...মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে নতুনরূপে আসছে...

This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Liberation War of Bangladesh and Genocide of Innocent Bengali People in 1971. More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

ফেসবুকে আমরা

মৃত্যুর মুখোমুখি ফকা-সাকার বন্দিশালায় - বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী

মৃত্যুর মুখোমুখি ফকা-সাকার বন্দিশালায়

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী


ডাউনলোড করুন (লিংক) অথবা, অনলাইনে পড়ুন



১৯৭১ সালের ১৩ আগস্ট। আন্দরকিল্লা থেকে সিরাজউদ্দৌলা রোড ধরে আমার তখনকার বাসা চন্দনপুরার হাদি মনজিলে ফিরছিলাম। সকাল আনুমানিক ১১টা। সঙ্গে দুই বন্ধু মীরসরাই’র আনোয়ার কামাল আর সাতকানিয়ার রফিকুল ইসলাম। দিদার মার্কেটের সামনে আমরা। হঠাৎ একটা মিলিটারি জিপ এসে পেছনে ব্রেক কষে। ড্রাইভারের পাশে বসা ফজলুল কাদের চৌধুরীর বড় ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। ফকার ছেলে নির্দেশ দিল- ‘তুলি ল’। দেখলাম জীপ থেকে নামছে আমাদের ছাত্রলীগের কর্মী ইউসুফ এবং তিনজন অবাঙালি মিলিশিয়া।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ইউসুফ আমাদের সঙ্গে ভারতের আগরতলা গিয়েছিল। সেখানে অবস্থানকালে ট্রেনিংও নিয়েছিল। কিন্তু আগরতলা থেকে দেশে ফিরে আসার পর তার বাবা মুসলিম লীগের কর্মী ও ফজলুল কাদের চৌধুরীর এক অন্ধভক্ত ইউসুফকে ধরে ফকার হাতে তুলে দিয়ে আসে। ফকা তার মুরিদের ছেলেকে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে নেয়। ই্উসুফের দায়িত্ব ছিল আমরা যারা আগরতলা থেকে এসে মুক্তিযুদ্ধের জন্য কাজ করছি তাদেরকে ফকা-সাকা বাহিনীর কাছে চিনিয়ে দেওয়া। সাকা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জিপ নিয়ে সারা শহর এবং আশে পাশে ঘুরে বেড়াত। সঙ্গে থাকতো এই ইউসুফ এবং পাকিস্তানি মিলিটারিকে সাহায্যকারী বন্দুকধারী মিলিশিয়া।

ইউসুফের এই রূপান্তর আগেই শুনেছি। তাই ফকার ছেলে আর তাকে জিপ নিয়ে থামতে দেখে পিলে চমকে গেল। বুঝে গেলাম টার্গেট আমি, কারণ আমার সঙ্গী দু’জন আগরতলা ফেরত না। পালানোর চেষ্টা করেও লাভ নেই। তাদের হাতে অস্ত্র। আমার দুই বন্ধু দৌড়ে পালাতে সফল হল। শুধু সফল নয়, ওইদিনই নাকি তারা গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিল। আর শহরে ফেরেনি। এমনকি আমাকে তুলে নেওয়ার খবরটাও আমার বাসায় দিয়ে যায়নি। তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে দেশ স্বাধীনের পর।

ইউসুফ বললো, ‘উঠেন আমাদের সঙ্গে।’ কোনও প্রতিবাদের সুযোগ নেই। যারা এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে তারাই অনুধাবন করতে পারবে এমন পরিস্থিতির ভয়াবহতা। শুনেছি যশোরের আওয়ামী লীগ নেতা এমপি মশিউর রহমানকে পায়ে দড়ি দিয়ে জিপের পেছনে বেঁধে টেনে টেনে হত্যা করেছে পাকিস্তানি বাহিনী ও তার দোসররা। মিলিশিয়ারা আমাকে নিয়ে জিপের পেছনের সিটে বসলো। অল্প দূরে ছিল ফকা-সাকাদের গুডস হিলের বাসা। তারা একটানে সেখানে নিয়ে আসলো।

আমি কোনদিন এর আগে এই পাহাড়ে উঠিনি। উত্তরমুখি একতলা একটি বাড়ি। পশ্চিমপাশে দুটি গাড়ির গ্যারেজ। গ্যারেজের সামনে মাটিতে বসিয়ে রাখলো আমাকে। ইউসুফ, সাকা আমাকে রেখে কোথায় চলে গেছে জানি না। পুরো পাহাড়ে প্রায় ৪০-৫০ জন মিলিশিয়া। কালো ড্রেস, হাতে অস্ত্র। সবাই অবাঙালি। কিছু রাজাকারও আছে। এলাকায় বিল্ডিংটির সামনে ছোট্ট একটি গোল চত্ত্বর। এর মাঝখানে পতাকা উড়ানোর স্ট্যান্ড। এই গোল চত্ত্বরেই একটা যুবকের লাশ পড়ে আছে। চিনি না। কিন্তু লাশ দেখে ভয়ে মৃত্যুর প্রহর গোনা শুরু হল আমার। গ্যারেজ দুটির দরজা বন্ধ। কিন্তু বুঝা যাচ্ছে ভেতরে লোকে ভর্তি। গ্যারেজের ভেতর থেকে কণ্ঠ শুনলাম একটা- ‘বখতিয়ারকেও আনছে।’ গলার স্বর শুনে বুঝিনি সে কে তবে সন্দেহ নেই আমার পরিচিত লোকেরাও আছে। শুনেছি ড. সানাউল্লাহ ব্যরিস্টারের ছেলে সেলিমসহ (বর্তমান পানি সম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মামা) অনেককে তুলে এনেছে। মনে মনে চিন্তা করছি তারাই হবে। সেলিমের মামা অবসরপ্রাপ্ত সাব জজ আবুল কাশেম এরমধ্যেই সেলিমকে উদ্ধার করার জন্য ফকার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন। সেলিমকে কখনো আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ করতে দেখিনি। তার বাবা ড. সানাউল্লাহ রাজনীতি করতেন। নিখিল ভারত জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ-এর জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। ১৯৪৬ এর সাধারণ নির্বাচনে ড. সানাউল্লাহ হাটহাজারি-ফটিকছড়ি-রাউজান নির্বাচনি কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে বেঙ্গল পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সম্ভবত একই নির্বাচনি কেন্দ্রের লোক হওয়ায় ড. সানাউল্লাহর সঙ্গে ফকার সম্পর্ক কখনও ভালো ছিল না। অবশ্য স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ড. সানাউল্লাহ জীবিত ছিলেন না। সেলিমকে হয়তো এনেছিল তার বাবার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। সেলিম মানবতাবিরোধী ট্রাইবুনালে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে স্বাক্ষী দিয়েছে।

গ্যারেজের সামনে মাটির ওপর বসে রইলাম দীর্ঘক্ষণ। চট্টগ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে অত্যাচার আর হত্যার দুটো কেন্দ্র ছিল। জামায়াত এবং ইসলামি ছাত্রসংঘের আলবদর বাহিনী ধরে নিয়ে যেত ওল্ড টেলিগ্রাফ রোডের ডালিম হোটেলে। সেখানে মীর কাশেমের নেতৃত্বে আল-বদর বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের নির্যাতন করতো। আর ফকা-সাকা ও মিলিশিয়ারের ‘কনসেনট্রেইশন ক্যাম্প’ ছিল তাদের বাড়ি এই গুডস হিল। এ যাবত পরিচিত যারা পাক বাহিনী এবং তার দোসরদের হাতে মারা গেছে তাদের কথা মনে পড়ছিল। মনে পড়ে ক’দিন আগে আমার ফুফাতো ভাই আলিমউল্লাহ চৌধুরী ফটিকছড়ির হলদিয়া পাহাড়ে পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে মারা যান। পটিয়ায় রাজাকার আর পাকবাহিনী হত্যা করেছে আমাদের ছাত্রলীগের বিশিষ্ট নেতা মুরিদুল আলমকে। জুবলি রোডে তারা হত্যা করেছে আমার বন্ধু ছাত্রলীগ নেতা মাহাবুবুল আলমকে। রাঙ্গুনিয়ায় হত্যা করেছে আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরীর বড় ছেলে এবং আমাদের বন্ধু সাইফ উদ্দিন খালেদ চৌধুরীকে। শুনেছি রাউজানে আত্মগোপন অবস্থা থেকে বের হয়ে চট্টগ্রাম শহরে আসার পথে আমার বন্ধু জাহাঙ্গীর ও তার বাবা ছালারেজেলা মোজাফ্ফর আহমেদকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাহিনী পথ থেকে তুলে নিয়ে গুম করে ফেলেছে।

মোজাফ্ফর আহমেদ সাহেব ঐতিহাসিক ‘বাংলার পতন’ নাটকের রচয়িতা। তিনি পাকিস্তান গণপরিষদে আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্য ছিলেন এবং চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মনে হচ্ছিল গোল চত্ত্বরে পড়ে থাকা যুবকের মতো আমার লাশও কিছুক্ষণ পর সেখানে পড়ে থাকবে। ভাবছি আমার নেতা সিটি আওয়ামী লীগের সভাপতি জহুর আহমেদ চৌধুরী যে দায়িত্ব দিয়ে আমাকে আগরতলা থেকে চট্টগ্রামে পাঠিয়েছেন সে দায়িত্ব আমার অবর্তমানে পালন করবে কে!

জুনের শেষের দিকে জহুর আহমেদ চৌধুরীর নির্দেশে আগরতলা থেকে চট্টগ্রামে ফেরত এসেছিলাম। সঙ্গে উনার তিনটি চিঠি। চিঠিতে শুধু লেখা ছিল ‘The bearer is my man, Please give him patience hearing’ – Zahur. দেশে এসে তিনটি চিঠি প্রাপকদের হাতে তুলে দেই। আমাকে যা যা বলতে বলেছেন সেটাই তাদেরকে বলেছি। তাদের একজন আশকার দীঘির পাড়ের ডা.  সিরাজ, অপর দুইজন ওয়াপদার বিদ্যুত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কে কে আলতাফ হোসেন এবং অপর নির্বাহী প্রকৌশলী শামুসুদ্দীন আহমেদ। পুরো মুক্তিযুদ্ধে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। জহুর চৌধুরীর নির্দেশ অনুসারে মুক্তিযোদ্ধাদের অকাতরে সহযোগিতা করেছেন।

বাংলাদেশ হওয়ার বহুদিন পর আলতাফ হোসেন ডেসার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। শামসুদ্দিন সাহেব এক সময় চাকরি ছেড়ে ঠিকাদারী করতেন। আর ডা. সিরাজ ১৯৯৯ সালে মারা গেছেন।

তিন ঘণ্টা পার হওয়ার পর দেখলাম বাসার বারান্দায় পাতানো ইজি চেয়ারে এসে বসলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। তার পাশে দেওয়ালে ঠেকানো একটা রাইফেল। আমার ডাক পড়লো। রাজাকার কমান্ডার রফিক যাওয়ার আগে বলে দিল- চৌধুরী সাহেবের সামনে করজোড়ে দাঁড়াতে। আমি হুকুম পালন করলাম। ফকা তার ঐতিহাসিক বিদ্রুপাত্মক স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, তোর নাম কী? আমি বললাম- বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী। বরাতে দুঃখ ছিল। মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না। পাশের রাইফেলটা হাতে নিয়ে বাট দিয়ে আঘাত করলো আমার বাম চোয়ালে। মারার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রুপ করলো- ‘গোলামের পুত চৌধুরী হইলি কবে?’ ‘চৌধুরী’ টাইটেলটা যে ফকার রেজিস্ট্রি করা কে জানতো! কয়েকটা দাঁত ভেঙে গেল। রক্ত পড়া শুরু হল। ফকা আমাকে পিটিয়ে মেরে ফেলার জন্য মিলিশিয়াদের হুকুম দিয়ে চলে গেলেন।

মিলিশিয়াদের একের পর এক আঘাতে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এরপর কিছুই আর মনে নেই। চেতনা যখন ফেরত আসে তখন দেখি রাত। আমি পাহাড়ের নিচে। পিপড়ার কামড়ে শরীর ফুলে গেছে। রক্তাক্ত দেহ। রাজাকার রফিক আমার নাকের ওপর একটা লেবু ধরে আছে। আমি মারা গেছি মনে করে মিলিশিয়ারা নাকি আমাকে গ্যারেজের পেছনের দিকে পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে ফেলে দিয়েছিল। রফিক আমাকে আস্তে আস্তে বললো, রাত আরও গভীর হলে সে কাঁটাতারের বেড়া ফাঁক করে দিবে। আমি তখন আস্তে আস্তে জামাল খান রোডের দিকে চলে যেতে পারবো।

কিছুক্ষণ পর আওয়াজ শুনলাম। আমার এক খালাতো ভাই এক মিলিটারি অফিসার নিয়ে আমাকে খোঁজাখুঁজি করছে। রফিক তাদেরকে নাকি আমার অবস্থান দেখিয়ে দিয়েছিল। আমাকে যেখান থেকে জিপে তুলেছিল সেই দিদার মার্কেটের দিদার চৌধুরীর বড় ছেলে (নামটা এই মুহূর্তে স্মরণ করতে পারছি না দুঃখিত) আমাকে চেনে এবং সাকা বাহিনী আমাকে তুলে নেওয়ার খবর সে-ই আমার মাকে বাসায় বলে এসেছে। আমার খালাতো ভাই আমাকে গাড়িতে তুলে নেন। তিনি এবং মিলিটারির সেই কর্নেল দু’জনই গাড়িতে করে আমাকে আমার খালাতো ভাইয়ের বাসায় নিয়ে আসেন।

ইউসুফ স্বাধীনতার আগেই পাকিস্তান পালিয়ে গিয়েছে। আজও আসেনি। তার বিরুদ্ধে বহু খুনের অভিযোগ আছে। আমি ১৬ ডিসেম্বর গুডস হিলে গিয়েছিলাম মনের ক্ষোভ মেটাতে। গিয়ে দেখি আমার আগেই মুক্তিযোদ্ধারা তছনছ করে দিয়েছে তার বাসভবন। ওরা তাকে পেলে টুকরা টুকরা করে ফেলতো। এরপর ফকা ট্রলারে করে বার্মা পালানোর সময় ধরা পড়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারা তাকে পেটানোর সময় ভারতীয় বাহিনী তাকে উদ্ধার করে। সাকা বিদেশে পালিয়ে গিয়েছিল স্বাধীনতার আগে আগে। ১৯৭৫ সালের পর দেশে ফিরে আসে। তার ভাইয়েরা অবশ্য দেশে আত্মগোপনে ছিল। তার ছোট ভাই জামাল ছাড়া অপর দুই ভাই সাইফুদ্দিন এবং গিয়াসউদ্দিন তার সঙ্গে অপকর্মে জড়িত ছিল। সাইফুদ্দিন দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগে সম্প্রতি মারা গেছে। গিয়াসউদ্দিনেরও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার হওয়া উচিত।

আল্লাহ হাকেমুল হাকেমিন। তিনি ফজলুল কাদের চৌধুরীর মতো দাম্ভিক, খুনি, কুলাঙ্গারের বিচার করেছেন বাংলার মাটিতে। জেলখানায় তার মৃত্যু হয়েছে। মুত্যুর পর ফকাকে দেখতে গিয়েছিলাম। সেই অভিশপ্ত মুখটা বিভৎস রূপ ধারণ করেছিল। সাকার মতো খুনি, কুলাঙ্গার, জালেম এখন জেলে। তার মৃত্যুদণ্ড দেখার অপেক্ষায় আছি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট