This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Liberation War of Bangladesh and Genocide of Innocent Bengali People in 1971.
More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

The Exeter South Asia Centre of the College of Humanities of the University of Exeter listed ‘Muktijuddho e-Archive’ as a source for Research materials.
The University of Exeter is a public research university located in Exeter, Devon, South West England, United Kingdom. 
This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

আমার কাঁধে পতাকা ছিল

আমার কাঁধে পতাকা ছিল




হ্যালোঃ কেমন আছেন ?
মহিব উল ইসলাম ইদুঃ এই তো ভালো। তুমি ভালো আছ?
হ্যালোঃ জ্বি আমিও ভালো যেদিন আমাদের জাতীয় পতাকা প্রথম উত্তোলিত হলো ঠিক সেদিন থেকে গল্প শুনতে চাই। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আপনার ভাবনাও শুনব।
মহিব উল ইসলাম ইদুঃ ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ, রেডিওতে খেলার ধারা বিবরণী চলছিল। হঠাৎ করে আনুমানিক বেলা ১১টা ১২ টার দিকে তা বন্ধ হয়ে গেল। এরপর ঘোষণা দেওয়া হলো যে, প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দিয়েছেন। ঐ ঘোষণায় আরও বলা হয়, আগামিকাল থেকে তথাকথিত পতাকা নিষিদ্ধ করা হলো এবং এই পতাকা বহনকারীকে দেখামাত্রই গুলি এবং যে ভবনে পতাকা উড়তে দেখা যাবে সেই ভবন ও তার আশেপাশের ১০০ গজ উড়িয়ে দেওয়া হবে।
অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বাণীতে তাৎক্ষণিক সাংবাদিক সম্মেলন ডাকেন। সেখান থেকে বেরিয়ে জনগণের উদ্দেশ্যে কথা বলেন তিনি। সেখানে আমরা ছাত্রলীগ কর্মীরা সবাই ছিলাম। সেখানে বঙ্গবন্ধু সবাইকে বলেন, “পাকিস্তানিরা আমাদের ক্ষমতা দিবে না। আমাদের কাজ আমাদেরই করতে হবে।”
চলতে থাকে স্লোগান, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।
বঙ্গবন্ধু বললেন, “থাম.. থাম.. আমি এখনি তোমাদের কিছু বলব না, তোমরা প্রস্তুতি গ্রহণ কর।
“আমি যা বলার ৭ মার্চ রেসকোর্সে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বলব।”
এরপর বিকেল ৩ টায় পল্টনে জনসভা। ওখানে যাব এবং দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য আমরা ফকিরাপুলে ‘হোটেল বাদশায়’ গেলাম। ঐ হোটেলে গিয়েই দেখা হলো আমার বন্ধু তৎকালীন ঢাকা নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ জাহিদ হোসেনের সঙ্গে।
খাওয়া শেষে মিটিংয়ে আসলাম, সেখান থেকে তৎকালীন ইকবাল হলে (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) গেলাম। ওখানে গিয়ে আমরা নিচে অবস্থান করি আর হাতে পোস্টার লেখা শুরু করি। জাহিদকে উপরে ডেকে নেওয়া হলো। ওখানে ছাত্রলীগের নিওক্লিয়াসের (উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি) মিটিং চলছিলো। এক ঘণ্টা পর জাহিদ নেমে আসল এবং আমাকে বলল, “চল আমাদের একটু যেতে হবে।”
তখন ছাত্রলীগের প্রধান কার্যালয় ছিল বলাকা ভবনের দু’তলায়, তো সেখানে গেলাম। যাওয়ার পর ছাত্র নেতা প্রয়াত রুমি ভাইকে পেলাম। উনি চা খাওয়ালেন এবং খবরের কাগজ মোড়ানো একটা প্যাকেট জাহিদের হাতে ধরিয়ে দিলেন। ঢাকায় মানুষ সেদিন স্বঃতস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমেছিল। মৌচাক পর্যন্ত আসলাম, দেখলাম লোকে লোকারণ্য হয়ে আছে। সেখানে ছাত্রলীগের অনেক নেতাই ছিলেন। আমি ও জাহিদ পাকিস্তানের পতাকা পোড়ালাম। জাহিদ সেখানে সমবেত মানুষের উদ্দেশ্য বলল, “আমি একটা ঘোষণা করতে চাই, আমাদের এই প্রাণ প্রিয় পতাকা নিষিদ্ধের প্রতিবাদে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আগামিকাল সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে এক বিক্ষোভ ও ছাত্র গণজামায়েতের আয়োজন করেছে।”
বলে রাখি, সেদিন রাতেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। বাসায় ফেরার সময় জাহিদ বলল, “ দোস্ত, আমার উপর একটা গুরু দায়িত্ব পড়েছে। আগামিকালের মিছিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র গণজমায়েতে এটা (কাগজে মোড়া প্যাকেটটা দেখিয়ে বলল) নিয়ে যেতে হবে। তুই কি আমার সাথে থাকবি?”
২১-২২ বছরের তরুণ আমি। রাজি হয়ে গেলাম। কবি বলেছেন না, ‘যৌবন যার, যুদ্ধে যাওয়ার সময় তার’ বিষয়টা এমন ছিল। জাহিদ সেই প্যাকেটটা দিল আমার কাছে। বলল, “আজ তুই রাখ। কাল সকালে আমাদের নিয়ে যেতে হবে।”
রাতে তো এক্সাইটমেন্টের কারণে ঘুমই হয়নি। পতাকাটা আমি ও আমার ছোটবোন খুলে দেখলাম। আমার বোনও ইকবাল হলের ছাত্রলীগের কর্মী ছিল। পতাকাটা দেখে তো বেশ আনন্দ পাচ্ছিলাম। রাতটা পার করলাম।
হ্যালোঃ পরের দিন ২রা মার্চ। অর্থাৎ সেই ঐতিহাসিক দিন। একদম সকাল বেলা থেকে শুনতে চাই।
মহিব উল ইসলাম ইদুঃ সকালে ওঠে নাস্তাটা খেয়েই ৮টার দিকে বেরিয়ে গেলাম। মালিবাগ গুলবাগে রেললাইনের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। জাহিদও সেখানে আসল। তখনতো বাঁশের লাঠি দিয়ে দোকানের ঝাপ উঠানো থাকত। ওখান থেকে একটা লাঠি নিয়ে পতাকাটা বাঁধলাম। এরই মধ্যে হাজার হাজার মানুষ পতাকা দেখেই আমাদের ঘিরে ফেলেছে। ডাকতে হয়নি কাউকে। চারিদিকে স্লোগান শুরু হয়ে গেল, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা।’
জাহিদ নগরের সাধারণ সম্পাদক আর আমি কর্মী। তাই আমি পতাকাটা বহন করে নিয়ে যাচ্ছি। আর জাহিদ স্লোগান দিচ্ছে, কাউসারসহ আরও অনেকে দিচ্ছে। রামপুরা রোড ধরে সিদ্ধেশ্বরী হয়ে আমরা যাচ্ছি। বর্তমান রাষ্ট্রীয় অতিথী ভবন ‘সুগন্ধা’ থেকে ৪০০-৫০০ গজ দূর থেকে দেখলাম যে, কিছু পাকিস্তানি সোলজার আমাদের দিকে রাইফেল তাক করে আছে। পিছনে তাকিয়ে দেখি মানুষ আর মানুষ। আবার সামনে তাকিয়ে দেখলাম অফিসার টাইপের একজন আর্মি আমাদের যাওয়ার জন্য হাতের রুমাল দিয়ে ইশারা দিলেন। আর যারা পথ আটকিয়েছিল তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিল। তখন মাথায় কাজ করছিল দেখা মাত্র গুলি করা হবে, যদি এখন করে দেয়! আমরা একটু ভড়কে গেলাম। তবে স্রোত ঠেলে পেছনে ফেরারও সুযোগ নাই। জনজোয়ার দেখে সাহস দ্বিগুণ বেড়ে গেল। তখন আমি স্লোগান ধরলাম, ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশে স্বাধীন কর।’
আমার কাঁধে পতাকাটা। নব উদ্যোমে রমনা পার্কের ভেতর দিয়ে রেসকোর্স হয়ে টিএসসির সামনে গিয়ে পৌঁছলাম। নিষিদ্ধের কারণে ওখানে সমবেত কারো হাতে কোনো পতাকা ছিল না। চারদিক লোকে লোকারণ্য। মিছিল নিয়ে ভেতরে ঢোকা সম্ভব হয়নি বিধায় জাহিদ ও আমাকে লোকজন একটু একটু করে রাস্তা পরিষ্কার করে দিল। আমরা দুজন কলাভবনে বানানো মঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছলাম। সেই মঞ্চে ঢাকায় অবস্থানরত সব ছাত্র সংগঠনের ছাত্র নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করছিলেন তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আ স ম আব্দুর রব। জাহিদ আমার কাছ থেকে পতাকাটা নিল। সে সামরিক কায়দায় রব ভাইয়ের হাতে পতাকাটা তুলে দিল। আমার কাছে মনে হলো, আমি বড় একটা কাজ করে ফেলেছি, হিমালয় জয় করেছি। তখন স্লোগান স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠলো চারপাশ। সবাইকে স্লোগানে স্লোগানে থামিয়ে রব ভাই বললেন, ‘পাকিস্তানিরা আমাদের ক্ষমতা দেবে না, বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়ে দিয়েছেন আমাদের কাজ আমাদেরই করতে হবে। আমাদের মুক্তি আমাদেরই ছিনিয়ে আনতে হবে এবং তারা আমাদের প্রাণপ্রিয় জাতীয় পতাকা নিষিদ্ধ করেছে। আজ থেকে এটাই হবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।
হ্যালোঃ  এর পাঁচদিন পর অর্থাৎ ৭ মার্চ রেসেকোর্স ময়দানে কি আপনি ছিলেন ?
মহিব উল ইসলাম ইদুঃ আমি তখন রাজারবাগ ইউনিওনের সাংগঠনিক সম্পাদক। ৭ মার্চের ঐ মঞ্চ তৈরির জন্য একটা বিশেষ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী নিযোগ করা হয়েছিল। সেন্ট্রাল কমিটি থেকে সম্ভবত ৩০ ও মহানগর থেকে ২০ জন সেই বাহিনীতে নেওয়া হয়। ঢাকা মহানগর আওয়ামিলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক গাজী গোলাম মুস্তফা ভাই মহানগরের ২০ জনের মধ্যে তিন নম্বরে আমার নাম লিখেছিলেন। মঞ্চ তৈরি থেকে শুরু করে ৭ মার্চ সভার আগ পর্যন্ত কাজ করেছি সেখানে। সারাদিন রেসকোর্সে পড়ে থাকতাম। ৬ মার্চ সারা রাত ছিলাম। ৭ তারিখ বঙ্গবন্ধু যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন তখন আমরা মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়েছিলাম। সেখান থেকে ভাষণ শুনছিলাম।
হ্যালোঃ সেই মুহুর্তে আপনারা কি টের পেয়েছিলেন যে ২৫ তারিখ রাতে কিছু ঘটতে যাচ্ছে?
মহিব উল ইসলাম ইদুঃ না আমরা বুঝিনি। তবে একটা কানাঘুষা চলছিল যে আজকেই হামলাটা হয়ে যেতে পারে। জনসভার উপর দিয়ে একটা হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছিল। সম্ভবত পাকিস্তান আর্মিরা ছবি নিচ্ছিল। জনগণ একটু আতঙ্কিত হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ঐ জনসভায় সবাই একটা করে লাঠি হাতে নিয়েই এসেছিল। জনজোয়ারের উত্তাল ঢেউ তখন রেসকোর্সে বইতে থাকে। ভয়কে সেখানেও হার মানতে হয়েছিল।
হ্যালোঃ আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সেই গল্পটা শুনতে চাই।
মহিব উল ইসলাম ইদুঃ রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আমি একজন প্রথম প্রতিরোধ যোদ্ধা। যেহেতু আমি রাজারবাগ ইউনিয়ন আওয়ামিলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম সেহেতু রাজারবাগ পুলিশ লাইন আমাদের অধীনে ছিল। ঐ সময় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পাড়ায় মহল্লায় সংগ্রাম কমিটি গঠন করেছিলাম। কোদাল, শাবল, গাইতি ইত্যাদি নিয়েই শত্রু মোকাবেলা করতে আমরা প্রস্তুত ছিলাম। ছাত্রলীগ থেকে ঢাকায় পাঁচটা ঠিকানা ঠিক করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনীরা বাঙালির উপর হামলা করলে আমরা যেন নিজেরা নিজেরা ঐ পাঁচ ঠিকানায় একত্রিত হই। তো আমার ৩৫৫/১ মালিবাগ গুলবাগের বাসাটা একটা ঠিকানা ছিল। সবার সাথে আমিও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। পাক সেনাদের হঁটাতে গুলি চালাই। চলতে থাকল স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ।
হ্যালোঃ মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে কিছু বলুন। কিভাবে কি করতেন?
মহিব উল ইসলাম ইদুঃ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের থেকে আামাদেরটা ছিল একটু উচ্চতর ট্রেনিং। আমাদের বলা হতো ‘পলিটিক্যাল মটিভেটেড ফ্রিডম ফাইটার’। আর সে জন্যেই ইন্ডিয়ান সেনারা আমাদের ডাকতো ‘লিডার সাহেবান’ বলে। ডিএলএফ (মুজিব বাহিনী) থেকে আমরা ট্রেনিং নিতাম। এটা গড়ে তোলা হয়েছিল ভারতের বেরাদুন জেলার টান্ডুয়া, চাকরাতা সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। ডিএলএফের চারজন প্রধান ছিলেন। তৎকালীন ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ এবং প্রয়াত শেখ ফজলুল হক মনি। প্রধান প্র্রশিক্ষক ছিলেন বর্তমান তথ্যমন্ত্রী ও তৎকালীন ছাত্রনেতা হাসানুল হক ইনু ভাই। সকাল দুপুর ট্রেনিং হতো, সন্ধ্যায় আবার পলিটিক্যাল ক্লাস হতো। আমাদের শেখানো হতো কিভাবে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করব মুক্তিযুদ্ধে আসার জন্য। শুনতে পাচ্ছিলাম মায়ার টানে অনেক বাবা মা সন্তানকে আসতে দিচ্ছেন না। আমরা মানুষকে বোঝাতাম। আমি এপ্রিল থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত কলকাতা থেকে বিভিন্ন শরনার্থী শিবিরে যেতাম। যুবকদের ট্রেনিংয়ে নিয়ে আসার জন্য অনুপ্রাণিত করতাম। সকালে যেতাম বিকেলে কলকাতায় ফিরতাম।
হ্যালোঃ তখন ভারতে যাতায়াত করতেন কিভাবে?
মহিব উল ইসলাম ইদুঃ ট্রেনে যাতায়াত করতাম। অনেকের সঙ্গে আমিও বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম সহায়ক কমিটি থেকে একটা পাস পেয়েছিলাম। সেটা দিয়ে ভারত যাতায়াতের জন্য সরকারি বাস ও ট্রেন ফ্রি ছিল।
হ্যালোঃ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার অন্তরঙ্গতার কথা শুনব এবং বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আপনাদের অবস্থার কথা শুনব। তার আগে আপনার ব্যক্তিগত জীবনের কথা জানতে চাই। জন্ম, শৈশব-কৈশোর, পড়াশোনা অর্থাৎ বায়োগ্রাফিটা যদি ছোট্ট করে একটু বলেন।
মহিব উল ইসলাম ইদুঃ আমার জন্ম পহেলা মে ১৯৫০ সালে। আমার বাবা মোহাম্মদ সিদ্দিক। তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। যদিও এক পর্যায়ে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। মায়ের নাম উম্মে সালমা। মনে না পড়া শৈশবটা কেটেছে লালবাগে। আর ৭ বছর বয়সে আমরা মালিবাগের গুলবাগে চলে আসি। সিদ্ধেশ্বরী স্কুল ও কলেজেই আমি মেট্রিক, ইন্টার শেষ করি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। টার্গেট মতো পড়তে না পারায় আবার সিদ্বেশ্বরী কলেজ থেকে বিএপাশ করি। ১৯৬৬ সালে মেট্রিক পাশ করি, ১৯৬৯ সালে ইন্টার আর বিএ শেষ করি ১৯৭৪ সালে। সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ করার জন্য পড়াশোনায় গ্যাপ হয়।
হ্যালোঃ প্রথম পতাকা বহনকারী হিসেবে আপনাকে রাষ্ট্রীয় বা দলীয়ভাবে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে কি ?
মহিব উল ইসলাম ইদুঃ না। আমি রাষ্ট্রীয়ভাবে এখনও কোনো সম্মান পাইনি। তবে সাংগঠনিক ভাবে ‘মুজিব নগর সরকারী কর্মচারী কল্যাণ সমিতি’ আমাকে বাংলাদেশের পতাকা সর্বপ্রথম বহনকারী হিসেবে সম্মানিত করেছে। সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথী হিসেবে বি চৌধুরী ছিলেন আর ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র হানিফ ভাই ও ড. আনিসুজ্জামান বিশেষ অতিথী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তারাই আমাকে প্রথম সম্মানিত করেন। এরপর প্রজন্ম ঢাকা ও আমাদের মালিবাগ নামক সংগঠনও আমাকে সম্মানিত করেছে।    
হ্যালোঃ বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচয়টা কেমন ছিল আপনার?
মহিব উল ইসলাম ইদুঃ বঙ্গবন্ধু আমাকে ১৯৬৫ সাল থেকে চিনতেন। মালিবাগে রাজারবাগ ইউনিয়ন আওয়ামিলীগের কাউন্সিলে এসে বঙ্গবন্ধু আমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে দিয়ে যান। তখন থেকে রাজনীতিতে নিয়মিত হয়ে যাই আমি। বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা দিলেন তখন আমাদের একটা কাজ ছিল। ছয় দফার লিফলেট গোপনে মানুষের বাসায় বিলি করা ও এর পক্ষে সাক্ষর সংগ্রহ করা। এ নিয়ে আমি একবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলাম, যদিও এদিনই রমনা থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু আমাকে তুই করেই ডাকতেন। আমি উনার বাসায় যেতাম। উনি চুল টেনে দিয়ে বলতেন কিরে কেমন আছিস? এগুলো এখনও হৃদয়ে গেঁথে আছে। ৭০’র নির্বাচনে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তৎকালীন ২১ টা জেলার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমি ৮/১০টা জেলায় নির্বাচনী প্রচারণার কাজে গিয়েছি।
হ্যালোঃ বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর কিভাবে পেলেন? পরিস্থিতি তখন কেমন হয়েছিল?
মহিব উল ইসলাম ইদুঃ ১৫ অগাস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা প্রোগ্রামে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিত থাকার কথা ছিল। আগের দিন সন্ধ্যার পর ওই এলাকায় ককটেল ফাটানো হয়। গাজি গোলাম মোস্তফা ভাইয়ের সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম ঘটনাস্থলে। বঙ্গবন্ধুর ছেলে শেখ কামাল ও ছেলে বউ সুলতানার সাথে দেখা হয় সেখানে। তখন রাত আনুমানিক প্রায় ১১টার মতো বাজে। শেখ কামালের শ্বশুর বাড়ি ছিল বকশিবাজারে। গাজি ভাই একটু মজা করেই বললেন এতো রাতে তোমাদের আর বাসায় যাওয়ার দরকার কি? শ্বশুর বাড়ি চলে যাও।
শেখ কামাল বলল, “না! সারাদিন খাটাখাটুনির পর বাসায় যাই। কালকে আব্বা আসবেন, যাই ফ্রেশ ট্রেশ হতে হবে, বাসায় যাই।”
আমিও সেখান থেকে বাসায় চলে আসি। ভোরবেলা আমার ছোট বোন ডেকে বলল ভাইয়া তাড়াতাড়ি ওঠো, “বঙ্গবন্ধুরে মাইরা ফালাইছে।”
ঘুম থেকে ডাকলে আমি একটু রাগারাগি করতাম সবসময়ই। তো ঐদিনও রেগে গিয়ে বললাম, ধুরর! একটু ঘুমাতে দে তো।
এর মধ্যে আব্বা এসে বলার পর তখন জেগে উঠলাম। রেডিওতেও শুনলাম কুখ্যাত মেজর ডালিমের কণ্ঠ। আব্বা বললেন, “বাসায় থেক না।”
তখন আমি বেরিয়ে গেলাম। হাঁটতে হাঁটতে মালিবাগ বাগান বাড়ি পর্যন্ত চলে গেলাম। দেখলাম লোকেও বলাবলি করছে।
পরিস্থিতি তাৎক্ষণিক উলট পালট হয়ে গেলো। স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তিরা তখনই তৎপরতা শুরু করে দিল। ওরা রাস্তায় নেমে এল। এলাকায় ঘাপটি মেরে থাকারাও বেরিয়ে এল। ভাবতেছিলাম যে, কোন স্থান থেকে প্রতিরোধের ডাক আসুক আমরা সেখানে যাব। আমরা তো ৬৯ সালে পাকিস্তান সামরিক জান্তার কারফিউও ভঙ্গ করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম কেউ আর ডাক দিচ্ছে না। টানা দুই বছর দিনের বেলায় প্রকাশ্যে থাকতাম তবে রাতে বাড়ি থাকতাম না ভয়ে। প্রথম ছয় মাস ঢাকার বাইরে আত্মগোপনে ছিলাম। মনে হলো বিপক্ষ শক্তিরাই আবার ক্ষমতা নিয়ে নিল। কার জন্য এই মুক্তিযুদ্ধ করলাম। তখন মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতাম না ভয়ে। সম্মানের বিষয়টি তো ছিলই না। দিন দিন নিরাশ হয়ে যেতে থাকলাম।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট