...মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে নতুনরূপে আর্বিভূত হবে...

This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Liberation War of Bangladesh and Genocide of Innocent Bengali People in 1971. More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

ফেসবুকে আমরা

গোলাম আযমের নির্দেশে ৩৮ জনকে হত্যা - কুন্তল রায়

গোলাম আযমের নির্দেশে ৩৮ জনকে হত্যা

কুন্তল রায়



একাত্তরের ২১ নভেম্বর গভীর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারের ৩৮ জনকে শহরের পৈরতলা রেলব্রিজের কাছে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। এই গণহত্যা হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের নির্দেশে।

গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উল্লেখ করা মানবতাবিরোধী অপরাধের ৫২টির একটি হলো এই গণহত্যা। তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২) ধারায় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা এবং এ ধরনের অপরাধে নেতৃত্ব, সহায়তা, প্ররোচনা ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গত সোমবার এই অভিযোগ দাখিল করা হয়। একই সঙ্গে তাঁকে গ্রেপ্তার বা আটকের জন্য পরোয়ানা জারিরও আবেদন জানায় রাষ্ট্রপক্ষ। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে আদেশের জন্য গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল ২৬ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ট্রাইব্যুনাল আমলে নিলে রাষ্ট্রপক্ষ পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
জানতে চাইলে জামায়াতের আটক নেতাদের আইনজীবী দলের প্রধান আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে প্রক্রিয়াধীন থাকায় এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। তবে এটা বলা যায়, গোলাম আযম পাকিস্তানের অখণ্ডতা চেয়েছিলেন এটা যেমন এক শ ভাগ সত্য, তেমনি এটাও এক শ ভাগ সত্য যে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে তাঁর দূরতম কোনো সম্পর্ক ছিল না।’

ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়েছে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমির গোলাম আযমের চেষ্টায় শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস, পাইওনিয়ার ফোর্স প্রভৃতি সহযোগী বাহিনী গঠিত হয়। তাঁর নেতৃত্বে ও নির্দেশে এসব বাহিনী সারা দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে এবং এসব অপরাধ করতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করে।

অভিযোগ অনুসারে, কুমিল্লার হোমনা থানার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের সিরু মিয়া একাত্তরে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় দারোগা (উপপরিদর্শক) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২৮ মার্চ তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও ১৪ বছরের ছেলে আনোয়ার কামালকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি যান। সেখানে তিনি শরণার্থীদের ভারতে যাতায়াতে সাহায্য করতেন। ২৭ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার তন্তর চেকপোস্টের কাছে তিনি, তাঁর ছেলেসহ ছয়জন ভারতে যাওয়ার পথে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। তাঁদের বিভিন্ন রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে কয়েক দিন নির্যাতনের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে পাঠানো হয়। আনোয়ারা বেগমের ভগ্নিপতি খিলগাঁও সরকারি স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ মুহসিন আলী খান সিরু ও আনোয়ারকে ছাড়াতে গোলাম আযমের সঙ্গে দেখা করেন। পরে আরেক দিন তিনি গোলাম আযমের কাছে গিয়ে ওই অনুরোধ জানান। গোলাম আযম ব্রাহ্মণবাড়িয়া শান্তি কমিটির নেতা পেয়ারা মিয়ার কাছে এ বিষয়ে তাঁদের মারফত একটি চিঠি পাঠান। ওই চিঠি পড়ার পর পেয়ারা মিয়া পত্রবাহককে গোলাম আযমের দেওয়া আরেকটি চিঠি দেখান, যাতে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেকে হত্যার নির্দেশ ছিল। পেয়ারা মিয়া পত্রবাহককে জানান, তাঁর আনা চিঠিতে নতুন কিছু নেই। পরে ২১ নভেম্বর (পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন) রাতে সিরু মিয়া, আনোয়ার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নজরুল ইসলামসহ ৩৯ জনকে পাকিস্তানি সেনারা রাজাকার ও আলবদরদের সহযোগিতায় কারাগার থেকে পৈরতলায় নিয়ে গুলি করে। এতে একজন ছাড়া বাকি ৩৮ জন মারা যান।

এ ঘটনায় গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা ও এতে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে।

বাকি ৫১ অভিযোগ অনুসারে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, রাজাকার ও সহযোগী বাহিনীগুলো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সারা দেশে যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটিয়েছে, নেতা হিসেবে গোলাম আযম এসব অপরাধ করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা করতে উৎসাহ, প্ররোচনা ও উসকানি দিয়েছেন।
গণহত্যায় প্ররোচনা: আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ২ মে জামায়াতের ঢাকার কার্যালয়ে কর্মিসভায় গোলাম আযম মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটনে দলের নেতা-কর্মী ও অনুসারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। ১৭ মে ঢাকায় সাবেক এমএনএ আবুল কাসেমের বাসভবনে এক সভায় গোলাম আযম ২৫ মার্চ মধ্যরাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক অভিযানকে সর্বাত্মক সমর্থন জানান। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ উল্লেখ করেন। ২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা কেন্দ্রে এক সভায় তিনি গণহত্যাকে সমর্থন করেন। ১৪ আগস্ট কার্জন হলে এক সভায় তিনি ‘ঘরে ঘরে দুশমন খুঁজে বের করে তাঁদের উৎখাতের মাধ্যমে’ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য প্ররোচিত করেন।

শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠন: অভিযোগ অনুসারে, ৪ এপ্রিল গোলাম আযমসহ ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানকে নাগরিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। দুই দিন পর গোলাম আযম, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পূর্ব পাকিস্তানের সভাপতি পীর মোহসীনউদ্দিন আহমদ ও এ টি সাদী আবার টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করেন। ৯ এপ্রিল খাজা খয়েরউদ্দিনকে আহ্বায়ক ও গোলাম আযমকে সদস্য করে ১৪০ সদস্যের নাগরিক শান্তি কমিটি গঠিত হয়। ১৫ এপ্রিল নাগরিক শান্তি কমিটির নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি এবং ২১ সদস্যের কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়, যার সদস্য ছিলেন গোলাম আযম। ২১ এপ্রিল একে আরও গতিশীল করতে ছয় সদস্যের একটি সাব-কমিটি গঠিত হয়, যার দুই নম্বর সদস্য ছিলেন গোলাম আযম।

অভিযোগ অনুসারে, ১৮ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রিপাবলিক স্কয়ারে এক সভায় গোলাম আযম শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুরে শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে রাজাকার শিবির পরিদর্শনকালে আলেম ও ইসলামি কর্মীদের প্রতি রাজাকার ও মুজাহিদ বাহিনীতে ভর্তি হয়ে সশস্ত্র হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি ১ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, তথাকথিত মুক্তিবাহিনীকে মোকাবিলা করতে রাজাকাররাই যথেষ্ট। এ জন্য রাজাকারের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

রাজাকারদের অস্ত্র সরবরাহের আহ্বান: অভিযোগ অনুসারে, ১৯ জুন গোলাম আযম রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করে মুক্তিযোদ্ধাদের মোকাবিলার জন্য রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহের আহ্বান জানান। পরদিন লাহোরে জামায়াতের পশ্চিম পাকিস্তানের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে দুষ্কৃতকারীরা সক্রিয় রয়েছে এবং তাদের প্রতিরোধের জন্য অস্ত্রসজ্জিত হওয়া উচিত। এমন কথা তিনি আরও একাধিক স্থানে বলেছেন।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে দালিলিক সাক্ষ্য হিসেবে যেসব নথি সংযুক্ত করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: একাত্তরে স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রতিবেদন (জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্র সংঘ ও শান্তি কমিটির কর্মকাণ্ড-সংক্রান্ত), গোয়েন্দা প্রতিবেদন, শান্তি কমিটির সঙ্গে রাজাকার, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনের যোগাযোগের নথি ও ছবি, ভিডিওচিত্র এবং একাত্তরের বিভিন্ন পত্রিকা ও বিদেশি টিভি চ্যানেলের প্রতিবেদন। এসব বিষয়ে প্রকাশ ও প্রচারের তারিখ অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট