...মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে নতুনরূপে আসছে...

This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Liberation War of Bangladesh and Genocide of Innocent Bengali People in 1971. More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

ফেসবুকে আমরা

গোলাম আযম-ফকা চৌধুরীরা মুক্তি বাহিনী আ'লীগ ও হিন্দুদের হত্যার তাগিদ দিত

গোলাম আযম-ফকা চৌধুরীরা মুক্তি বাহিনী আ'লীগ ও হিন্দুদের হত্যার তাগিদ দিত

কর্নেল নাদির আলী (পাকিস্তান আর্মি)-এর সাক্ষাৎকার
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : সুভাষ সাহা ও বিভূতিভূষণ মিত্র

দৈনিক সমকাল (২০ মার্চ ২০১১)



'গোলাম আযম, ফজলুল কাদের চৌধুরী, মাওলানা ফরিদ আহমেদসহ শীর্ষস্থানীয় জামায়াত ও মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ মাঝে মধ্যেই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবাহিনী, আওয়ামী লীগার ও হিন্দুদের ওপর অপারেশন চালানোর পরিকল্পনা হাজির করতেন এবং তারা এসব অপারেশন জরুরি ভিত্তিতে সম্পন্ন করার তাগিদ দিতেন। এভাবে বেসামরিক ব্যক্তিদের পরামর্শে কাজ করতে হচ্ছে বলে একজন সেনা কমান্ডো হিসেবে নিজেকে খুব ছোট মনে হতো। কিন্তু এটাই ছিল তখন ওপরের নির্দেশ। সিলেটে এদের পরামর্শে পরিচালিত একটা অপারেশনের কথা মনে আছে। ওই অপারেশনে অনেক সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।'

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের কমান্ডো বাহিনীর কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) নাদির আলী গত শনিবার ঢাকার ব্র্যাক ইনে সমকালের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে উলি্লখিত মন্তব্য করেন।
ঢাকায় তিনি এক অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে শনিবার সস্ত্রীক ঢাকা ত্যাগ করেন।

বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান কমান্ডো বাহিনীর যে ইউনিটটি পঁচিশে মার্চ কালরাতে বন্দি করে পরে সেটি তার অধীনে ছিল। কমান্ডো বাহিনী সরাসরি পূর্ব পাকিস্তান কমান্ডের অধীন ছিল। সে কারণে অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ সাক্ষী এই সাবেক কমান্ডো কর্নেল। তবে তিনি কখনোই সরাসরি বাঙালি নিধনযজ্ঞে অংশ নেননি। বরং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সঙ্গী সামরিক কর্মকর্তারা এবং জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগ নেতারা হত্যা, লুটপাট, বাড়িঘর জ্বালানো ও ধর্ষণসহ যেসব বিধ্বংসী এবং মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ বা ইন্ধন জোগাতেন, তার বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ড তার পক্ষে সহ্যের অতীত ছিল। সে কারণেই তিনি শেষ পর্যন্ত স্মৃতিভ্রংশের শিকার হন। যুদ্ধের একেবারে শেষ দিক থেকে পরের কয়েক বছর এ জন্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয় তাকে। হাসপাতালে তার অবস্থা স্বচক্ষে দেখে তার বৃদ্ধ পিতা সেখাইে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। পরে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি কবিতা ও গল্প লেখায় আত্মনিয়োগ করেন। ২০০৭ সালে বিবিসি উর্দু সার্ভিসে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা ও সাধারণ মানুষের দুর্দশার বিবরণ তুলে ধরেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন সহযোগী বাহিনীগুলোর কাছে নির্দেশ আসত : হিন্দুদের কতল কর ও নিশ্চিহ্ন করে দাও। এ ধরনের নির্দেশ তার কাছেও বিভিন্ন সময়ে এসেছে। তবে লোক দেখানো ছাড়া তিনি তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে থাকা ইউনিটকে জনস্বার্থবিরোধী কাজে ব্যবহার করতেন না
তরুণ ক্যাপ্টেন থেকে মেজর পদে উন্নীত হওয়া নাদির আলীর নেতৃত্বাধীন কমান্ডো ফোর্সকে ১৯৭১ সালের মধ্য এপ্রিলে গোপালগঞ্জ-ফরিদপুরে পাঠানো হয়। তখন তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়, 'যত পার বাস্টার্ড হিন্দুদের হত্যা করবে, দেখবে একজন হিন্দুও যাতে জীবিত না থাকতে পারে।' তখন তিনি এর প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, 'স্যার, নিরস্ত্র কোনো ব্যক্তিকে আমি হত্যা করতে পারব না।' এ জন্য তাকে অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। তিনি জানতেন এ ধরনের নির্দেশ প্রত্যেক সেনা কর্মকর্তার কাছেই গেছে। মধ্য এপ্রিলে গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর এসে তিনি দেখলেন, এলাকা শান্ত হয়ে এসেছে। গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। অথচ এই মানুষরাই যখন ফিরছিল তখন অদূরে অন্য বাহিনী সদস্যদের দ্বারা আক্রান্ত হন। সাধারণ মানুষকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে বলে জেনেছি। এরপরের গন্তব্য ছিল বরিশাল।

'আমি যদিও প্রত্যক্ষভাবে কোনো হত্যাযজ্ঞে অংশ নেইনি। তবে অনেক অপারেশনের কাহিনীই আমার কানে এসেছে বিভিন্ন বৈঠক ও ফেলো কর্মকর্তাদের কাছ থেকে শোনার কারণে।'  ৬ জুন তিনি ছিলেন বিলোনিয়া সীমান্তে ফেনীতে। সেখানে কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি তার বাহিনী। বরং সাধারণ মানুষের আতিথেয়তা পেয়েছিলেন তারা। চট্টগ্রামেও তিনি থেকেছেন। সেখানে তৎকালীন ইপিআর বাহিনীর এক পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তাকে বাঙালিরা হত্যা করে। এ ঘটনার পর বাঙালি কর্মকর্তারা প্রায় সবাই পালিয়ে যান। কিন্তু তাদের অধিকাংশের পরিবার-পরিজনকে তখনও পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারেননি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি কর্মকর্তা ও সৈনিকদের পরিবার-পরিজনকে শিশুসহ লাইনে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। 'একটি বাহিনীর কর্মকর্তা ও সিপাহিদের পরিবার-পরিজনকে এভাবে হত্যা করার ঘটনা আমার হৃদয়কে আলোড়িত করে। এ ঘটনা আমার মনে স্থায়ী দাগ ফেলে দেয়।' পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরতার বিবরণ দিতে গিয়ে সুদীর্ঘকাল পরও তিনি বারবার বিমর্ষ হয়ে পড়ছিলেন। অনেক সতীর্থ সেনা কর্মকর্তা কীভাবে বাঙালিদের হত্যা করতেন, তার বিবরণ দিতেন। তার দম বন্ধ হয়ে আসত এসব বর্বরোচিত ঘটনার বিবরণ শুনে। অনেক সময় সেনা কর্মকর্তা, এমনকি সিপাহিরা পর্যন্ত বাঙালিদের এক সারিতে দাঁড় করিয়ে এক গুলিতে কতজন মারা যায় তার প্র্যাকটিস করতেন। আসলে বাঙালি নিধনটা ছিল পাকিস্তানি অনেক সেনা কর্মকর্তার কাছে খেলার মতো। অনেক সময় সাধারণ মানুষকে দৌড় দিতে বলে লম্বা একটি দলের ওপর নির্বিচার গুলি চালানো হতো। একবার একদল লোককে ধরে এনে সারি করে দাঁড় করিয়ে তাদের ওপর নির্বিচার গুলি চালানো হয়েছিল। সবাই মরে গেছে মনে করে গুলিবর্ষণকারী বাহিনীর সদস্যরা চলে গেলে দেখা যায় এদের মধ্যে ভাগ্যক্রমে দু'জন বেঁচে আছেন। ওই দু'জনকে তিনি মুক্তি দেন বলে উল্লেখ করেন। মাসকারেনহাস তৎকালে বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালানোর যে বিবরণ তুলে ধরেন তা যথার্থ বলে পাকিস্তানি এ কমান্ডো স্বীকার করেন।

যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতি সংক্ষেপে তুলে ধরতে গিয়ে তার স্মৃতির মণিকোঠায় ভেসে ওঠে অনেক অশ্রুত ঘটনা। বাঙালিরা এক পর্যায়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চলে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ষাটের দশকের প্রথম দিকে তার সঙ্গী অনেক বাঙালি সামরিক কর্মকর্তার মধ্যেই তিনি পাঞ্জাবি বা পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা অবনমনের জ্বালা দেখেছেন। জিয়া, খালেদ মোশাররফ, তাহের, জিয়া উদ্দিন এক সময় তার সতীর্থ ছিলেন বলে উল্লেখ করেন কর্নেল নাদির আলী। তখন বাঙালি অফিসাররা একজন অন্যজনকে জেনারেল বলত। নাদির আলী এবং তার সহকর্মীরা তখন এটাকে তামাশা বলেই মনে করতেন। আসলে এটা যে তামাশা ছিল না, বাঙালি কর্মকর্তাদের মনের লালিত ক্ষোভের প্রকাশ ছিল, সেটা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে।

সিমলা চুক্তির মধ্য দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের জেলে আটক থাকা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণকারী সদস্যদের পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়ার সময় যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের পাকিস্তান বিচার করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও তাদের বিচার কেন সম্পন্ন করা হলো না সে ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, '৭১ সালের পর পাকিস্তানের ক্ষমতায় ভুট্টো এলেও মূলত তখনও প্রকৃত ক্ষমতার মালিক ছিল সেনাবাহিনী। তারা কি তাদের বাহিনীর অপকর্মের বিচার করবে? তদুপরি সাধারণ পাকিস্তানিদের মধ্যে বাংলাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো বা গণহত্যা চালানোর জন্য সেনাসদস্যদের বিচারের দাবি জোরদার হয়নি কখনও। প্রায় গোটা পাকিস্তানই এ ব্যাপারে নিশ্চুপ ছিল।পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত করতে গেলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সদস্যদের বিচারের বিষয়টি সামনে আসবে উল্লেখ করায় সাবেক কমান্ডো কর্নেল এ ব্যাপারে সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, অভিযুক্ত অনেকেই এখন মৃত। এ ব্যাপারে বিস্তারিত তার জানা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে তিনি সে সময়ের ঘটনাবলির জন্য পাকিস্তান সরকারের আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করেন। এ অঞ্চলের শান্তি ও উন্নতির জন্য এক সময় একই রাষ্ট্রের অধীন এবং পরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতকে একসঙ্গে কাজ করা উচিত বলে বলে মনে করেন তিনি। সবশেষে তিনি বাংলাদেশের শুভ কামনা করে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট