর শর্মিলা বোস এরপর আরেকজন সাক্ষ্যদাতা আখতারুজ্জামান মন্ডলের সাক্ষ্যকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। জনাব মন্ডল তাঁর বিবরণে তাঁদের ভুরুঙ্গামারী যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ভুরুঙ্গামারি ক্যাম্পের পাকসেনাদের সাথে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর আড়াইদিনের যুদ্ধের পর জায়গাটি মুক্ত হয়। জনাব মন্ডল তাঁর বিবরণে লিখেন যে ক্যাম্প দখলের পর সিও অফিসের পাশের বাংকারে পাকিস্তানী গ্রুপের প্রধান আতাউল্লাহ খানের লাশ পাওয়া যায়, এবং চরিত্রহীন আতাউল্লাহ মৃত্যুর সময়ও একজন বাঙালী নারীকে জড়িয়ে ছিল।
ড. বোস তাঁর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এই বলে যে, আতাউল্খাহ খানকে জনাব মন্ডল আগে চিনতেন কিনা সেকথা তিনি কোথাও উল্লেখ করেননি, কাজেই জনাব মন্ডল কিভাবে আতাউল্লাহ খানের লাশ চিনলেন? এই প্রশ্নটি শিশুসুলভ এই জন্য যে, জনাব মন্ডল না চিনলেও শত্রুপক্ষের পতনের পর তাদের প্রধানকে সনাক্তকরণের অনেক উপায় আছে। হয়ত আখতারুজ্জামান মন্ডল অন্যকারো মাধ্যমে জেনেছেন, অথবা হয়ত আরো পরে জেনেছেন যে ঐ লোকটিই আতাউল্লাহ খান। আখতারুজ্জামান মন্ডল আতাউল্লাহ খানকে আগে দেখেননি বলে তার লাশ সম্পর্কে কিছু বলতে পারবেননা, এ কেমন যুক্তি?
একইসাথে ড. বোস বিভিন্ন পাকিস্তানী সেনাদের বরাত দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে আতাউল্লাহ খান একজন চরিত্রবান লোক ছিলেন, নারীর সম্ভ্রম নিয়ে পাশবিকতা করার মতো মানুষ তিনি না। আমার কথা হলো, নয়মাস ধরে হেন অপরাধ নেই করেনি এরকম একটি বাহিনীর সদস্যদের বরাত কতটুকু গ্রহনযোগ্য? প্রফেসর বোস আরো বলেছেন যে আড়াইদিন একটানা চলা যুদ্ধে একজন নারীর দেহ আঁকড়ে ধরে মারা গেছেন আতাউল্লাহ খান -- এটা ভাবা অসম্ভব (বেগার'স বিলিফ!!)
কথা হলো, প্রফেসর বোস কি জানেননা, একটানা যুদ্ধের মানে হলিউড মুভির সিন নয় যেখানে দুই আড়াইদিন ধরে ননস্টপ ফায়ারিং হয় আর সবাই নিজের জান বাঁচানো নিয়ে ব্যস্ত থাকে; অবশ্যই দুই পক্ষ অবস্থান নিয়ে সময় সুযোগমতো আক্রমণ করেছে। চরিত্রহীন পাকিস্তানী সেনাকর্তাদের পক্ষে সেরকম মুহূর্তে নস্টামি করা একশ ভাগ অসম্ভব -- এটাই বরং মানা কঠিন।

৮. সংখ্যাতাত্বিক ম্যানিপুলেশন
প্রফেসর বোস তাঁর সদ্য আবিস্কৃত থিওরীটিকে প্রমাণ করতে চেয়েছেন এভাবে --
ড. নীলিমা ইব্রাহীমের "আমি বীরাঙ্গনা বলছি" বইটিতে ড. নীলিমা সাতজন বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এঁদের সবাইকে কোন না কোন সেনাক্যাম্প থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁরা সাতজনই বলেছেন যে তাঁদের সাথে আরো বেশ কিছু বীরাঙ্গণা সেনাক্যাম্পে ছিলেন, যেখানে সংখ্যাটা ৫-৬ থেকে ২০-২৫ পর্যন্ত ছিল। প্রফেসর বোস এঁদের বক্তব্যে কোন উকিলীয় খুঁত ধরতে পারেননি, কিন্তু এই তথ্যগুলো দিয়ে এক চমৎকার অংক কষে ফেলেছেন। সাতজন সাক্ষ্যদাতার ক্ষেত্রে তিনি এই সংখ্যা (মোট নারীবন্দীর সংখ্যা) গড় করেছেন ১৩-১৪ জনায়। অর্থাৎ ৭ পূরণ ১৪ সমান প্রায় একশ' জনের হদিস তিনি স্বীকার করেছেন। তারপর তাঁর বিখ্যাত উপসংহার টানলেন এই বলে যে এই ১০০ জন যদি মোট ধর্ষিতার ১০ পার্সেন্ট হয়, তাহলে মোট ধর্ষিতা ১০০০, যদি ১ পার্সেন্ট হয় তাহলে মোট ধর্ষিতা ১০০০০, কিন্তু কোনভাবেই দুই লাখ সংখ্যাটাকে স্বীকার করে নেয়া যায়না। আমি বলি, এই সংখ্যাটা কেন ০.১ পার্সেন্ট নয়, ড. বোস? সেটা হতে বাঁধা কোথায়, সংখ্যাটা লাখের ঘরে চলে যায় -- এটাই কি বাঁধা?

শুনুন প্রফেসর বোস, আপনার ভুরুঙ্গামারীকে স্যাম্পল হিসেবে ধরেই হিসেব করুন, যদি ৯০ জনের মতো পাকসেনা থাকে সেখানে তাহলে সারা বাংলাদেশ জুড়ে প্রায় হাজারখানেক সেনাক্যাম্প ছিল। স্বাধীনতার প্রাকমুহূর্তে ভুরুঙ্গামারী ক্যাম্পে পাওয়া যায় ২০ জনের মতো বীরাঙ্গনাকে, অর্থাৎ ঠিক স্বাধীনতার সময়েই শুধু গড়ে বিশ হাজারের মতো নারীকে উদ্ধার করার কথা। সারা নয় মাসজুড়ে এভাবে তারা অসংখ্য বাঙালী নারীকে ক্যাম্পে এনেছে, মেরে ফেলে দিয়েছে। একইরকম অত্যাচার করেছে গ্রামে গ্রামে তাদের দোসর রাজাকার/আলবদর/শান্তিকমিটি -- এরা সবাই। তারওপর, পাকিস্তানী বাহিনী অনস্পট রেপ করেছে অসংখ্য, যেমন মানুষের বাড়ীঘর রেইড করে। মোট সংখ্যাটা দুই লাখ পেরিয়ে যেতে পারে বলেই অধিকাংশ বিষেশজ্ঞের ধারনা।
আপনি আবার পরিস্কার ভাবে বলবেন কি, ঠিক কোন তথ্য বা ক্লু'র ভিত্তিতে আপনি এমন একটি সংখ্যাকে "কয়েক হাজার মাত্র" বলতে চান?

প্রফেসর বোসের প্রবন্ধটির যেকথাটার সাথে আমি পুরোপুরি একমত সেটা হলো এই যেধর্ষিতার সংখ্যা বাড়িয়ে বললে আসলে সত্যিকারের ধর্ষিতাদের অপমান করা হয়, কারণ তাতে এমন একটা নির্দেশনা থাকে যে আমাদের আরো ভিকটিম চাই, নাহলে ঠিক জমবেনা। কিন্তু, ৭১ এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাপেক্ষে একথাটা কতটুকু খাটে? ড. বোস, উল্টো করে যদি বলি, ধর্ষিতার সংখ্যা দু লাখ হবার পরও আমরা যদি লজ্জায় চোখ ঢেকে সংখ্যাটাকে "কয়েক হাজার" বলে প্রলাপ বকি, তখন কি ধর্ষিতাদের অপমান করা হয়না? তখন কি তাঁদের সবাইকে উদ্দেশ্য করে এটাই বলা হয়না যে "তোমার ক্ষতি হয়েছে তাতে আমার কি, আমার তো কোন ক্ষতি হয়নি!"?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট