...মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে নতুনরূপে আর্বিভূত হবে...

This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Liberation War of Bangladesh and Genocide of Innocent Bengali People in 1971. More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

ফেসবুকে আমরা

তথ্য’বিনা মিথ্যা বোনা - কৌস্তুভ

তথ্য’বিনা মিথ্যা বোনা

কৌস্তুভ


পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করুন অথবা অনলাইনে পড়ুন

চল্লিশ বছর হয়ে গেল তবু কিছু লোক এখনও একাত্তরে যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে খোঁচাখুঁচি চালিয়ে যায়। এইসব নাস্তিক-ইসলামবিরোধী-আওয়ামীলীগার-ভারতের দালাল এখনও প্রমাণ করার চেষ্টা করে চলেছে যে তাদের ‘মুক্তিযুদ্ধে’ নাকি তাদের তিরিশ লাখ লোক মারা গেছিল। একথা যে সর্বৈব মিথ্যা, তা এটা স্মরণ করলেই বোঝা যাবে – প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলেছিলেন, “Kill 3 million of them and the rest will eat out of our hands” – তাই বাংলাদেশ যে স্বাধীন হয়ে যেতে পেরেছিল, এটাই যথেষ্ট প্রমাণ যে দয়ালু পাকিস্তানি সেনারা তাদের তিন মিলিয়ন ছুডুভাইকে আসলে মেরে উঠতে পারেনি।
তবুও ব্যাটারা থামে না, তাদের নির্লজ্জ মিথ্যাচার চালিয়েই যায়। তাদেরকে ডাউন দেবার জন্য কিছু কট্টর প্রমাণওয়ালা বিপরীত প্রোপাগাণ্ডার দরকার পড়েছে। এক শ্রদ্ধেয় বড়ভাই আমাকে বোসম্যাডামের বইটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এর চেয়ে নিরপেক্ষ, বাস্তবনিষ্ঠ অনুসন্ধানপূর্ণ বই আজকাল পাওয়াই অসম্ভব, এবং এটা অকাট্যভাবে আমাদের কথা প্রমাণ করে দিয়েছে; আমি যেন এটা নিয়ে কিছু লিখি যাতে ঈমানদার ভাইবোনেরা ব্যাপকহারে শেয়ার দিতে পারেন।
এখন শ্রীমতী শর্মিলা বোসের পরিচয় দেবার মত ধৃষ্টতা করার কোনো প্রয়োজনই নেই। তিনি এই উপমহাদেশের সবচেয়ে সফল, বিখ্যাত এবং তথ্যনিষ্ঠ রাজনীতি-গবেষক। তাঁর খ্যাতিকে সম্মান করতে তাঁর বাল্যক্রীড়াভূমি কলকাতা শহর সম্প্রতি তাদের একমাত্র বিমানবন্দরটির নাম পরিবর্তন করে তাঁর প্রয়াত দাদামশাই সুভাষ বোসের নামে রাখে, যিনি ভারতের মুক্তিযুদ্ধে কিছু টুকটাক কাজ করেছিলেন। অতএব বাংলাদেশের ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নিয়ে এই বাঙালি মহিলা তো বইটই লেখার অধিকার রাখেনই।
এই মহীয়সী মহিলার হার্ভার্ডে এক পুস্তকালোচনা অনুষ্ঠানে কিছু বদমাশ মানুষজনের প্রশ্নবাণে উত্ত্যক্ত হয়েছিলেন তা পড়েছিলাম (বলাই বাহুল্য, আমরা জানতে পেরেছিলাম যে ওই অনুষ্ঠানের পোস্টার পড়ামাত্রই হার্ভার্ডজুড়ে যে চাঞ্চল্য দেখা গিয়েছিল, তা অভূতপূর্ব। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিল গেটস ভাষণ দিতে আসার সময়ও এহেন উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায় নি। ফলে, লাইব্রেরিতে তাঁর বইটির একমাত্র কপিখানি শেলফে ক্ষণিকের তরেও ফেরত আসার সুযোগ পাচ্ছিল না)। লেখিকা ১৯৭১-এর বাংলাদেশ যুদ্ধের উপর তাঁর বইটির সম্পর্কে সেই অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তিনি ‘তাঁর প্রাপ্ত তথ্যাদির থেকে নিহত বাঙালিদের সংখ্যার একটা রেঞ্জ এস্টিমেট করেছেন (কনফিডেন্স ইন্টারভাল), যে নিহতের সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে এক লাখের মধ্যে, ৯০% প্রোবাবিলিটি সহ।’ আমার কাজ হবে ওনার বই খুঁজে এই কথাগুলো এবং তার পেছনের তথ্যপ্রমাণগুলো গুছিয়ে লেখা। ওনার মতে মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ নিহত হবার কাহিনী কেবল এক বৃহৎ গাঁজাখুরি। দুপক্ষের পারষ্পরিক হানাহানিতে পাকিস্তানের উপর অন্যায় কলঙ্ক চাপিয়ে দেওয়ার জন্য এ এক নেহাতই প্রোপাগাণ্ডা। ত্রিশ লক্ষের সপক্ষে ভারত বা বাংলাদেশের হাতে কোনোই তথ্যপ্রমাণ নেই, একাত্তর থেকে চলে আসা এই প্রবচন কেবল তথ্য'বিনা বোনা এক মিথ্যার জাল, যা ছিঁড়ে ফেলার সময় হয়েছে। আসুন, আমরা বৈদূর্যমণির সমান নিষ্কলঙ্ক নিটোল সেইসব হিসাব পাঠ করে কিছু শেখার চেষ্টা করি।
********* পর্ব ১ *********
যে কথা আমরা বারবারই বলে আসছি, সে কথাই ওনার বইতেও দেখতে পাই, যে তিরিশ লাখের কথাটা আসলে মুজিবের মুখচলতি বলেই অকাট্য হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে, যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানের বন্দী অবস্থা থেকে প্লেনে ফেরার সময় ওনাকে যেটা বলা হয়েছিল ফিরে সাংবাদিক সম্মেলনে উনি সেটাই দুম করে বলে দেন, “I discovered that they had killed three million of my people”, কোনো বিচার-বিবেচনা ছিল না সেটার পেছনে। এ সম্বন্ধে বোসম্যাডাম একটা বই থেকে উদ্ধৃতি দেন,
“Examination of the available material on the 1971 war in both Bengali and English showed that while the allegation of ‘genocide’ of ‘three million Bengalis’ is often made–in books, articles, newspapers, films and websites–it is not based on any accounting or survey on the ground.”
বস্তুত, ত্রিশ লাখের দাবির পেছনে আসলে ওদের কোনো পাক্কা তথ্যপ্রমাণই নেই। তাই কেউ কেউ হিসেব দেখাতে চায়, যে গড়ে একজন পাকিস্তানি সেনা দশদিনে মাত্র একজনকে হত্যা করলেই মোট সংখ্যা দু-তিন মিলিয়ন হওয়া সম্ভব। কিন্তু বোসম্যাডাম পাক সর্বাধিনায়ক নিয়াজিকে উদ্ধৃত করে (অতএব অকাট্য) বলেছেন যে যুদ্ধবন্দী পাকিস্তানী ৯৩ হাজার হলেও সেনা ছিল মাত্র ৫৫ হাজার। (রাজাকারের সংখ্যা এখানে চেপে যেতে হবে)। এরা ওই হত্যা’হারের পেছনে জাতিসংঘ থেকেও উদ্ধৃতি দেয়, “Among the genocides of human history, the highest number of people killed in lower span of time is in Bangladesh in 1971. An average of 6000 (six thousand) to 12 000 (twelve thousand) people were killed every single day” – কিন্তু সবাই জানে যে এসব লেখা তখনকার প্রচলিত ভারত-বাংলাদেশের প্রচারিত গল্পের উপর ভিত্তি করেই।
কেউ কেউ জনসংখ্যার হিসেব করে দেখাতে চান যে ওই সময় পূর্ব পাকিস্তান ও পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা থেকে ওই দুই-তিন মিলিয়ন পরিমাণ লোকই কম দেখা যায়। কিন্তু এর মধ্যে যুদ্ধের সময় কম মৃত্যুহার, বিহারী হত্যার সংখ্যা, ভারতে উদ্বাস্তুদের সংখ্যা, হিসাবের পদ্ধতিতে ভুল ইত্যাদি অনেক রকম অভিযোগও সহজেই তোলা যায়।
এসব ছেঁদো কথা ফেলে চলুন দেখি কিছু অকাট্য তথ্যপূর্ণ কথাবার্তা, বোসম্যাডামের বই থেকে।
********* পর্ব ২ *********
বোসম্যাডামের পুস্তক শুরু হয় একাত্তরের যুদ্ধের পাকিস্তানি সর্বাধিনায়ক জেনারেল নিয়াজি’কে ট্র্যাজিক নায়ক রূপে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এ থেকেই বোঝা যায়, ম্যাডাম লাইনে আছেন। কয়েকটি চরণ: 
“... If this was the fate of the winning commander, I wondered what had become of the one who had lost. The result was a revelation. General A.A.K. Niazi turned out to have a distinguished past and a tragic fate. Honoured by the British with the Military Cross for his performance on the Burma front during the Second World War, he was a general who had literally fought his way up from the ranks and a humble background. ... The Bengali insurgency was wiped out within a few weeks of Niazi's arrival in East Pakistan in April 1971. But in the continuing absence of any political settlement, his men ended up fighting a wearying war against Indian-assisted guerrillas for months and then a full-scale invasion by India from all directions, helped by a population largely hostile to the Pakistan army. By all accounts the Pakistan army performed astonishingly well against India in East Pakistan under almost impossible odds.”
এইভাবে শুরুতেই তাঁর সুলেখনী পাঠককে প্রস্তুত করে নিয়েছে তাঁরই মত উদার হৃদয় নিয়ে পরাজিত, হতমান, ভাগ্যনিপীড়িত পক্ষ পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল হবার জন্য। তাঁর তুলনায় আমার কলম নেহাতই পার্কারের পাশে নলখাগড়া, তবুও আশা করব এই পোস্টের পাঠকও মোটামুটি সেই অবস্থানে চলে আসতে পেরেছেন।
শুরুতে তিনি নানা উক্তিমালা উপস্থাপন করেছেন যেখানে ত্রিশ লাখ সংখ্যাটিকে তাঁরই মতন অন্যান্য গবেষক-পণ্ডিতজন ছেঁদো কথা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, তবে বইস্থ হিসাবনিকাশের পক্ষে তাঁর উপস্থাপিত মূল সূত্র তিনটি। সেগুলো এক-এক করে পর্যালোচনা করে নিই চলুন।
১) War and Secession: Pakistan, India, and the Creation of Bangladesh - Richard Sisson, Leo E. Rose (১৯৯১)
এই বইটা অবশ্য ঠিক সংখ্যাবিষয়ক প্রতিবেদন নয়, বরং যুদ্ধপরবর্তী নানা ইন্টারভিউ এবং সেসবের আলোচনা। তাঁর বইয়ের শুরুতেই শ্রীমতী বোস এদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন – “The only book on 1971 that stands out in terms of research, analysis and objectivity is by the American scholars Richard Sisson and Leo Rose: War and Secession: Pakistan, India and the Creation of Bangladesh (1991). Sisson and Rose did their research in the 1970s, interviewing key players in Pakistan, India, Bangladesh and the United States. Most of the senior players have since passed away, making their work unique. On reading Sisson and Rose I was intrigued to find that the picture of what happened in 1971 that emerges from this work by two eminent scholars differed significantly from my childhood memories from Calcutta, which reflect the dominant narrative and public perception of 1971 in South Asia and beyond.”
এনারা ওই ত্রিশ লক্ষ মিথ তৈরির দায় দেন স্বার্থপর সুযোগলোভী ইন্ডিয়াকে। এবং ভোলাভালা বিদেশী মিডিয়া সেই প্রোপাগাণ্ডাকেই বেদবাক্য বলে মেনে নিয়ে চুপ করে ছিল, কারণ কে না জানে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের সামনে সবাই ভয়ে জুজু। “Much Indian attention during the war was directed to influencing the public and key political leaders and groups in the West, particularly the United States, to pressure their governments to adopt pro-Indian–or at least refrain from anti-Indian–policies. With the cooperation of most of the Western media, India was spectacularly successful in this endeavor. India had, of course, a good case to make in terms of Pakistani atrocities in East Pakistan, and it found the foreign press incredibly gullible in accepting, without effort at verifying, the substantial exaggerations that were appended to the list of horror stories from Dhaka.”
ত্রিশ লক্ষ যে কেমন গাঁজাখুরি, তা দেখাতে এনারা নিজেদের নেওয়া একটা টপ সিক্রেট সাক্ষাৎকারের উল্লেখ করেন:
“India set the number of victims of Pakistani atrocities at three million, and this is still the figure usually cited. We interviewed two Indian officials who had held responsible positions on the issue of Bangladesh in 1971. When questioned about the actual number of deaths in Bangladesh in 1971 attributable to the civil war, one replied "about 300,000." Then when he received a disapproving glance from his colleague, he changed this to "300,000 to 500,000.””
একাত্তরের গণ্ডগোলের পেছনে মূল অপশক্তি যে ভারত, তাদেরই পদস্থ কর্মকর্তাদের এই কথাটুকুই যথেষ্ট প্রমাণ পুরোটাকে মিথ্যাচার বলে প্রতিপন্ন করতে। তবুও তথ্য হিসাবে এটার গুরুত্ব কতখানি তা জেনে নেওয়া প্রয়োজন। ভাইটালস্ট্যাটিস্টিক্স নিকের এক ছোকরা আছে, সে খানিক বেয়াদপ নাস্তিক হলেও স্ট্যাটটা ঠিকমত বোঝে। এক মিষ্টি বালিকার পিক’ওয়ালা প্রোফাইল থেকে তাকে অ্যাড করে রেখেছি। তাকে একটা মেসেজ দিয়ে জানতে চাইলাম। তার উত্তর:
মনে করুন সত্যজিৎ নৌকাডুবিতে মাঝিমাল্লাশুদ্ধু রায়পরিবারকে ডুবে মরতে দেখেন। এই দুর্ঘটনায় কতজন লোক মরেছে, সেটা জানায় আমাদের আগ্রহ। তো সত্যজিৎ নিজে প্রত্যক্ষদর্শী, তিনি যদি তথ্যসংগ্রাহককে স্বমুখে এই কথা জানান বা কোনো বইতে লিখে যান, তবে সেটা হবে প্রাইমারি ডেটা বা প্রথম শ্রেণীর তথ্য। এবার সৌমিত্র সব্যসাচী যে-ই সেই বইটা যত ঘুরপথেই সাইট করুন না কেন, সেই তথ্যটা প্রাইমারি ডেটাই থাকবে।
কিন্তু যদি সত্যজিৎ এই কথা কেবল তাঁর সুযোগ্য পুত্র সন্দীপকে জানিয়ে থাকেন, এবং সেই তথ্য সন্দীপ কোনো টিভি ইন্টারভিউতে আমাদের জানান, তবে সেটা সেকেন্ডারি ডেটা বা দ্বিতীয় শ্রেণীর তথ্য। কারণ, সত্যজিৎ সন্দীপকে ঠিক কী বলেছিলেন তার কোনো প্রমাণ নেই, সন্দীপ এর মধ্যে খুঁটিনাটি ভুলে গিয়ে থাকতে পারেন অথবা আপন মনের মাধুরি মিশায়েও বলে থাকতে পারেন।
আর যদি এমন হয় যে সন্দীপ কোনো গোপন ইন্টারভিউতে সিসন/রোজ’কে বলে থাকেন এবং তাঁদের মাধ্যমে সেই তথ্যটা প্রকাশিত হয়, তাহলে সেটা টার্শিয়ারি বা তৃতীয় শ্রেণীর ডেটা। এবং এক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে। কেননা, সরকারের উচ্চপদস্থ আমলারা অবশ্যই নিজেরা জাবদা খাতা খুলে গুণেগেঁথে এই সংখ্যাগুলো তৈরি করেন নি। তথ্যবিষয়ক দায়িত্বে আছে এমন কারো কাছ থেকে শুনেছেন। সেও অবশ্যই নোটবুক হাতে বাংলাদেশের মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছিল না। এবং কোনো পর্যায় থেকেই কোনো প্রমাণ লেখকদুজনের কাছে আসেনি। এর মাঝে কোথায় কত ঘাপলা ঢুকেছে, নাকি পুরোটাই মনগড়া, তা কিছুই বলা যায় না।
উত্তর খানিক নিরাশাজনকই। তবে বোসম্যাডাম এই ঘটনাটাকে উল্লেখ করলেও অবশ্য তিনিও সংখ্যাগুলোকে গ্রহণ করেন নি, যেহেতু ওগুলো আমরা যে এস্টিমেট দেখাতে চাই তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি।
২) Hamoodur Rahman Commission Report, (১৯৭৪)
হামিদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট প্রকাশের পর তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো অসন্তুষ্ট হয়ে সেটাকে ধামাচাপা দিয়ে দেন। ২০০০ সালে পাকিস্তান সরকার সেটাকে ডিক্লাসিফাই করে। অতএব এটা নিয়ে কতটা উৎসাহিত হওয়া উচিত তা নিশ্চিত নই। তবে কোট করার মত সুবিধাজনক অংশ কিছু আছে অবশ্যই:
“According to the Bangladesh authorities, the Pakistan Army was responsible for killing three million Bengalis and raping 200,000 East Pakistani women. It does not need any elaborate argument to see that these figures are obviously highly exaggerated. So much damage could not have been caused by the entire strength of the Pakistan Army then stationed in East Pakistan even if it had nothing else to do. ...
Different figures were mentioned by different persons in authority but the latest statement supplied to us by the GHQ shows approximately 26,000 persons killed during the action by the Pakistan Army. This figure is based on situation reports submitted from time to time by the Eastern Command to the General Headquarters. It is possible that even these figures may contain an element of exaggeration as the lower formations may have magnified their own achievements in quelling the rebellion. 
... An important consideration which has influenced us in accepting this figure as reasonably correct is the fact that the reports were sent from East Pakistan to GHQ at a time when the Army Officers in East Pakistan could have had no notion whatsoever of any accountability in this behalf.”
এইটাকে বোসম্যাডাম পাকিস্তানি পক্ষের এস্টিমেট বলে যথোপযুক্ত সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। যদিও বদমাইশেরা বলতে পারে, যুদ্ধের সময় জেনারেল’স হেডকোয়ার্টারে আসা তথ্যগুলো, যখন পাকিস্তানি সৈন্যদের কোনোরকম দায়দায়িত্ব ছিল না এইসব সংখ্যা জানানোর বিষয়ে, এবং তাদের যথেচ্ছ গুলিবর্ষণের উপরে কোনো খবরদারি ছিল না, এবং লাশ গুণতে বসতে তাদের কোনো দরকারও ছিল না, সেই তথ্যের কতটা অ্যাকিউরেসি আছে তা নিয়ে সন্দেহ করাই যায়।
(কমিশন রিপোর্টে কিছু অস্বস্তিকর অংশও আছে বইকি। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের উপদেষ্টা রাও ফরমান আলি’কে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “Harrowing tales of rape, loot, arson, harassment, and of insulting and degrading behaviour were narrated in general terms.” কিন্তু এসব কথা সামনে আসতে দেওয়া উচিত না।)
বাংলাদেশের দেওয়া হত্যার সংখ্যার একটা পাল্টা এস্টিমেট পাওয়া যায় বটে, কিন্তু তাদের দেওয়া ধর্ষণের সংখ্যাকেও একই রকম ফালতু বলা হলেও তার কোনো পাল্টা এস্টিমেট দেওয়া হয় না; হলে সুবিধা হত। দেয়নি কেন, কে জানে... ধর্ষণের বিষয়ে কমিশন কম আগ্রহী, এমনও তো নয় – আওয়ামি লীগের গুণ্ডারা কেমনভাবে তাদেরই স্বদেশী ‘সিস্টার’দের ধর্ষণ করত সে বিষয়ে তেজস্বী প্রতিবেদন আছে। তবে কি সেনারা এই কৃতকর্মের রিপোর্টগুলো লজ্জাবশত হেডকোয়ার্টারের কাছে চেপে যেত? তাও তো হতে পারে না। ওই জেনারেল নিয়াজি সম্পর্কেই কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, “The troops used to say that when the Commander (Lt. Gen. Niazi) was himself a rapist, how could they be stopped.” আবারো, “there is some evidence to suggest that the words and personal actions of Lt. Gen. Niazi were calculated to encourage the killings and rape.” আর নিয়াজির সেই বিখ্যাত কোটেশন তো আছেই - “You cannot expect a man to live, fight and die in East Pakistan and go to Jhelum for sex, would you?” (পাঠক স্মরণ করে দেখুন, নিয়াজির প্রতি শ্রীমতী বোসের চরিত্রপূজা কেমন খাপে খাপে মিলে যায়। এবং ধর্ষণের নামোল্লেখ এনার বইটাতেও নেই।)
৩) Behind the Myth of 3 million – M. Abdul Mu’min Chowdhury (১৯৯৬)
এই ঈমানদার বাংলাদেশী লেখকের বইটির প্রতিবেদন থেকে বোসম্যাডাম একটি চমৎকার তথ্য বের করে এনেছেন: ভুট্টোর মতই মুজিবও একটি কমিশন গঠন করেন এবং কমিশনের রিপোর্ট পছন্দ না হওয়ায় তিনিও সেটি হাপিস করে দেন – যেহেতু সেটিতে নিহতের সংখ্যা তাঁর প্রচার করা তিন মিলিয়নের চেয়ে অনেক কম ছিল।
“Sources in Bangladesh reported that the draft report showed an overall casualty figure of 56,743. When a copy of this draft report was shown to the Prime Minister, “he lost his temper and threw it on the floor, saying in angry voice 'I have declared three million dead, and your report could not come up with three score thousand! What report you have prepared? Keep your report to yourself. What I have said once, shall prevail.” ”
কিন্তু সমিস্যে এই, যে ইনি এই তথ্যের কোনো সূত্র দেন না। বোসম্যাডামের অবশ্য সে ঝামেলা ছিল না, উনি এই বইটাকেই সূত্র বলে উল্লেখ করে দিয়ে পেরেছেন। তিনি আরো বলেছেন যে এই কথা শুনে তিনি বাংলাদেশে গিয়ে অনেক খোঁজ করলেন কিন্তু রিপোর্টটা দেখতে পেলেন না।
এই চৌধুরীসাহেবকে আমার পছন্দ হয়েছে। বোসম্যাডামের মত নিরপেক্ষতার বোরখা করার দরকার এঁর পড়ে না। তাঁর বই আমাদের ধার্মিক, ঈমানদার, বদ’নসিবের ফলে বিছড়া হুয়া পাকিস্তানি ভাইদের জন্য কাঁদে, ভারতের দালাল, স্বার্থপর, স্বেচ্ছাচারী, বেদর্দ মুজিবের প্রতি তার ছত্রে ছত্রে আগুন ঝরে পড়ে। (কুচক্রীরা অবশ্য এজন্য এনাকে পাকিস্তানপ্রেমী, রাজাকারসমর্থক বলতে পারে।) বইটির থেকে কিছু নমুনা:
  • “few have spoken about the treatment meted out to the men and women who have either served Pakistan faithfully in the past or refused to join the conspiracy to destroy Pakistan.”
  • “the Pakistan Army personnel and their families who were killed by their one time brothers and colleagues who together took oath to defend Pakistan.”
  • “Apart from the systematic drive to penalize the huge number of patriotic Muslims and Buddhists who had refused to be beguiled by the Awami League/Indian machination, the Mujib Government also vouched for its determination to try and punish the members of the Pakistani Army...”
  • “India needed to write the separation of East and West Pakistan in the boldest 'letters of blood'. There were a number of reasons for that - both immediate and long term. A peaceful political settlement within the framework of a united Pakistan would have deprived India of her chance of dismembering Pakistan through bitterness.”
  • “The source of the American report of implied 5,000 killed at Rajarbag was, none other than the Goanese-born journalist who was later rewarded by the Mujib Government with 'a London House' for his service in putting slur on Pakistan.”
ডক্টর বোসের নীতিনিষ্ঠতা এবং রেফারেন্সের প্রকৃতি বোঝাতে এর চেয়ে বেশি উদাহরণ আর লাগার কথা নয়। জিহাদী ভায়েরা খুশি হয়েছেন আশা করি।
********* পর্ব ৩ *********
এখানে একটা সমস্যা এসে দাঁড়ায়। পাজিগুলো ইন্টারনেটে একটা বইয়ের রেফারেন্স ছড়াতে থাকে, যেটাতে নাকি তাদের কোলে ঝোল টেনে কথা বলা হয়েছে।
বইটা হল R.J. Rummel -এর Statistics of Democide: Genocide and Mass Murder Since 1900, ওরা দাবি করে এটা নাকি বিশ্বে গণহত্যা নিয়ে সংখ্যাগতভাবে অন্যতম কমপ্রিহেন্সিভ একটা বই। এই রামেল লোকটি আমেরিকায় পলিটিকাল সাইন্সের একজন অধ্যাপক এবং মাঝেমধ্যে নানা সরকারি কমিটিতে বসে-টসে থাকেন। ডেমোসাইড শব্দটা এনারই সৃষ্ট, যার অর্থ করেছেন সরকারের নির্দেশে গণহত্যা। ওনার মতে, এটা জিনোসাইডের চেয়ে অনেক সহজ সংজ্ঞা, কারণ জিনোসাইডের আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্ট সংজ্ঞা থাকলেও তার প্রয়োগ নিয়ে অনেক পিছলামি আছে। সেটা অবশ্য মন্দ না, কারণ বোসম্যাডামও বাংলাদেশের হত্যাকাণ্ডকে জিনোসাইড বলতে নারাজ।
ব্যাটারা ওনার নিরপেক্ষতার প্রমাণ হিসেবে বলে, উনি কোনো একটা বিশেষ এজেন্ডা নিয়ে একটা দেশকে আক্রমণ করেন নি, এই বইটায় উনি দুশোরও বেশি শাসনকালকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন তাদের হত্যা ইত্যাদির তথ্য দিয়ে (যার মধ্যে আমেরিকাও আছে), এবং তার মধ্যে ১৪১টিকে ডেমোসাইডের দায়ে দোষী এবং ৭৩টিকে বেকসুর সাব্যস্ত করেছেন। যদিও ওনার সোভিয়েত রাশিয়া, চীন ইত্যাদি কমিউনিস্ট শাসনযন্ত্রের প্রতি বিরাগ আছে (এবং সেটা আশ্চর্য কিছুই নয়), পাকিস্তানের প্রতি বিশেষ শত্রুতা আছে এমনটা ভাবার কারণ নেই, যেহেতু যুদ্ধের সময় আমেরিকা সরকারই ছিল পাকিস্তানের অন্যতম বন্ধু...
কিন্তু বইটা খুলেই ওনার নিরপেক্ষতার প্রতি বিশ্বাস পুরোই উবে গেল। ‘The Pakistani Cutthroat State’ নামের অষ্টম চ্যাপ্টারে উনি লিখেছেন,
“In 1971 the self-appointed President of Pakistan and Commander-in-Chief of the Army, General Agha Mohammed Yahya Khan and his top generals prepared a careful and systematic military, economic, and political operation in East Pakistan (now Bangladesh). They also planned to murder its Bengali intellectual, cultural, and political elite. They also planned to indiscriminately murder hundreds of thousands of its Hindus and drive the rest into India. And they planned to destroy its economic base to insure that it would be subordinate to West Pakistan for at least a generation to come. This despicable and cutthroat plan was outright genocide.
After a well-organized military buildup in East Pakistan the military launched its campaign. No more than 267 days later they had succeeded in killing perhaps 1,500,000 people, created 10,000,000 refugees who had fled to India, provoked a war with India, incited a counter-genocide of 150,000 non-Bengalis, and lost East Pakistan.”
অবশ্য ওনার মতামত দিয়ে তেমন কিছুই আসে-যায় না, কিন্তু উনি যে তথ্য সংগ্রহ করেছেন সেগুলো সমস্যাজনক। বোসম্যাডামের দুতিনটির তুলনায় রামেল রেফারেন্স দিয়েছেন প্রায় পঞ্চাশটি, বাঙালি-অবাঙালি-সায়েব মিলিয়ে। (অবশ্য সেসব রেফারেন্সের অধিকাংশই বোসম্যাডাম ভারতপন্থী প্রোপাগাণ্ডা বিবেচনায় ফেলে দিয়েছেন বোধ করি।)
এনার হিসাবকিতাব কতটা নির্ভরযোগ্য, কতটা অকাট্য? কোনোভাবে ডাউন দেওয়া যায় কি? আবারও মেসেজ করলাম ভাইটালস্ট্যাটিস্টিক্স’কে। সে বলে:
ওনার অধ্যাগুলোর যা ধরন দেখলাম, এইধরনের আলোচনায় ওনার নিজের কথা খুবই অল্প, ছোট খানিক ইন্ট্রোডাকশনের পরই একটি সামারাইজড (৮.১) এবং একটি বিস্তৃত (৮.২) টেবিলে উনি প্রতিটি সূত্র অনুসারে নানা বিভিন্ন বিষয় যেমন বাংলাদেশী হত্যা, বিহারী হত্যা, যুদ্ধে নিহত সেনা, অসুস্থ, উদ্বাস্তু ইত্যাদি সব কিছুর উপর আলাদা ভাবে সংখ্যাগুলো সাজিয়ে দিয়েছেন। সন-তারিখ, উৎস, টীকা তো দিয়েছেনই, সংখ্যাগুলোও তিনটে আলাদা কলামে সাজানো – যদি মূলে ‘অ্যাট লিস্ট’ বলা থাকে তবে ‘লো’, যদি ‘আপ টু’ বা ‘অ্যাট মোস্ট’ বলা থাকে তবে ‘হাই’, আর ‘অ্যারাউন্ড’ বা ‘অ্যাপ্রক্সিমেট’ ইত্যাদি বলা থাকলে ‘মিড’। যেহেতু ওনার পুরো বইটাই নেটে পাওয়া যায়, তা থেকে দেখার সুবিধার জন্য টেবিলগুলোকে রঙ দিয়ে চিহ্নিত করে এখানে দেওয়া গেল
সংক্ষিপ্ত টেবিল ৮.১ এর দিকে নজর দিই আগে। শুরুতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে মৃত সেনার হিসেব, সেটায় আমাদের দরকার নেই। আরো কিছু অপ্রয়োজনীয় জিনিসও আছে যেমন বেলুচিস্তানে হত্যার সংখ্যা। তার পরে নীল চিহ্নিত অংশে (লাইন ৭) ‘সিভিল ওয়ার’ নামে মুক্তি বাহিনী–পাকিস্তান সেনার যুদ্ধে মৃতদের সংখ্যা (সেটা বিশদে দেখতে হলে টেবিল ৮.২তে লাইন ৯-১৬ দেখতে হবে)। আমাদের মূল আগ্রহ বাদামী চিহ্নিত (লাইন ৩২) অংশটা যেখানে বাংলাদেশে গণহত্যার হিসেব এবং এস্টিমেট আছে। তার পরের হলুদ অংশটা (লাইন ৩৫) বাঙালিদের হাতে নিহত বিহারীদের হিসাব, যা পাকিস্তানি ইত্যাদিদের প্রধান সমবেদনা কিন্তু এখানে প্রধান বিবেচ্য না। আর সবুজ অংশটা (লাইন ৩৭) হচ্ছে ভারতে পালিয়ে যাওয়া উদ্বাস্তুর হিসাব, যা প্রায় দশ মিলিয়ন বা এক কোটি।
বাদামী অংশ দিয়েই টেবিল ৮.২তে গণহত্যার বিশদ হিসেবগুলো চিহ্নিত করা রয়েছে, লাইন ২৩ থেকে ৮২। অনেকগুলো ভাগে, এবং অনেকগুলো ভাগে, তথ্যগুলো সাজানো, যাতে পরষ্পর সেগুলো কতটা মেলে এবং একে অন্যকে সমর্থন করে তা দেখা যায়। আর তথ্য সাজানো তো বটেই, ওনার হিসেব করার পদ্ধতিটাও বেশ যুক্তিসঙ্গত। ধরুন জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর চলা একটা যুদ্ধে, ক বলেছেন জানুয়ারিতে ১০০জন মারা গেছে, খ বলেছেন ডিসেম্বরে ৫০০ জন মারা গেছে, গ বলেছেন পুরো যুদ্ধে ৩০০০ জন মারা গেছে, আর ঘ বলেছেন প্রথম ৫ মাসে ১০০০ জন মারা গেছে। তাহলে চারটে সূত্র থেকে চারটে মাসিক মৃত্যুর হার উনি বের করেছেন – ১০০, ৫০০, ২৫০, ২০০। সবচেয়ে কমটা নিলে মোট মৃত্যুর হার ১২০০, সবচে বেশিটা নিলে ৬০০০, আর গড়ে ৩১৫০। অবশ্য, যদি কোনো সূত্রে ঠিকমত রেফারেন্স দেওয়া না থাকে, বা তথ্য অসম্পূর্ণ বা দুর্বল বা অবাস্তব মনে হয়, উনি সেসব কারণ পাশে টীকায় উল্লেখ করে দিয়ে সেগুলো বাদ দিয়েছেন।
আগেই বলেছি, ব্যাটায় বড্ড বেশি বিশদে কাজ করেছে – ওনার রেফারেন্সের দীর্ঘ তালিকায় (ফাইলের তৃতীয় পাতা) বোসম্যাডামের উল্লেখ করা সবগুলো সংখ্যাসূত্রই আছে (বই প্রকাশের আগে অবধি)। অবশ্য উনি কেবল প্রাইমারী সূত্রই নিয়েছেন, অর্থাৎ কোনো সংবাদ প্রতিবেদন কোনো বইয়ের তথ্যকে রেফারেন্স হিসেবে দিলে উনি সেই খবরটাকে সূত্র না বলে সরাসরি বইটাকেই বলেছেন। তা এতে সিসন-রোজের উল্লেখ আছে, যে অ্যান্টনি মাসকারেনহাসের প্রতিবেদন উল্লেখ করে বোসম্যাডাম গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে লোকে এটার কেবল পাকিস্তানি অত্যাচারের অংশটাই পড়ে কিন্তু বিহারী হত্যার অংশটা উপেক্ষা করে যায় সে সবটাই আছে, বিহারী হত্যার (হলুদ) অংশে পাকিস্তানি সরকারের হোয়াইট পেপার আর কুতুবুদ্দিন আজিজের Blood and Tears এগুলোরও বিস্তারিত তথ্য নেওয়া আছে।
তা ওনার এস্টিমেট কত বলে? ন্যূনতম তিন লাখ থেকে ত্রিশ লাখ অবধি, মধ্যমান পনেরো লাখ বা দেড় মিলিয়ন। ভেরি স্যাড। বুঝতেই পারছি, এটার এত প্রচার কেন হচ্ছে। ওখানে নিহত হিন্দুদের সংখ্যা, সশস্ত্র যুদ্ধ শুরুর আগেই নিহতের সংখ্যা, এগুলোও আমরা যেমন কমসম দেখাতে চাই তার তুলনায় বড্ড বেশি। এর সঙ্গে যোগ করুন রিচার্ড ক্যাশের মত লোকেদের কথা, যাঁরা বলেন, সরাসরি নিহতের সংখ্যার সঙ্গে যুদ্ধপরবর্তীতে রিফিউজি/আহত/রুগ্নদের মধ্যে মৃতর সংখ্যা ধরলে সেটা প্রায় ত্রিশ লাখেই গিয়ে দাঁড়াবে।
আশার কথা এটুকুই যে, রামেলের এই বইটার কোনো উল্লেখ বোসম্যাডামের বইটিতে নেই, নেই এতে উল্লেখিত কোনো তথ্যও যা ত্রিশ লাখের হিসাব করায় ব্যবহৃত হয়েছিল, নেই সেসব কোনো রেফারেন্সও। আমাদের ম্যাডাম যে মোটামুটি পাকিস্তানের প্রতি ‘তুমি যা বলিবে তাই বলিব–আমি কিছুই না জানি’ মোডে আছেন তা প্রথমদিকের পর্বেই দেখতে পেয়েছেন আশা করি। ওনার বইটা পড়লেও দেখতে পাবেন, উনি কেমন অবিচল আস্থার সাহায্যে সাক্ষাৎকারে বলা পাকিস্তানি সেনাধ্যক্ষদের প্রতিটা কথা বিশ্বাস করে থাকেন। এবং উচিতমতই আশা করেন যে পাঠকও তেমন অবিচল আস্থার সাহায্যে ওনার কথাগুলি গ্রহণ করবে।
(ফুটনোট: এই ছ্যাঁচোড় ষড়যন্ত্রী রামেলকে একমাত্র মুখের মত জবাব দিয়েছে আমাদের তুর্কী ভাইরা, যারা কিনা রাজনীতির আঙিনায় পাকিস্তানের জিগরি দোস্ত। পশ্চিমি দুনিয়া দাবি করে আর্মেনীয়দের উপর তুর্কী জিনোসাইড আরেকটা প্রতিষ্ঠিত অধ্যায়, আর রামেলও তাঁর বইতে এই বিষয়ক হিসাবকিতাব করে সেটাকে প্রমাণিত করেছেন। তাই তুরষ্কের লোকজনও খুব খেপেটেপে রামেলকে মিথ্যাবাদী ইবলিশ হারামজাদা ইত্যাদি গাল দিচ্ছে। পাকিস্তানি ভায়েরা যে কবে এনার পেছনে উঠেপড়ে লাগবে?)
********* পর্ব ৪ *********
হিসাবনিকাশ আর তথ্য-সূত্রের পরিমাণ দেখে তো ত্রিশ লাখ যদি না-ও বলি অন্তত লাখ-পনেরোর হিসাবকে নেহাতই তথ্যবিহীন মিথ্যা বলে আর প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না যেমনটা বোসম্যাডাম ওই আলোচনায় দাবী করেছেন। এখন শেষ ভরসা এটা দেখা, যে বোসম্যাডাম কেমন হিসাবকিতাব করে ব্যাপারটাকে পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখে এনে ফেলেছেন। ওনার তথ্যসূত্রের অবস্থা খুব ভালো নয় বটে, কিন্তু হিসাবটুকু অন্তত অকাট্য হলে সেটা নিয়েই প্রতারণা থুড়ি প্রচারণা করা যাবে।
কিন্তু অধ্যায়টা পড়ে অত্যন্ত অত্যন্ত হতাশ হলাম। শুরুতে উনি বলেছেন, ঠিকমত হিসাব করাটা কত কঠিন, কারণ গণহত্যার জায়গাগুলো ঠিকমত খুঁড়ে গোনাগুনতি করা হয়নি, যারা মারা গেছে তারা মুক্তিযোদ্ধা নাকি সাধারণ বাংলাদেশি অথবা বিহারী না রাজাকার কিংবা সেনাবাহিনী তা চেনা পরে মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়, ‘uneven time and space’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর উনি তথ্যসূত্রগুলো আলোচনা করেছেন, ড্রামন্ড, কিসিংগার ইত্যাদি কিছু বিদেশী (অতএব সম্মানীয়) ব্যক্তিদের উদ্ধৃতি দিয়ে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ত্রিশ লাখের দাবি কতটা বানোয়াট, এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহতের সংখ্যার মত ছোটোখাটো বিষয়েও যে কতটা গণ্ডগোল সেটা ওই বিষয়ক আগের অধ্যায় থেকে সূত্র টেনে এনে মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন যে পুরো দেশের হিসাবটাও একই রকম ঝাপসা। কিন্তু দিনশেষে সব সংখ্যাগুলোকে রামেলের মত হিসাবমাফিক যুক্ত করার কোনো কাজই নেই!
তিনি প্রশ্ন করছেন, হামিদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টে বলা ছাব্বিশ হাজার আর বাংলাদেশ-ভারতের দাবি করা ত্রিশ লাখ, এর মাঝে কোনটা সত্যি? (অবশ্য এটাও বলছেন, লোকজন গর্ব করে কত মেরেছে সেটা বাড়িয়েও বলতে পারে, অর্থাৎ ২৬,০০০-টাও নিম্নতম নাও হতে পারে।) এর পর, কোনো হিসাবনিকাশ না দেখিয়েই সরাসরি বলছেন,
“From the available evidence discussed in this study, it appears possible to estimate with reasonable confidence that at least 50,000–100,000 people perished in the conflict in East Pakistan/Bangladesh in 1971, including combatants and non-combatants, Bengalis and non-Bengalis, Hindus and Muslims, Indians and Pakistanis.”
ধুর! কোনো পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচ, জটিল ইকুয়েশন, কিছুই না ঢুকিয়ে মহিলা দুম করে এই সংখ্যাগুলো কোত্থেকে পেলেন? এখন আমি এগুলোর কী ব্যাখ্যা দেব? উনি বলছেন বটে, “Under the circumstances, the number ‘three million’ appears to be nothing more than a gigantic rumour.” – কিন্তু ওনার এস্টিমেটগুলোই যে জাইগ্যান্টিক ঘাপলা নয় তা কে প্রমাণ করবে? ওই সেমিনারে যে কনফিডেন্স ইন্টারভাল, ৯০% প্রোবাবিলিটি ইত্যাদি ভালো ভালো স্ট্যাটিস্টিকাল জার্গনের কথা বলেছিলেন সেগুলো ভোঁ-ভাঁ? ছাব্বিশ হাজার আর তিরিশ লাখ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-চুকনগর ইত্যাদি কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার মৃতের সংখ্যা থেকে দুম করে পঞ্চাশ হাজার-এক লাখে পৌঁছলেন কী করে? হিসাবের কড়ি কি বাঘে, থুড়ি, মারখোরে খেয়ে গেল?
********* পর্ব ৫ *********
এখন শেষ আশা বোসম্যাডামের কেস-স্টাডিগুলোকেই আরেকটু ভালো করে দেখা। উনি বলেছেন, ওনার বইটা মূলত বাংলাদেশ ও পাকিস্তান মিলিয়ে নেওয়া একাধিক ইন্টারভিউয়ের উপর ভিত্তি করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-চুকনগর ইত্যাদি নানা জায়গার বাংলাদেশী ও বিহারী হত্যার কেসগুলোকে আলোচনা করার মধ্যে দিয়ে, ওই সময়ের একটা নিরপেক্ষ আখ্যান তুলে ধরা।
চুকনগরের অধ্যায়টা খুললাম। এটার সম্বন্ধে উনি ওই হিসাবের চ্যাপ্টারে বলেছেন, “The evidence assembled in Chapter 6 on the killing of Hindu refugees at Chuknagar indicates that a large-scale massacre–perhaps with hundreds dead–occurred there on 20 May. This is still not enough for some locals and Bangladeshi academics, who aspire to establish this incident as the ‘biggest mass killing’ of the year, by claiming–implausibly–that 10,000 people were killed there by a platoon of soldiers with just their personal weapons in a morning’s operation.”
অতএব বাংলাদেশের দাবি করা বৃহত্তম গণহত্যাকেই যদি উনি সাফল্যের সঙ্গে অবাস্তব হিসাব বলে দেখাতে পারেন তাহলেও কিছুটা কাজ হয়। উনি অবশ্য বলেছেন, “by the massacre of unarmed and helpless Hindu refugees at Chuknagar, a band of twenty-five to thirty men brought lasting disgrace to an entire army and a whole nation.”, কিন্তু ওনার এ কথায় আমরা আমল দিচ্ছি না। এজন্য নয় যে উনি একথা প্রতিটা গণহত্যা-অধ্যায়ের শেষেই বলে থাকেন, এজন্য যে পাকিস্তান ও পাকিস্তানি সেনার সম্মান এত ঠুনকো নয় – চুকনগরের আগে বা পরে যে কয়েক হাজার খুন-ধর্ষণই তারা করে থাকুক না কেন, ওটুকু যুদ্ধের সময় জায়েজ তো বটেই বরং পবিত্র কর্তব্য।
দেখেন, উনি যখন পাকিস্তানি সেনাধ্যক্ষদের জিজ্ঞেস করেছেন তখন কেউই চুকনগরে কোনো গণহত্যার কথা শোনেননি বলেছেন। অতএব সেটাই যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র ধরে নেওয়া উচিত, যে তেমন বড়সড় কিছু ওখানে ঘটেনি। তার পরেও কিছু হিসাব দিয়েছেন। সিভিলিয়ান হত্যার ব্যাপারে উনি বলছেন যে পাকিস্তানি বাহিনী মোটেই নির্বিচারে হত্যা করত না - “There appears to be a clear pattern in these cases of the Pakistan army targeting adult men, while sparing women and children. Female casualties in these instances appear to have been unintentional.” দুয়েকজনের ইন্টারভিউয়ের মধ্যে দিয়েই তিনি অকাট্যভাবে তা প্রমাণও করে দিয়েছেন। যদিও একজন বলেছে মাঠে পড়ে থাকা মৃত মায়ের স্তন্য চুষতে সদ্যোজাত শিশুকে দেখা গিয়েছিল, ওগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা।
একজন বলেছে তিনটে ট্রাকে করে পঞ্চাশ-ষাটজন পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের সাথে কিছু বিহারী এসেছিল। জায়গাটায় আট-দশ হাজার লোক ছিল। অতএব যেহেতু পাকিস্তানি সেনারা খুব যত্নের সাথে বেছে বেছে শুধু পূর্ণবয়স্ক পুরুষদেরই মেরেছিল, এবং ওখানে ভারতে সরে পড়ার উদ্দেশ্যে জমায়েত হওয়া মহিলা ও শিশুদেরই বেশি সংখ্যায় থাকার সম্ভাবনা বেশি, খুব বেশি হলে একের-তিন ভাগ লোককে টার্গেট করা হয়েছিল। আর তাছাড়া অন্যরা বলেছে বিশ-পঁচিশ বা তারো কম সেনা এসেছিল। অতএব কমসম করে তিরিশ ধরাই ভালো। আরো বলা হয়েছে যে সেনারা ছিল ‘লাইটলি আর্মড’, অতএব বোসম্যাডামের অনুমান তাদের কাছে সর্বোচ্চ ১২০০ গুলি ছিল। তাও সব গুলি মানুষের গায়ে লাগবে না – একজনের বর্ণনায় তাকে তিনটে গুলি মারা হয়েছিল, যার একটামাত্র হাতে বিঁধেছিল, তাতেও সে মরেনি। অর্থাৎ মোট নিহতের সংখ্যা খুব বেশি করে কয়েকশ হবে।
এখন এইটা তুলনায় খানিক বেটার হিসেব হলেও এটাতেও বেশ কিছু ফুটোফাটা দেখিয়ে দেবে পাজি লোকেরা। আগত সেনা ও বিহারীর হিসাব নিয়ে লোকে আপত্তি করতে পারে। উল্টোপাল্টা গুলি লেগেও যে কিছু মেয়ে-বাচ্চা মরেনি, তাই বা কে বলতে পারে? সব পাকিস্তানি সেনারাই কি আর মেহেরজানের নায়কের মত কোমল? তাছাড়া কয়েক হাজার থেকে দুম করে কয়েক শ-তে নামিয়ে আনার মূল চালক যে গোলাগুলির সংখ্যা, সেটাতেও সমস্যা আছে। বইতে ও অন্যত্র সাক্ষাৎকারে লোকেরা বলেছে, সেনারা নাকি হামলা করবে বলেই তৈরি হয়ে এসেছিল। অতএব তাদের কাছে কেমনতরো অস্ত্রশস্ত্র ও কত গুলিগোলা থাকতে পারে, এ বিষয়ে বোসম্যাডামের আরেকটু পাক্কা হিসেব যেমন কিছু হালকা অস্ত্রের ভারিক্কি নামধাম দেওয়া উচিত ছিল, তাহলে কথাগুলো পোক্ত শোনাতো। এমতাবস্থায় এই হিসাবটাও ঝাপসামত।
নাহ, একটা কেস স্টাডিও ঠিকমত করতে পারেননি, মহিলা কিছুই ভদ্রমত করতে পারেন না দেখা যাচ্ছে। কোথায় ভাবলাম ত্রিশ লাখের হুহুঙ্কার ভেঙে মহিলা কিছু শক্তপোক্ত তথ্য উপস্থাপন করবেন, সে গুড়ে বালি; নাহোক অন্তত কিছু কথার মায়াজাল বানিয়েও আমাদের সুবিধা করে দিতে পারতেন, কিন্তু এতই ফাঁকিবাজি যে যুতমত মিথাগুলোও বুনতে পারেননি দেখা যাচ্ছে। ধুত্তোর। এখান ত্রিশ হাজার বা তিন লাখ এসব সংখ্যা প্রতিষ্ঠিত করার মত প্রোপাগাণ্ডা কোত্থেকে বানাই? বিরক্ত মেজাজে ইউটিউবে গিয়ে একটু গানটান শুনতে লাগলাম – ‘কাদের কুলের বউ গো তুমি কাদের কুলের বউ?’...

----------------------------------------------------------------------------------------
নানাবিধ সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ ষষ্ঠ পাণ্ডব, হিমু, আরিফুর রহমান, টিউলিপ ও অরফিয়াস’কে।

রামেলের চার্ট-রেফারেন্সসহ লেখা ডাউনলোডের লিঙ্ক...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট