...মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে নতুনরূপে আসছে...

This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Liberation War of Bangladesh and Genocide of Innocent Bengali People in 1971. More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

ফেসবুকে আমরা

সিরাজ শিকদার–ভুল বিপ্লবের বাঁশীওয়ালা - অমি রহমান পিয়াল

সিরাজ শিকদার – ভুল বিপ্লবের বাঁশীওয়ালা

অমি রহমান পিয়াল


ডাউনলোড করুন (লিংক) অথবা অনলাইনে পড়ুন

[সিরাজ শিকদার বাংলার রাজনীতিতে একজন কিংবদন্তী। কারো মতে বাংলার চে গুয়েভারা। আবার কেউ তার মধ্যে একজন সন্ত্রাসবাদী ছাড়া আর কিছু খুঁজে পাননি। তার অনেক কমরেডই তাকে একনায়ক হিসেবে আখ্যা করে দল ছেড়েছেন। অনেক প্রবীন নেতা তার কাজকর্মকে এডভেন্চারিস্টের তকমা দিয়েছেন, বলেছেন হঠকারী, বলেছেন সিআইএর দালাল। তারপরও লাল বই পড়ে বিপ্লবী হতে ইচ্ছুকদের কাছে সিরাজ শিকদার নমস্যই রয়ে গেছেন। সর্বহারা তথা প্রলেতারিয়েতের এত সুন্দর বাংলা এর আগে কোন বিপ্লবী নেতাই করতে পেরেছেন, কোন বাংলায়! এই বাংলাদেশে যেখানে চালটা-ডালটা-নুনটার সঙ্গে জঙ্গীটা এবং কমরেডশিপ ও তাদের থিসিসটাও আমদানী হয় ভারত থেকে, সেখানে সিরাজ শিকদার তার সর্বহারা তত্ব লিখেছিলেন এই বাংলাকে মাথায় রেখেই। এইখানেই তিনি আলাদা। বিপ্লবী কিংবা সন্ত্রাসী যাই হোন- এই একটা জায়গায় তিনি খাঁটি বাঙালী। পূর্ব বাংলার বাঙালী। এই পোস্টটি তাকে হেয় করতে কিংবা তাকে আকাশে তুলতে লেখা হচ্ছে না। প্রচলিত মিথের বাইরে কিছু চমকপ্রদ ব্যাপার নজরে এসেছে লেখকের। সেটা তুলে ধরার পাশাপাশি কিছু অবান্তর বিতর্ক খন্ডনের চেষ্টা থাকবে। তবে কোনো ক্ষেত্রেই ইতিহাস থেকে বিচ্যুতির কোনো চেষ্টা নেই- এ ব্যাপারে লেখক নিজের কাছে দায়বদ্ধ থাকার চেষ্টা করেছেন। তারপরও বক্তব্য পাতি বুর্জোয়াসুলভ হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো।]

ষাটের দশকের শেষার্ধে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে অসাধারণ কিছু ঘটনা ঘটে যায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার নামে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ফাসানো হয় লে.কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ও তার সঙ্গীদের। এ নিয়ে স্বাধীনতার আগে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা নামে সিরিজ লেখা হয়েছে আমার ব্লগে। এই মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয় শেখ মুজিবর রহমানকেও। তিনি সেই মুহূর্তে বেশ আলোচিত তার ৬-দফা নিয়ে। এই মামলা দিয়েই পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদের কিংবা স্বাধীনতার সামরিক ও রাজনৈতিক অভিপ্রায় কিংবা যড়যন্ত্র প্রকাশ্যে চলে আসে।
বামপন্থীদের মধ্যে সে সময় দুটো ধারা-রুশ ও চীনাপন্থী। মূলত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যেই তা প্রবল ছিলো। নেতা পর্যায়ে তা ছিলো ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ব্যানারে। কারণ পাকিস্তানে তখন কম্যুনিস্ট পার্টি ছিলো নিষিদ্ধ, অতএব গোপন। রাশিয়া এবং চীনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক চুক্তিতে লেনিন এবং মাও সেতুংয়ের রচনাবলী তখন সহজপ্রাপ‌্য। সুবাদেই দলের প্রবীন নেতারা বিপাকে। এদের বেশীভাগই স্বদেশী করা আন্দামান ফেরত সন্ত্রাসী। নতুন পড়ুয়ারা বিভিন্ন তত্ব নিয়ে তর্ক করে তাদের নাজেহাল করে। রুশপন্থীদের ঝামেলা কম। তারা কর্মীদের নানা ধরণের অসাম্প্রদায়িক গান-বাজনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্যস্ত রাখে। তিন জনের সেল পদ্ধতিতে (যেখানে কর্মীরা একাধিক সেলের সদস্য) পার্টি ম্যানিফেস্টোর প্রচারণা চলে। সমাজতন্ত্রের পথে শান্তিপূর্ণ রূপান্তরে বার্মা তাদের কাছে মডেল। শৃংখলা ভাঙ্গার সুযোগ তাই নেই। অন্যদিকে চীনাপন্থীরা সোভিয়েত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কে বেশী সাম্রাজ্যবাদী, কাকে শ্রেনীশত্রু ও সংস্কারবাদী ধরা হবে এই নিয়ে বিতর্কে ব্যস্ত। ভিয়েতনাম যুদ্ধে সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে নিয়ে লড়াইয়ে তাদের মন খারাপ হয়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী উন্মেষ তাদের চোখ এড়ায়। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে তারা পাকিস্তানের সঙ্গে গলা মেলায় বটে, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বার্থের পক্ষে তাদের রা সরে না।
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ই তাদের এই রূপটা অবশ্য পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো। চীন পাকিস্তানের বন্ধু বলে তারা পাকিস্তানের পক্ষে গলা মিলিয়েছে। শোনা যায় ভাসানী কয় দিনের জন্য নিখোজ হয়ে গিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন পিকিংয়ে (বেইজিং) আইউব খানের জন্য সামরিক সাহায্যের দেনদরবার করতে। যদিও এই দাবির স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি কেউ। এই দশকের শেষ দিকে পশ্চিম বঙ্গ কাঁপিয়ে দিলেন চারু মজুমদার। নকশাল বাড়ি আন্দোলনের সেই জোয়ার পিকিং রিভিউর সৌজন্যে রোমাঞ্চিত করে তুললো চীনাপন্থী তরুণ তুর্কীদের। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র সিরাজ শিকদার তাদের একজন। ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) লিয়াকত হল শাখার সভাপতি তিনি। মার্কসবাদ সম্পর্কে তার প্রচুর জ্ঞান। পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির (মার্কস-লেনিন) সদস্যপদও পেয়েছেন। নকশালবাড়ির আন্দোলনকে পার্টির নেতারা হঠকারিতা বলে রায় দিয়েছেন। আর এর প্রতিবাদে তরুণদের একটা দল বেরিয়ে এসে গঠন করলেন রেডগার্ড। ঢাকা শহরে চিকা পড়লো- বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস/ নকশালবাড়ী জিন্দাবাদ।
সিরাজ শিকদার তাদের অন্যতম। তার চোখে তখন মাও সেতুং হওয়ার স্বপ্ন জেঁকে বেসেছে। এমনিতে তার খুব বেশী বিলাসিতা নেই সানগ্লাসটা ছাড়া। প্রিয় খাবার বলতে মশুরের ডালে বিস্কিট ডুবিয়ে খাওয়া। ধুমপানের বদভ্যাস নেই। বিপ্লবী হওয়ার প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণে এ যাবত তোলা যত ছবি সব পুড়িয়ে ফেললেন। তারপর তখনকার ফ্যাশন মেনে কৃষকদের জাগিয়ে তোলার জন্য গেলেন নিজের এলাকা মাদারীপুরের ডামুড্যায়। কিন্তু শ্রেনী সংগ্রামের বিভেদ বোঝাতে গিয়ে বিপাকে পড়লেন। সার্কেল অফিসারের ছেলে, ইঞ্জিনিয়ার, পাত্রের বাজারে দাম লাখ টাকা। এক কৃষক তাকে চ্যালেঞ্জ করে বসলেন গরীবের প্রতি তার দরদ পরীক্ষায়। চ্যালেঞ্জ মেনে কৃষকের মেয়ে হাসিনাকে বিয়ে করলেন। স্বভাবতই পরিবার সেটা মেনে নিলো না। তাতে থোড়াই বয়ে গেছে শিকদারের। এবং হঠকারিতা অর্থে এটিই তার প্রথম নয়।
বিপ্লবের আরো প্রস্ততি হিসেবে মার্শাল আর্ট শেখা ধরলেন। এরপর ৭ সঙ্গী নিয়ে টেকনাফ হয়ে গেলেন বার্মা (মায়ানমার)। সেখানকার কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা থান-কিন-থাউর সঙ্গে দেখা করলেন নে-উইনের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামের স্বরূপ জানতে। রেডগার্ডের মাহবুবুল করিমকে চিঠি দিয়ে জানালেন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় তিনি বিপ্লবীদের মূল ঘাটি তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আরো সদস্য পাঠাতে। আর বাকী কমরেডদের নিয়ে লেগে গেলেন পাহাড় কেটে সুরঙ্গ তৈরিতে। চীনা দুতাবাসে এর আগে টানেল ওয়ারফেয়ার নামে একটা তথ্যচিত্র দেখেছেন তারা। সে ধাচেই তৈরি হবে বিপ্লবী সদর। সঙ্গীরা সব অল্প বয়সী, কেউ ২০ পেরোয়নি। মধ্যবিত্ত ঘরের আদুরে সন্তান। পাহাড়ের খাদে ওই খেয়ে না খেয়ে ঝড় বৃষ্টিতে মশার কামড় খাওয়া আর সাপের সঙ্গে শোয়া বিপ্লব তাদের সইলো না। ৭ জনের মধ্যে ৫ জন পালালেন। রেডগার্ড নেতা মাহবুবের ভাই মাহফুজ তাদের একজন। রয়ে গেলেন বিহারী দুই ভাই। এদের মধ্যে কায়েদ-ই আযম কলেজের বিএসসির ছাত্র সাইফুল্লাহ আজমী সিরাজ শিকদার অন্তপ্রাণ। তার স্বপ্ন লিন বিয়াও হওয়া। ক্ষুব্ধ সিরাজ তাকে ছেড়ে আসা ৫ জনের বিশ্বাসঘাতকতায় মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করলেন। মাহবুব তার ভাইর পক্ষ নিলেন। সিরাজের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলো রেডগার্ড।

পুরো ঘটনাকাল ১৯৬৭-৬৮ সালের। এর মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিলো মাও সেতুং থট রিসার্চ সেন্টার বা মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারা গবেষণা কেন্দ্র। সে বছরই মালিবাগে এটি প্রতিষ্ঠা করেন সিরাজ শিকদার। পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির প্রকাশনা স্ফুলিংঙ্গের বিশেষ সংখ্যায় (১৯৮১) এই সময়কালের কথাই বলা হয়েছে। একই সময় জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ সিরাজ শিকদার পুর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের ব্যানারে সর্বদলীয় এক বিপ্লবী ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়াস নেন। আর মাও থট সেন্টার ছিলো তার একটি ওপেন ফ্রন্ট। অন্যদিকে কমরেড রোকন তার স্মৃতিকথায় ব্যাপারটা উল্লেখ করেছেন অন্যভাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের এডভেঞ্চার শেষে ঢাকায় ফেরার পর খানিকটা হতাশ ছিলেন সিরাজ শিকদার। তার মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করার মতো কোনো ক্যাডার তখন ছিলো না। আর রেডগার্ডের সেই অংশ অর্থাৎ মাহফুজ, মাহবুব, নুরুল ইসলামসহ বাকিরা পূর্ব বাংলা বিপ্লবী কম্যুনিস্ট আন্দোলন নামে আলাদা সংগঠন গড়ে তোলেন। আর সেই ঘাটতি পূরণ করতেই মাও থট সেন্টারের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করার দায়িত্ব পান রোকন। সেই অর্থে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের ব্যানারেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সুরঙ্গ খোড়ার সেই বিখ্যাত এডভেঞ্চারটি ঘটিয়েছিলেন সিরাজ শিকদার। ফজলুল আমিনের সঙ্গে সাক্ষাতকারের উল্লেখ করে তার বয়ানে রোকন জানান- সিরাজ শিকদারের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব নয় কারণ তিনি হঠকারী (এডভেঞ্চারিস্ট)। এই বিষয়ে আরো ইঙ্গিত রয়েছে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে যা সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে পাঠকদের।
বিতর্ক এই পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের গঠনের স্থান নিয়েও। ১৯৬৮ সালের ৮ জানুয়ারি একটি সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে সংগঠনটি। রোকন জানাচ্ছেন লিয়াকত হলে সিরাজ সিকদারকে সেক্রেটারি করে জন্ম নেয় ইবিডাব্লুএম। অন্যসূত্রের বয়ানে ঢাকা জুটমিলের একজন শ্রমিকের বাসায় আয়োজিত হয় সম্মেলনটি যাতে অংশ নেন মাও থট রিসার্চ সেন্টারের প্রায় ৫০জন অনুসারী। এই সম্মেলনেই সিরাজ তার বিখ্যাত থিসিসটি পরিবেশন করেন যাতে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের উপনিবেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই থিসিসেই সিরাজ প্রধান ও মূল সংঘাতগুলো (কনট্রাডিকশনস) উল্লেখ করার পাশাপাশি একটি সফল বিপ্লবের বিভিন্ন পর্যায় ও তা সম্পন্নের রূপরেখা দেন। সম্মেলনে উপস্থিত সবার অনুমোদন পায় তা। থিসিস অনুযায়ী জাপানের বিরুদ্ধে চীনের যুদ্ধের আদলে বিপ্লবের সিদ্ধান্ত হয়। সুবাদেই গঠিত হয় ইস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট ও ইস্ট বেঙ্গল রেভুলেশনারী আর্মি (পূর্ব বাংলার বিপ্লবী সেনাবাহিনী)।
এখানে চমকপ্রদ ব্যাপার আছে আরো। রোকন জানাচ্ছেন থিসিস অনুযায়ী ১৯৫৮ সাল থেকে পাকিস্তান সামরিক-সামন্তবাদী উপনিবেশবাদ চালাচ্ছে পূর্ব বাংলার উপরে। তার আগ পর্যন্ত শোষণের ধরণটা ছিলো জাতীয়তাবাদী। তাই স্বাধীনতার একমাত্র উপায় সশস্ত্র সংঘাত। মাও সেতুংয়ের পদ্ধতির এই লড়াইয়ে পাকিস্তানের ভূমিকা জাপানের। শেখ মুজিবর রহমান চিয়াং কাইশেক। পূর্ব বাংলা যেহেতু পাকিস্তানী উপনিবেশবাদী সেনাবাহিনীর অধিকৃত অঞ্চল, দখলমুক্তি ও স্বাধীনতার এই লড়াইয়ে তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনুচর শেখ মুজিবকে মিত্র মানা যেতে পারে।
এরপর মাঠে নামলো ইবিডাব্লুএম। মাওর বিখ্যাত উক্তি নিয়ে চিকা পড়ে : “Power comes from the barrel of a gun” (বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস”।পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনা এরপরই ঘটেছে, কারণ এর পর কর্ণেল আবু তাহেরের মাধ্যমে সামরিক ট্রেনিং নেয় পূর্ব বাংলার বিপ্লবী সেনাবাহিনী। ‘৬৮ সালের মাঝামাঝি প্রথমবার গেরিলা অপারেশনে নামে ইবিডাব্লুএম। দিলখুশার এক অফিস থেকে একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন ছিনতাই করে তারা। উদ্দেশ্য পার্টির ইশতেহার ছাপানো। এর আগ পর্যন্ত বায়তুল মোকাররমের ইসলামী ফাউন্ডেশন থেকেই এসব কাজ সারতেন সিরাজ শিকদার। শুরু হয় দলের মুখপত্র লাল ঝাণ্ডার প্রকাশনা। পাশাপাশি সদস্য সংগ্রহের কাজও চলতে থাকে পুরোদমে। এর মাঝে জামাতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের তোপের মুখে পড়ে মাও থট সেন্টার। যদিও হামলাটি শেষ পর্যন্ত সামাল দেয় সেখানে থাকা কর্মীরা।
বাংলাদেশের আইনে ‘কাফকা কেইস’ বলে যে কিছু আছে তা জানা ছিলো না। কিন্তু ‘৭৪ সালের শেষে সিরাজ শিকদার ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত এই মামলাতেই হয়রানি হয়েছেন তার বেশ ক’জন পার্টি কর্মী। মামলার ব্যাখ্যাটি সরল- সিডুসিং আ হাউজ ওয়াইফ। আরেকজনের বউকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মামলা। আর সিরাজ শিকদারের বিপ্লবী জীবনে একটি মোটা দাগের অধ্যায় এটি, যা খুব সহজে কারো মুখে শোনা যায় না।
সেই গল্পে আসার আগে আরেকটু বলে নেয়া যাক। বড় মেয়ে শিখার জন্মের পর স্ত্রীকে নিয়ে খিলগাওয়ে বাবার বাড়িতে উঠলেন তিনি। সঙ্গে ছোট তিন ভাইবোন- নাজমুল, শামীম ও শিবলী। আর বড় ভাইর স্ত্রী। ডাক্তার বড় ভাই দিনাজপুরে পোস্টিং। সিরাজ তখন তেজগাঁ টেকনিকাল কলেজে সাড়ে চারশো রুপিতে প্রভাষকের চাকুরি করছেন। পার্টিতে ছদ্মনাম রুহুল আলম। ছেলে সঞ্জীবের জন্মের পর শিল্পপতি জহুরুল ইসলামের ফার্মে ১৪০০ রুপি বেতনে চাকুরি নিলেন সিরাজ। স্ত্রী ছেলেমেয়ে নিয়ে উঠলেন রামপুরার এক পাকা বাড়িতে।
১৯৬৯ সালে পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন মোটামুটি জমিয়ে ফেলেছেন সিরাজ। ন্যাপ ভাসানীর ছাত্র ফ্রন্টের বেশীরভাগ কর্মীই যোগ দিয়েছেন তার সাথে। এদেরই একজন রোকনউদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের ছাত্র। তার কাজিন জাহানারা। পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ব্রিগেডিয়ার হাকিমের স্ত্রী। মহিলাদের পত্রিকা মাসিক বেগমে লেখালেখি করতেন। স্ত্রীর নারীবাদী চিন্তাভাবনা পছন্দ ছিলো না হাকিমের। তার চলাফেরার উপর তাই নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। দুই সন্তানের জননী জাহানারা রোকনউদ্দিনের সহয়তায় বাড়ি থেকে পালালেন। রোকন শরণ নিলেন নেতা সিরাজ শিকদারের। খালেদা ছদ্মনামে দয়াগঞ্জে এক শেলটারে রাখার ব্যবস্থা হলো তাকে। এনএসআইর একঝাক গোয়েন্দা নেমে পড়লো জাহানারার খোঁজে।
এদিকে বাংলার মাও সিরাজ তার অর্ধশিক্ষিত স্ত্রী হাসিনার মাঝে যা পাননি, তা পেলেন জাহানারার মাঝে। জিয়াং কুইং জাহানারার আরেকটি ছদ্মনাম নিলেন রাহেলা। কারণ এনএসআই তার খালেদা নামের খোজ পেয়ে গেছে। আর অনেকটা মজা করেই সিরাজ নাম নিলেন হাকিম ভাই। সবুজবাগে একটা ভাড়া বাসায় দুজনে একসঙ্গে থাকতে শুরু করলেন। রাতে বেরোতেন একসঙ্গেই। পার্টি সদস্যদের মধ্যে এ নিয়ে কানাকানি এবং একসময় অসন্তোষ সৃষ্টি হলো। চরমপন্থাতেই এই বিদ্রোহ দমন করলেন সিরাজ। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর এবং পেয়ারা বাগানে দুর্দান্ত যুদ্ধ করা সেলিম শাহনেওয়াজ খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক হুমায়ুন কবিরকে মরতে হলো জাহানারা-সিরাজের সম্পর্কের বিরুদ্ধাচরণ করায়। তবে এসব স্বাধীনতার অনেক পরের ঘটনা। ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭৪ সিরাজের সঙ্গেই গ্রেপ্তার হন জাহানারা ওরফে খালেদা ওরফে রাহেলা। তাকে কুমিল্লায় ভাইয়ের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর দুজনের সন্তান অরুণের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিরাজ শিকদারের পিতাকে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিভিন্ন কীর্তিমানদের নিয়ে অনেককালই বিতর্ক সইতে হয়েছে স্বাধীনতাত্তোর প্রজন্মকে। সরকারী নিয়ন্ত্রণের প্রচারযন্ত্র ও পাঠ্যপুস্তকে যখন যার খুশী তাকে নায়ক বানিয়েছে। তবে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ হয়েছে এই ভূমিকা। সে কারণেই চাঁদপুরের চাঁন মিয়া নিজেকে স্বাধীনতার প্রথম ঘোষক বলে দাবী করলেও সেটা ধোপে টেকেনি। রেফারেন্স, দলিল, উপাত্ত এসবই নির্ধারণ করে দিয়েছে সত্যিকার ঘোষকের নাম।
সেই বিচারে সিরাজ শিকদার এবং পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলনকে বঞ্চিতই বলতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তর পরিসরে তাদের ডাকটা সেভাবে পৌঁছেনি কিংবা তা চাপা পড়ে গেছে শেখ মুজিবর রহমানের ব্যক্তিত্ব ও আওয়ামী লীগের তখনকার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কাছে। ১৯৬৮ সালে EBWM তাদের প্রথম থিসিস দেওয়ার পর থেকেই পূর্ব বাংলার বিচ্ছিন্নতা আদায়ের লড়াইয়ে নেমে পড়ে। এই লক্ষ্যেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এর কর্মীরা। গ্রামাঞ্চল এবং মফস্বল শহরগুলোতে জনভিত্তি স্থাপনে প্রচারণায় নামে। ১৯৭০ সালের ৮ জানুয়ারী সংগঠনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে স্বাধীন পূর্ব বাংলার পতাকা ওড়ানো হয়। ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও ময়মনসিংহে ওড়া এই পতাকায় সবুজ জমিনের মাঝে লাল সূর্য্য। বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় পতাকারই অনুরূপ! ১৯৭০ সালের ৬ জুন জহুরুল হক হলের (তখন ইকবাল হল) ১১৬ নম্বর রুমে যে পতাকার পরিকল্পনা ও ৪০১ নম্বর রুমে যার নকশা হয়েছে বলেশিবনারায়ণ দাশ দীর্ঘ বঞ্চনার পর কৃতিত্ব ফিরে পান, EBWM সেটা করে ফেলে অনেক আগেই। আর সেই নকশার মূল পরিকল্পকদের একজন ছিলেন সাইফুল্লাহ আজমী। যার পরিবার বিহার থেকে অভিবাসী হয়ে এসেছিলেন এদেশে।
বিতর্ক এড়াতে এখানে একটি কথা বলে নেওয়া ভালো, শিবনারায়ণের পতাকায় লাল সূর্য্যের মাঝে হলুদ মানচিত্র ছিলো বাংলাদেশের। গোটা মুক্তিযুদ্ধকালে উড়েছে এই পতাকাই। রূপটা বদল হয় ১৯৭২ সালে, ১৭ জানুয়ারি। পতাকার মানচিত্র দু’পাশ থেকে দু’রকম দেখায় এবং একরকম করতে গেলে জটিলতার সৃষ্টি হয় বলেই মানচিত্র বাদ দেয়া হয়।
সে বছর ৬ মে কার্লমার্ক্সের জন্মদিনে পাকিস্তান কাউন্সিলে দুটো হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায় EBWM, যা নিজেই ছুড়েছিলেন বলে দাবি করেছেন কমরেড রোকন। তার মতে পাকিস্তানের দুই অংশের যুবক যুবতীদের মধ্যে বিয়েকে উৎসাহিত করতে ৫০০ রূপী ভাতা চালু করেছিলো এই কাউন্সিল। স্মৃতিকথায় একই কাউন্সিলে দ্বিতীয়বার সিরাজের নির্দেশে আরেকজন কমরেডকে পাঠান রোকন। তার একহাত পঙ্গু ছিলো। পাকিস্তান কাউন্সিলের চারপাশে কড়া পাহারা দেখে তিনি পাশের এক ডাস্টবিনে বোমা ফেলে দেন। আর তা কুড়িয়ে পেয়ে খোলার সময় বিস্ফোরণে মারা যায় দুটো অল্পবয়সী শিশু।
ক্টোবর নাগাদ ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন, আমেরিকান ইনফরমেশান সেন্টারসহ আরো বেশ কিছু জায়গায় বোমা হামলা চালায় EBWM, যাতে হতাহতের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে জাতীয় শত্রু খতম কর্মসূচী চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। পার্টির স্বার্থবিরোধী এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা বিরোধীদের এই খতম তালিকায় রাখা হয়। পার্টির প্রথম খতমের শিকার হন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির এক চা বাগানের সহকারী ম্যানেজার হারু বাবু। ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে সংগঠিত এই হত্যাকাণ্ডই ছিলো EBWM-এর প্রথম খতম অভিযান।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন গোষ্ঠীর অবস্থান ও তৎপরতা যথাযথ মূল্যায়ন পায়নি। এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিপিকারদেরও দেখা গেছে গা বাচিয়ে চলতে। প্রথাগত লাইনের বাইরে তারা হাটেননি। যে কারণে বিভিন্ন ইতিহাস বইয়ে সিরাজ শিকদার ও তার বাহিনীর জন্য দুই লাইনের বেশী বরাদ্দ হয় না। লেখা হয় : এ ছাড়া সিরাজ শিকদার ও তার বাহিনী পেয়ারা বাগান অঞ্চলে পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একটা কারণ হতে পারে স্বাধীনতার পরও তা মানতে সিরাজের অস্বীকৃতি। দেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক বিজয় দিবসে হরতাল আহবান কিংবা মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে অন্য পিকিংপন্থী কম্যুনিস্টদের আদলেই তার অবস্থান। নির্দিষ্ট করে বললে অক্টোবরে সিরাজ শিকদার নতুন থিসিস দেন এবং আহবান জানান আওয়ামী লীগ, ভারতীয় বাহিনী ও পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুগপত লড়াই চালাতে। তার দলের আক্রমণের শিকার হন মুক্তিযোদ্ধারাও।
কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির (এম-এল) তোয়াহা, হক, মতিনদের এই লাইন কিন্তু সিরাজ শুরুতে একদমই নেননি। বরং EBWM-এর প্রথম থিসিসে শেখ মুজিবর রহমানকে কৌশলগত মিত্র হিসেবে উল্লেখ করে তাকে সহায়তা করার সিদ্ধান্তই ছিলো তার। ১ মার্চ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যথন সংসদ অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা দেন, উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা বাংলা। পরদিন ২ মার্চ EBWM-এর এক ইশতেহারে শেখ মুজিবকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার আহবান জানান সিরাজ শিকদার। সেখানে সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অস্থায়ী বিপ্লবী জোট সরকার গঠন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ পরিষদ গঠনের অনুরোধ ছিলো। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য সেদিনের পত্রপত্রিকায় গোলাম আযম থেকে শুরু করে সবুর খানসহ শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সব রাজনৈতিক নেতাই ইয়াহিয়াকে অনুরোধ জানান মুজিবের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে। কিন্তু সিরাজ বুঝেছিলেন যুদ্ধ ভিন্ন পথ নেই। মুজিব প্রত্যাখ্যান করলেন তার প্রস্তাব।
এ ক্ষেত্রে এটাও মনে রাখতে হবে সিরাজ শিকদার তখনও মুজিবের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাজনীতিক নন। তার দলও নয়। ৭০ এর সময়কালে আওয়ামী লীগের বেশ কজন উচ্চপর্যায়ের নেতা এবং নির্বাচিত সাংসদ হত্যার জন্য মুজিব খুবই ক্ষুব্ধ ছিলেন চীনাপন্থী কমিউনিস্টদের ওপর। ‘৭১এর জানুয়ারিতে মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেও বসেন :এরপর আমার একজন লোক মরবে, আমি ওদের তিনজনকে মারবো।তাছাড়া ভিয়েতনাম স্টাইলে গেরিলা যুদ্ধের পরিকল্পনাটাও পছন্দ ছিলো না তার। ১৯৭০ সালের জুনেই তিনি পরিষ্কার করে দেন তার মনোভাব যার উল্লেখ রয়েছে মার্কিন দুতাবাস থেকে পাঠানো টেলিগ্রামে। মুজিবের উদ্ধৃতি দিয়ে সেখানে লেখা হয় : If the army, civil service, and “vested interest” continued to play this game, threatened Mujib, “I will proclaim independence and call for guerilla action if the army tries to stop me. It is primarily fear of communist exploitation a Vietnam type situation which has kept me patient this long. “ (Source: The American Papers- Secret and Confidential India.Pakistan.Bangladesh Documents 1965-1973, The University Press Limited, p.367)
অবশ্য বাংলাদেশের পক্ষে এমনিতেও ভিয়েতনাম হওয়া সম্ভব ছিলো না। The scope of Pakistan Army’s military problem can be seen in comparison of Vietnam. There a million man South Vietnamese army plus American troops and massive fire-power must try to control a population of 17 million, many basically sympathetic to the Government. Here only 60,000 West Pakistani troops are trying to control a thoroughly hostile population of 75 million. East Pakistan, moreover, is surrounded on three sides by India, which is giving sanctuaries and supplies to the guerrillas. The Pakistan army’s supply routes from West Pakistan to the East must circumvent by sea and air, 1200 miles of India. Of course, the Mukti Bahini is not Viet-Cong. For one thing the guerrillas are not communists. For another they are not-or not yet-very effective fighters. They have been at it for less than four months. – The Wall Street Journal, July 27, ’71.
সিরাজের এই সহযোগী মনোভাব অবশ্য আগস্ট পর্যন্ত ছিলো। সে মাসের শুরুতে তার ডান হাত সাইফুল্লাহ আজমীসহ ৫জন যোদ্ধাকে সাভারে পাঠিয়েছিলেন মুজিব বাহিনীর সঙ্গে সমঝোতায় আসতে। কিন্তু তাদের উল্টো হত্যা করা হয়। এ ঘটনাই পুরোপুরি বিগড়ে দেয় সিরাজকে। অবশ্য মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটমেন্টের সময়ই ভারতীয় সরকারের বিশেষ নির্দেশে যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারকে সতর্ক থাকতে হয়েছে কম্যুনিস্ট অনুপ্রবেশের ব্যাপারে। মঈদুল হাসান তার মূলধারা ৭১ বইয়ে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন :“তরুণদের ট্রেনিং দেওয়ার ব্যাপারে অবশ্য ভারতীয় প্রশাসনের সকল অংশের সমান উৎসাহ ছিল না। যেমন ট্রেনিং প্রদান এবং বিশেষত ‘এই সব বিদ্রোহী ও বামপন্হীদের’ হাতে অস্ত্র সরবরাহের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন ভারতীয় সামরিক কর্তৃপক্ষের আপত্তি প্রথম দিকে ছিল অতিশয় প্রবল। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, নক্সালবাদী, নাগা, মিজো প্রভৃতি সশস্ত্র বিদ্রোহীদের তৎপরতা-হেতু পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতীয় পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা সম্পর্কে এদের উদ্বেগ। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দকৃত অস্ত্র এই সব সন্ত্রাসবাদী বা বিদ্রোহীদের হাতে যে পৌঁছবে না, এ নিশ্চয়তাবোধ গড়ে তুলতে বেশ কিছু সময় লাগে। মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং-এর ব্যাপারে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তাতে এই নিশ্চয়তাবোধ ক্রমে গড়ে ওঠে।প্রথম দিকে রিক্রুটিং সীমাবদ্ধ ছিল কেবল আওয়ামী লীগ দলীয় যুবকদের মধ্যে। পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এ ব্যবস্হা ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীরও মনঃপূত। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে আগ্রহীদের বিরাট সংখ্যার অনুপাতে ট্রেনিং-এর সুযোগ ছিল নিতান্ত কম। ট্রেনিং-এর আগে পর্যন্ত তরুণদের একত্রিত রাখা এবং তাদের মনোবল ও দৈহিক সুস্হতা বজায় রাখার জন্য সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় ‘যুব শিবির’ ও ‘অভ্যর্থনা শিবির’ স্হাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সব শিবিরে ভর্তি করার জন্য যে স্ক্রীনিং পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়, তদনুযায়ী ‘বহির্দেশীয় আনুগত্য’ (Extra Territorial Loyalty) থেকে যারা মুক্ত, কেবল সে সব তরুণরাই আওয়ামী পরিষদ সদস্যদের দ্বারা সনাক্তকৃত হবার পর ভর্তির অনুমতি পেত। পাকিস্তানী রাজনৈতিক পুলিশের এই বহুল ব্যবহৃত শব্দ ধার করে এমন ব্যবস্হা খাড়া করা হয় যাতে এই সব শিবিরে বামপন্হী কর্মীদের প্রবেশের কোন সুযোগ না ঘটে।”
যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব যখন ভারতে আশ্রয় নিয়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন, তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধকারীদের অন্যতম ছিলেন সিরাজ শিকদার ও তার দল। বরিশালের বানারিপাড়া অঞ্চলে অবস্থান নেয় EBWM, ৩০ এপ্রিল গঠন করে জাতীয় মুক্তিবাহিনী যা দখলমুক্ত করে পেয়ারাবাগানের খানিকটা। এই মুক্তিবাহিনী পরিচালনা করতে সিরাজ শিকদারকে প্রধান করে সর্বোচ্চ সামরিক পরিচালনামন্ডলী গঠন করা হয়। ৩ জুন ১৯৭১, পেয়ারা বাগান যুদ্ধক্ষেত্রেই EBWM নতুন নাম নেয় পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি। সিরাজ শিকদার এর আহবায়ক নির্বাচিত হন। তবে জুনের মাঝামাঝি পাকিস্তানী আক্রমণ প্রবল হওয়ায় সর্বহারা পার্টি পেয়ারা বাগান থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। (সূত্র : স্ফুলিঙ্গ, বিশেষ সংখ্যা মে ১৯৮১, পৃ: ৭১-৮৫)
যুদ্ধক্ষেত্রে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিলেন সিরাজ। কেউ তাকে চিনতো সালাম নামে, কেউবা মতি মিয়া। বানারিপাড়া অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধকারী বেণীগ্রুপের অধিনায়কসহ অনেকের মু্খেই সাক্ষ্য মিলেছে এর। মুক্তিযুদ্ধের মৌখিক ইতিহাসের রেকর্ড ঘেটে এমনি কয়েকজনের সাক্ষাতকার থেকে কিছু অংশ তুলে দেওয়া হলো :
বর্তমানে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত মুজিবল হক মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৭-১৮ বছর বয়সী ছাত্র। তার বক্তব্য ছিলঃ 
প্র: আপনি বলছিলেন যে, ‘পূর্ববাংলা সর্বহারা’ নামে পরিচিত একটি দল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতেছিল। এই দলটিতে কারা নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং তাদের কার্যক্রম কি রকমের ছিল?
উ: প্রথম অবস্থায় যখন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ সব জায়গায় গঠিত হয়নি, সেই সময় কুরিয়ানায় এবং পরে আলতা, ভিমরুলি এলাকায় ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’ সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন যে দল সেই দলের ক্যাম্প ছিল আতা স্কুলের পিছনে। আমি সেখানে তাদের সাথে লিয়াজো করার জন্য কয়েকবার গিয়েছিলাম বানারীপড়া থানা এটাক করার জন্য। কেননা তখন বানারীপাড়া থানায় অনেক অস্ত্র ছিল। বানারীপাড়া থানায় একটা শক্ত ঘাঁটি ছিল পাক আর্মির। আমাদের হাতে অস্ত্র কম ছিল, সেই জন্যে তাদের শরণাপন্ন হলাম। তারা আর আমরা একত্র হয়ে বানারীপাড়া থানা কয়েকবার আক্রমণ করেছিলাম। তারা স্বাধীনতার পক্ষেই কাজ করেছিল। পরবর্তীতে কি হয়েছে আমি জানি না। তবে ঐ সময় প্রথম দিকে তারা পাকিস্তানি জান্তার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। তখন সেই দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা ছিল সেলিম শাহনাজ। সেলিম শাহনাজ তার বাড়ি সম্ভবত ঝালকাঠিতে। তিনি ছিলেন স্থানীয় নেতা। ওখানে একবর সিরাজ সিকদার সাহেবও এসেছিলেন। আমরা তখন পাঞ্জাবি মিলিটারি সহ একটা স্পিডবোট গুলি করে দখল করেছিলাম। সেই সময় দশ এগারো জন পাক আর্মিকে হত্যা করা হয়। সেই স্পিডবোটে সেলিম শাহনাজ সাহেব অন্য জায়গায় চলে গিয়েছিলেন। আমি তখন ওখানে ছিলাম।
১৯ বছর বয়সী শোভারাণী মন্ডল এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন, সদ্য বিধবা হয়েছেন। তার কাছে জানা যায় আরো বিস্তারিত :
প্র: আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন ?
উ: আমার স্বামীকে পাক বাহিনী মেরে ফেলেছে সেই প্রতিশোধ নেয়ার জন্য।
প্র: আপনি কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে এলেন ?
উ: সিরাজ শিকদার এই এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলো। সেই আমাকে ট্রেনিং দিয়েছে। সেই আমাকে বুঝাইয়া শুনাইয়া মুক্তিবাহিনীতে নেয়। আমাদের এই বাড়ির পাশের একটা বাড়িতে তারা থাকতো। সেখানে সে ছেলেমেয়েদের ট্রেনিং দিতো এবং বিভিন্ন জায়গায় অপারেশন করতে পাঠাইতো।
প্র: আপনি বলছিলেন যে, একটি বাড়িতে সিরাজ শিকদার আপনাকে ট্রেনিং দিতো। বাড়িটি ঠিক কোথায় এবং বাড়িটির নাম মনে পড়ছে কি ?
উ: এই বাড়িটি আতা গ্রামে। সম্ভবত মিস্ত্রী বাড়ি বলা হতো। এর চতুরপাশে পেয়ারা বাগান, মাঝখানে এই বাড়িটি।
প্র: এখানে আপনারা প্রথম কতজন মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং নিয়েছিলেন ?
উ: বাইশ জন একত্রে।
প্র: ঐ সময়কার আর অন্য কারো নাম মনে পড়ছে কি ?
উ: একজন মনিকা, তারপরে আরো ৪/৫ জনের নাম আমার মনে আসছে, কিন্তু তারা বেঁচে নেই। একজন ছিলো সুনীল, বাড়ি আতা। বাকি নামগুলো মনে পড়তেছে না।
প্র: আপনারা ওখানে এই বাইশ জনের মধ্যে কতজন পুরুষ এবং কতজন মহিলা ছিলেন ?
উ: ১৮ জন পুরুষ এবং ৪ জন মহিলা।
প্র: এরপরে আপনি কিভাবে যুদ্ধে অংশ নিলেন ?
উ: প্রশিক্ষণের পরে যখন আমরা খবর পেতাম যে আর্মি আসছে তৎক্ষণাৎ আমরা সেখানে গিয়া ঝোপঝাড়ের ভিতরে, রাস্তার ধারে, গাছের আড়ালে বা পেয়ারা বাগান থেকে তাদের আক্রমণ করার চেষ্টা করতাম।
প্র: আপনি কোথায় কোথায় পাক বাহিনীর সাথে লড়াই করেছেন ? সেখানে আপনাদের কি ফলাফল হয়েছিলো ?
উ: প্রথম পাক বাহিনীর ওপর আক্রমণ করা হয় কুরিয়ানা গ্রামের একটু নামায়। একটা স্পীডবোটে ৪ জন পাক বাহিনী আসছিলো একটা মেয়েকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। মেয়েটিকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পথে আমি গ্রেনেড নিক্ষেপ করি সেই স্পীটবোটের উপরে। তখন বোটটা ডুবে যায়। আরো লোকজন আমার সাথে ছিলো, তারা ওদের ধরে ফেলে এবং বেয়নেট দিয়া কইচ্চা [কেটে] নদীতে ফালাইয়া দেয়।
প্র: পাক বাহিনীর ৪ জনকে হত্যার পরে আপনি আর কোথায় কোথায় গেলেন?
উ: তারপরে গরাঙ্গলে আক্রমণ করেছি। গরাঙ্গলে যে আক্রমণ করেছি সেখানে একটা ছোট লঞ্চে পাক বাহিনী যাইতেছিলো। সেটা আক্রমণ করার পরে পিছন থেকে তিনখানা গানবোট আসায় আমরা পিছাইয়া যাই। কিন্তু তখন যে কয়জন মারা গেছে তা আমি বলতে পারবো না। তবে মারা গেছে। লঞ্চ থেকে যে রক্ত ঝরছে সেটা আমরা দেখছি।
প্র: আপনি যে দু’টো মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপে অংশগ্রহণ করেছিলেন সেই দু’টো গ্রুপের উচ্চ পর্যায়ে অর্থাৎ লিডিং পর্যায়ে কারা ছিলেন ?
উ: শেষের গ্রুপটায় লিডিং পর্যায়ে ছিলেন বেণীলাল দাশগুপ্ত। আর প্রথম পর্যায়ের লিডিং ম্যান ছিলেন সালাম ভাই ওরফে সিরাজ শিকদার। সেই ছিলো প্রথম ম্যান। দ্বিতীয় ম্যান ছিলো মজিবুল হক, তৃতীয় ম্যান ছিলো ফিরোজ কবির। কবিতা লেখে যে হুমায়ুন কবির তারই ভাই ফিরোজ কবির। আর কারো কথা আমার তেমন মনে নাই।
২২ বছর বয়সী শ্রমিক ফরহাদের ভাষ্য :
প্র: আপনি বলছিলেন যে, থানার অস্ত্রগুলো একটি পার্টি নিয়ে গেছে? এই পার্টি কি স্বাধীনতার পক্ষে ছিল? না বিপক্ষে ছিল?
উ: স্বাধীনতার পক্ষের পার্টি ছিল। কমরেড সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’ তাদের নেতৃত্বে সেই অস্ত্রগুলো নেওয়া হয়েছিল। তারা দেশের মাটিতে থেকেই স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করার অঙ্গীকার করেছিল। তাদের ঘাঁটি ছিল কুরিয়ার পেয়ারা বাগানে।
২৯ বছর বয়সী শিক্ষক বেনীলাল দাশগুপ্ত বানারিপাড়া অঞ্চলে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে খ্যাতিমান। তারও অভিজ্ঞতা হয়েছে সিরাজ শিকদারের সঙ্গে লড়াইয়ের :
সিরাজ সিকদার তখন এই এলাকায় মতি নামে পরিচিত। সিরাজ সিকদার,সেলিম শাহনেওয়াজ এখন সব বেঁচে নেই। নিজেদের দ্বন্দ্বে ওদের মরতে হয়েছিলো স্বাধীনতা পরবর্তীকালে। তাদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে মিলে আমরা বানারিপাড়া থানা আক্রমণ করেছিলাম। সেদিন আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো বানারিপাড়া থানা আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে ওখানে পিস কমিটির মিটিং-য়ে আমরা হানা দেবো। তখন থানার পাশে সাহা বাড়িতে পিস কমিটির মিটিং হচ্ছিলো। কিন্তু এই কথাগুলি কেমন করে যেন ফাঁস হয়ে যায়। আমরা এখনও জানি না এই রহস্যটা। আমরা যখন থানা আক্রমণ করলাম তখন থানা থেকে আমাদের লক্ষ্য করে প্রতি আক্রমণ করলো। আমাদের অস্ত্র যেহেতু তাদের মতো ছিলো না,এমুনিশন খুব কম ছিলো,তাই আমরা সেখান থেকে রিট্রিট করি। এই আক্রমণে দুইজন পুলিশ মারা যায়। আমার অসিত্বকে সেদিনই ওরা ধরতে পারলো। তারা জানলো যে আমি একটা বিরাট দল নিয়া এখানে একটিভ। ঐ রাতেই আমরা আমাদের ক্যাম্প থেকে যে ক্যাম্পটি বুড়ির বাড়ির ক্যাম্প বলে পরিচিত ছিলো সেই ক্যাম্প থেকে স্পীডবোটে সিরাজ সিকদারের কাছে চলে যাই আটঘর কুরিয়ানায় নিরাপদ অঞ্চলে। আমরা জানতাম যে,আমাদের ক্যাম্প আক্রান্ত হবে কালকেই। তখন আমার দলের একটা গোয়েন্দা গ্রুপ ছিলো। তারা আমাকে খবর দিয়েছিলো যে পাকিস্তানিরা রাত্রেই হয়তো আক্রমণ করতে পারে। আমি সিরাজ সিকদারকে এই কথাটা বলেছিলাম। উনি বলেছিলেন যে, এক ডিভিশন সৈন্য ছাড়া এতোবড় অঞ্চলে তারা আক্রমণ করতে পারবে না। কিন্তু দেখা গেলো যে, রাত্র সাড়ে তিনটার সময় আমরা যেখানে ছিলাম তার চারিদিকে অজস্র মানুষ এসে গেছে। তাদের একদল সহযোগী পেয়ারা বাগান সাফ করতে লাগলো। এক সময় পেয়ারা বাগান সব কেটে ফেললো। আখের খেত শেষ করলো। সমস্ত জায়গা তখন একটা উদাম বা খালি অঞ্চলে পরিণত হলো। পেয়ারা বাগানের দুই পাশে কতকগুলি খাল ছিলো-যেখানে দশ বারো হাত পানি জমা থাকতো প্রায় সব সময়। এই খালের ভিতরে হাজার হাজার মানুষ প্রাণের ভয়ে লুকাতে চেষ্টা করলো। এদিকে শর্ষিনা পীর সাহেবের মাদ্রাসার প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার ছাত্র এবং চারিদিকের ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের সরবরাহকৃত অনেক লোকজন নিয়া এই অঞ্চলটাকে পাকিস্তানি আর্মি ঘিরে ফেললো। অসংখ্য মানুষ তারা হত্যা করলো। পাকিস্তানিরা সেদিনই মেয়েদের ধরলো,যারা অল্প বয়সী মেয়ে বা ৪৫ বছর পর্যন্ত বয়স তাদের ধরে নিয়ে কুরিয়ানা স্কুলে একটা ঘাঁটি করলো। সেই ঘাঁটিতে পাকিস্তানিরা বেশ কয়েকদিন থাকে এবং ধারাবাহিক অত্যাচার করতে থাকে। তারা যাকে পায় তাকেই হত্যা করে। লুটপাট করে। ঐ অঞ্চল তখন এক বিরান ভূমিতে পরিণত হলো। কয়েকদিন থাকার পর পাকিস্তানি আর্মি এখান থেকে চলে যায়।
পেয়ারা বাগানের যুদ্ধ বিষয়ে ৭ জুন ১৯৭১ একটি প্রচারপত্র ছাড়ে পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি। এতে বলা হয় : পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন (সর্বহারা পার্টির অঙ্গ শ্রমিক সংগঠন) প্রতিনিয়ত আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীসহ সকল দেশপ্রেমিক পার্টি ও জনসাধারণের প্রতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সঠিক পথে সংগ্রাম পরিচালনা করতে আহবান জানায়। বরিশাল জেলার ঝালকাঠির মুক্তিবাহিনী ও আওয়ামী লীগের দেশপ্রেমিকরা এতে সাড়া দেয়। তাদের অংশগ্রহনসহ অন্যান্য দেশপ্রেমিকদের নিয়ে স্থানীয় মুক্তিফ্রন্ট গঠন করা হয়। ঐক্যবদ্ধ মুক্তিবাহিনী তপশিলী হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত পূর্ব বাংলার বৃহত্তম পেয়ারাবাগান, কুরিয়ানা, ডুমুরিয়া, ভীমরুলী এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করে।”এরপর সর্বহারারা কেনো পেয়ারা বাগান থেকে অবস্থান গুটিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লো এর কোনো ব্যাখ্যা সেখানে ছিলো না। তবে সেই মুহূর্তে সত্যিকার অর্থেই মিত্র খুজছিলেন সিরাজ। স্হানীয় পর্যায়ের মুক্তিবাহিনী কমান্ডারের সঙ্গে ফ্রন্ট গঠনের চেয়ে বৃহত্তর পরিসরের নেতৃত্বে আসার ইচ্ছেটা তীব্র হয়ে উঠেছিলো তার। কিন্তু আগের পর্বেই বলা হয়েছে, সাড়া মেলেনি। উল্টো মুজিব বাহিনীর হাতে নিহত হন তার ডানহাত সাইফুল্লাহ আজমী।
সত্যিটা হচ্ছে সে সময় মুক্তিবাহিনীর বিশ্বস্ততা অর্জনে আসলেই ব্যর্থ হয়েছিলো মাওপন্থী দলগুলো। এমনিতেই তারা তখন বিভিন্ন অংশে বিভক্ত। পাকিস্তানের প্রতি চীনের পক্ষপাতে বিভ্রান্তও। যদিও সিরাজ ‘৬৮ সালের প্রথম থিসিসেই নিজেদের আলাদা বলে দাবি করে হক-তোয়াহা-মতিনদের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টিকে সংশোধনবাদী বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এবং পাল্টা বিবৃতিতে তাদের সিআইএর দালাল বলে অভিহীত করা হয়। এর মধ্যে চারু মজুমদারের নেতৃত্বাধীন নকশালবাদীদের সঙ্গে হক-তোয়াহা গ্রুপের ঐক্য গড়ে ওঠার পর মুক্তিবাহিনী তাদের আক্রমণের শিকার হয়। নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পেরোলী গ্রামে আবদুল হকের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির শ্রেণীশত্রু খতমের নামে কয়েকশ স্বাধীনতাকামী বাঙালী হত্যার খবরও মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরে পৌছে গেছে। জুনে পূর্ব পাকিস্তান প্রশ্নে তার চতুর্থ থিসিসে চারু স্পষ্টই সমর্থন দিয়েছেন হক-তোয়াহাদের। তাই মাওপন্থী হিসেবে সিরাজকে মিত্র ভাবার আলাদা কোনো কারণ ছিলো না মুক্তি বাহিনীর। এই পর্যায়ে এসে সিরাজও পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির লাইন গ্রহণ করেন এবং অক্টোবরের থিসিসে মুক্তিবাহিনীকেও প্রতিপক্ষ হিসেবে ঘোষণা দেন। এই হঠকারিতার জের সিরাজকে শেষ পর্যন্ত দিতে হয়েছে যে কারণে স্বাধীনতার পর দলের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি শক্তি এবং ভিত্তি তৈরিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। চেয়ারম্যান মাওর থিওরীতে বিপ্লব হবে দীর্ঘস্থায়ী, তাই তারা তখন জোর দিলেন ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য অস্ত্র সংগ্রহে। এবং তা ছলে বলে কৌশলে।
দেশ স্বাধীন হলেও তা আসলে রুশ-ভারতের সম্প্রসারণবাদের শিকার, মুজিব সরকার পুতুল সরকার এবং তাদের উৎখাতের জন্য বিপ্লব চলবে- এই লাইনে এগোতে থাকে সর্বহারা। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালেই ঢাকায় যখন বিজয় উৎসব চলছে তখন তারা লিফলেট বিতরণ করে এটি উল্লেখ করে। ‘৭৪ সালে এসে এই ব্যাপারে খুব সরল এক নীতি গ্রহণ করেন সিরাজ। এক থিসিসে বলেন- মুজিব সরকারের উপর ক্রমাগত আঘাতে একে টলিয়ে দিতে হবে যাতে ভারতীয় বাহিনী নাক গলাতে বাধ্য হয়। আর তারপর শুরু হবে সত্যিকারের বিপ্লব। সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক লিফলেটে লেখা হয়: Even though our enemies have increased pressure on us through army, BDR and Rokkhi Bahini, they have not been able to harm us and our rainy season attacks continue. Our guerillas are killing national enemies and grabbing hold of thanas and police faris. Eventually we will form a regular army and create liberated areas. This is the right answer to smash the teeth of the puppet government of Bangladesh. Eventually these puppets will be forced to call in the Indian army to save them. When the colonialist Indian army enters East Bengal, all the masses will join our national liberation struggle.
সে লক্ষ্যেই ২০ এপ্রিল ১৯৭৩ গঠন করেন পূর্ব বাংলা জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট। লক্ষ্য দ্বিতীয় বিপ্লব। আর তা করতে একের পর এক বোমা হামলা, পুলিশ ফাড়ি দখল, পুলিশ ও রাজনীতিবিদ হত্যা চলতেই থাকে। সঙ্গে শ্রেণীশত্রু খতম।
কিন্তু এই শ্রেণীশত্রুরা তার দলেও ছিলো বৈকি। ১৯৭২ সালের ১২ থেকে ১৬ জানুয়ারি প্রথম জাতীয় কংগ্রেসে নতুন রাজনৈতিক লাইনের ব্যাপারে স্পষ্ট ঘোষণা দেন সিরাজ। এতে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, রুশ সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তব্যবাদ এবং রুশ ভারতের দালালদের পূর্ব বাংলার জনগনের মূল শত্রু হিসেবে গণ্য করা হয়। এই থিসিস সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়। একই সঙ্গে দলের গঠনতন্ত্রও ঘোষণা করা হয় যা কিছু সংশোধনীর পর কার্যকর হয়। এতে সিরাজ শিকদারকে চেয়ারম্যান করে ৭ সদস্যের প্রেসিডিয়াম গঠিত হয় যা দায়িত্ব নেয় কংগ্রেস পরিচালনার। এরপর গোপন ভোটে সিরাজ শিকদারকে চেয়ারম্যান করে ৬ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার ছাত্র মাহবুবুর রহমান ওরফে শহীদ (কমরেড রোকন) ও মুক্তিযোদ্ধা সেলিম শাহওনেওয়াজ ওরফে ফজলু নির্বাচিত হন সদস্য। বিকল্প সদস্যপদ পান বুয়েট ছাত্র ফজলুল হক ওরফে রানা, বিএর ছাত্র মাহবুব রহমান ওরফে সুলতান এবং টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ইনস্ট্রাকটর নাসিরউদ্দিন ওরফে মজিদ।
জাহানারার সঙ্গে সিরাজের অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে পার্টিতে শুরু হয় কলহ। এইসময় অভিযোগ ওঠে আজম, রিজভী ও মোহসিনসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে সঙ্গী করে সিরাজকে বহিষ্কার করার উদ্যোগ নেন ফজলু ও সুলতান। এদের কুচক্রী হিসেবে চিহ্নিত করে ১৯৭২ সালের মে মাসে বহিস্কার করেন সিরাজ। জুনের প্রথম সপ্তাহে কাজী জাফর গ্রুপের কিলার খসরুকে দিয়ে সেলিম শাহনেওয়াজ ওরফে ফজলু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরকে হত্যা করা হয়। হুমায়ুন কবির হ্ত্যাকান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে সিআইডি জেরা করে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফরহাদ মাজহারকে। এর মধ্যে মাহবুবুর রহমান ওরফে শহীদ গ্রেপ্তার হন পুলিশের হাতে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন এই সন্দেহে তাকে সেন্ট্রাল কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয় ‘৭৩ সালের শুরুতে। এর মধ্যে পার্টি বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে সংশোধনের শিকার হতে হয় আরো অনেককে। এর মধ্যে বহিষ্কার এবং মৃত্যু দুটোই বরণ করতে হয় তাদের। ‘৭৪ সালে গ্রেপ্তার হন মজিদও। এবং রানা সিরাজ শিকদারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। নেতৃত্ব সংকটে পড়া কেন্দ্রীয় কমিটি ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর একটি জরুরী বৈঠকে রানার সদস্যপদ স্থগিত করেন। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউদ্দিন, জ্যোতি, মতিন, মাহবুব, রফিক ও রানাকে দিয়ে দুটো সহযোগী ও সমন্বয়কারী দল গঠন করা হয়। এভাবে সিরাজের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব অক্ষন্ন থাকে।
‘৭৩ সালকেই ধরা হয় সিরাজ শিকদারের স্বর্ণ সময়। এ সময়ই সরকারের প্রশাসনিক দূর্বলতা এবং বাংলাদেশে দূর্ভিক্ষের আসন্ন ছায়াকে কাজে লাগিয়ে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন তিনি। ভাবমূর্তি বলতে এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে লড়িয়ে এক রবিনহুডের। এর মধ্যে ঢাকার অদূরে বৈদ্যেরবাজারসহ বেশ কটি ব্যাঙ্ক লুট করে সর্বহারা। গল্প ছড়িয়ে পড়ে সিরাজ ব্যাঙ্ক লুট করে অভাবী মানুষকে খাবার দিচ্ছেন। দখল করা হয় ময়মনসিং মেডিকেল কলেজ, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও টাঙ্গাইলের পাথরাইল পুলিশ ফাড়ি। মাদারিপুরের এএসপি সামাদ মাতবর, মগবাজারের রক্ষীবাহিনীর কর্মকর্তা ফজলুল হক, বরিশালে সাংসদ মুকিম, শেখ মুজিবর রহমানের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী মহিউদ্দিন, টেকেরহাতের নেতা শাহজাহান সরদার, ভোলার রতন চৌধুরী, মাদারিপুরের নিরুসহ অনেকেই খতম তালিকায় নাম লেখান। এরপর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে আবার হরতাল ডাকেন সিরাজ। বিজয় দিবসকে ঘোষণা করেন কালো দিবস হিসেবে। এবার নড়েচড়ে বসে মুজিব সরকার। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদউল্লাহ মাওবাদী চরমপন্থীদের অরাজকতার দোহাই দিয়ে সারা দেশে জরুরী অবস্থা জারি করেন।
বাংলাদেশে মাওবাদীদের বিপ্লবের স্বর্ণক্ষেত্র হিসেবে ১৯৭৪ সাল উপস্থিত হলেও সিরাজ তার সুযোগ নিতে পারেননি। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ক্রমাগত তাড়া খেয়ে তখন কোথাও কয়েকঘণ্টার বেশী থাকার উপায় নেই তার এবং জাহানারার। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক হাইডআউটেই জন্ম নেয় দুজনের সন্তান অরুণ। আর দলের মধ্যে কলহ লেগেই আছে। পার্টির অনেক ক্যাডারই দলীয় নীতি ভুলে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াচ্ছেন। সেবছর ভারতীয় রাষ্ট্রপতি গিরির সফরের সময় হরতাল ডাকেন সিরাজ এবং বোমায় কাঁপে সারা দেশ। এ সময়টাতেই ভারতের মার্কসবাদীদের মুখপাত্র বলে কথিত সাপ্তাহিক ফ্রন্টিয়ারে (২০ জুলাই, ১৯৭৪) সিরাজ শিকদারের দলের তীব্র সমালোচনা করে লেখা হয় যে চারু মজুমদার যা ভুলভ্রান্তি করেছেন তা সিরাজের নখের সমানও নয়। চীনা বিপ্লবের ভুল পাঠ নিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি লুটপাটের মাধ্যমে সদস্যদের পকেটভর্তি এবং ব্ল্যাক মেইলের অভিযোগও ওঠে। এবং অন্য মাওবাদীরা তাকে সিআইএর এজেন্ট বলছেন এমন কথাও লেখা হয়। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে গোটা সময়টায় সিরাজ শিকদারের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন শিল্পপতি জহুরুল ইসলাম। ফেরারী অবস্থায় তার নাভানা মটরসই ছিলো সিরাজ ও জাহানারার নিরাপদ আশ্রয়।
আগেই বলেছি সঙ্গীদের মধ্যে রুশ পন্থী কমিউনিস্টরা থাকলেও স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে মাওবাদীদের কোনো তফাত দেখতেন না মুজিব। ১৯৭১ সালের ১১ জানুয়ারি পটুয়াখালী সফরে এক বক্তৃতায় মাওবাদীদের হাতে পাবনার এক সাংসদ এবং খুলনার এক নেতার মৃত্যু প্রসঙ্গে বলেছিলেন : রাতের আধারে চোর-ডাকাতের মতো মানুষ হত্যা করে এরা যদি মনে করে জনগনের উপকার করছে, তাহলে ভুল ভাবছে। এসব বিপ্লবী আর চরমপন্থীদের আমার চেনা আছে। এরা মানুষের মতামতের যেমন মূল্য দেয় না তেমনি জনগনের উপর আস্থাও রাখে না। এর ফল তারা ঠিকই পাবে। (দ্য ডন, ১২ জানুয়ারি, ১৯৭১)
১৯৭৪ সালে ডিসেম্বরের ৩০ তারিখ গ্রেপ্তার হন সিরাজ শিকদার। এ বিষয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। বলা হয় তার ঘনিষ্ঠ কোনো কমরেডই বিশ্বাসঘাতকতা করে ধরিয়ে দিয়েছেন তাকে। পাশাপাশি এও বলা হয় যে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা সফলভাবেই সর্বহারা গ্রুপে ইনফিলট্রেট করে এবং তারই ধারাবাহিকতায় গ্রেপ্তার হন সিরাজ। এরপর তাকে ঢাকা নিয়ে আসা হয়। নাইম মোহাইমেন তারগেরিলাজ ইন দ্য মিস্ট নামে সিরাজকে নিয়ে লেখা আর্টিকেলে প্রাক্তন সর্বহারা সদস্যদের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন কেউ বলে তাকে প্রাইভেট বিমানে করে উড়িয়ে আনা হয়েছে, কেউ বলেছেন হেলিকপ্টারে। বিমানের গল্পে সিরাজের চোখ বাধা, এটা দেখে পাইলটদের বিমান চালাতে অস্বীকৃতির অধ্যায় আছে। এয়ারপোর্টে সিরাজের পানি খেতে চাওয়া এবং তাকে কষে লাথি মারার গল্প আছে। এবং সবচেয়ে নাটকীয়টি হচ্ছে মুজিবের মুখোমুখি রক্তাক্ত সিরাজের উক্তি : বি কেয়ারফুল মুজিব, ইউ আর টকিং টু সিরাজ শিকদার। এরপর মুজিবের তাকে লাথি মারা। কিন্তু কোনটারই সত্যিকার অর্থে প্রমাণ দিতে পারেননি কেউই।
বে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে মুজিবের উক্তি : কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? ২ জানুয়ারী সাভারে নিহত হন সিরাজ শিকদার। সরকারী ভাষ্য গাড়ি থেকে পালানোর সময় গুলিতে নিহত হন তিনি। বাংলাদেশে ক্রসফায়ারের (এটাও ভারত থেকে আমদানী যা নকশালদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে খ্যাতিমান হয়ে গিয়েছিলেন সাবইনন্সপেক্টর রুনুগুহ নিয়োগী) প্রথম উদাহরণ। তবে কমরেড রোকনের স্মৃতিকথায় একটি গুরুত্বপূর্ন ঘটনার উল্লেখ আছে। ১৯৭৩ সালে মাদারিপুরে একবার ধরা পড়েছিলেন সিরাজ শিকদার। কিন্তু দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা মোহসিন তাকে পালানোর সুযোগ দেন। কারণ ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও ক্ষিপ্ত ছিলেন। ২ জানুয়ারি সাভারে সেই একই টোপ হয়তো তাকে দিয়েছিলেন এসপি মাহবুব (মুজিবনগর সরকারের গার্ড অব অনারের দায়িত্বে থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুন্সিগঞ্জের সাংসদ), কে বলতে পারে।
শেষ করবো মুজিবের বিখ্যাত উক্তিটির ঘটনাটি দিয়ে। প্রচলিত গল্প হচ্ছে সিরাজ শিকদার মারা যাওয়ার পরদিন সংসদে দাড়িয়ে মুজিব সদম্ভে ঘোষণাটা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সে বছর সংসদ অধিবেশন বসে ২৫ জানুয়ারি। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করানোর পর তার দ্বিতীয় বিপ্লবের (বাকশাল) বিশ্লেষণ করার এক পর্যায়ে (বক্তৃতার মাঝামাঝি) মুজিব বলেন : স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার পর যারা এর বিরোধীতা করেছে, যারা শত্রুর দালালী করেছে, কোনো দেশেই তাদের ক্ষমা করা হয় নাই। কিন্তু আমরা করেছি। আমরা তাদের ক্ষমা করে দিয়ে বলেছি দেশকে ভালোবাসো। দেশের স্বাধীনতা মেনে নাও। দেশের কাজ করো। কিন্তু তারপরও এদের অনেকে শোধরায়নি। এরা এমনকি বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে বিদেশ থেকে টাকা নিচ্ছে। ওরা ভেবেছে আমি ওদের কথা জানি না! একজন রাতের আঁধারে মানুষ মেরে যাচ্ছে আর ভাবছে তাকে কেউ ধরতে পারবে না। কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? তাকে যখন ধরা গেছে, তখন তার সহযোগীরাও ধরা পড়বে। আপনারা কি ভেবেছেন ঘুষখোর কর্মকর্তাদের আমরা ধরবো না? যারা বিদেশীদের থেকে টাকা নেয় তাদের আমরা ধরবো না? মজুতদার, কালোবাজারী আর চোরাকারবারীদের ধরবো না? অবশ্যই ধরবো। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার। তারা কিছুই হজম করতে পারবে না। ইনশাল্লাহ, পাপী একদিন ধরা পড়বেই…’
মোটামুটি এই হলো সিরাজ শিকদারের মিথ। এ ব্যাপারে যারা আরো বিস্তারিত জানতে চান, লিংকগুলোতে গুতোবেন। আরো জানতে পারবেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি সিরাজ শিকদার ভুল বিপ্লবের মোহে হেঁটেছেন। আর তার বাঁশীর সুরে মোহগ্রস্থ হয়ে আত্মাহুতি দিয়েছে প্রতিভাবান অনেক যুবক। সে সময় জনযুদ্ধের যে চীনা থিওরি প্রচলিত ছিলো তার লেখক লিন বিয়াও এবং মাওর মতবাদের প্রচারণায় থাকা চার কুচক্রী– দু পক্ষই চীনে প্রতিবিপ্লবী হিসেবে কলঙ্কিত হয়েছেন। তাহলে তাদের অনুকরণে কি বিপ্লব ঘটাতেন সিরাজ শিকদার! আরেকজন পলপট হতেন হয়তো। আর সর্বহারারা খেমারুজদের মতো শ্রেণীশত্রু খতমের নামে আরো ৩০ লাখ মানুষ মারতেন হয়তো। এসব ভূল স্বপ্নকেই হয়তো ইউটোপিয়া বলে, বিপ্লব না।
সূত্রঃ
১৯৬৭ : নক্সালবাড়ী, রেডগার্ড ও মাও থট সেন্টার গঠন
১৯৬৮ : পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সুরঙ্গ কাটা অভিযান, পুরানো কমরেডদের সঙ্গে বিচ্ছেদ ও লাল ঝাণ্ডার প্রকাশনা
১৯৬৯ : জাহানারার সঙ্গে পরিচয় এবং লিভ টুগেদার
আ কেইস স্টাডি অব পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি
দ্য সান ইজ রেড
রুহুল ও রাহেলার গল্প

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট