...মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে নতুনরূপে আর্বিভূত হবে...

This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Liberation War of Bangladesh and Genocide of Innocent Bengali People in 1971. More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

ফেসবুকে আমরা

যুদ্ধাপরাধের বিচার নুরেমবার্গ থেকে ঢাকা - শাহরিয়ার কবির

যুদ্ধাপরাধের বিচার নুরেমবার্গ থেকে ঢাকা: ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

শাহরিয়ার কবির

দৈনিক জনকন্ঠে চার খন্ডে প্রকাশিত হয়েছিল



কেউ কোন অপরাধ করলে তার বিচার হতে হবে সমাজের এই নিয়ম সভ্যতার বোধের অন্তর্গত। হত্যা, নির্যাতন, সম্পদ লুণ্ঠন বা সম্পদহানি প্রাচীনকাল থেকেই মানব সমাজে অপরাধ হিসেবে গণ্য। এ সব অপরাধের বিচার ও শাস্তির বিধান ভারত, চীন, মেসোপটেমিয়া, গ্রীস ও মিসরের প্রাচীন ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে।
যুদ্ধের সময় বিবদমান উভয় পক্ষকে কিছু নিয়ম বা রীতি মান্য করার বিধান মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম গৃহীত হয়েছে প্রাচীন ভারতবর্ষে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়। এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল পাঁচ হাজার বছরের আগে। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ‘মহাভারত’-এ এই যুদ্ধের কারণ, বিবরণ, যুদ্ধের অস্ত্র, কলাকৌশল, কূটনীতি প্রভৃতির পাশাপাশি যুদ্ধের আইনের উল্লেখ রয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিবদমান পা-ব ও কৌরবরা কতগুলো নিয়ম বা আইন মান্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে যুদ্ধের সময় উভয় পক্ষই এসব আইন ভঙ্গ করে যুদ্ধাপরাধ করেছিল। সেই সময় যুদ্ধাপরাধের জন্য জাগতিক শাস্তির বিধান ছিল না। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আইন লঙ্ঘনকারীরা যুদ্ধাপরাধের জন্য ঐশ্বরিক শাস্তি ভোগ করেছিলেন, যে শাস্তি থেকে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরও রেহাই পাননি। তাঁর অপরাধ ছিল প্রতিপক্ষকে অর্ধসত্য বলে প্রতারণার।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর চীন, মেসোপটেমিয়া, মিসর ও গ্রীসে যুদ্ধের নিয়ম বা আইনের উল্লেখ সামরিক ইতিহাসে পাওয়া যাবে। আইন ও বিচারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছিল প্রাচীন গ্রীসে। এথেন্সের ক্ষমতাবান শাসক ও সমরনায়ক এ্যালিবিয়াদিস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০-৪০৪)-এর বিচার হয়েছিল সিসিলির বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান পরিচালনাকালে যুদ্ধের আইন ভঙ্গের জন্য। এথেন্সের আদালতে তার অনুপস্থিতিতে বিচার হয় এবং তাঁকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়। পরে সিসিলি জয় করে ফিরে আসার পর এথেন্সবাসী তাকে বীর হিসেবে বরণ করে এবং আদালত শাস্তি প্রত্যাহার করে নেয়।
বিশ শতকের আগে যুদ্ধকালে সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন প্রভৃতি অপরাধের জন্য বিচারের কয়েকটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা সম্পর্কে জানতে পেরেছি ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে। ঐতিহাসিক বাসিয়োনির মতে যুদ্ধাপরাধের জন্য প্রথম বিচারের তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে ইতালি থেকে। ১২৬৮ সালে নেপলস-এর কনরাডিন ভন হোহেনস্টেফানের বিচার হয়েছিল যুদ্ধের আইন ভঙ্গের জন্য এবং তাকে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়েছিল। এর এগারো বছর পর ১২৭৯ সালে ইংল্যান্ডে ‘ওয়েস্টমিন্স্টার আইন’ (স্ট্যাটিউট অব ওয়েস্টমিন্স্টার) পাস হয়, যেখানে আইন ভঙ্গের জন্য সেনাবাহিনীর বিচারের ক্ষমতা রাজাকে দেয়া হয়েছে। এই আইনের অধীনে ১৩০৫ সালে স্কটল্যান্ডের স্যার উইলিয়াম ওয়ালেসের (১২৭২-১৩০৫) বিচার হয়। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধের। এ ছাড়াও ওয়ালেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল যুদ্ধের সময় বয়স ও নারীপুরুষ নির্বিশেষে গণহত্যার জন্য। ইংল্যান্ডের আদালত তাঁকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করলেও স্কটল্যান্ডে স্যার উইলিয়াম ওয়ালেস স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ও জাতীয় বীর হিসেবে আজও সম্মানিত।

ইতালিতে হোহেনস্টেফান এবং ইংল্যান্ডে উইলিয়াম ওয়ালেসের বিচার হয়েছিল সেই সব দেশের রাজার আইনে, যা ছিল নির্দিষ্ট দেশের জন্য প্রযোজ্য। তবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালত স্থাপনের প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে অস্ট্রিয়া ১৪৭৪ সালে স্যার পিটার ভন হাগেনবাখের (১৪২০-১৪৭৪) বিচারের ক্ষেত্রে। বার্গান্ডির ডিউক চার্লস (যিনি ‘চার্লস দি টেরিবল’ নামে বেশি পরিচিত) ব্রেইসাখের শাসক নিযুক্ত করেছিলেন হাগেনবাখকে। অস্ট্রিয়া তখন রোমান সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। ব্রেইসাখের শাসক হিসেবে হাগেনবাখ হত্যা ও নির্যাতনের বিভীষিকাময় রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। হাগেনবাখের দখল থেকে ব্রেইসাখকে মুক্ত করে অস্ট্রিয়া ও তার মিত্ররা। হাগেনবাখকে বিচারের নির্দেশ দেন রোম সম্রাট। এই বিচারের জন্য রোমান সাম্রাজ্যের ২৮টি দেশ থেকে বাছাই করা ২৮ জন বিচারকের সমন্বয়ে একটি বিশেষ আদালত গঠন করা হয়েছিল। এই আদালতে হাগেনবাখের বিচার হয়েছিল ঈশ্বর ও প্রকৃতির আইন লঙ্ঘনের জন্য। তার বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, অবৈধ কর আদায়, সম্পত্তি দখল ইত্যাদি অভিযোগ আনা হয়েছিল। হাগেনবাখ অবশ্য আদালতে বলেছেন, তিনি সবই করেছেন তার নিয়োগদাতা বার্গান্ডির ডিউকের নির্দেশে। এই বিচারকার্য শুরুর এক বছর আগে ডিউক চার্লস মারা গিয়েছিলেন। আদালত হাগেনবাখের যুক্তি খারিজ করে তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে। রায়ে তার নাইট উপাধি বাতিল করে তাকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়। ৯ মে ১৪৭৪ তারিখে শিরñেদের মাধ্যমে হাগেনবাখের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। হাগেনবাখের এই বিচারের মাধ্যমে যুদ্ধআইনে ‘অধিনায়কের দায়বদ্ধতা’র (কমান্ড রেসপনসিবিলিটি) ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে এ ধরনের বিচারের সূত্র হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। একই সঙ্গে এই বিচার ‘আন্তর্জাতিক আদালত’-এর ধারণাও প্রতিষ্ঠা করেছে।
বিশ শতকের আগে যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে একটি বহুল আলোচিত মামলা হচ্ছে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় ক্যাপ্টেন হেনরি রীযের বিচার। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় (১৮৬১-১৮৬৫) হেনরি একটি কারাগারের দায়িত্বে ছিলেন। এই গৃহযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩,৫৯,৫২৮। কারাগারে আটক যুদ্ধবন্দী মৃত্যুর সংখ্যা ২৪,৮৬৬। ক্যাপ্টেন হেনরির বিরুদ্ধে ১৩টি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল, যার ভেতর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও আঘাত অন্যতম। ক্যাপ্টেন হেনরির বিচার হয়েছিল সামরিক আদালতে, যার প্রধান বিচারক ছিলেন মেজর জেনারেল লিউ ওয়ালেস (‘বেনহুর’ উপন্যাসের রচয়িতা)। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটা ছিল প্রথম যুদ্ধাপরাধের বিচার। বিচারে ক্যাপ্টেন হেনরিকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়।

যুদ্ধের ব্যাপক নিষ্ঠুরতা, হত্যা ও নির্যাতনের বিভীষিকা গত শতাব্দীতে আমরা প্রথম প্রত্যক্ষ করি প্রথম মহাযুদ্ধে (১৯১৪-১৯১৮)। চার বছরের এই মহাযুদ্ধ মানব জাতির বিবেককে প্রচ-ভাবে আলোড়িত করেছিল। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য জার্মানিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই।
ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যুদ্ধ চলাকালে পৃথকভাবে দাবি করেছে- যারা স্থলে ও সমুদ্রে যুদ্ধ ও মানবতার আইন লঙ্ঘন করে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তাদের অবশ্যই বিচার করতে হবে। ১৯১৮ সালে ৫ অক্টোবর ফরাসী সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল- আন্তর্জাতিক আইন ও মানব সভ্যতার মূলনীতি অগ্রাহ্য করে যারা যুদ্ধ করেছে তারা শাস্তি থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী লুই বারথু ১৯১৭ সালের ৩ নবেম্বর বলেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি পেতেই হবে এবং এটা দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে।
১৯১৮ সালের ১১ নবেম্বর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইংল্যান্ডের লর্ড হাই চ্যান্সেলর ভাইকাউন্ট বিরকেনহেড দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটির দায়িত্ব ছিল ১ম বিশ্বযুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের ঘটনা সম্পর্কে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা প্রণয়ন করা। এরপর ভার্সাইতে মিত্রশক্তির সঙ্গে জার্মানির বৈঠকে ঐতিহাসিক ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯১৯ সালের ২৮ জুন। এই চুক্তি সম্পর্কে জার্মানি পরে বলেছে তাদের এতে স্বাক্ষর প্রদানে বাধ্য করা হয়েছিল।
ভার্সাই চুক্তির ৪৪০টি অনুচ্ছেদের ভেতর জার্মানির প্রতি শাস্তিমূলক বহু ধারা রয়েছে। এই চুক্তির সপ্তম পর্বে ২২৭, ২২৮ ও ২২৯ অনুচ্ছেদে জার্মানির সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়াম হোহেনযোলেনসহ তদন্তে অভিযুক্ত সকল জার্মান যুদ্ধাপরাধীকে সামরিক আদালতে বিচারের কথা বলা হয়েছে।
ভার্সাই চুক্তি অনুযায়ী মিত্রশক্তি প্রথমে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ১৯ হাজার ব্যক্তির তালিকা তৈরি করেছিল। এই তালিকা বলা বাহুল্য জার্মানির কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। জার্মান প্রতিনিধিরা বলেছেন এত বেশি ব্যক্তির বিচারের যেমন সমস্যা রয়েছে- এই বিচার শুরু হলে জার্মানিতে গৃহযুদ্ধ বাধতে পারে। মিত্রশক্তি এই যুক্তি মেনে নিয়ে যাচাই বাছাই করে দ্বিতীয় পর্যায়ে ৮৯৫ জন এবং শেষে চূড়ান্তভাবে ৪৫ জন যুদ্ধাপরাধীর একটি তালিকা জার্মানিকে প্রদান করে।

জার্মানির কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম যুদ্ধে পরাজয়ের পর নেদারল্যান্ডে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নেদারল্যান্ডস নিরপেক্ষ ছিল। এ ছাড়া কাইজার উইলিয়াম আত্মীয়তার সূত্রে নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। সেই সময় ইউরোপের অধিকাংশ রাজ পরিবার একটি অপরটির সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ ছিল।
মিত্রশক্তি আশা করেছিল কাইজারের বিচার সম্ভব না হলেও ৪৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার জার্মানি করবে। কিন্তু সমস্যা ছিল বিচারের আইন ও পদ্ধতির ক্ষেত্রে এবং জার্মান সরকারের সদিচ্ছার। জার্মানির আইন এবং ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও আমেরিকার আইন এক নয়। এ ছাড়া বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে জার্মান ভাষায়, মিত্রশক্তির সাক্ষীদের জন্য যা ছিল অস্বস্তিকর ও বিরক্তিকর। বিচারে জার্মান সরকারের আগ্রহ ও আন্তরিকতার অভাব লক্ষ্য করে কিছু ব্রিটিশ সাক্ষী শেষ পর্যন্ত লাইপযিগের আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
জার্মান সুপ্রীমকোর্ট শেষ পর্যন্ত মাত্র ২২ জন যুদ্ধবন্দীর বিচার করেছিল যাদের ভেতর সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল তিন বছর কারাদন্ড যার এই শাস্তি হয়েছে তার অপরাধ ছিল সে মিত্রশক্তির একটি সমুদ্রগামী হাসপাতাল জাহাজ টর্পেডোর আঘাতে ডুবিয়ে দিয়েছিল- যে জাহাজে দুই শতাধিক আহত ও অসুস্থ সৈন্য এবং সাধারণ রোগী ছিল। ঠান্ডা মাথায় দুই শতাধিক নিরস্ত্র, আহত ও অসুস্থ মানুষকে হত্যার জন্য ওবেরলেফট্যানেন্ট সি প্যাটজিগকে মাত্র তিন বছরের কারাদ- প্রদান করে ‘লাইপজিগ ট্রায়াল’ ন্যায়বিচারের ইতিহাসে কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

মানব জাতির ইতিহাসে নৃশংসতম গণহত্যা, নির্যাতন, ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) সময়। জার্মানিতে হিটলারের নাৎসি বাহিনী, ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট বাহিনী এবং প্রাচ্যে জেনারেল তোজোর রাজকীয় জাপানী বাহিনীর গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের কথা বিশ্ববাসী কখনও ভুলবে না। হিটলারের নাৎসি বাহিনী এবং তাদের সহযোগী গেস্টাপো ও অন্যান্য বাহিনী যেভাবে ইহুদি, কমিউনিস্ট ও অজার্মানদের হত্যা করেছে সভ্যতার ইতিহাসে তার কোনও নজির নেই। যুদ্ধের ইতিহাসবিদরা নাৎসিদের এই নৃশংসতাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘হলোকস্ট’ বা ‘শোয়াহ্’ নামে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর মিত্রশক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঘোষণা প্রদান করে। ১৯৪৩ সালে ৩০ অক্টোবর ঐতিহাসিক ‘মস্কো ঘোষণা’ স্বাক্ষরিত হয়। এতে বলা হয়েছে, অক্ষশক্তির যে সব রাজনৈতিক নেতা ও সমর অধিনায়কদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ পাওয়া যাবে তাদের গ্রেফতার করে বিচার করা হবে। মস্কো ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৪৫ সালের ৪-১১ ফেব্রুয়ারি ইয়াল্টা কনফারেন্সে মিলিত হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল এবং সোভিয়েত রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্টালিন। এই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয় বিজয়ের পর মিত্রশক্তি সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবে। শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে তিন দেশের পররাষ্ট্র সচিবরা সম্মিলিতভাবে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করবে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে ইয়াল্টা সম্মেলনে চার্চিল বলেছিলেন, যুদ্ধজয়ের পর দেরি না করে পরাজিত সব নাৎসি নেতাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলতে হবে। স্টালিন বলেছিলেন আমাদের দেশে আমরা কাউকে বিচার না করে শাস্তি দিই না। বিরক্ত চার্চিল বলেছিলেন, আমরা বিচার করেই তাদের ফাঁসিতে ঝোলাব।
ইয়াল্টা সম্মেলনের পর মিত্রশক্তি যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা ও প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। তাদের সামনে ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা- প্রয়োজনীয় আইন এবং আন্তরিকতার অভাব ঘটলে কিভাবে যুদ্ধাপরাধীরা বিচার ও শাস্তি থেকে অব্যাহতি লাভ করে। ১৯৪৫ সালের ৮ আগস্ট মিত্রশক্তি ‘লন্ডন চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এতে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল’-এ। ট্রাইব্যুনালের নীতি ও কার্যবিধি এই চুক্তির ভেতর অনুমোদন করা হয়। এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন জাস্টিস এইচ জ্যাকসন, ফ্রান্সের অস্থায়ী সরকারের পক্ষে রবার্ট ফ্যালকো, যুক্তরাজ্য ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের সরকারের পক্ষে জোউইট সি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারের পক্ষে আই নিকিশেঙ্কো ও এ ট্রাইনিন।
এই চুক্তি অনুযায়ী মিত্রশক্তির চারটি দেশ ট্রাইব্যুনালের জন্য নিজ নিজ দেশের আইনজীবী ও বিচারক নিয়োগ চূড়ান্ত করে। যুক্তরাষ্ট্র ‘আন্তর্জাতিক সামরিক আদালত’ (আইএমটি)-এর প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতি রবার্ট এইচ জ্যাকসনকে নিয়োগ করে।

২০ নবেম্বর ১৯৪৫ তারিখে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম আরম্ভ হয়। এর আগে ১৮-১৯ অক্টোবর মিশ্রশক্তির আইনজীবীরা ‘আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতে’ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২৪ জন শীর্ষস্থানীয় নাৎসি নেতা ও সমরনায়ক এবং ৭টি সংগঠনকে সুপরিকল্পিতভাবে লাখ লাখ মানুষ হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করে ৬৫ পৃষ্ঠার অভিযোগনামা পেশ করেন। বিচার শুরু হওয়ার আগে নাৎসি পার্টির প্রধান হিটলার এবং তার দুই শীর্ষ সহযোগী হিমলার ও গোয়েবলস আত্মহত্যা করার জন্য বিচার থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন। অভিযুক্তদের তালিকায় ১ নম্বর আসামি ছিলেন ডেপুটি ফুয়েরার মার্টিন বোরমান। গ্রেফতারের আগেই তিনি আত্মগোপন করেছিলেন।
১৯টি তদন্ত দল অভিযুক্ত নাৎসি নেতাদের দুষ্কর্ম সম্পর্কে তদন্ত করেছেন। নাৎসি সরকারের দলিল, চিঠিপত্র, আলোকচিত্র ও চলচ্চিত্র সংগ্রহ করা ছাড়াও তারা অনেক বন্দী নির্যাতন শিবির পরিদর্শন এবং প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের জবানবন্দী নথিবদ্ধ করেছিলেন।

ব্যক্তির বিচারের পাশাপাশি নুরেমবার্গে ৭টি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের কর্মকা- সম্পর্কে তদন্ত ও বিচার হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে- ১) নাৎসি পার্টির নেতৃত্ব, ২) রাইখ সরকারের মন্ত্রিসভা, ৩) এসএস, ৪) গেস্টাপো ৫) এসডি, ৬) এসএ এবং ৭) জার্মান হাই কমান্ড। বিচারে ৪টি সংগঠন দোষী প্রমাণিত হয়েছে এবং রায়ে এদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য ৭টি নীতি বা ধারা প্রণয়ন করা হয়েছিল। ৬ নং ধারায় বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক আইনে যে সব অপরাধ শাস্তিযোগ্য বলে নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- ক) শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, খ) যুদ্ধাপরাধ ও গ) মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এরপর এই তিনটি অপরাধের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এর আগে এত নির্দিষ্টভাবে এই সব অপরাধ আইনশাস্ত্রে বিধিবদ্ধ হয়নি। নুরেমবার্গ নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানও অব্যাহতি পাবেন না। এই নীতিমালার ভিত্তিতেই প্রস্তুত করা হয়েছিল অভিযোগনামা।
প্রত্যেক দেশের বিচার ব্যবস্থার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পশ্চিমে প্রধানত দুই ধরনের বিচার পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্রশক্তিদের ভেতর আমেরিকা ও বৃটেন অনুসরণ করে ‘দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি’ (অফাবৎংধৎরধষ ঝুংঃবস)। অন্যদিকে ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়ন অনুসরণ করে ‘অনুসন্ধানমূলক পদ্ধতি’ (ওহয়ঁরংরঃরাব ঝুংঃবস)। আমেরিকা, ব্রিটেন এবং ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থার উত্তরসূরি হিসেবে আমাদের দেশে আদালতে বিচারক থাকেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। সাধারণত দুই পক্ষের সওয়াল-জবাব শুনে তারই ভিত্তিতে তিনি রায় দেন। অন্যদিকে ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের অধিকাংশ দেশের আদালত প্রধানত বিচারককেন্দ্রিক। বিচারক নিজেও বাদী ও বিবাদীকে প্রশ্ন করতে পারেন, দুই পক্ষের আইনজীবীদেরও জেরা করতে পারেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রায় দেন।
লন্ডনে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের নীতি প্রণয়নের সময় এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর কিছু পরিমার্জনসহ ‘দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি’ গ্রহণ করা হয়। এরপর প্রশ্ন উঠেছিল নতুন নীতিমালার ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা (জবঃৎড়ংঢ়বপঃরাব বভভবপঃ) সম্পর্কে। কোন অপরাধের বিচারের সময় বাদী পক্ষের আইনজীবীকে আদালতে বলতে হয় সেই অপরাধ আইনের কোন কোন ধারায় দন্ড যোগ্য। অপরাধ যখন সংঘটিত হয় তখন যে আইন বলবৎ ছিল সেই আইনে অপরাধীর বিচার হয়। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের নীতি ও আইন প্রণয়নের সময় মিত্রশক্তির আইনপ্রণয়নকারীদের এ বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হয়েছেজ্জ তারা নতুন কোন আইন তৈরি করতে যাচ্ছেন না যা আইনশাস্ত্রে ইতিপূবে বর্ণিত হয়নি। নুরেমবার্গে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ ও ‘শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধে’র বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রথমবারের মতো সূত্রবদ্ধ করা হলেও হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, বাধ্যতামূলক শ্রম, যৌনদাসত্ব, বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতি প্রভৃতি বহু আগে থেকেই অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। জাস্টিস জ্যাকসন লন্ডন বৈঠকের শুরুতেই মিত্রশক্তির সহযোগীদের বলেছিলেন, আমরা এমন সব কর্মকান্ডের বিচার করতে যাচ্ছি যা আদিকাল থেকে অপরাধ হিসেবে পরিগণিত এবং প্রতিটি সভ্য দেশে যার বিচার করা হয়।

নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের নীতি ও কার্যবিধি প্রণয়নের সময় মিত্রপক্ষের আইনজীবীরা সম্ভাব্য সকল চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। জাস্টিস জ্যাকসন তার উদ্বোধনী ও সমাপনী ভাষণে প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য সমালোচনা ও বিরুদ্ধ যুক্তি অত্যন্ত মেধা ও দক্ষতার সঙ্গে খন্ডন করেছেন। একটি সমালোচনা নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল গঠনের সময় থেকে এখন পর্যন্ত করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে এটি ছিল ‘বিজয়ীর বিচার’ (ঠরপঃড়ৎ’ং ঔঁংঃরপব)।
নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের উদ্বোধনী ভাষণে জাস্টিস জ্যাকসন এ বিষয়ে বলেছেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, আদালত গঠন সহ আইনজীবী ও বিচারক সবই নিয়োগ করতে হয়েছে যুদ্ধে বিজয়ী মিত্রশক্তিকে পরাজিত অক্ষশক্তির অপরাধের বিচারের জন্য। অভিযুক্তদের বিশ্বব্যাপী আগ্রাসনের কারণে সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ কেউ নেই বললেই চলে, যারা এই বিচারে আগ্রহী হতে পারে। এ ক্ষেত্রে হয় পরাজিতদের বিচার করতে হবে বিজয়ীদের, নয় তো পরাজিতদের অপরাধের বিচারের ভার তাদের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে। দ্বিতীয়টির অকার্যকারিতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অপরাধীদের বিচার কার্যক্রম থেকে।
অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছিল ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে অভিযুক্তদের আপিলের সুযোগ নেই, এমনকি বিচারকদের সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপনেরও কোন সুযোগ কার্যবিধিতে রাখা হয়নি। এ বিষয়ে অক্সফোর্ডের অধ্যাপক এ এল গুডহার্ট লিখেছেন, ‘তত্ত্বগতভাবে এই যুক্তি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, তবে তা যে কোন দেশের বিচারব্যবস্থার পরিপন্থী। এই যুক্তি মানতে হলে কোন দেশ গুপ্তচরদের বিচার করতে পারবে না। কারণ যে দেশের আদালতে সেই গুপ্তচরের বিচার হবে সেখানকার বিচারক তার শত্রুদেশের। এ ক্ষেত্রে কেউ নিরপেক্ষতার কথা বলতে পারে না। বন্দি গুপ্তচর বিচারকদের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করতে পারে কিন্তু কোন অবস্থায় তাদের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে না। (ক্রমশ.)

লর্ড রিট যেমন বলেছেন একই নীতি সাধারণ ফৌজদারি আইনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। একজন চোর নিশ্চয়ই অভিযোগ করতে পারে না তার বিচার কেন সৎ লোকেরা করছে।

নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে জাস্টিস জ্যাকসনের উদ্বোধনী ভাষণের মতোই আকর্ষণীয় ছিল তাঁর সমাপনী ভাষণ। ১৯৪৫-এর ২৬ জুলাই-এ প্রদত্ত এই ভাষণের উপসংহারে শেক্সপিয়ারের ‘রিচার্ড দি থার্ড’ নাটকের একটি উদ্ধৃতি দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ... অভিযুক্তরা বলছেন তারা হত্যা, হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের এই দীর্ঘ তালিকায় বর্ণিত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তারা এই বিচারের সামনে এমনভাবে নিজেদের দাঁড় করিয়েছেন যেভাবে রক্তরঞ্জিত গ্লচেস্টার দাঁড়িয়েছিলেন তার নিহত রাজার লাশের সামনে। এদের মতো গ্লচেস্টারও বিধবা রানীকে বলেছিলেন, আমি হত্যা করিনি। রানী জবাবে বলেছিলেন, ‘তাহলে বল তারা নিহত হয়নি, কিন্তু তারা মৃত।’ যদি এদের (অভিযুক্তদের) সম্পর্কে বলা হয় এরা নিরাপরাধ, তাহলে তা এমনই সত্য হবে যুদ্ধ বলে কিছু হয়নি, কেউ নিহত হয়নি, কোন অপরাধের ঘটনাও ঘটেনি।’
অভিযুক্তরা আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় সকল অপরাধের দায় হিটলার, হিমলার ও গোয়েবলস-এর উপর চাপিয়েছিলেন, যারা জার্মানির আত্মসমর্পণের আগেই বার্লিনে ২৫ ফুট মাটির নিচে বাঙ্কারে সপরিবারে আত্মহত্যা করেছিলেন। এ বিষয়ে ব্রিটেনের প্রধান কৌঁসুলি স্যার হার্টলি শকরস তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘কেউ হয়ত অন্যদের চেয়ে বেশি অপরাধ করতে পারে, হতে পারে কেউ অপরাধ সংঘটনে অন্যদের চেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকায় ছিল । কিন্তু অপরাধ যদি গণহত্যা, দাসত্ব, বিশ্বযুদ্ধদুই কোটি মানুষের প্রাণহানির মতো গুরুতর হয়, যদি একটি মহাদেশ ধ্বংসের মতো এবং বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত দুঃখক্লেশ ও বেদনার কারণ হয় তখন কে কম অপরাধ করেছে আর কে বেশি করেছে তাতে এই ক্ষত মিটবে না। কেউ কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী, কেউ দায়ী কয়েক লক্ষের মৃত্যুর জন্য, এতে অপরাধের কোন তারতম্য ঘটছে না।’

নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের গঠন প্রক্রিয়া এবং এর মান সম্পর্কে অনেকে তখন অনেক কথা বলেছেন। নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের উকিলরা বলেছিলেন এই ট্রাইব্যুনালে তারা ন্যায় বিচার পাবেন না। তারপরও বিচার চলাকালে কয়েকজন শীর্ষ নাৎসি নেতা এই ট্রাইবুনালকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। নাৎসি নেতা হ্যান্স ফ্র্যাঙ্ক ছিলেন অধিকৃত পোল্যান্ডের গবর্নর জেনারেল। তিনি বলেছেন, ‘আমার বিবেচনায় এই বিচার হচ্ছে ঈশ্বরের ইচ্ছাধীন আদালতে, যেখানে এডলফ হিটলারের আমলের দুঃসহ যাতনার পর্যালোচনা ও সমাপ্তি ঘটবে।’ হিটলারের যুদ্ধসামগ্রী নির্মাণ মন্ত্রী এ্যালবার্ট স্পিয়ার বলেছেন, ‘এই বিচার জরুরী। এমনকি একটি একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও এসব ভয়াবহ অপরাধের সম্মিলিত দায় থাকে।’ অভিযুক্তদের একজন আইনজীবী ড. থিয়োডর ক্লেফিশ লিখেছেন, ‘এই ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া ও রায় সর্বোচ্চ পক্ষপাতহীনতা, বিশ্বস্ততা ও ন্যায়বোধ দাবি করে। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল এই সব দাবি মর্যাদার সঙ্গে পূরণ করেছে। এই বিশাল বিচারযজ্ঞের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সত্য ও ন্যায় অনুসন্ধান ও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যাতে কারও ভেতর কোন সন্দেহ না থাকে।

নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে ৪টি মিত্র দেশের ৮ জন বিচারক ছিলেন যাদের একজন পূর্ণ সদস্য অপরজন বিকল্প সদস্য। বিচারকমন্ডলীর সভাপতি ছিলেন ইংল্যান্ডের লর্ড জাস্টিস জিওফ্রে লরেন্স। ৪টি দেশের ৫২ জন আইনজীবী ছিলেন সরকারের পক্ষে। প্রত্যেক দেশের এক মুখ্য আইনজীবী এবং কয়েকজন আইনজীবী ও সহকারী আইনজীবী ছিলেন, তবে সরকারি আইনজীবীদের পক্ষ থেকে আদালতে সূচনা ও সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস জ্যাকসন। তাঁর এই দুটি দীর্ঘ ভাষণ আন্তর্জাতিক আইনশাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে গণ্য করা হয়।
নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের একটি সচিবালয় ছিল। বিভিন্ন বিভাগে মোট ১৮ জন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম দফা বিচারকালে ৬ জন ছিলেন সচিব, ২ জন মার্শাল, অনুবাদ বিভাগের প্রধান ছিলেন ৩ জন, প্রশাসনিক বিভাগের প্রধান ১ জন, সাক্ষীদের তলব ও সাক্ষ্য প্রমাণ বিভাগের ১ জন প্রধান, অভিযুক্তদের তথ্য বিভাগের প্রধান ১ জন, দলিল ও রেকর্ডের বিভাগের দায়িত্বে ১ জন, রেকর্ড সম্পাদক ১ জন এবং মুদ্রণ বিভাগের পরিচালক ১ জন। এই সচিবালয়ের বিভিন্ন বিভাগে তিন শতাধিক কর্মচারী ছিলেন। জনশক্তির বিবেচনায় নুরেমবার্গ ট্রায়ালের দ্বিতীয় উদাহরণ বিচারের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। এই বিচারকার্যের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশগ্রহণের জন্য আমেরিকা থেকে ৬৪০ জন সামরিক ও অসামরিক ব্যক্তি নুরেমবার্গ এসেছিলেন যাদের ভেতর ১৫০ জন ছিলেন আইনজীবী।
নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করলেও নুরেমবার্গ ট্রায়ালের রেকর্ড কখনও ভাঙা যাবে না। বিচার চলাকালে কয়েক শ’ সৈন্য ৭৫ মি.মি. কামান সমেত প্যালেস অব জাস্টিসের চতুর্দিকে টহল দিত। শতাধিক মিলিটারি পুলিস আদালত ভবনের ভেতরে টহল দিত। ১৯৪৬-এর ৩০ সেপ্টেম্বর সেদিন আদালতের রায় ঘোষণা করা হয় সেদিন অতিরিক্ত ১০০০ সৈন্য নিরাপত্তার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল।

১৯৪৯ সালের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আদালত বার্লিনে স্থানান্তর করা হয়। অন্যান্য মিত্র দেশের আদালতেও ১৬০০ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে, যারা পরে ধরা পড়েছেন।
ট্রাইব্যুনালে ৪টি ভাষায় (ইংরেজী, ফরাসী, রুশ ও জার্মান) বিচারিক কার্য সম্পাদিত হয়েছে। আদালতের ৪০৩টি প্রকাশ্য অধিবেশনে দুই শতাধিক সাক্ষী উপস্থিত হয়ে অভিযুক্তদের পক্ষে ও বিপক্ষে মৌখিক সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। ১৮০৯ জন সাক্ষীর এফিডেভিট আদালতে প্রদান করা হয়েছে। ১৫৫০০০ ব্যক্তির স্বাক্ষরকৃত ৩৮ হাজার এফিডেভিট প্রদান করা হয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে। এসএসদের পক্ষ থেকে করা হয়েছে ১৩৬২১৩টি এফিডেভিট। ১০,০০০ এসএ-র পক্ষে, ৭,০০০ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এবং ২,০০০ এফিডেভিট গেস্টাপোদের পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়েছে। প্রায় তিশ লাখ ফুট প্রামাণ্যচিত্রের ফিল্ম পরীক্ষা করে এক লাখ ফুট নুরেমবার্গে আনা হয়েছিল। ২৫,০০০-এরও বেশি আলোকচিত্র প্রমাণ হিসেবে নুরেমবার্গে আনা হয়েছিল। এর ভেতর ১৮,০০০ আলোকচিত্র ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মিত্রপক্ষের আইনজীবীরা তিন হাজার টন রেকর্ড আদালতে প্রদান করেছিলেন।
নুরেমবার্গের আদালতে ৪০০ দর্শনার্থী/পর্যবেক্ষককে অনুমতি দেয়া হয়েছিল প্রাত্যহিক বিচারকার্য প্রত্যক্ষ করার জন্য।

পর্যবেক্ষকদের তালিকায় মন্ত্রী, বিচারক, আমলা, আইনপ্রণেতা ও মানবাধিকার কর্মীরা ছিলেন। এ ছাড়া ২৩টি দেশ থেকে ৩২৫ জন সাংবাদিক প্রতিদিন উপস্থিত থেকে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচার করেছেন।
জাস্টিস জ্যাকসন পরে বলেছিলেন, প্রাথমিকভাবে তিনি প্রমাণের জন্য নির্ভর করেছেন নাৎসি নেতাদের লিখিত বক্তব্য, সরকারী দলিল এবং পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ওপর। তিনি সাক্ষীর ওপর বেশি নির্ভর করেননি এ কারণে যে, প্রতিপক্ষ বলতে পারে সাক্ষীদের প্রভাবিত করে শিখিয়ে-পড়িয়ে আনা হয়েছে। (ক্রমশ.)

ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের জবানবন্দী থেকে আমরা বিস্তারিত জেনেছি অসউইজসহ বিভিন্ন বন্দীশিবিরে কী নৃশংসভাবে ইহুদি বন্দীদের গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে মারা হয়েছে।
১ অক্টোবর ১৯৪৬ সালে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে প্রথম পর্যায়ে শীর্ষস্থানীয় ২৪ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারে ১২ জনকে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়। ৩ জনকে যাবজ্জীবন, ২ জনকে ২০ বছর, ১ জনকে ১৫ বছর এবং ১ জনকে ১০ বছর কারাদ- প্রদান করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩ জন খালাস পায়। অভিযুক্ত বাকি দুজনের ভেতর জার্মান শ্রমিক ফ্রন্ট ডিএএফ-এর প্রধান গুস্তাভ ক্রুপকে শারীরিক অসুস্থতার জন্য মেডিকেল বোর্ড বিচারের সম্মুখীন হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করে। অপর অভিযুক্ত ডাঃ রবার্ট লাই বিচার শুরু হওয়ার আগে ২৫ অক্টোবর ১৯৪৫ তারিখে আত্মহত্যা করেন। নাৎসি পার্টির সেক্রেটারি, ডেপুটি ফুয়েরার মার্টিন বোরমানের অনুপস্থিতিতে বিচার হয়েছিল এবং তাঁকে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়।
নুরেমবার্গ ট্রায়াল বলতে সাধারণভাবে প্যালেস অব জাস্টিসে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে’র প্রথম বিচারকে গণ্য করা হয়, যার সময়কাল ছিল ১০ মাস। ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত নুরেমবার্গের প্যালেস অব জাস্টিসে আরও ১২টি মামলার বিচার হয়েছিল যেখানে ২০০ জন নাৎসি রাজনৈতিক নেতা, সামরিক কর্মকর্তা ও পেশাজীবীর বিচার হয়েছিল। এদের ভেতর ২৪ জনকে প্রথমে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছিল, পরে ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হয়। অবশিষ্টদের ২০ জনকে যাবজ্জীবন এবং ৯৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেয়া হয়। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩৫ জনকে অব্যাহতি দেয়া হয়। গুরুতর অসুস্থতা ও বার্ধক্যের কারণে ৪ জনকে বিচার থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ৪ জন বিচার চলাকালে আত্মহত্যা করেছিলেন।

উপরোক্ত ১২টি মামলা ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল’-এ হয়নি। কারণ প্রথম ২৪ জনের মামলা চলাকালে চার মিত্রশক্তির ভেতর বিভিন্ন বিষয়ে গুরুতর মতপার্থক্য ঘটেছিল। ১৯৪৫-এর ৩০ আগস্ট পরাজিত জার্মানির রাষ্ট্রীয় কর্মকা- পরিচালনার জন্য যখন মিত্রশক্তির কন্ট্রোল কাউন্সিল (এসিসি) গঠিত হয় তখনও বিচারের পদ্ধতি সম্পর্কে শরিকদের ভেতর মতপার্থক্য যথেষ্ট পরিমাণে ছিল। এসিসির নীতিমালায় বলা হয়েছে শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্মিলিতভাবে করা হলেও যারা পরে যার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ধরা পড়বে সেই দেশ তাদের বিচার করবে। ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইবুনালে’ (আইএমটি) ২৪ জন শীর্ষ নাৎসি নেতার বিচার শেষ হওয়ার পর ‘আইএমটি’র বিলুপ্তি ঘটে। একই ভবনে আমেরিকা গঠন করে ‘নুরেমবার্গ মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল (এনএমটি)।

এই ট্রাইব্যুনালে নিম্নোক্ত ১২টি মামলা হয়েছিল
১। ডক্টর্স ট্রায়াল (৯ ডিসেম্বর ১৯৪৬২০ আগস্ট ১৯৪৭) : বিচার হয়েছিল ২৪ জনের, ২। মিল্চ্ ট্রায়াল (২ জানুয়ারি১৬ এপ্রিল ১৯৪৭) : বিচার হয়েছিল ১ জনের, ৩। জাজেস ট্রায়াল (৫ মার্চ৪ ডিসেম্বর ১৯৪৭) : বিচার হয়েছিল ১৬ জনের, ৪। পল ট্রায়াল (৮ এপ্রিল ৩ নবেম্বর ১৯৪৭) : বিচার হয়েছিল ১৮ জনের, ৫। ফ্লিক ট্রায়াল (১৯ এপ্রিল ২২ ডিসেম্বর ১৯৪৭) : বিচার হয়েছিল ৬ জনের, ৬। আই জি ফারবেন ট্রায়াল (২৭ আগস্ট ১৯৪৭ ৩০ জুলাই ১৯৪৮) : বিচার হয়েছিল ২৪ জনের, ৭। হস্টেজেস ট্রায়াল (৮ জুলাই ১৯৪৭ ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮) : বিচার হয়েছিল ১২ জনের, ৮। রুশা বা রাশিয়া ট্রায়াল (২০ অক্টোবর ১৯৪৭ ১০ মার্চ ১৯৪৮) : বিচার হয়েছিল ১৫ জনের, ৯। আইনসাজ গ্রুপেন ট্রায়াল (২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ ১০ এপ্রিল ১৯৪৮) : বিচার হয়েছিল ২৭ জনের, ১০। ক্রুপ ট্রায়াল (৮ ডিসেম্বর ১৯৪৭ ৩১ জুলাই ১৯৪৮) : বিচার হয়েছিল ১২ জনের, ১১। মিনিস্ট্রিজ ট্রায়াল (৬ জানুয়ারি ১৯৪৮ ১৩ এপ্রিল ১৯৪৯) : বিচার হয়েছিল ২১ জনের, ১২। হাই কমান্ড ট্রায়াল (৩০ ডিসেম্বর ১৯৪৭ ২৮ অক্টোবর ১৯৪৮) : বিচার হয়েছিল ১৪ জনের।
উপরোক্ত ১২টি মামলাসহ আমেরিকান মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ১৯৪৫ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ইউরোপ, জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৮০৯টি মামলা পরিচালনা করেছে যেখানে বিচার হয়েছে ১৬০০ জন আসামির। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ৯৩৭ জনের বিচার করেছে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স করেছে ২১০৭ জনের বিচার ।

আমেরিকা ছাড়াও সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স ও ব্রিটেন তাদের অধিকৃত জার্মানিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে। এসব বিচারের ভেতর উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ১) ডাচাউ ট্রায়ালস, ২) অসউইজ ট্রায়াল, ৩) বেলসেন ট্রায়াল, ৪) ফ্র্যাঙ্কফুর্ট-অসউইজ ট্রায়াল, ৫) বুখেনওয়াল্ড ট্রায়াল এবং ৬) নেউয়েনগামে ট্রায়াল। এই ৬টি মামলায় ১০৯ নাৎসি যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও শাস্তি হয়েছে। সবচেয়ে অধিকসংখ্যক নাৎসির বিচার হয়েছে অসউইজ ট্রায়ালে। এই মামলায় ৩৯ জন অভিযুক্তের ভেতর ২০ জনকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে। এর বাইরে নাৎসিদের সহযোগীদেরও বিচার হয়েছে নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ফিনল্যান্ড, রুমানিয়া, ফ্রান্স, পোল্যান্ড ও অস্ট্রিয়া সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।
নুরেমবার্গ ট্রায়াল সম্পর্কে বলা হয় আইন শাস্ত্রের ইতিহাসে এত বড় বিচার কখনও হয়নি। এই বিচার আন্তর্জাতিক আইনকে সমৃদ্ধ করেছে, সভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার ও শাস্তির বোধ প্রতিষ্ঠা এবং দেশে দেশে অনুরূপ অপরাধ বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এর আগে বা পরে কোন দেশের ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থানকারী সামরিক-অসামরিক নেতৃবৃন্দকে কখনও আদালতের কাঠগড়ায় এভাবে দল বেঁধে দাঁড়াতে হয়নি যেমনটি হয়েছে নুরেমবার্গে। একজন ব্যক্তি বা ব্যক্তিমন্ডলী কিংবা কোন দল বা সংগঠন যত শক্তিশালী ও ক্ষমতাসম্পন্ন হোক না কেন কেউই আইনের উর্ধে নয় নুরেমবার্গের বিচার এই বোধটিও প্রতিষ্ঠা করেছে।
টোকিও ট্রাইব্যুনাল আয়োজন ও আড়ম্বরের দিক থেকে নুরেমবার্গের কাছাকাছি হলেও রাজনৈতিক কারণে, বিশেষভাবে আমেরিকার প্রয়োজনে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীর বিচার না করায় এই বিচার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইতিহাসে নতুন কোন মাত্রা যুক্ত করতে পারেনি। এরপর ম্যানিলা, বসনিয়া, রুয়ান্ডা, যুগোসøাভিয়া, সিয়েরা লিওন, কম্বোডিয়া ও ইস্ট তিমুরে গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালত গঠন করা হয়েছে কিংবা পূর্বে গঠিত আন্তর্জাতিক আদালতে এসবের বিচার হয়েছে।

এসব বিচারের ক্ষেত্রে আদালতের রায়ে অপরাধের বৈশিষ্ট্য এবং বিচারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিবেচনা ও বিচারপদ্ধতি নিঃসন্দেহে গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে নতুন নতুন ধারণা ও মাত্রা সংযোজিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থা সমৃদ্ধ হয়েছে। একাধিক কারণে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থায়ও গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা সংযোজন করেছে।
নুরেমবার্গের ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইবুনাল’ (আইএমটি)-এর সঙ্গে ঢাকার ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইবুনাল’ (আইসিটি)-এর প্রধান মিল হচ্ছে ন্যায়বিচারের দর্শন ও চেতনাগত। আমরা যদি মনে করি ‘গণহত্যা’ ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ ‘শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ’, ‘যুদ্ধাপরাধ’ প্রভৃতি সাধারণ হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুন্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞের চেয়ে অনেক ভয়াবহ ও গুরুতর অপরাধ তাহলে অপরাধীদের অবশ্যই বিচার করতে হবে যুদ্ধের ভিকটিমদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের স্বার্থে, ভবিষ্যতে মানবজাতিকে গণহত্যা ও যুদ্ধের অভিশাপ থেকে মুক্তি প্রদান এবং সভ্যতার বোধ নির্মাণের প্রয়োজনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রশক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সরকার এই উদ্দেশ্যে বিশেষ আইন প্রণয়ন করে বিশেষ ট্রাইবুনালে এসব অপরাধের বিচারের প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করেছে। নুরেমবার্গের ‘আইএমটি’-র সঙ্গে ঢাকার ‘আইসিটি’-র পার্থক্য হচ্ছে প্রথমটি ছিল আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল এবং দ্বিতীয়টি জাতীয় বা দেশীয় ট্রাইবুনাল। এছাড়া প্রথমটি ছিল সামরিক আদালত, দ্বিতীয়টি অসামরিক আদালত। (ক্রমশ)

পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ দেশ, আমেরিকা, কানাডা, রাশিয়া, ইসরাইল ও আরও কয়েকটি দেশ যুদ্ধাপরাধ সহ মানবতাবিরোধী বহু কর্মকান্ড যা আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির পরিপন্থী সেসব তাদের দেশীয় আইনে সংজ্ঞায়িত করে বিচারের ক্ষেত্র প্রসারিত করেছে। নুরেমবার্গ ট্রাইবুনালে ‘গণহত্যা’ স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত হয়নি। ঢাকার ট্রাইবুনাল গণহত্যাকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে এবং এই ট্রাইবুনালে অভিযুক্ত আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে প্রথম রায়ে এ বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের আগে কোনও দেশের নিজস্ব আইনে গণহত্যা (মবহড়পরফব)-কে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি।
ইংরেজিতে দুটি শব্দ সধংং শরষষরহম ও মবহড়পরফব-এর বাংলা গণহত্যা, কিন্তু দুটির অর্থ এক নয়। সধংং শরষষরহম হচ্ছে নির্বিচারে হত্যা, যা বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছিল ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের পর। কিন্তু এই সধংং শরষষরহম দ্রুত মবহড়পরফব-এ রূপান্তরিত হয়েছে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় বিশেষভাবে হিন্দুরা। এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থক এবং স্বাধীনতার পক্ষের বাঙালি জাতি। একটি নৃগোষ্ঠী, সম্প্রদায় ও জাতিকে যখন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে হত্যা এবং অন্যান্য প্রক্রিয়ায় নিশ্চিহ্নকরণের উদ্যোগ নেয়া হয় সেটা মবহড়পরফব. গণহত্যা বিশেষজ্ঞ মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আর জে রুমেল এই ধরনের গণহত্যাকে আরও বিভাজন করেছেন। একটি হচ্ছে সরকার বা রাষ্ট্র কর্তৃক, অপরটি হচ্ছে সরকারের বাইরের কোন গোষ্ঠী, দল বা সম্প্রদায় কর্তৃক। সরকার কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যাকে রুমেল অভিহিত করেছেন ফবসড়পরফব হিসেবে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশে সধংং শরষষরহম, মবহড়পরফব, ঢ়ড়ষরঃরপরফব ও ফবসড়পরফব সব ধরনের হত্যা সংঘটিত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে আইএমটির চেয়ে আইসিটির অবস্থান স্বচ্ছ এবং নিঃসন্দেহে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী। দেশীয় আইন ও দেশীয় আদালতে গণহত্যার বিচার করে বাংলাদেশ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, গত শতাব্দীতে গণহত্যার শিকার অথচ বিচারবঞ্চিত এমন বহু দেশের জন্য তা অনুকরণযোগ্য বিবেচিত হবে।

যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল যে বিশাল আয়োজনের পাশাপাশি আইনী লড়াইয়ের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে আইএমটির প্রতিদিনের ধারাবিবরণী পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় বিশ্বের বিচারব্যবস্থায় তা এক অনন্য অধ্যায়, অতীতে যেমনটি দেখা যায়নি, ভবিষ্যতেও যাবে কি না সন্দেহ। বাংলাদেশে আইসিটির আয়োজন আইএমটির আয়োজনের তুলনায় কিছুই নয়। কিন্তু যে সীমিত সম্পদ, লোকবল ও রসদ সম্বল করে ঢাকার ট্রাইব্যুনাল যাত্রা শুরু করেছে, দশ মাসের ভেতর একটি মামলার শুনানি শেষ করে রায় দিয়েছে তাতে সংশ্লিষ্টদের দেশপ্রেম ও পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দৃঢ়তা প্রতিফলিত হয়েছে।
নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়েছিল অপরাধ সংগঠনের অব্যবহিত পরে অথচ বাংলাদেশে বিচার শুরু হয়েছে প্রায় চল্লিশ বছর পর। সময়ের ব্যবধানে বহু প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী মৃত্যুবরণ করেছেন, বহু তথ্যপ্রমাণও হারিয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে অধিকাংশ সময় ক্ষমতায় ছিল ’৭১-এর গণহত্যাকারীরা এবং তাদের সহযোগীরা। ক্ষমতায় থাকার সুযোগে তারা বহু তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করেছে এবং পাঠ্যপুস্তক ও প্রচার মাধ্যম থেকে ’৭১-এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ শুধু নয় সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলতে চেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাহীনতার এক অন্ধকার সময়ের ভেতর। যাদের অনেকে পাকিস্তানী লেখক এবং তাদের বাংলাদেশী দোসরদের মিথ্যাচারের শিকার। তার মনে করে ’৭১-এ তিরিশ লাখ মানুষের গণহত্যা, সোয়া চার লাখ নারীর পাশবিক নির্যাতন ইত্যাদি পরিসংখ্যান অতিরঞ্জিত। তারা মনে করে ’৭১-এ কোন মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, পশ্চিম পাকিস্তানের ভাইদের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের ভাইদের কিছু রাজনৈতিক বিষয়ে মতপার্থক্যকে হিন্দু ভারত গৃহযুদ্ধে রূপান্তরিত করেছে এবং এই গৃহযুদ্ধের সুযোগে ভারত পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগ ভারতের এই চক্রান্তের প্রধান সহযোগী ছিল এবং এখনও ভারতের স্বার্থে কাজ করছে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে এদেশের মানুষের অনন্যসাধারণ ত্যাগ, জীবনদান, শৌর্যবীর্যের পাশাপাশি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের দ্বারা নৃশংসতম গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ যেমন সংঘটিত হয়েছে, গণহত্যার একই নৃশংসতায় হত্যা করা হয়েছে ইতিহাসের এই অমোঘ সত্য। এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ঢাকায় আইসিটি যে রায় দিয়েছে তা ইতিহাসের বহু বিস্মৃত সত্যকে মিথ্যার অন্ধকার বিবর থেকে মুক্ত করেছে।
আইসিটির প্রথম রায়ে গণহত্যার নৃশংসতা উপলব্ধির জন্য বাচ্চু রাজাকারের কয়েকটি হত্যা, ধর্মান্তকরণ ও ধর্ষণের উল্লেখ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাচ্চু রাজাকার যাদের হত্যা করা হয়েছে ধর্মীয় পরিচয়ে তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের। রাজাকারদের গণহত্যার যে পদ্ধতি ফরিদপুরের নগরকান্দায় অনুসৃত হয়েছে সারা দেশের চিত্র তারই সমার্থক। এই রায়ের সমালোচনা করতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর কিছু ভাড়াটে গণমাধ্যম, পেশাজীবী ও মানবাধিকার সংগঠন মন্তব্য করেছে অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন ধর্মপ্রচারক, ইসলামী চিন্তাবিদ তার বিচারের অর্থ হচ্ছে ইসলামকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো, তার মৃত্যুদ- সরকারের ইসলামবিরোধী মনোভাবের প্রকাশ ইত্যাদি। এরা মনে করেহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন প্রভৃতি অপরাধ ইসলামের সমার্থক। ১৯৭১ সালে ইসলামের দোহাই দিয়েই জামায়াতে ইসলামী গণহত্যা ও নারীধর্ষণ সহ যাবতীয় মানবতাবিরোধী নৃশংস অপরাধকে বৈধতা দিয়েছিল। একজন ধর্মপ্রচারক কিভাবে ভিন্ন ধর্মের অনুসারী বস্তু জগৎ ও পার্থিব স্বার্থের বিপরীতে আধ্যাত্মিক জগতের অনুসারী আটজন সাধু সন্ন্যাসীকে হত্যা করতে পারে এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার প্রয়োজন তারা মনে করে না। হত্যার হুমকি দিয়ে ধর্মান্তরকরণের মতো নিষ্ঠুরতা কিভাবে অনুমোদন করা যায়? অঞ্জলী সাহাকে যেভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে, যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, যেভাবে তাকে দাহ করতে বাধা দেয়া হয়েছেএ ধরনের নৃশংসতার ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্টের পর পৃথিবীর কোথাও ঘটেনি। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর চেয়ে তাদের সহযোগীদের অপরাধের নৃশংসতা কোনও অংশে কম ছিল না। ঢাকার ট্রাইব্যুনালের রায়ে এ বিষয়টি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

নুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রাইব্যুনাল চরিত্রগতভাবে ছিল সামরিক আদালত। আদালতের রায় ছিল চূড়ান্ত। এর বিরুদ্ধে অভিযুক্তকে আপিলের সুযোগ দেওয়া হয়নি। ঢাকার ‘আইসিটি’র আইনে অভিযুক্তকে ট্রাইবুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে আপিলের সুযোগ দেয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি মানবাধিকারের বিবেচনায় নুরেমবার্গ ও টোকিওর চেয়ে মানসম্পন্ন।
নুরেমবার্গ ট্রাইবুনালে নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের যখন বিচার হয় তখন সমগ্র জার্মানি যুদ্ধবিধ্বস্থ। পৃথিবীর কোথাও অভিযুক্ত নাৎসিদের প্রতি সহানুভূতি জানাবার মতো কেউ ছিল না। ’৭১-এর গণহত্যার সময় সৌদি আরব তথা মুসলিম উম্মাহ পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের বাঙালি সহযোগীদের পক্ষে ছিল। আমেরিকা, চীন, আফ্রিকা এবং পশ্চিম ইউরোপের বহু দেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের গণহত্যাকে সমর্থন করেছে। ২০০৯ সালে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী ও গণহত্যাকারীদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণের পর পরই অপরাধীদের প্রধান দল জামায়াতে ইসলামী বিচার প্রশ্নবিদ্ধ ও বিঘিœত করাবার জন্য শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে তাদের পক্ষে লবিস্ট নিয়োগ করেছে, তাদের পক্ষে বহু গণমাধ্যম কর্মী, মানবাধিকার কর্মী এবং বিভিন্ন সংগঠনকে ভাড়া করেছে এই বিচার সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য। আইসিটির ভেতরেও তাদের অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মহল অবগত রয়েছেন। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালকে এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বহু কারণেই নুরেমবার্গে নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। নাৎসি দর্শনের একনিষ্ঠ অনুসারী জামায়াতে ইসলামীর মিত্র যেমন দেশের ভেতরে আছে তার চেয়ে বেশি আছে দেশের বাইরে। পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জামায়াতের কোন প্রভু বা বন্ধুরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারের বিরোধিতা না করলেও কয়েকটি দেশ ও সেসব দেশের আল কায়দার সহযোগীরা অনানুষ্ঠানিক ও পরোক্ষভাবে এই বিচার সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে অপপ্রচার ও নেতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করছে যে সুযোগ নুরেমবার্গ ট্রাইবুনালে বিচারাধীন যুদ্ধাপরাধীদের ছিল না।
নুরেমবার্গে ২২ জন অভিযুক্ত ও ৭টি সংগঠনের বিরুদ্ধে মামলার রায় একসঙ্গে দেয়া হয়েছে। আইসিটি প্রতিটি অভিযুক্তের জন্য পৃথক অভিযোগনামা প্রণয়নের পাশাপাশি শুনানি করেছে পৃথকভাবে এবং রায় প্রদানও শুরু হয়েছে পৃথকভাবে। এতে অভিযুক্তরা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ বেশি পেয়েছেন। নুরেমবার্গে প্রথম মামলার রায় পরবর্তী পর্যায়ের বিচারের ক্ষেত্রে কতগুলো বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। ঢাকার আইসিটির প্রথম রায়ের একাধিক পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য পরবর্তী মামলাসমূহের রায় কিছুটা সহজ করে দিয়েছে। যদিও বাচ্চু রাজাকারের বিচার হয়েছে তার অনুপস্থিতিতে, তার নিজস্ব আইনজীবী ছিলেন না, রাষ্ট্র তার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করেছে, পলাতক থাকার কারণে তার পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে আপিলেরও সুযোগ নেই যা অন্যদের আছে; তা সত্ত্বেও ‘প্রধান প্রসিকিউটর বনাম মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ওরফে আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু (পলাতক)’ শীর্ষক মামলার রায়ে যেভাবে ‘ঐতিহাসিক পটভূমিকা’, ‘ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার’, ‘অভিযোগ প্রমাণের দায়’, ‘পটভূমি ও প্রসঙ্গ’, ‘ত্রিপক্ষীয় চুক্তি ও ১৯৫ পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীর দায়মুক্তি’ ‘অপরাধের সংজ্ঞা ও উপাদান’, ‘অভিযোগের বিচার’, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ভূখন্ডে বিরাজমান প্রেক্ষিত’ প্রভৃতি অনুচ্ছেদে এমন কিছু মন্তব্য রয়েছে যা বাংলাদেশে এবং আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে।

দেশীয় আইনে এবং দেশীয় আদালতে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুরূহ কাজ। এ ক্ষেত্রে ট্রাইবুনালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা, আইনজীবী, প্রশাসনিক বিভাগ ও বিচারকদের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, কিন্তু তাদের সামনে ছিল নুরেমবার্গ, টোকিও ও ম্যানিলা থেকে আরম্ভ করে চলমান কম্বোডিয়ার বিচারের ইতিহাস ও কার্যক্রম; এসব বিচারের ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিষয়সমূহ। ঢাকার ট্রাইবুনালের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা পড়াশোনা করেছেন, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন এবং নিজেদের কর্মক্ষেত্রের বিশাল অভিজ্ঞতার আলোকে ’৭১-এর গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের মামলার প্রথম রায় প্রদান করেছেন।
নুরেমবার্গ থেকে আরম্ভ করে কম্বোডিয়া পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অপরাধে ঘটনার দীর্ঘ চল্লিশ বছরের ব্যবধানে বিচার একমাত্র বাংলাদেশেই আরম্ভ হয়েছে। এই বিচার ও প্রথম রায় প্রমাণ করেছে দেশের জনগণ ও সরকার যদি চায় অপরাধ যত অতীতেই ঘটুক না কেন স্বজনহারাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে তাদের দুঃসহ বেদনা সম্পূর্ণ উপশম না হোক লাঘব করা সম্ভব।

এই বিচার যাতে অব্যাহত থাকে এখনই প্রয়োজন আইন প্রণয়ন করে অস্থায়ী ট্রাইবুনালকে স্থায়ী ট্রাইবুনালে রূপ দেয়া। আরও প্রয়োজন বিচার বিলম্বিত, প্রশ্নবিদ্ধ ও বানচাল করবার যাবতীয় ষড়যন্ত্র, সহিংসতা ও অন্তর্ঘাত প্রতিহতকরণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ। এসব ষড়যন্ত্র ও অন্তর্ঘাত দেশের ভেতর মোকাবেলা করতে হবে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আইনগতভাবে এবং দেশের বাইরে করতে হবে সর্বাত্মক কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে।
আমরা আরও চাই নুরেমবার্গের মতো ঢাকার ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল’ ভবন একদিন জাদুঘরে পরিণত হবে। ‘গণহত্যা’, ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’, ‘শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ’ ও ‘যুদ্ধাপরাধের’ স্থান জাদুঘরের বাইরে আর কোথাও হওয়া উচিৎ নয়। সকল দেশের সকল অপরাধীর বিচার ও শাস্তির মাধ্যমে এই প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব। বাংলাদেশ সেই প্রত্যাশা তখনই পূরণ করতে পারবে যেদিন ঢাকার আইসিটি শেষ যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারকার্যের সমাপ্তি ঘোষণা করবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট