...মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে নতুনরূপে আসছে...

This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Liberation War of Bangladesh and Genocide of Innocent Bengali People in 1971. More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

ফেসবুকে আমরা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৮০ তিব্বতি শহীদ : গিয়ালপো পেমা'র সাক্ষাৎকার - মোস্তফা হোসেইন, দৈনিক কালের কণ্ঠ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৮০ তিব্বতি শহীদ

গিয়ালপো পেমা'র সাক্ষাৎকার

মোস্তফা হোসেইন


জাপানের তো-ইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আইন বিভাগের অধ্যাপক গিয়ালপো পেমা। একাত্তরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অনুবাদকের কাজ করেছেন বাংলাদেশ দূতাবাস, টোকিওতে; শরণার্থীদের জন্য অর্থ জোগাড় করেছেন রাস্তায় রাস্তায়। জাপানের ডেমোক্র্যাটিক লিবারেল পার্টির নেতা, জাপানে অবস্থিত আইএফসির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, কাউন্সিল ফর এশিয়ান সলিডারিটি অ্যান্ড ডেমোক্রেসির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. গিয়ালপো পেমা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফর করে গেছেন মার্চের প্রথম দিকে। সে সময়ে সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মোস্তফা হোসেইন।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী হিসেবে অংশ নিতে কিভাবে অনুপ্রাণিত হলেন?
পেমা : বলতে পারেন ঘটনাক্রমে। একাত্তরে বাংলাদেশে যখন যুদ্ধ চলে, সেখানে কোনো ভূমিকা পালনের কথা ছিল না আমার। কিন্তু যখন জানতে পারলাম, এখানকার লাখ লাখ মানুষ প্রাণের তাগিদে দেশ ত্যাগ করছে, আর সেই উদ্বাস্তু মানুষরা মানবেতর জীবন যাপন করছে, তখন নিজ থেকে তাগাদা অনুভব করি। মনে হয়, আমারও কিছু করণীয় আছে। কারণ আমি বুঝি, শরণার্থীজীবনে একজন মানুষ কী দুর্ভোগ মোকাবিলা করে। কতটা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে একেকজন মানুষের জীবন।
প্রশ্ন : শরণার্থীজীবনের অভিজ্ঞতা কি ছিল আপনার?
পেমা : হ্যাঁ। আমার তো ওই সময়ও শরণার্থীজীবনের ক্ষত শুকায়নি। মাত্র বছর দশেক আগে আমি দেখেছি সেই দুর্বিষহ চিত্র। আমার যখন মাত্র সাত বছর বয়স। আমার জন্মভূমি তিব্বতে চীনের আগ্রাসী শক্তি হামলে পড়ে। তারা শত শত মানুষ খুন করে। ওরা আমাদের শত শত উপাসনালয় গুঁড়িয়ে দেয়। অসংখ্য মানুষ তখন বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ে। আমার পরিবারও ছিল সেই কাফেলায়। আমাদের জীবন বিষিয়ে দেয় সেই দিনগুলো। আজও আমার পরিবারের একেকজন সদস্য একেক দেশে। আমি যে জাপানে এসেছি, সেটা তারই ধারাবাহিকতা। আর একাত্তরের কথা যদি বলেন, তখন তো আমি দেশহীন এক মানুষ। জাপানে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছি। হাই স্কুল ছেড়ে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ি। এমন একটা সময় জানতে পারি, বাংলাদেশের মানুষও আমার মতো শরণার্থী হয়েছে। বাংলাদেশের শরণার্থীদের মনে হয়েছিল আমারই পরিবারের সদস্য হিসেবে।
প্রশ্ন : প্রথম কিভাবে জানতে পারলেন বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি?
পেমা : জাপানের পত্রিকাগুলো এসব সংবাদ প্রকাশ করত। জাপান টাইমস, আশাহি ইভেনিং, ডেইলি মিউইর মতো পত্রিকা সেসব সংবাদ পরিবেশন করত। আমি তখন জাপান টাইমসই পড়তাম। 
প্রশ্ন : কিভাবে সহযোগিতা কার্যক্রম শুরু করলেন?
পেমা : ইন্টারন্যাশনাল ফ্রেন্ডশিপ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলাম আমি। ক্লাবটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল আমার কিছু স্কুলবন্ধুকে নিয়ে। সাইতামায় হান্নু উচ্চ বিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী ছিল এমন ১০/১২ জনকে নিয়ে আমাদের সেই ক্লাব প্রতিষ্ঠা করি। আমাদের সদস্যরা সবাই একমত হলেন, বাংলাদেশের শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াব। সেই তো কাজ শুরু।
প্রশ্ন : তাঁদেরও কি আপনার মতো শরণার্থীজীবনের অভিজ্ঞতা ছিল?
পেমা : না। তাদের তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু আমার শিশুকাল সম্পর্কে ওরা জানত। আর কাজ শুরু করার আগে আমি তাদের জানিয়েছিলাম, আসলে বাংলাদেশের শরণার্থীদের জীবনে কী দুর্বিষহ অবস্থা তৈরি হয়েছে। বললাম—হাজার হাজার মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের খাবার নেই, ওষুধ নেই। চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। তাদের খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই তারা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। আমার সঙ্গে তারাও কাজ করতে শুরু করে।
প্রশ্ন : প্রথম কী কাজ করলেন আপনারা?
পেমা : প্রথম আমরা ভাবলাম, শরণার্থীদের আর্থিক সহযোগিতা করতে হবে। ওষুধ কিনতে হলে, খাবার কিনতে হলে অর্থ প্রয়োজন হবে। তাই অর্থ সংগ্রহের চিন্তা করলাম। একটা কার্টন তৈরি করে তাতে বাংলাদেশের শরণার্থীদের সহযোগিতায় অর্থ দেওয়ার আহ্বান জানালাম। তারপর সেই কার্টন নিয়ে স্টেশনের সামনে দাঁড়ালাম। তবে আমাদের আহ্বানে বড় কোনো সাড়া পাইনি। সব মিলে হয়তো এক লাখ ইয়েন আমাদের জমা হলো।
প্রশ্ন : এই টাকা কি বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য ভারতে পাঠালেন?
পেমা : না, এখানে বেশ বোকামো হয়ে গেল একটা। আমরা এই ইয়েনগুলো নিয়ে গুতান্দায় পাকিস্তানি দূতাবাসে চলে যাই। সেগুলো জমা দিলাম ওখানেই। তখন পাকিস্তান দূতাবাসে প্রেস ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন এস এম মাসুদ। সম্ভবত তিনি প্রেস অ্যাটাচে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। তিনি প্রথম পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলেন। তাঁর সঙ্গে আমি যোগাযোগ বাড়িয়ে দিলাম। একসময় জানতে পারি, জাপানে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন হবে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলাম সেই সময়ের জন্য। সেই সময় জাপানের একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও চিকিৎসক নাকাজিমা এস এম মাসুদকে সহযোগিতা করছিলেন। নাকাজিমা তখন মুরুয়ামা নার্সি স্কুলে কাজ করতেন। তিনি দায়িত্ব নিলেন জাপানে অধ্যয়নরত বাঙালি স্টুডেন্টদের বিষয়টি জানানোর। জাপানে বসবাসরত প্রায় ৩০ জনকে তিনি হাজির করতে পেরেছিলেন। দূতাবাসে আমি তো চাকরি করতাম না। একেবারেই স্বেচ্ছাশ্রমে সেখানে যুক্ত ছিলাম। মাসুদ সাহেব বসার জায়গা পাওয়ার পর নাকাজিমাকে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে দেখেছি। তিনি বিভিন্ন জায়গায় যেতেন দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তি নিয়ে। আমি দায়িত্ব নিলাম অনুবাদকের। মাসুদ সাহেব ও দূতাবাসের অন্যরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিগুলো ইংরেজিতে বলতেন কিংবা কখনো তাঁরা সেগুলো লিখেও দিতেন। সেগুলো জাপানি ভাষায় অনুবাদ করতাম আমি। তারপর সেগুলো নিয়ে যাওয়া হতো প্রয়োজনীয় স্থানে।
প্রশ্ন : আপনার মতো আরো কোনো তিব্বতি কি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছিলেন?
পেমা : আমি তো জাপানে বাংলাদেশের জন্য কাজ করেছি। অনেক তিব্বতি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সরাসরি লড়াইয়েও অংশ নিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, একাত্তরের সেই যুদ্ধে অন্তত ৮০ জন শহীদও হয়েছেন। অনেক তিব্বতি আহত হয়েছেন। আমার আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই এমন ব্যক্তি আছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। মনে পড়ছে দুজনের নাম। একজন রাটু গোয়াং, অন্যজন জাম্পা কালদেন। জাম্পা কালদেন ছিলেন তাদের মধ্যে জুনিয়র। রাটু গোয়াং জীবিত আছেন।
প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধের একজন সৈনিক হিসেবে আপনাকে শ্রদ্ধা জানাই।
পেমা : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট