This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Bangladesh Liberation War, Genocide of Innocent Bengali People in 1971 and contemporary political events of Bangladesh.
More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

The Exeter South Asia Centre of the College of Humanities of the University of Exeter listed ‘Muktijuddho e-Archive’ as a source for Research materials.
The University of Exeter is a public research university located in Exeter, Devon, South West England, United Kingdom. 
This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

জিয়াউর রহমান সেক্টর কমান্ডার ছিলেন না - হারুন হাবীব

জিয়াউর রহমান সেক্টর কমান্ডার ছিলেন না

হারুন হাবীব



মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য প্রামাণ্যচিত্র জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইডে’র শুরুতে চোখে পড়ে একটি টাইপরাইটার একের পর লিখে যাচ্ছে। ডেডলাইন ঢাকা, ডেডলাইন হেনয়। এই সেই টাইপরাইটার যা দিয়ে লেখা হয়েছিল ভারতের আগরতলায় আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের স্বাক্ষর করা প্রথম সেই যুক্ত বিবৃতি, ‘স্টপ দিস জেনোসাইড’, যা সারা বিশ্বে প্রচারিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে। ইতিহাসের সাক্ষী ক্ষয়ে যাওয়া সেই টাইপরাইটারটি জায়গা করে নিয়েছে ঘরের এক কোণায়। বসার ঘরটি জুড়েই মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ কিছু স্থিরচিত্র। ইট-পাথরের দেয়াল বছরে পর বছর এগুলো আগলে রেখেছে ক্লান্তহীন। মিরপুরের সাংবাদিক আবাসনের এই বাসাটি একজন মুক্তিযোদ্ধার, যিনি একই সঙ্গে একজন সাংবাদিক ও লেখক।

একাত্তর তা আজ থেকে প্রায় বছর ৪৪ আগের কথা। তখন তথ্যপ্রযুক্তি যে সহজলভ্য ছিল না, এ কথা অজানা নয়। যেটুকু ছিল তা দিয়েই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মুহূর্তগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন মুক্তিযোদ্ধা লেখক, সাংবাদিক হারুন হাবীব। ক্যামেরায় অসংখ্য ছবি তুলেছেন। এর মধ্যে হয়ত শখানেক জায়গা পেয়েছে দেয়ালে লেপ্টে থাকা স্মৃতির অ্যালবামে। নষ্ট হয়ে গেছে অনেক ছবি। পশ্চিম দেয়ালের অর্ধেকটা জুড়ে লাল-সবুজের নিশানের মাঝখানে খচিত বাংলাদেশের মানচিত্রটি দেখলে সহজেই মনে পড়ে একাত্তরের কথা। তখন তো এই পতাকার সম্মান রাখতেই লাখ লাখ শিশু, নারী, তরুণ, যুবা, বুড়ো বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে এই মাটি করেছে উর্বর। সম্ভ্রম হারানো মা-বোনের আঁচলের ছোঁয়াতেও খাঁটি হয়েছে এই মাটি। আর এই উর্বর জমিতেই তরতর করে বেড়ে উঠছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতেই ব্যস্ত সময় পার করছেন ‘সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম’-এর এই মহাসচিব। স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলতে ব্যাকুল এই মানুষটির সঙ্গে গত ১৬ জুন কথা হয় তার বাসায় বসে। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর নানা স্মৃতি-বিস্মৃতি। আবেগ মেশানো কথার বাঁকে মুক্তিযুদ্ধের একজন গেরিলা যোদ্ধা ও রণাঙ্গনের সাংবাদিককে আবিষ্কার করা গেছে সহজেই। দেশের জন্য জীবন বিপন্ন করতে দ্বিধাহীন একজন যোদ্ধারও দেখা মিলেছে সেদিন। যুদ্ধ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বিধ্বস্ত বাংলাদেশের চিত্র ফুটে উঠেছে রণাঙ্গনের এই চিত্রগ্রাহকের কথায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা থেকেই বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। স্বাধীনতা বিরোধীদের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার আগে এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার নয়।’ ব্যক্তিজীবনের নানা ধাপের কথাও বলে গেছেন অবলীলায়। কখনো চোখেমুখে বিস্ময়, উন্মাদনা, তারুণ্য আবার কখনো ছলছল চোখ নিঃশব্দে বলে গেছে অনেক কথাই।

দীর্ঘ এই আলাপচারিতায় ছিলেন হাবিবুল্লাহ ফাহাদ।



আপনার শৈশব কেটেছে কোথায়?

জন্মেছি ১৯৪৮ সালে জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার খড়মা গ্রামে। ওখানেই শৈশবের বড় একটি সময় কেটেছে।



আপনার বাবা-মা সম্পর্কে কিছু বলেন?

বাবা তোফাজ্জল হোসেন। তিনি ছিলেন নাটক, সংস্কৃতি জগতের মানুষ। অভিনেতা ও সংগঠকদের একজন। বৃহত্তর ময়মনসিংহে অন্যতম নাট্যাভিনেতাদের মধ্যে বেশ পরিচিত ছিলেন। তবে পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। পরবর্তীতে অবশ্য নাটক ছেড়ে দেন। ইসলামিক জীবনযাপন করেন। জীবনের গতিই পাল্টে যায় তার। মা ফাতেমা খাতুন। স্ত্রী-সন্তান ছাড়া জীবনে আর কিছু ছিল না তার। নানা বাড়িটা আমাদের বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। সে কারণে নানীর সঙ্গে বেশি সময় কাটত আমার। বাবা-মার একমাত্র ছেলে আমি। ছোট দুই বোন আছে। ওরা আমার অনেক ছোট। বাবাও তার বাবা-মার একমাত্র সন্তান ছিলেন। আমাদের বেশ কিছু জমাজমি ছিল। আর্থিক অবস্থা খুব একটা খারাপ ছিল না। তারপরও বাবা যেহেতু সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ ছিলেন, সে অর্থে সংসারি ছিলেন না, সেহেতু আমাদের আর্থিক অবস্থাটা খুব ভালো ছিল ভাববার কোনো কারণ নেই।



পড়াশোনায় হাতেখড়ি হয়েছে কোথায়?

এখনকার দেওয়ানগঞ্জে, যেখানটায় জিলবাংলা সুগার মিল, সে এলাকায়। এটাই আমার শৈশবের এলাকা। এখানকার খড়মা প্রাইমারি স্কুলে প্রথম লেখাপড়া করি। দেওয়ানগঞ্জ কো-অপারেটিভ হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করি। তারপর ১৯৬৫ সালে জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করি। তখন এটি সরকারি কলেজ ছিল না। এখন সরকারি। ঢাকায় আসি ১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে। তখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক আন্দোলন তুঙ্গে।



ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন?

ছাত্র হিসেবে প্রগতিশীল রাজনীতিতে যুক্ত ছিলাম বটে, কিন্তু ছাত্ররাজনীতি বলতে যা বোঝায়, তাতে খুব একটা যুক্ত ছিলাম না কখনো। আমাদের তারুণ্যের সময়টা ছিল রাজনীতি পরিবেষ্টিত। রাজনীতিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত। হয়ত পরিবেশের কারণেই ছাত্ররাজনীতির কর্মকা-ে সক্রিয় হই। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু যখন তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা পেশ করলেন, তার পর থেকে। সে সময় থেকেই পূর্ববঙ্গের রাজনীতিতে তাৎপর্যময় পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আমরাও যুক্ত হই।



স্কুলজীবন থেকেই কমবেশি লেখালেখি করতেন বলে জেনেছি...

স্কুলজীবন থেকেই বলা চলে। লেখালেখিতে হাতেখড়ি সে সময়েই। অনেকটা পারিবারিক ঐতিহ্যগতভাবেই এটা পেয়েছি। বাবা সাংস্কৃতিক জগতের মানুষ ছিলেন, নাটক লিখতেন। মনে আছে স্কুলজীবনে লেখা আমার নাটক নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। যখন জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে পড়ি তখন স্পোর্টস করতাম। ইন্টার-কলেজ সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথমও হয়েছিলাম। ছোট বেলা থেকেই সাঁতারের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক।





নাটক নিয়ে কী আন্দোলন হয়েছিল?

ক্লাস এইট-নাইনের সময়। প্রথম নাটক লেখি। ওটা নিয়ে প্রচ- আন্দোলন হয় এলাকায়। আবুল হোসেন আকন্দ নামে আমাদের স্কুলে একজন ‘রেক্টর’ ছিলেন। এখন এই ‘রেক্টর’ পদবিটি নেই। আমাদের সময় ছিল। সরকার ইচ্ছা করলে কিছু কিছু হেডমাস্টার, যাঁরা শীর্ষ তাদের ‘রেক্টর’ উপাধি দিত। আমাদের ‘রেক্টর’ আবুল হোসেন আকন্দকে ষড়যন্ত্র করে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এটা আমাদের কাছে চরম বেদনাদায়ক ছিল। আমরা চাচ্ছিলাম তিনি থাকুন। এই ঘটনাটাকে কেন্দ্র করে একটা নাটক লিখে ফেললাম। নাটক তো নয়, একটা আন্দোলন। যে করেই হোক ‘রেক্টর’ সাহেবকে রাখতে হবে, ষড়যন্ত্রকারীদের রুখতে হবে। সে আন্দোলন ঠেকাতে গিয়ে পুলিশ আমাদের ওপর অত্যাচার শুরু করে। কারণ প্রতিপক্ষরা সামাজিকভাবে অনেক প্রভাবশালী ছিল। বলা যায়, ওখান থেকেই আমার লেখালেখি জীবন শুরু।





ঢাকায় এসে অনার্সে ভর্তি হয়েছিলেন?

ঢাকায় এলেও ‘অনার্স’ পর্যায়ে পড়া হয়নি আমার। রাজনীতির কারণে এক কলেজ থেকে আরেক কলেজ যেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কায়েদে আযম কলেজ (বর্তমান কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ) থেকে গ্র্যাজুয়েশন করি।



বললেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে পরিবার থেকে কোনো বাধা ছিল?

মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ আমি। কমবেশি সংকট তো হয়েছেই। হয়ত সবার বেলাতেই হয়েছে। তারপরও দেখ, মধ্যবিত্ত নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবার থেকেই কিন্তু রাজনীতিতে মূল লোকগুলো এসেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে তাজউদ্দিন আহমেদসহ যাঁরাই এসেছেন তাঁরা সবাই কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের। অবশ্য এরও আগে পাকিস্তান আমলে রাজনীতির কর্তৃত্ব করেছেন নবাব, জোতদার, জমিদার ও মৌলানারা। কিন্তু বাংলাদেশ আন্দোলনের পক্ষে মাঠে নামা রাজনীতিকরা প্রায় সবাই নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো থেকেই এসেছেন। এরাই রাজপথে আন্দোলন করেছেন, ছাত্ররাজনীতি করেছেন। এরাই ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতিতে এসেছেন। আমার যেটা মনে হয়, প্রগতিশীল বাঙালি রাজনীতিবিদ, যারা ষাটের দশক থেকে রাজনীতিতে আসতে শুরু করেছেন, তারা প্রত্যেকেই নি¤œবিত্ত ও মধ্যেবিত্ত পরিবারের সন্তান।



ঢাকায় আসার আগে কলেজ জীবনে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন?

গ্রামে থাকতে ওভাবে জড়িত ছিলাম না। নাটক, গানবাজনা এগুলোই বেশি করতাম। সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। তবে রাজনীতি সচেতন ছিলাম, বলা যায়।



ঢাকায় এসে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি শুরু করলেন কীভাবে?

ঢাকায় এসে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যাতায়াত শুরু করলাম। যোগাযোগ শুরু হলো। দৈনিক সংবাদ, আজাদ, ইত্তেফাকে মাঝেমধ্যে লিখতাম। পাকিস্তান আমলে মোনায়েম খানদের মালিকানায় ছিল ‘দৈনিক পয়গাম’, সেখানেও কিছু কিছু লিখেছি। সাপ্তাহিক ‘একতা’ পত্রিকা, যেটা কমিউনিস্টদের পত্রিকা ছিল, সেখানেও লেখা ছাপা হয়েছে। কিন্তু আমার সাংবাদিকতার ব্যাপারটা শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের মাঠ থেকে।



মুক্তিযুদ্ধের সাংবাদিকতায় কীভাবে এলেন?

মুজিবনগর সরকার, যা মুক্তিযুদ্ধের নিয়ন্ত্রক শক্তি, তার দুটো মুখপত্র ছিল। একটি ‘জয় বাংলা’ পত্রিকা, অন্যটি ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। দুটোরই আমি ১১ নম্বর সেক্টরের সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ পাই। ফলে যুদ্ধে আমার দুটো কাজ একসঙ্গে করতে হয়েছে। একদিকে সক্রিয় গেরিলা যোদ্ধা অন্যদিকে রণাঙ্গনের সাংবাদিক। কর্নেল আবু তাহের (তখনকার মেজর) ছিলেন আমাদের সেক্টর কমান্ডার, অধিনায়ক।



ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা পেয়েছিলেন কোথায়?

কর্নেল তাহের পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর একটা ‘ইয়াসিকা’ ক্যামেরা ছিল। যখন পরিচয় হলো, জানলেন আমি সাংবাদিকতা করি, তখন তিনি ওটা আমায় দিলেন। এরও আগে অবশ্য আরেকটি ক্যামেরা হাতে আসে। ওটা ছিল ডা. হুমায়ুন হাই সাহেবের। যখন বিভিন্ন গেরিলা অপারেশনে যেতাম তখন সঙ্গে ক্যামেরা থাকত আমার। যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে ছবি তুলতাম। রণাঙ্গন, রণাঙ্গনের সাথীদের ছবি। বলতে পার এই ছবি তোলাটা ছিল একান্তই আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছে। আমি কখনো পেশাদার ক্যামেরাম্যান ছিলাম না, আজও নই। কিন্তু এরপরও ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক রণাঙ্গনের কিছু ছবি তোলার গর্ব নিতে পেরেছি। এটা সত্যিই আমার সৌভাগ্য।



মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়কার ছাত্ররাজনীতির প্রেক্ষাপট কেমন ছিল?

১৯৬২ সালে হামদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয় বলা যায়, সেটা ছিল বাঙালি ছাত্রসমাজের প্রথম সংগঠিত আন্দোলন। এর আগে ১৯৫২ সালে ছাত্র সমাজ ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে। তখন সংগঠিত শক্তি হয় তারা। তার পর দীর্ঘদিন ছাত্রসমাজ তেমন সংগঠিত শক্তি ছিল না। যখন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ তৈরি হয়ে কাজ করতে শুরু করে তখন আবারও সংগঠিত শক্তিতে রূপ নেয় ছাত্রসমাজ। সে সময়ে ছাত্রইউনিয়ন বেড়ে উঠেছিল সমাজ রূপান্তরের আন্দোলনে। এরা সবাই সংগঠিত শক্তি হিসেবে আসে ১৯৬২ সালের আন্দোলনে। নানা ইস্যুতে ছাত্রসমাজের পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের সময় একুশে ফেব্রুয়ারি বা বাঙালি জাতীয়তবাদ নিয়ে বড় একটা আন্দোলন হয়েছিল। ফলে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক যুক্তফ্রন্টের প্রধানমন্ত্রী হলেন। যে মুসলিম লীগ পাকিস্তান জন্ম দিল, দেখা গেল মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ১৯৫৪ সালেই, সে মুসলিম লীগ ধুয়ে মুছে গেল। বলা যায়, বাঙালির জাতীয়তাবাদী জাগরণ ’৫২ সালটা শুরু করে ’৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট আন্দোলন, সরকার গঠন এবং এরপর ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। এটা থমকে দাঁড়ায় ১৯৫৮ সালে যখন আইয়ুব খানের ‘মার্শাল ল’ জারির পর। তখন অবশ্য আন্দোলনের নতুন পর্যায় শুরু হয়।



ছাত্ররাজনীতির গতিপ্রকৃতি কেমন ছিল তখন?

সবসময় লাগাতারভাবে ছিল না। কখনো কম কখনো বেশি। ’৬২, ’৬৬, ’৬৭, ’৬৮, ’৬৯ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে। ’৬৯ সালে এসে তা তীব্র আকার ধারণ করে। তখন সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো চলে আসে। আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলন, অন্যদিকে ছাত্রসমাজের ১১ দফা। এর মধ্যে ’৬৮ সালে শুরু হয় আগরতলার ষড়যন্ত্র মামলা। ছাত্রজনতার আন্দোলন আরো তুঙ্গে উঠে। এসব আন্দোলনে দুটো সংগঠনই মূল ভূমিকা রেখেছে। একটা ছাত্রলীগ অন্যটা ছাত্রইউনিয়ন।



আপনি ওই সময় কোনো নেতৃত্বস্থানে ছিলেন?

না, আমি কোনো নেতা ছিলাম না, ছিলাম কর্মী। একজন সাধারণ ও সক্রিয় কর্মী। তৎকালীন রাজনীতিটা ভালো লাগত এই কারণে যে, সেটা ছিল আমাদের অস্তিত্বের সংকট। পাকিস্তানিরা যেভাবে শাসন করছিল, শোষণ করছিল, আমার ওই বয়সে মনে হয়েছিল, এসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে; পড়ালেখার আগে নিজেদের ঘর সামলাতে হবে, বাঙালির অস্তিত্বের সম্মান রক্ষা করতে হবে।



কেন মনে হয়েছে অস্তিত্ব সংকটে আছেন?

পাকিস্তান আমলে সরকারি চাকরিতে মিলিটারি, সিভিল প্রশাসন, পুলিশ, কোথাও বাঙালিদের তেমন স্থান ছিল না। সে বয়সেই বুঝেছিলাম পাকিস্তান নামক দেশটার ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ নাগরিক আমরা। পূর্ব পাকিস্তান যেন পশ্চিম পাকিস্তানের একটা উপনিবেশ। আমাদের এখানে পাট হতো, পাটের মূল অর্থ চলে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। কর্ণফুলি পেপার মিলে কাগজ তৈরি হতো, চলে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। ওখান থেকে কাগজ বিতরণ হতো। আমাদের এতগুলো পাটকল সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। পূর্ব পাকিস্তান দেশীয় প্রবৃত্তিতে এত কিছু দিত কিন্তু পেত না কিছুই। কাজেই আমাদের কাছে ছাত্ররাজনীতিটা ছিল অস্তিত্বের রাজনীতি, একটা অপরিহার্য আন্দোলন। এতে সর্বস্তরের মানুষের একটা ন্যায্য সমর্থন ছিল।



মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার পেছনে কী ধরনের অনুপ্রেরণা ছিল?

মুক্তিযুদ্ধে যাওয়াটা, জাতীয় স্বাধীনতার রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়াটা মোটেও কাকতালীয় ব্যাপার নয়। আমার মতো অসংখ্য তরুণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। যুবা-তারুণ্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত, কিংবা বিভিন্ন কলেজ-স্কুলে পড়ত, এমন কি যারা ছিল গ্রামগঞ্জের সাধারণ তারুণ্য, চাকরিজীবী-খেটেখাওয়া মানুষ, তারাও দেশের জন্য অস্ত্র ধরেছে। এটা ছিল দেশপ্রেমের অঙ্গীকার।



পাকিস্তান সরকার তো বঙ্গবন্ধুকে ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসাতে চেয়েছিল?

যদিও আইয়ুব খানের সরকার আটঘাট বেঁধেই বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝোলাতে চাইছিল, কিন্তু তারা তা পারেনি। তারা এই ষড়যন্ত্রটাকে মাথায় রেখেই মামলাটা সাজিয়েছিল যে, শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করতে চাইছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ছাত্রসমাজ, সাধারণ মানুষ ও শ্রমিকসমাজ সোচ্চার ছিল। তখন রাজনীতিতে শ্রমিক সমাজের একটা বড় অংশগ্রহণ ছিল। যেটা এখন নেই। টঙ্গি, খালিশপুর, খুলনা, ডেমরা, আদমজি এগুলো ছিল তখনকার আন্দোলনের অন্যতম মূল ঘাঁটি। ঢাকা শহরে যত বড় বড় আন্দোলন হতো, শ্রমিকরা চলে আসত। ছাত্ররা তো ছিলই। কাজেই আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। ছাত্রজনতার সম্মিলিত এই শক্তি পাকিস্তান সরকারের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র ট্রাইব্যুনালের প্রধান বিচারপতির বাসস্থান পুড়িয়ে দেওয়া হয়, দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার অফিসে আগুন দেওয়া হয়, গোটা দেশে পাকিস্তানবিরোধী গণবিস্ফোরণ ঘটে। ফলে প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ইয়াহিয়া খানকে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে তিনি সটকে পড়েন। নতুন জেনারেল ইয়াহিয়া খান এসে পরিস্থিতি সামলাতে পারেননি। অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তান।



পাকিস্তান সরকার তখন কী বলে আশ্বস্ত করল?

উপায় না দেখে তারা পরের বছরে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিল। অবিভক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরে প্রথম সাধারণ নির্বাচন হলো ১৯৭০ সালে। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক তখন নতুন করে আন্দোলনে যুক্ত হলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন রাজনীতির মূল কা-ারি, তিনি যেভাবে নির্দেশ দিচ্ছেন সেভাবেই মানুষ চলছে। ফলে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করল। কিন্তু পাকিস্তানি জান্তাদের ষড়যন্ত্র শেষ হলো না।



পরে তো আন্দোলন আরও চাঙ্গা হয়েছিল...

আন্দোলনটা আরেক দফা তুঙ্গে ওঠে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ। জাতীয় সংসদের নির্ধারিত অধিবেশন বাতিলের ঘোষণা করার ফলে। সেনা-প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আকস্মিকভাবে অধিবেশন বাতিলের ঘোষণা দিলেন। আমার মনে পড়ে, সেদিন ঢাকা স্টেডিয়ামে একটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চলছিল। আমি নিজেও খেলার দর্শক ছিলাম। ইয়াহিয়া খানের আকস্মিক বেতার ভাষণ শোনার সঙ্গে সঙ্গে শত শত মানুষ জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে এলো। খেলা বন্ধ হয়ে গেল। এরপর মিছিল চলল। রোড ব্লকেড তৈরি হলো। স্লোগান চললÑ ‘পিন্ডি না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা।’ ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’



নির্বাচনী রায়ে বঙ্গবন্ধুর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল, বাধা কোথায় ছিল?

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। স্বভাবতই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হবেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তা হতে দিল না ওরা। যেভাবেই হোক ছয় দফার ভিত্তিতে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র ওরা তৈরি করতে দেবে না।



৭ মার্চের ভাষণ কি এর পরেই?

জানুয়ারির ৩ তারিখ রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের এমপি ও এমএলএদের শপথ গ্রহণ করালেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্যেই জানালেন, ছয় দফা নিয়ে কোনো ধরনের ‘কমপ্রোমাইজ’ করা হবে না। এ সময়ে দেশের নানা জায়গায় গুলি চলতে থাকল। যেখানে মিছিল হয় সেখানে গুলি হয়। ফার্মগেট এলাকাতেও গুলি চলল। খালিশপুর ও আদমজিতে অনেক লোক মারা গেল। এরপর বঙ্গবন্ধু ১৯১৭ সালের ৭ মার্চ তার ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন রমনার রেস কোর্সে।



৭ মার্চের ভাষণের সময় আপনি কি রেসকোর্স ময়দানে ছিলেন?

অবশ্যই। সেদিন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একটি দল মঞ্চের কাছাকাছি ছিলাম। ‘জয়বাংলা বাহিনী’ মঞ্চের চারদিক ঘেরাও করেছিল। ৭ মার্চ সকাল থেকে আমরা বসে আছি রমনা রেস কোর্সে। বলা হয়, দশ লাখ লোকের জমায়েত হয়েছিল। আমি যতটা দেখেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকাটা পুরো ভরে গেছে; রেসকোর্স পুরোটা ঠাসাঠাসি, শাহবাগ, প্রেসক্লাস, কার্জন হলের রাস্তা ভরা। লোকসমাগম ১০ লাখেরও বেশি হবে। বঙ্গবন্ধু এলেন বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে। তার চেহারা ছিল বিমর্ষ, দেখে ক্ষুব্ধ মনে হচ্ছিল। উনি এসেই তার বক্তব্য শুরু করলেন।



মুক্তিবাহিনীর উপ-প্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার (অব.) তার লেখা ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ বইটিতে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ শেষে ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন। আপনি সেদিন রেসকোর্সে ছিলেন। আসলেই কি বঙ্গবন্ধু তাই বলেছিলেন?

এ কে খন্দকারকে আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি। কিন্তু তার এই বক্তব্যের ইতিহাস সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে আমি বাধ্য। ৭ মার্চ আমি রমনা রেসকোর্সের ঐতিহাসিক মঞ্চের কাছে ছিলাম। ওইদিন কম করে হলেও রেসকোর্স থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, কার্জন হল এবং প্রেসক্লাব এলাকায় সব মিলিয়ে ১০ লাখ লোক সমাগম হয়েছিল। অবাক করার মতো ব্যাপার যে, তারা কেউ যা শুনলেন না, শুনলেন কেবল জনাব এ. কে. খন্দকার, যিনি তখনও পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন অফিসার! এই ধরনের দাবি ইতিহাসের ভয়ংকর অপলাপ, এর সঙ্গে ইতিহাস সততার বিন্দুমাত্র মিল নেই।

মনে আছে, পরের দিন রেডিওতে প্রচার হওয়া ভাষণের কথাও। বাংলাদেশসহ বিশ্বের মানুষ শুনেছে। আমার বিশ্বাস, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর এ রকম একটি চরম বিভ্রান্তিকর দাবি তুলে খন্দকার সাহেব গণমানুষের ‘কালেকটিভ মেমোরি’ বা সম্মিলিত স্মৃতিতে আঘাত করেছেন। এ রকম উদ্ভট কথা কেন ছাপা হলো, কী বিবেচনায় ছাপা হলো, তা বইটির প্রকাশকই ভালো বলতে পারবেন।

৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে তা জনাব এ কে খন্দকার বিশ্বাস করেন না। এটা বলে তিনি আসলে কী বোঝাতে চাইছেন? কিছু কিছু ব্যক্তিগত মত এড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু এ কে খন্দকার তো কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন। কাজেই বিষয়টি আমাকে ভাবায়। বইটি এমন এক সময় প্রকাশ পেয়েছে যখন দেশে এবং বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ চলছে।



বিভিন্ন প্রামাণ্য দলিলেও তো ভাষণটি আছে...

আমার নিজের স্মৃতি থেকে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষণের পুরোটাই বাঙালিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানিদের ধারাবাহিক নির্যাতন-শোষণের বর্ণনা ছিল; ছিল জাতির কাছে আসন্ন যুদ্ধের ইঙ্গিতসম্পন্ন নেতার চূড়ান্ত নির্দেশনা। ‘দ্য স্পিচ দ্যাট ইনস্পায়ার্ড হিসট্রি’ নামে একটি বই হাতে এসেছে আমার সম্প্রতি লন্ডন থেকে। একেবারে আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত সারা বিশ্বে রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া বক্তৃতা তুলে ধরা হয়েছে ওতে, যেসব বক্তৃতা ইতিহাস তৈরি করেছে। ওতেও বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি স্থান পেয়েছে। বলা হয়েছে, ভাষণটি কী করে একটি জাতির স্বাধীনতার জন্ম দিল। আমার আক্ষেপ হচ্ছে, জাতির মৌল ইতিহাস বিকৃত করার মাঝে কোনো কৃতিত্ব থাকতে পারে না। এতে জাতি প্রতারিত হয়।



এ কে খন্দকার তার বইয়ে এও বলেছেন, বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। এটা কতটুকু সত্য?

আবারও বলি, তিনি আমার খুবই পরিচিতজন। তবু একটি প্রশ্ন করতে চাই। তিনি তো মুজিবনগর সরকার কর্তৃক নিয়োজিত মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি। মুজিবনগর সরকার হয়েছিল ১০ এপ্রিল। শপথ হয় ১৭ এপ্রিল ১৯৭১। সেদিনই স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্রটি পাঠ করা হয়, যাতে প্রথম ছত্রেই বলা আছে, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণার পর আমরা এই সরকার গঠন করছি। সেখানে নতুন করে ৪৩ বছর পর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি এ ধরনের কথা বলার কী যৌক্তিকতা আছে, আমার বোধগম্য নয়। আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে, ২৬ মার্চ একটি ‘ক্ল্যানডেনস্টাইন রেডিওতে’ শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন। সারা বিশ্বের পত্রপত্রিকায়, এমনকি পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় একই কথা বলেছে। ভারতের পত্রপত্রিকায় বলা হয়, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধারাও বেশির ভাগ জীবিত। তারা সবাই জানেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। সারা দেশে সে ঘোষণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কাজেই আজ এত বছর পর কেন স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক তোলা হলো জানিনা।



স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি কি আগে থেকেই ছিল?

স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতিটা মোটামুটি আগে থেকেই ছিল। এখন দেখা যায় অনেক প্রাক্তন মিলিটারির লোক, যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তারা বলেন মুক্তিযুদ্ধের কোনো প্রস্তুতি ছিল না, এটা একেবারেই সঠিক নয়। একটা ব্যাপার বোঝার আছে; যে কথাটা বলার চেষ্টা করি এবং আমি মনে করি যে আমি সঠিকÑ বঙ্গবন্ধু একজন গণতান্ত্রিক নেতা ছিলেন। সশস্ত্র বিপ্লবের নেতা ছিলেন না।



তাহলে মুক্তিযুদ্ধে কি সশস্ত্র বিপ্লব ছিল না?

নিশ্চয়ই ছিল। সশস্ত্র বিপ্লবটা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, কিন্তু একটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। যেমনÑ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একদিকে যেমন একটা সশস্ত্র বিপ্লব একই সঙ্গে একটা গণতান্ত্রিক বিপ্লব। পাকিস্তানের সংবিধানের অধীনে নির্বাচন ঘটেছে, এমএনএ, জাতীয় পরিষদের সদস্যরা শপথ নিয়েছেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। এটা একটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এর কারণে বিপ্লব থেমে যায়নি। গণদাবি ছিল ছয় দফা মানতে হবে। ছয় দফার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।



তাহলে বলতে চাচ্ছেন ৭ মার্চের ভাষণেই মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা ছিল?

৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্র-শাসনতন্ত্রকে রাখলেন। একদিকে তিনি পাকিস্তানের শাসকদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেন, আবার সতর্কও করলেন। বললেন, তোমাদেরকে ভাতে মারব, পানিতে মারব...। বলেই দিলেন, ‘এরপরও যদি একটি গুলি চলে তাহলে তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।’ এটা ছিল মূলত, কার্যত মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার নির্দেশ।

এরপর ১৪-১৫ মার্চ থেকে ইয়াহিয়া আলোচনার টেবিলে বসলেন। তারা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল কী করবে। শুধু সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছিল। এ সুযোগে পাকিস্তান থেকে মিলিটারি আনা হচ্ছিল। এর মধ্যে ভুট্টোও এলেন আলোচনা করতে। এরপর ২৫ মার্চ রাতে যা ঘটল তা সবাই জানে। চালানো হলো একটি দেশের সশস্ত্র বাহিনী দিয়ে নিরস্ত্র মানুষের ওপর আগ্রাসন। চলতে থাকল গণহত্যা, নির্মমতা। বঙ্গবন্ধুকেও গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হলো পশ্চিম পাকিস্তানে!



ভাষণ শুনে ফিরে গিয়ে কী করলেন?

আওয়ামী লীগের একসময়ের বড় এবং ত্যাগী নেতা ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক। কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তার শ্যালক মুরাদ, ইউনিভার্সিটির কয়েকটি ছেলে মিলে আমরা একটা গাড়ি জোগাড় করেছিলাম। তখন আমি হলে থাকতাম না। আসলে থাকতে পারতাম না। ঝিগাতলায় থাকতাম। ভাষণ শুনে চলে যাওয়ার সময় আমরা শাহবাগের রেডিও পাকিস্তানের অফিসে একটা বোমা মারলাম। বোমাটা আগে থেকেই বানিয়ে রেখেছিলাম। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল; যে কারণে আমরা খেয়াল করিনি যে, রেডিও ভবনের ওপর মেশিনগান নিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা দাঁড়িয়ে ছিল। মুরাদ গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে সজোরে বোমাটি মারার পর গুলি শুরু হলো। আমরা দ্রুত গাড়ি নিয়ে সটকে পড়লাম। যে কারণে ক্ষতি হয়নি।



কেন সেদিন বোমা মেরেছিলেন?

সেদিন রেডিও পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করেনি। তাই ক্ষুব্ধ হয়ে বোমা মেরেছিলাম। তার পরের দিন ৮ মার্চ ভাষণ প্রচার করেছিল।



মুক্তিযুদ্ধে কবে, কীভাবে যোগ দিলেন?

২৫ মার্চ রাতে আমি ঢাকায় ছিলাম না। আমার উপর দায়িত্ব পড়ে জামালপুর অঞ্চলের। আগে থেকেই সব ঠিক করা ছিল। যার যেই অঞ্চল সেখানেই দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমি আগেই এলাকায় চলে যাই। নির্দেশ ছিল এলাকায় গিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু করার। যুদ্ধ ছাড়া বাঙালির ন্যায্য অধিকার মিলবে না। সে মতে ময়মনসিংহ চলে গেলাম। সবাইকে বললাম সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া উপায় নেই। উপর থেকে নির্দেশনা আছে।



প্রশিক্ষণ শুরু করলেন কোথায়?

প্রথম প্রশিক্ষণ জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ। ওখানে একটা বড় সুগার মিল আছে। মুজাহিদ বাহিনীর লোকজন, আনসার, ইপিআরের লোকজন, এদেরকে নিয়ে সুগার মিলের মাঠে প্রশিক্ষণ শুরু করলাম। এ প্রস্তুতি আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণার আগে। শুধু যে আমরাই এটা করেছি তা নয়, দেশের সব জায়গাতেই ট্রেনিং শুরু হয়েছে। কাঠের রাইফেল বানিয়ে ট্রেনিং চলছে।



২৫ মার্চে ঢাকায় যখন পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে হত্যা শুরু করে তখন আপনি কোথায় ছিলেন?

২৫ মার্চ ঢাকাতে যখন ‘ক্রাক ডাউন’ শুরু হয় তখন আমি গ্রামের বাড়িতে। রেডিওতে খবর শুনছিলাম। বিবিসি ও আকাশ বাণী একটা বড় ভূমিকা রাখে সে সময়। দেশের পত্রিকাগুলো সঠিক খবর ছাপতে পারত না। যোগাযোগ ব্যবস্থাও ঠিক ছিল না। রেডিও শুনে আমরা থানা থেকে গিয়ে অস্ত্র নিয়ে আসলাম। থানার বড় দারোগা দেবে না। ছোট দারোগা আমাদের সঙ্গে চলে এলো, ট্রেনিং দেওয়া শুরু করল। তখন যুদ্ধের একটা আমেজ তৈরি হয়ে গেছে। যার বাড়িতে যা অস্ত্র আছে যেমন- আমার মামার একটা দুনলা বন্দুক ছিল ওটা নিয়ে আসলাম। এ রকম করে যেভাবে পারি শুরু করলাম।



আপনার সঙ্গে কারা ছিলেন?

আমার সঙ্গে আরও অনেকে ছিল। দেওয়ানগঞ্জে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা ওড়ালাম। আমার সহযাত্রীদের একজন বন্ধু আনোয়ারুল আজিম (ছানা)। ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আনোয়ারুল আজিম আমার এলাকার প্রথম শহীদ। বিহারিরা আমাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণের ছবি তুলে রেখেছিল। আর্মিরা এলাকায় আসার পর বাহাদুরাবাদ ঘাটে বড় ক্যাম্প গড়ে তোলে। তখন একদিন তারা ছানাকে ধরে নিয়ে গেল। তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলল।



আপনি তখন কোথায়?

আমাকে ধরতে পারল না, কারণ আমি তখন নিজের এলাকা ছেড়ে ছেলেদের নিয়ে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে গুঠাইল নামে একটা এলাকায় চলে যাই। একবার এসেছিলাম বাড়িতে। ওখান থেকে শখানেক ছেলেকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে যাই ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জে। এরপর মেঘালয় পাহাড়ের কাছে ঐতিহাসিক কামালপুর রণাঙ্গনে অবস্থান হয় আমার। সেখানেও প্রশিক্ষণ চলল।



প্রশিক্ষণ অবস্থার কোনো স্মৃতি কি মনে পড়ে?

আমি এপ্রিল মাসের ৬ কিংবা ৭ তারিখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মহেন্দ্রগঞ্জে যাই। হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সব এসে ঠাঁই নিয়েছে ভারতের পাহাড়গুলোতে। পাকিস্তানিরা যখন যেখানে গেছে সেখানে ধর্ষণটা মূল কাজ ছিল। লুণ্ঠন করত, ঘরবাড়িতে আগুন দিত আর যুবতী মেয়েদের নির্যাতন করত। সারা দেশেই জীবন বাঁচাতে মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিতে শুরু করেছে। আমাদের এলাকার লোকজনও চলে গেছে। জনপ্রতিনিধি এমপিরাও চলে গেছে। দেশে থাকা কারো জন্যই নিরাপদ নয়, এমন অবস্থা তৈরি করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ভারতে যাওয়ার পর অনেক পরিচিত লোকজন পেয়ে গেলাম। আমার সঙ্গে অনেকেই ছিল। এলাকায় আমি যেহেতু একটু-আধটু নেতৃত্বের সারিতে ছিলাম, তরুণরাই আমার সঙ্গে বেশি থাকত।



ওপারে গিয়ে মূল কাজ কী করলেন?

কয়েকদিন এভাবে-সেভাবেই কাটে। যুদ্ধের প্রথম দিকে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী-বিএসএফ আমাদের প্রচুর সহযোগিতা করেছে। প্রথম ট্রেনিংটা তাদের হাতেই হয়। পরে অবশ্য আমাদের বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর-এর লোকেরা ট্রেনিং দিতে থাকে। দলে দলে যুবা-তারুণ্য অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতে থাকে। বিএসএফের সহায়তায় মহেন্দ্রগঞ্জের ক্যাম্পটা তৈরি করি আমরা, যেটা পরে ১১ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার হয়।



শরণার্থীদের থাকার জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়?

ভারতীয় সরকার শরণার্থী শিবির (রিফিউজি ক্যাম্প) তৈরি করে দেয়। হাজার হাজার শরণার্থী থাকে সেখানে। তারপর আস্তে আস্তে এপ্রিল মাস থেকেই প্রশিক্ষণের পর্যায়টা পুরোদস্তুর শুরু হয়। আস্তে আস্তে বেঙ্গল রেজিমেন্টের কেউ কেউ পালিয়ে চলে আসে। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) বাঙালি সদস্যরাও প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে। সবকিছুই ঘটেছে ভারতীয় আতিথেয়তায় বা ওদের সম্মতিতে। কারণ দেশটা তো ওদের।



আপনিও ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন?

আমিও প্রশিক্ষণ নেই। কিন্তু আগেই বললাম না, আমার যুদ্ধের দুটো অংশ। একটি হচ্ছে, আমি যুদ্ধ কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করেছি, আবার অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি কিন্তু যুদ্ধ সম্পর্কে লিখেছি, ছবি তুলেছি। এটাও একটা যুদ্ধের অংশ বলেই মনে করি।



রণাঙ্গনে সাংবাদিক হিসেবে নিয়োগ পেলেন কীভাবে?

একটা সময় আমি মেঘালয় থেকে পালিয়ে কলকাতায় গেলাম। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিএসএফ, পুলিশ যে যে এলাকায় ঢুকেছে তাদের এলাকার বাইরে যেতে দিচ্ছে না। নিরাপত্তার প্রয়োজনেই এটা করতে হয়েছে। পাকিস্তানিরা অনেক ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করেছে। গুপ্তচর পাঠিয়েছে। সবাই তো সবাইকে চেনে না।



কলকাতায় কীভাবে পালিয়ে গেলেন?

মহেন্দ্রগঞ্জ থানার দারোগাকে বললাম কলকাতা যাব। তিনি বললেন, আমি এসপিকে অনুমতির জন্য লেখি। অনুমতি আসতে বিলম্ব হচ্ছে। একদিন পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে একটা কাঁচা কলার ট্রাকে চড়ে কলকাতার পথে চললাম। ট্রাকটি ধুবড়ির দিকে যাচ্ছিল। আমার সঙ্গে আরও একজন ছিল। ধুবড়ির কাছে ব্রহ্মপুত্র নদ কতবড় তা আগে জানা ছিল না। এত বড় নদ আমি আগে দেখিনি। লঞ্চে করে ওপারে চলে গেলাম।



ওপারে গিয়ে কারো সহযোগিতা পেয়েছিলেন?

ওখানে গিয়ে দেখি জয় বাংলার লিয়াজোঁ অফিস। আমার খুব অবাক লাগল। যেখানে যেখানে গেছি সেখানে ভারতের সবশ্রেণির, সবদলের মানুষ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটাকে তাদের নিজেদের যুদ্ধ বলে গ্রহণ করেছে। যাওয়া-আসার পথে যা দেখলাম তা খুবই মজার। ’৪৭ সালে দেশভাগের সময় বা তার আগে পরে যারা নির্যাতিত হয়ে দেশ ছেড়েছেন তাদের মনে অনেক ক্ষোভ-বেদনা থাকার কথা। কিন্তু তারাও আমাদের হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করেছে, মনেপ্রাণে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে।



সেখান থেকে কলকাতা গেলেন কীভাবে?

ধুবড়ি থেকে ট্রেনে চেপে একদিন-একরাত পর কলকাতা পৌঁছালাম। প্রথম কলকাতা ভ্রমণ। খুঁজে খুঁজে থিয়েটার রোডে গেলাম। যেখানে আমাদের বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের অফিস ।



ওখানে গিয়ে কাদের সঙ্গে দেখা হলো?

আমি শুধু বাংলাদেশের দু-একজন এমপিকে চিনতাম। তাজউদ্দিন সাহেব বা অন্য কাউকে তো চিনতাম না। আমার মধ্যে একটা চেতনা কাজ করছিল যে, আমি কলকাতায় বসে থাকতে পারব না। আমি তো গেছি যুদ্ধের আরও কিছু কাজ করব বলে। কাজেই আমাকে যেতে হয়েছে। তারপর আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো ২১ বালু হক্কাক লেন। যেখানে আমাদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, জয়বাংলা পত্রিকা এবং প্রচার ও প্রকাশনা সেল ছিল।



পরিচিত কাউকে পেলেন?

সেখানে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। যেমনÑ সম্প্রতি মারা গেলেন আমিনুল হক বাদশা, আসাদ চৌধুরী এরা তো জুনিয়র ছিলেন। আবদুল গাফফার চৌধুরী, এম আর আকতার মুকুল, সন্তোষ গুপ্ত, কামাল লোহানী, সলিমুল্লাহ এদের সবাইকে চিনতাম। এরপর কয়েকদিনের মধ্যেই রণাঙ্গনের সংবাদদাতা হিসেবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে চলে এলাম।



তাহলে আপনি সাংবাদিকতা মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই করতেন?

পেশা হিসেবে ছিল না। টুকটাক লেখালেখি করতাম। মূলত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই সাংবাদিকতা শুরু হলো।



শুরু হলো আপনার রণাঙ্গন সংবাদিকতা, পাশাপাশি একজন গেরিলাযোদ্ধাও আপনি। যুদ্ধের মাঠ থেকে সংবাদ পৌঁছাতেন কীভাবে?

এটা ইন্টারেস্টিং! এখনকার মতো মোবাইল বা ইন্টারনেট দিয়ে সংবাদ পাঠানোর ব্যবস্থা ছিল না তখন। কলকাতার আশপাশে যেসব রণাঙ্গন সেখানে কিছুটা সুবিধা ছিল। দিনে গিয়ে ফটোগ্রাফাররা ছবি তুলে আনত, রিপোর্টাররা রিপোর্ট লিখে ডেস্কে দিত। আগরতলাতেও তখন কম বেশি সুবিধা ছিল। সেখানে টেলেক্স, টেলিফোন ছিল। কলকাতায় যাওয়ার প্লেন ছিল। আমরা ছিলাম মেঘালয়ে যার সঙ্গে কোনো যোগাযোগের ব্যবস্থাই ছিল না। এদিকে আগরতলা কয়েকশ মাইল, কলকাতাও কয়েকশ মাইল। বিদেশি সাংবাদিকরাও আমাদের এখানে আসত না। এই দুর্ভেদ্য পাহাড়ি অঞ্চলে যোগাযোগের তেমন কোনো ব্যবস্থাই নেই, কীভাবে আসবে। কিন্তু আমাকে রিপোর্ট পাঠাতে হবে। রীতিমতো চ্যালেঞ্জ।



দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবরাখবর পৌঁছে দেওয়ার অন্য কোনো মাধ্যম কি ছিল?

একবার কর্নেল তাহেরের সঙ্গে আলোচনা করে একটা লিফলেট লিখলাম। লিফলেটগুলো আমাদের গেরিলারা যখন দেশের ভেতরে বিভিন্ন অপারেশনে যাবে তখন ছড়িয়ে দেওয়া হবে। লিফলেটে ছিল সতর্ক নানা ধরণের : পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কী করতে হবে, না করতে হবে ইত্যাদি। তখন তো প্রচারযন্ত্র বলে কেবল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আকাশ বাণী আর বিবিসি মাঝেমধ্যে; আর তেমন কিছু নেই। অতএব নানা মাধ্যম আমাদের রপ্ত করতে হয়েছে।



আপনি যুদ্ধ চলাকালে গৌহাটিতে গিয়েছিলেন, কেন?

১১ নম্বর সেক্টর থেকে কিছু টাকা নিয়ে আমি গিয়ে পৌঁছলাম একবার গৌহাটি। লিফলেট ছাপাব। কিন্তু কাউকে চিনি না। আসামের মুসলমানদের মধ্যে সবাই না হলেও একটা বড় অংশ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল না। এটা খুবই ইন্টারেস্টিং। একটা অদ্ভুত সাইকোলজি। আমি একটা হোটেলে গেলাম, বিসমিল্লাহ হোটেল। অনেকের সঙ্গে চেনা পরিচয় হয়ে গেছে তখন। কিন্তু ভালো ব্যবহার পেলাম না। এরপর আমি গিয়ে উঠলাম কামাক্ষা হোটেলে। এখনও হোটেলটি আছে। কয়েক বছর আগে গিয়ে দেখলাম হোটেলটি অনেক বড় হয়েছে।



সেখানে গিয়ে কার সঙ্গে দেখা করলেন?

প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার (পিটিআই) সাংবাদিক মানিক চৌধুরীর নাম শুনেছিলাম। তাকে খুঁজে বের করলাম। ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়া (ইউএনআই) নামে একটি বড় নিউজ এজেন্সি ছিল। পরিচয় হলো তার সাংবাদিক কে. কে. চাড্ডার সঙ্গে। আমি যে ছবি তুলে নিয়ে গেছি সেগুলো তাদের দেখালাম। ওরা আমাকে সাহায্য করল। কলকাতার যুগান্তর পত্রিকায় আমার ছবি ছাপা হলো। এদের একজন সাংবাদিক আমাকে নিয়ে লিখল। তখন আমি একটু পরিচিত হলাম।



তখন ছবি প্রিন্ট করাতেন কীভাবে?

এখনকার মতো নয়, তখন ছবি তোলার জন্য ফিল্ম লাগত। ফিল্ম কেনার জন্য আমার কাছে একমাত্র কাছের জায়গা, ৫২ মাইল দূরের তুরা শহর। কয়েক সপ্তাহ পর পর মাটি তুরায় যেতাম। ফিল্ম আনতাম, ফিল্ম ডেভেলাপ করাতাম। মহেন্দ্রগঞ্জ থেকে তুরা পর্যন্ত পাহাড়ি রাস্তায় অনেকটাই বিপজ্জনক জার্নি। কখনো মিলিটারি ট্রাকে করে চলে যেতাম। ফিরতাম মিলিটারি ট্রাক বা বাসে করে। বাস ব্যবস্থা মোটেও ভালো ছিল না। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা।



পত্রিকায় খবর বা ছবি কীভাবে পাঠাতেন?

জেলা শহর বলে তুরাতে হেড পোস্ট অফিস ছিল। যখন বড় কোনো ঘটনা ঘটত তখন টেলিগ্রাম করতাম। তাও একদিন দুদিন পরে যেত। অথবা অন্য কেউ যাচ্ছে তখন আমি লিখে দিতাম, তিনি পাঠিয়ে দিতেন। মেজর স্টোরিগুলো হতো ফিচারধর্মী, হাতে লিখতাম। তিন-চারটে প্যাকেট করতাম। ছবি প্রিন্ট করতাম তুরার একটা স্টুডিওতে গিয়ে, সেগুলো প্যাকেটে ঢুকিয়ে দিতাম। এগুলো পাঠিয়ে দিতাম কলকাতার বালুহক্কাক লেনে ‘জয় বাংলা’ পত্রিকায়। সপ্তাহে দু-তিনদিন করে আমার প্যাকেট যেত। যে কারণে একটা ধারাবাহিকতা ছিল।



রণাঙ্গনে কি ছাপা হওয়া পত্রিকা আসত?

হ্যাঁ, হ্যাঁ সব জায়গায় আসত। এমপি সাহেবরা যখন আসতেন তখন নিয়ে আসতেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিতরণের একটা ব্যবস্থা করা হতো। তবে ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলটা অতটা ভালো ছিল না। পরে আমি আগরতলাতেও গিয়েছি, এখানেও সাংবাদিকতা করেছি, যুদ্ধ করেছি। সেখানেও কাগজগুলো পেতাম। যেখানে যাতায়াত ব্যবস্থা সুবিধাজনক ছিল সেখানে কাগজগুলো আসত।



একটা টাইপরাইটার দেখছি আপনার বসার ঘরে, এটা কি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার?

এর একটা ইতিহাস আছে। বেশ কয়েক বছর আগে মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার অবদান নিয়ে বই লিখতে যাই আমি আগরতলায়। ১৯৭১ সালের এপ্রিলের দিকে আমাদের অসংখ্য জনপ্রতিনিধি ত্রিপুরায় আশ্রয় নিয়েছেন। তারা তখন একটা যৌথ বিবৃতি প্রচার করেন বিশ্ববাসীর সামনে। বলা যায় সেটিই ছিল পাকিস্তানের নির্বিচার গণহত্যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের প্রথম আন্তর্জাতিক বিবৃতি। এর নাম ছিল ‘স্টপ দিজ জেনোসাইড’। এই টাইপরাইটার দিয়েই সেটা লেখা হয়েছিল, সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর জহির রায়হান ‘স্টপ জেনোসাইড’ নামে যে ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্রটি তৈরি করেন তাতে দেখবে, প্রথমে একটা টাইপরাইটার ব্যবহার করা হচ্ছে। একের পর এক লেখা হচ্ছে, ‘ডেডলাইন ঢাকা, ডেডলাইন হেনয়।’ তখন ভিয়েতনামেও যুদ্ধ চলছিল। ছবিতে এই টাইপরাইটারটি ব্যবহার করা হয় বলে শুনেছি।



আপনার কাছে এলো কী করে?

এই টাইপরাইটারটি ছিল আগরতলার পিটিআই অফিসের। পুরনো হয়ে গেছে বলে পরিত্যক্ত হয়েছিল। আগরতলার কয়েকজন উদ্যোগী মানুষ, বিশেষ করে পিটিআই বার্তা সংস্থার বর্তমান আগরতলা প্রধান জয়ন্ত ভট্টাচার্য টাইপরাইটারটি উদ্ধারে আমাকে সর্বাত্মক সাহায্য করেছেন। সাংবাদিক জয়ন্ত ভট্টাচার্য ও মানস পাল এ ব্যাপারে আমাকে বিশেষ সাহায্য করেছেন। এটা সময় মতো মিউজিয়ামে দেব।



আপনার ঘরের দেয়ালে ঝোলানো ছবিতে দেখা যাচ্ছে একজন উড়োজাহাজ থেকে নামছেন, কে তিনি?

ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহ। মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদান। পাকিস্তানিরা গণহত্যা চালাচ্ছে, সীমান্ত খুলে দেবেন কি না, তাই নিজের উদ্যোগে চলে গেলেন তিনি দিল্লি। ওখানে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কথা বললেন। দিল্লি থেকে এসে প্লেন থেকে নামছেন, হাজার হাজার মানুষ তাকে দেখছে।



মুক্তিযুদ্ধের সময় তোলা বেশকিছু ছবি আপনার ঘরের দেয়ালে টাঙানো। এর বাইরেও কি আরও ছবি আছে?

হ্যাঁ, তা তো আছেই। এখানে তো মাত্র কিছু। আর এগুলোর ‘ডিজিটাল ফরমেট’-এ বিভিন্ন জায়গায় আছে। যাতে এগুলো ধ্বংস হয়ে গেলেও হারাবে না, ঠিকই পাওয়া যাবে। আমি মরে গেলেও ছবিগুলো থাকবে।



ছবি তোলার জন্য তো কোনো ধরনের প্রশিক্ষণও পাননি তখন...

আমি তো ক্যামেরাম্যান ছিলাম না। সাংবাদিকতার ছাত্র ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যুদ্ধের মাঠে সাংবাদিকতার শুরু। হয়ত একশ ছবি তুলেছি তার মধ্যে ২০টা ভালো হয়েছে। অনেক ফিল্ম নষ্ট হয়ে গেছে। তুরা পাহাড়ের একটা সাধারণ স্টুডিওতে ফিল্মগুলো ডেভেলাপ করা হতো। মনে আছে, কুমারী নামে একটা মেয়ে স্টুডিওটি চালাত। নেপালি বংশোদ্ভূত কিন্তু ভারতীয়। হিন্দিতেই কথা বলত। সে হয়ত ভালো করে ডেভেলাপও করতে পারেনি।



সাংবাদিকতা এমনিতেই চ্যালেঞ্জিং পেশা, তার ওপর আবার রণাঙ্গন। দিন-রাত কাটত কীভাবে?

যুদ্ধের মাঠে তো স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ নেই। সেটা ছিলও না। কিন্তু আমরা কিছুটা সৌভাগ্যবানই বটে। ভারত আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্যগুলোতেÑ পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয়Ñ যেখানে আমরা একই ভাষাভাষীর মানুষও পেয়েছি। আরো বিচিত্র যে, এই মানুষের মধ্যে অনেকেই আবার দেশভাগের দাঙ্গায় বিদ্ধ, বিতাড়িত! এরপরও মনুষ্যত্বকে আঁকড়ে ধরেছে সবাই। কাজেই আমাদের পরিবেশটা একটু আলাদা ছিল।



কর্নেল তাহেরের সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে হলো?

বাংলাদেশ সংলগ্ন আসাম-মেঘালয়ের পাহাড়ে তেলঢালা বলে একটা জায়গা আছে। ওখানে ‘জেড ফোর্স’-এর প্রাথমিক অবস্থান ছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। যুদ্ধের একটা সময় আমি জেড ফোর্সে কয়েকদিন ছিলাম। একদিন শুনলাম মেজর জিয়াউদ্দিন এবং কর্নেল তাহের (তৎকালীন মেজর) পাকিস্তান থেকে চলে এসেছেন। মেজর সাফায়েত জামিলও সেখানে ছিলেন। আগ্রহ নিয়ে দেখার অপেক্ষা করছিলাম, কে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এলো দেখতে। মেজর সাফায়েত আমাকে মেজর তাহেরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাহের ভাই খুব খুশি হলেন। বাড়ি কোথায় জানতে চাইলেন। বললাম, ময়মনসিংহের জামালপুরে। তারও বাড়ি ছিল ময়মনসিংহের দিকে। সবকিছু শুনে তিনি খুশি হলেন, বিশেষ করে সাংবাদিক শুনে।



১১ নম্বর সেক্টর কি তখন গঠিত হয়েছিল?

মুজিবনগর সরকার এবং মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানী মেজর জিয়াউর রহমানের নানা কর্মকা-ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। ওসমানী একবার তাকে বহিষ্কারেরও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যা হোক, সেপ্টেম্বর মাসে জিয়াউর রহমানকে আমাদের এলাকা থেকে সরিয়ে সিলেট সেক্টরে পাঠানো হলো। জুলাই-আগস্টে নতুন ১১ নম্বর সেক্টর তৈরি হলো। এটা সর্বশেষ এবং মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় সেক্টর। যেটা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে গেরিলাদের দিয়ে। ছাত্র, চাষাভুষা, কর্মচারী এরাই ছিলেন এর প্রাণশক্তি। রেগুলার কোনো ট্রুপস (সৈন্যদল) এখানে ছিল না বললেই চলে।



বীরপ্রতীক তারামন বিবিকে নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেকে বলেন তিনি জেড ফোর্সে ছিলেন, অনেকে বলেন ১১ নম্বর সেক্টরে। আসলে কোনটা ঠিক?

অনেকের সঙ্গে আমার তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, কর্নেল সাফায়েত জামিলের সঙ্গেও তর্ক হয়েছে। বিষয়টি ছিল, আমি ১৯৯২-৯৩ সালে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় একটা লেখা লেখলাম, যে তারামন বিবিকে এতদিন পর বীর প্রতীক খেতাব দেওয়া হলো তিনি আমাদের ১১ নম্বর সেক্টরে ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সাফায়েত জামিল বড় একটা আর্টিক্যাল লিখে প্রতিবাদ করলেন। বললেন, আমি ভুল বলছি। আমিও তখন তার প্রতিবাদ জানালাম। পরে তিনি অবশ্য স্বীকার করেছেন, ১১ নম্বর সেক্টর গঠিত হয় সর্বশেষে এবং কর্নেল তাহেরকে (তৎকালীন মেজর আবু তাহের) দিয়েই গঠিত হয়। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে যে ‘জেড ফোর্স’ ছিল সেটা বেশ কিছু দিন একই এলাকাতে অবস্থান ছিল এবং ১১ নম্বর সেক্টর গঠনের আগে। আমি মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টর গঠিত হওয়ার দিন থেকে সর্বশেষ দিন পর্যন্ত এই সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম । আমি দেখেছি, এই যে তারা ভুলটা করেন, অনেকটা ‘পলিটিক্যাল’ কারণেও করেন। আরেকটা ব্যাপার, মেজর জিয়াউর রহমান কখনই সেক্টর কমান্ডার ছিলেন না, ছিলেন একজন ফোর্সেস কামান্ডার।



তাহলে তিনি কী ছিলেন?

জিয়াউর রহমান ছিলেন ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক। এটা সেক্টরের সমতুল্য। মেজর কে এম সফিউল্লাহকে ৩ নম্বর সেক্টরের প্রধান করা হয়, সঙ্গে ‘এস ফোর্স’-এরও কমান্ডার করা হয়। অন্যদিকে মেজর খালেদ মোশাররফকে ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার করা হয় এবং ‘কে ফোর্স’-এরও কমান্ডার করা হয়। কিন্তু জিয়াউর রহমানকে কোনো সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়নি।



কেন তাকে সেক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি বলে মনে করেন?

যুদ্ধ থেকে আমি যা বুঝেছি, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী সরকারের কাছে অনেক রিপোর্ট এসেছিল জিয়াউর রহমানের কর্মকা-ের ব্যাপারে, কাজেই তাকে সন্দেহ করার কারণ ছিল। সে হয়ত একটা পাল্টা কিছু করার স্বপ্ন দেখছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পাল্টা কিছু। যতটা জেনেছি, জেনারেল ওসমানী তো একবার জিয়াকে প্রায় সরিয়ে দিচ্ছিলেন। শেষে ধরপাকড় করে রক্ষা হয় আর কি।



আপনি স্কুলজীবন থেকেই কমবেশি লেখালেখির সঙ্গে জড়িত হয়ে যান। কী ধরনের লেখা পড়তে বেশি পছন্দ করতেন?

মূলত সাহিত্য, ইতিহাস আমার পছন্দ ছিল। নাটক, গল্প এগুলো নিয়েই ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালে আমার কয়েকটি নাটক মহিলা সমিতিতে মঞ্চস্থ হয়েছে। বেইলী রোড তখন নাটকের মূল জায়গা। এখন শিফট হয়ে অন্য জায়গায় চলে গেছে। পরে আমার নাটকের সঙ্গে থাকা হয়নি। সাংবাদিকতা, গল্প-উপন্যাসে সময় পার করেছি। আমাকে কয়েক বছর আগে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেয়। বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য।



তখন কার লেখা আপনি বেশি পছন্দ করতেন?

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল তো বটেই, ওই সময়ে শওকত ওসমান, শামসুদ্দিন আবুল কালাম আমার প্রিয় লেখক। গদ্যে আরো আছেন হাসান আজিজুল হক, আলাউদ্দিন আজাদ। কবিতায় নিঃসন্দেহ শামসুর রাহমান, আবুল হোসেন, আল মাহমুদ। আবদুল মান্নান সৈয়দ আমার কিছুটা বড় হলেও আমরা একসঙ্গে সময় কাটিয়েছি।



ভারত বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য কম করেনি, যা ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। তখনকার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে যদি বলতেন...

প্রায় এক কোটি মানুষ ওপারে গেছে। ভারতের আজকের আর্থিক অবস্থা যে রকম ৪৪ বছর আগে এ রকম ছিল না। তখন ভারতের লোকেরা চাঁদা বা ট্যাক্স দিত বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য। তাদের এই সহমর্মিতা আমাদের ইতিহাসের অংশ। যুদ্ধের শেষ দিকে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের বাহিনী যৌথ কমান্ড গঠন করে। ভারতের প্রায় ১৮ হাজার সৈনিক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মারা যায়। তবে সেটিই হয়ত বড় কথা নয়। ভারতের সাধারণ মানুষ যে কত অবদান রেখেছে, যে হিন্দু পরিবারের ঘরে মুসলমানদের ঢুকতে বাধা ছিল, সেখানেও আমাদের বাঙালি মুসলিম মেয়েরা সন্তান প্রসব করেছে। তারা সবাইকে আগলে রেখেছে। এই সহমর্মিতা ১৯৭১ সালে দেখা গেছে। সে কারণে আমি সবসময় বলি ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি ১৯৭১। সম্পর্কের এই ভিত্তিকে না পারবে ভারত অস্বীকার করতে, না পারবে বাংলাদেশ অস্বীকার করতে। কারো জন্যই অস্বীকার করা উচিত হবে না।



অনেকে বলেন এতে ভারতেরও তো ভৌগোলিক রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল...

ওই সময়ে মনুষ্যত্ব কাজ করেছে। অনেকে বলবে, ভারতের একটা ‘জিও পলিটিক্যাল স্ট্যাটেজি’ ছিল। একটি রাষ্ট্র হিসেবে থাকতেই পারে। তবে সেই সময়ের সঙ্গে বাঙালি জনগোষ্ঠীর আকাক্সক্ষা মিলে গিয়েছিল। ভারত বাংলাদেশের জন্মের বন্ধু হয়েছিল। বিশ্বের নানা প্রান্তেই এ রকম সহযোগিতার দৃষ্টান্ত আছে। আজ সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই। ঐতিহাসিক সত্য এটাই যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি ‘কমিউনিস্ট ব্লক’ না থাকত, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরাশক্তি একটা থাকত, তাহলে পৃথিবীর কয়টা দেশ উপনিবেশমুক্ত, স্বাধীন হতো বলা তো মুশকিল।



এ প্রসঙ্গে কোনো উদাহরণ...

আমরা জানি, আফ্রিকার উপনিবেশ মুক্ত প্রথম দেশ ঘানার কথা। আফ্রিকাতে প্রচুর উপনিবেশ ছিল। ইংরেজদের যেমন ছিল, ছিল জার্মানদের, ফরাসিদের ওলন্দাজদের। কিন্তু ঘানার উপনিবেশ মুক্ত হলো প্রথম। ক্রমান্বয়ে আফ্রিকার ৫২টি দেশ স্বাধীন হলো, সর্বশেষ হলো নামিবিয়া। আমার সৌভাগ্য ১৯৯০ সালে নামিবিয়া যেদিন স্বাধীন হয় সেদিন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম বাংলাদেশের একমাত্র সাংবাদিক হিসেবে।



নামিবিয়াতে যাওয়ার কারণ কী?

তখন আমাদের বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক ছিলেন জনাব আমানুল্লাহ। আমাকে বললেন, আপনি তো মুক্তিযোদ্ধা, ভেবে দেখেন যাবেন কি না। আমি বললাম, কীভাবে যাব? কারণ সাউথ আফ্রিকার সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। যেতে হবে আমাকে সাউথ আফ্রিকার মাঝখান দিয়েই। নানা কিছু ভেবে আমি চ্যালেঞ্জ নিলাম। বললাম, আমানুল্লাহ ভাই আমি যাব, টিকিটের ব্যবস্থা করুন।

এরপর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আমানুল্লাহ সাহেব টেলেক্স পাঠালেন কোন পথে সহজে আমি নামিবিয়া যেতে পারি সে লক্ষ্যে। মজার ব্যাপার হলো, মেজর ডালিম হলো তখন কেনিয়ার রাষ্ট্রদূত কিংবা দূতাবাসের কোনো বড় কর্মকর্তা। সে জানাল সে সাহায্য করতে পারবে, আমি যেন কেনিয়া হয়ে যাই।



বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর ডালিমের কথা বলছেন তো?

প্রথম দিকে নামটা বুঝতে পারিনি। পরে মনে পড়ল, এ লোক তো বঙ্গবন্ধুর ঘাতক, জিয়াউর রহমান যাকে দূতাবাসে চাকরি দিয়েছে! আমি আমানুল্লাহ ভাইকে বললাম, আমি কেনিয়া দিয়ে যাব না, ওর মতো একজনের সঙ্গে ‘হ্যান্ডশেক’ করতে হবে আমি ভাবতেও পারি না। শেষ পর্যন্ত জিম্বাবুয়েতে গেলাম। তখন ওখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির। তিনি আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করলেন। হারারে থেকে প্লেনে সাউথ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে পৌঁছলাম। কয়েক ঘণ্টার বিরতির পর আরেকটি প্লেনে উইন্ডহগ, নামিবিয়ার রাজধানীতে।



সাউথ আফ্রিকায় কোনো বাঙালির আতিথেয়তা পেয়েছিলেন?

না, সাউথ আফ্রিকায় যাওয়ার বাইরে কোথাও যাইনি। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই প্লেনে উঠতে হয়েছে উইন্ডহকের পথে। যা হোক, উইন্ডহক এয়ারপোর্টে নেমেই দেখি একটি বাঙালি পরিবার হারুন হাবীব লেখা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্বামী-স্ত্রী সঙ্গে ছোট্ট একটা মেয়ে। আমি এগিয়ে গিয়ে পরিচয় দিলাম। তার পরিচয়ও পেলাম। তিনি বোরহান সিদ্দিকী। পরে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হয়েছিলেন। স্বামী-স্ত্রী (রেহেনা সিদ্দিকী) দুজনেই শিল্পী। বোরহান ভাই জাতিসংঘ শান্তি রক্ষী বাহিনীতে পুলিশের হয়ে সেখানে ছিলেন। তাকে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ম্যাসেজ দেওয়া হয়েছিল। সে কারণে তিনি এসেছিলেন। আরও একটি বড় ঘটনা ঘটে আমার জীবনে। আমিই প্রথম নেলসন ম্যান্ডেলার সাক্ষাৎকার নেই উইন্ডহগ স্টেডিয়ামে বসে।



মুক্তিযুদ্ধ শেষ করে আপনি ফিরলেন কবে?

৪ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক কামালপুর রণাঙ্গনের পতন ঘটল। পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ করানো হলো। ৩ ডিসেম্বর যৌথ কমান্ড গঠিত হয় ভারত-বাংলাদেশের। তখন ভারতীয় সেনারাও মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে এক হয়ে যায়। ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান পশ্চিম সেক্টরে আক্রমণ করে। সেদিন ইন্দিরা গান্ধী কলকাতার ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি চলে গেলেন দিল্লিতে, পার্লামেন্টের অধিবেশন ডেকে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। একইদিন ভারত-বাংলাদেশ যৌথ সামরিক কমান্ড দুই দেশে গঠিত হলো।



কামালপুরের যুদ্ধ শেষ হলো কবে?

৪ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনারা এলো সীমান্তে। দুই দেশের যৌথ কমান্ড গঠিত হয়েছে। একটা চিঠি লেখা হলো, কামালপুরের পাকিস্তানিদের কাছে পাঠানো হবে আত্মসমর্পণের জন্য। এক ঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণের সময় বেঁধে দেওয়া হলো। কামালপুরে ৯ মাস প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধ হয়েছে। প্রচ- রক্তপাত হয়েছে। ওরাও মারা গেছে, আমরাও মারা গেছি। কত লোক মারা গেছে তার হিসাব নেই। তবে ওদেরকে আমরা কামালপুরের অবস্থান থেকে একেবারে তুলতে পারিনি। তুলে যে ঢাকা রওনা দেব সেটা সম্ভব হয়নি। খুব শক্তিশালী অবস্তান ছিল ওদের। বাঙ্কারের মধ্যে থাকত, যে কারণে আমরা বুঝতে পারতাম না। ওরা যখন বের হতো তখন আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ চলত।



চিঠিটা কি পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?

প্রথম চিঠিটা নিয়ে গেল বশির আহমদ। (দেয়ালে ঝোলানো একটা ছবিতে অস্ত্রহাতে বশির আহমদকে দেখান তিনি)। সঙ্গে সঞ্জু ছিল। এক ঘণ্টা হলো বশির ফিরে আসছে না। আমরা তো ধরেই নিলাম রাস্তায় মাইন বিস্ফোরণে হয়ত বশির মারা গেছে। গাছপালা, জঙ্গলের কারণে সবকিছু বোঝাও যাচ্ছিল না।



তারা কি ফিরে এসেছিলেন?

এক ঘণ্টা পরে নতুন করে সঞ্জুকে পাঠানো হলো। বশির কামালপুরের আর সঞ্জু ত্রিশালের ছেলে। আরও কিছুক্ষণ পর পাকিস্তানিরা সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করল না। বশির ও সঞ্জুর সঙ্গে ১৫০ জন পাকিস্তানি সৈন্য হাতে তুলে সীমান্তের দিকে আসতে থাকল। হাতে আমার ক্যামেরা ছিল। আমি সেই মুহূর্তকে ধরে রাখলাম। সঞ্জু এবং বশিরের ছবি তুললাম। বশির ও সঞ্জু দুজনই বীর প্রতীক।



এর পরই তো সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন?

হ্যাঁ, বের হলাম। ওখান থেকে প্রথমে বকশিগঞ্জ। আমার কাছে একটা হোন্ডা মোটরসাইকেল ছিল, ওটা নিয়ে আমরা অ্যাডভান্স হয়ে বকশীগঞ্জ, নালিতাবাড়ি পার হয়ে শেরপুর এলাম। শেরপুর থেকে পাকিস্তানিরা তখন পালিয়ে চলে গেছে। পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে আমরা জামালপুর আসব কি করে তা ভাবছি। পাকিস্তানি সৈন্যরা মর্টার মারছে শেরপুরের চরাঞ্চলের দিকে। কাজেই এগিয়ে যেতে পারছিলাম না আমরা।



তখন কী করলেন?

পরিকল্পনা করা হলো, আমরা চারদিক থেকে ওদের আক্রমণ করব। ভারতীয় সেনাবাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা সবমিলে আক্রমণ করাতে জামালপুরে অবস্থানরত পাবিস্তানি বাহিনী পালাতে লাগল। তারা ভারী যানবাহন সব পুড়িয়ে দিল, যাতে আর ব্যবহার করা না যায়। এরই মধ্যে তারা ট্রেনে চেপে ঢাকার দিকে রওয়ানা দিল। টাঙ্গাইল দিয়ে ওরা এগুতে পারবে না কারণ ওখানে কাদের বাহিনী (কাদের সিদ্দিকীর বাহিনী) আছে। এ সময় পাকিস্তানিরা তখন প্রচুর লোককে হত্যা করল। আমরা জামালপুর পৌঁছলাম ১০ ডিসেম্বর।



জামালপুর থেকে কোথায় গেলেন?

সেখান থেকে আমরা ময়মনসিংহ গেলাম। পাকিস্তানিরা তখন সারা দেশে পরাজিত হচ্ছে। সব জায়গা থেকেই পালাচ্ছে। আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কিছু করার নেই তাদের। এই সময়ে আমি আহত হলাম। গুলিটি পায়ে লেগে বেরিয়ে গেল। হাড়ে লাগেনি। আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো। ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের দিনে আমি ঢাকায় আসতে পারলাম না। জীবনে একটা ট্র্যাজেডি যে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ আমি দেখতে ব্যর্থ হলাম। ‘সূর্যোদয় দেখে এলাম’ বইটিতে সে কারণেই হয়ত আমি লিখেছি, ঢাকাতে পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণ দেখার ইচ্ছে ছিল, পারিনি। ময়মনসিংহ হাসপাতালে শুয়েছিলাম। কিন্তু নামিবিয়ার স্বাধীনতাপ্রাপ্তির মুহূর্ত দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। দক্ষিণ আফিকার বিরুদ্ধে নামিবিয়ার কালো মানুষেরা শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হলো, তারা স্বাধীন হলো।’



ঢাকা ফিরলেন কবে?

ঢাকা এসেছি ডিসেম্বরের ২৭ তারিখ। ঢাকায় এসে অনেক বন্ধু, মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্রজীবনের বন্ধু-বান্ধবকে পাই। তাদের সঙ্গেই থাকি। তখন তো আমরা কেউই অস্ত্রশস্ত্র জমা দেইনি। পরে অবশ্য অস্ত্র জমা দেই।



স্বাধীন বাংলাদেশে সাংবাদিকতার শুরু কবে?

দেশে এসে আমি কি করব ভাবছিলাম। এম এ পরীক্ষাটা তখনো দেওয়া হয়নি। ক্লাসও শুরু হচ্ছে না। এরই মধ্যে ’৭২ সালের ৮ জানুয়ারি তৎকালীন বিপিআই নিউজ এজেন্সিতে যোগ দিলাম। আগে ছিল পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনাল (পিপিআই)। ‘পি’টা পরিবর্তন হয়ে ‘বি’ হয়ে গেল। এখানে ওদের একটা ব্যুরো অফিস ছিল। তখন প্রথম সম্পাদক হলেন চৌধুরী আবুল ফজল মোহাম্মদ হাজারী। কক্সবাজারে বাড়ি। খুবই যোগ্য এবং সিনিয়র সাংবাদিক ছিলেন।

একদিন হঠাৎ প্রস্তাব এলো নিউজ এজেন্সিতে ঢুকব কি না। সৈয়দ মোস্তফা জামাল চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক। আগে থেকেই আমাকে চিনতেন। বললেন, ‘আপনি ঢুকবেন নাকি। হাজারী সাহেব সম্পাদক।’ এখন জাসদের অফিস যেটা তার উপরতলাটা ছিল পিপিআই অফিস। হাজারী সাহেব অনেক সিগারেট খেতেন। মিনার বলে একটা সিগারেট ছিল ওটা তিনি বেশি খেতেন। তিনি আমাকে বললেন হারুন, দেখেন (পিপিআই) কী দাঁড়াবে না দাঁড়াবে জানি না। টাকা-পয়সা কে দেবে জানি না। তবে আমরা চেষ্টা করব। দেশে নিউজ এজেন্সির দরকার আছে। আমার ভাগ্যের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন। দেখাই যাক না।’



হাজারী সাহেবের পর সম্পাদক হলেন কে?

তারপর সম্পাদক হলেন মীজানুর রহমান। এক সময় ইত্তেফাকের চিফ রিপোর্টার এবং খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর। কাজ করতে থাকলাম। এরপর ’৭৫ সালের প্রথম দিকে বিপিআই ও বাসস সরকারি নির্দেশে একীভূত হলো। বিবিআই আর থাকল না। আমরা আত্তীকরণ হয়ে গেলাম বাসসে।



তখন তো সাংবাদিকতায় নতুনরাই বেশি ছিলেন?

বিপিআই একটা ছোট্ট নিউজ এজেন্সি। আমরা কয়েকজন মাত্র রিপোর্টার। আমি, ড. আলী রেজা খান। পরবর্তীতে সে পাখি বিশেষজ্ঞ। আমরা থাকতাম আজিমপুরে আলী রেজাদের বাসায়। ওখান থেকে হেঁটে বা রিকশা দিয়ে প্রেসক্লাবে আসতাম, সেখান থেকে অফিসে যেতাম। আলী রেজা শিক্ষক হয়ে চলে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি পেশাতেই রয়ে গেলাম। তখন সুবিধাটা ছিল কি, আমরা নতুন দেশের নতুন সাংবাদিক। পুরনোদের কেউ কেউ পাকিস্তানিদের দালালি করার কারণে পালিয়েছে, কেউ সিনিয়র পদে বসেছে। কাজেই রিপোর্টার নতুনরাই।



বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে?

দেখা মানে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমি মাত্র কয়েকটি ট্যুরে গেছি। দুটোর কথা বেশ মনে আছে। ১৯৭৩ সালে যখন দেশের প্রথম নির্বাচন হলো তখন পুরো সিলেট-চট্টগ্রাম অঞ্চলে বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনী প্রচারে আমি তার মিডিয়া টিমের একজন ছিলাম। অনেকেই ছিলেন, তবে নতুনদের মধ্যে আমিও। স্পষ্ট মনে আছে, বঙ্গবন্ধু তাঁর সফরসঙ্গি সাংবাদিকদের খোঁজখবর নিতেন। কে খেল, কে খেল না এসবের দিকে খেয়াল রাখতেন।

আরেকটা ঘটনা আমার মনে আছে, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি গঠিত হয় কুমিল্লা সেনানিবাসে। বঙ্গবন্ধুই উদ্বোধন করেন। আমি সেখানে রিপোর্টার হিসেবে গিয়েছিলাম। জিয়াউর রহমান তখন সেখানে, তাকে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ করে ঢাকায় আনলেন বঙ্গবন্ধু। কর্নেল তাহেরকে জিয়াউর রহমানের ওই জায়গায় বসালেন।



বঙ্গবন্ধু সেদিন কী বলেছিলেন, মনে আছে?

মিলিটারি একাডেমির উদ্বোধনের পর দরবার হলে বঙ্গবন্ধু আবেগময় ভাষণ দিলেন। তিনি একসময় কেঁদে ফেললেন, বললেন, ‘এই সেনানিবাসে একবার আমাকে বন্দি করে আনা হয়েছিল। সেদিনই ঠিক করেছিলাম, যদি কোনোদিন সুযোগ পাই, বাংলাদেশ যদি স্বাধীন করতে পারি, এই কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টেই স্বাধীন দেশের মিলিটারি একাডেমি করব। আজ সেই স্বপ্ন আমার পূরণ হল।’



বঙ্গবন্ধু কি তখন আপনাকে চিনতেন?

না, তিনি চিনতেন না। এমন কেউ আমি ছিলাম না। সবেমাত্র যুদ্ধ-ফেরত একজন তরুণকে কেনই বা তিনি চিনবেন। চা-নাস্তা খাওয়ার সময় কর্নেল তাহের আমাকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন, এর নাম হাবীব, যুদ্ধে আমার সঙ্গে ছিল। বঙ্গবন্ধু আমাকে গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘খাইসস?’ খুব বেশি আন্তরিক মানুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। পরে তো সিনিয়র রিপোর্টারদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে অনেক গিয়েছি, খেয়েছি। আতাউস সামাদ, ফয়েজ আহমেদ, হেদায়েত হোসেন মোর্শেদ, জোয়াদুল করিম আমার অনেক সিনিয়র ছিলেন। তাদের সঙ্গে অনেকবার গিয়েছি সাংবাদিকতার কাজে। বঙ্গবন্ধু ওদের সবাইকেই নামে চিনতেন।



বঙ্গবন্ধুকে যেদিন হত্যা করা হলো সেদিনের কোনো স্মৃতি কি মনে আছে?

আমি তখন বার্তা সংস্থা বাসস-এ কাজ করি। সেদিনের স্মৃতিটা মনে পড়ে বৈকি। আমাদের মেয়ে শুক্লা তখন তার মায়ের গর্ভে। আমার শ্বশুর তখন কুষ্টিয়ার জগতি সুগার মিলের চিফ ক্যামিস্ট। ঠিক হলো কুষ্টিয়াতেই মেয়ের জন্ম হবে। যশোর হয়ে রচি (আমার স্ত্রী) সেখানে চলে গেলেন কিছুদিন আগে। আমি কলাবাগান এক নম্বর লেনে একটা ছোট্ট ভাড়া বাড়িতে থাকি। বাড়িতে আমার মা। সেদিন বোধহয় কী একটা ধর্মীয় ‘অকেশন’ ছিল। অনেক রাত পর্যন্ত নামাজ-কালাম পড়লেন মা। হঠাৎ সকালের আগে বা শেষ রাতে গোলাগুলির শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। শব্দগুলো কাছে বুঝতে পারি। আম্মা আমাকে ডেকে তুলে বললেন, ‘বাবা, এত গোলাগুলির শব্দ কেন?’ সূর্য তখনও উঠেনি। দেখি অনেক লোক রাস্তায় বেরিয়ে গেছে। আমিও ঘর থেকে বের হলাম। হাঁটতে হাঁটতে ধানমন্ডি মাঠের কাছে গেলাম। আমাদের গলিটা থেকে বেরুতেই দেখি রাস্তায় কয়েকটা ট্যাঙ্ক দাঁড়িয়ে আছে। ট্যাঙ্কে লোকজন নিজেদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করছে। সাধারণ মানুষকে কিছু বলছে না। কী হয়েছে জানতে চাইলে কে যেন বলল, বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলা হয়েছে। এ রকম একটা ঘটনা বাংলাদেশে ঘটবে, সেটা অবিশ্বাস্য ছিল। কিন্তু ঘটেছিল তাই। পরে অবশ্য শোনা গেছে, ওই ট্যাঙ্কগুলোতে কোনো গোলাগুলি ছিল না।



সেখান থেকে কোথায় গেলেন?

বাসায় এসে মা, ছোট বোনটাকে বলতেই ওরা কান্নাকাটি শুরু করল। বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছে! কারা মারল? কে মারল? দেশে এখন কী হবে? আসলে স্পষ্ট কিছুই জানা যাচ্ছে না। তখন আমি ভাবলাম দ্রুত অফিসে যাই, গেলে হয়ত কমবেশি জানা যাবে। মা কিছুতেই আমাকে ছাড়বেন না। কিন্তু আমি বাইরে বেরুলাম। অফিসে গেলাম। অফিস বলতে এখন যেটা এখনকার বাসস-এর অফিস। দোতলা থেকে নিচের রাস্তা দেখা যায়। তখন অনেকে জেনে গেছে যে, বঙ্গবন্ধু মারা গেছেন। ডালিম নাকি এর মধ্যেই রেডিওতে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়টি ঘোষণা দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর রাস্তায় দেখলাম কয়েকটি ট্যাঙ্ক ও গাড়ি বহর যাচ্ছে। বঙ্গভবনের দিকে। একটি গাড়িতে টুপি পরা খোন্দকার মুশতাককে দেখা গেল। সে নাকি প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছে। রেডিওতে না কোথায় জানি ছিল, সেখান থেকে বঙ্গভবনের দিকে যাচ্ছে। বহরের একটা গাড়িতে দেখা গেল, নুরুল ইসলাম মঞ্জু, সাংবাদিক তাহের উদ্দিন ঠাকুরসহ আরও কয়েকজন। এরা পরে মুশতাক সরকারের মন্ত্রী হয়েছিল।



আপনার বর্ণাঢ্য সাংবাদিকতা জীবনের বাকিটা সময় কোথায় কাজ করেছেন?

বিপিআই থেকে এসে আমি বাসসেই ছিলাম। বিদেশের নানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি বছরের পর বছর। জার্মান বেতার তরঙ্গ ‘ডয়েৎসে ভেলে’, ‘টাইম ম্যাগাজিন’ এবং ভারতের মর্যাদাশীল ইংরেজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’সহ অনেক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছি। ১৯৯৯ সালে যখন বাসস-এর প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলাম তখন প্রচুর চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছিল। বুঝতেই পারবে, ওটা শেখ হাসিনার প্রথম আমল। একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। সব প্রতিষ্ঠানেই সরকার বিরোধীদের সংখ্যা অনেক। আমার মতো একজনকে জাতীয় সংবাদ সংস্থার প্রধান বানানো হয়েছে, কাজেই সামলাতে হয়েছে অনেক কিছুই। দেখতে দেখতেই আমার নিয়োগের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা হলো। এগুলোকে মোকাবেলা করতে হলো। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলো। ওটা ছিল বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সরকার গঠনের তিন থেকে চার দিনের মাথায় আমাকে বদলি করে তথ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হলো। আমি তো অবাক।



অবাক হলেন কেন?

কারণ হলো আমি তো সাংবাদিকতা করি, কোনো সরকারি চাকরি করি না। আমাকে কেন ‘ট্রান্সফার’ করা হবে? বিএনপি-জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হলো, যদি এই লোককে বাসস-এ রাখা হয় তাহলে নির্বাচনে ‘মিডিয়া ক্যু’ হয়ে যাবে। হাস্যকর সব যুক্তি। চিঠি দিয়ে জানালাম, আমি সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে জাতীয় সংবাদ সংস্থার প্রধান হয়েছি। তার মানে এই নয় যে, আমি সরকারি কর্মচারী হয়ে গেছি। কাজেই এ প্রতিষ্ঠান থেকে আমার চাকরি পরিবর্তনযোগ্য নয়। ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলাম আমার হয়ে হাইকোর্টে একটা মামলা করলেন। এর মধ্যে এক-দেড় মাস কেটে গেল। আমি তখন আর বাসস-এ নেই। তখন জোর করে সরকার মোফাখখারুল আনাম নামে একজনকে অস্থায়ীভাবে বাসস-এর এমডি ও প্রধান সম্পাদক বানিয়ে দেওয়া হলো।



শুনেছি, বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতা এসে আপনাকে চাকরিচ্যুত করেছিল?

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার কয়েকদিনের মাথায় বেশ কয়েকজন সচিবসহ আমাকেও চাকরিচ্যুত করল। পরে শুনেছি ‘হাওয়া ভবন’ থেকে এগুলোর তালিকা করা হয়েছে। এই অপকর্মটির বিরুদ্ধে আমি হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করলাম। এ ভাবেই মামলা- মোকদ্দমা করে সাত বছর গেল। এই দীর্ঘ সময় আমাকে কোনো বেতন-ভাতা দেওয়া হলো না। শ্রদ্ধেয় ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিষ্টার তানিয়া আমীর আমার আইনজীবী। মামলার ‘ফাইলিং অ্যাডভোকেট’ ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। সাত বছর পর হাইকোর্টে আমি জয়ী হলাম। ওই সময়ের মিডিয়া জগতের এটি বড় ঘটনা। কিন্তু তাতেও রেহাই নেই। সরকার ও বাসস কর্তৃপক্ষ আবারও সুপ্রিম কোর্টে আপিল করল। সেখানেও জয়ী হলাম। এটাকে ঐতিহাসিক রায় বলা যায়। হাইকোর্টের রায়টা দিয়েছিলেন বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক।

তারপর আমি আর বাসস-এ যাইনি। মোটামুটি ক্লান্তই হযে পড়ি আমি। আর কত যুদ্ধ!



আপনাদের সময়কার সাংবাদিকতা কেমন ছিল? তখনকার সঙ্গে এখনকার পার্থক্য দেখতে পান?

আমাদের সময়ে কর্পোরেট লেবেলের সাংবাদিকতা ছিল না। সাংবাদিকতায় যতটা রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব আজ, ততটা তখন ছিল না। সাংবাদিকতা একটা স্বাধীন পেশা, একটা বিবেকী পেশা। ইদানীংকালে মিডিয়ার ধরন অনেক বদলেছে। তখন ছিল শুধু নিউজ পেপার, রাষ্ট্রীয় রেডিও-টিভি। এখন তো আর তা নেই। বেসরকারি খাতে সবকিছু চলে গেছে। বরং সরকার নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলোর গুরুত্ব নেই বললেই চলে। আমার ধারণা, তখনকার সাংবাদিকতার মধ্যে চাকচিক্যের ব্যাপারটা কম থাকলেও সামাজিক দায়বোধের ব্যাপারটা বেশি ছিল। পরে তো দুঃখজনকভাবে সাংবাদিকতায় দলীয়করণ ঢুকে গেল।



সাংবাদিকতার মধ্যে দলীয়করণটা কবে থেকে শুরু হলো?

এটা প্রকট হয়েছে ১৯৯০-৯২ সালের দিকে। খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামলে রাজনৈতিক বিভেদে সাংবাদিক ইউনিয়ন ভাগ হয়ে গেল। আজকে প্রেসক্লাব নিয়ে এত সংকট, তখন এসব কিছুই ছিল না। বিভিন্ন মতের লোক প্রেসক্লাবের সদস্য হয়েছে। তর্ক করছে, বিতর্ক করছে, যার যার অফিসে কাজ করছে। সম্পাদকীয় নীতিতে একেকটা পত্রপত্রিকা একেক রকম, সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তার মানে এই নয়, পেশাজীবী সাংবাদিকরা একে অপরের শত্রু। এখন তো দেখছি শত্রু হয়ে গেছে। রাজনীতি যারা করেন তারা একে অপরের শত্রু হয়ে গেছেন। সে সময় এমনটা ছিল না।



ইতিবাচক পরিবর্তনও তো এসেছে সাংবাদিকতায়?

হ্যাঁ, তখনকার সাংবাদিকতার সঙ্গে এখনকার সাংবাদিকতার গুণগত পার্থক্য হচ্ছে, তখন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন খুব একটা ছিল না। টাইপরাইটার দিয়ে কাজ করতাম। একটা মজার গল্প বলি। আমার বিয়ের জন্য মেয়েপক্ষের লোকজন এসেছিল। তো বরকে  দেখতে হবে, জানতে হবে, বুঝতে হবে। তাই বরকে দেখার জন্য বিপিআই অফিসে গিয়ে পৌঁছলেন কয়েকজন ’৭৩-৭৪ সালে। যারা গেছেন তাদের আমি চিনি না। গিয়ে তারা অবাক হয়ে দেখেছেন আমি টাইপরাইটারে কিছু একটা লিখছি। আর যায় কোথায়? ফিরে গিয়ে তারা রিপোর্ট দিয়েছেন, কীসের সাংবাদিক, সে তো টাইপিস্ট। নিজের চোখে দেখে এলাম আমরা। ব্যাস, বিয়ে আর এগুলো না, ভেঙে গেল। তাতে অবশ্য ভালোই হয়েছে। আমার পছন্দের মানুষটাকে আমি পেয়েছি।



এখন তো তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে সাংবাদিকতাতেও...

এখন সবাই কম্পিউটারে কাজ করে, বাংলা ও ইংরেজিতে, সব কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তথ্যপ্রযুক্তির রেভ্যুলেশন যেটা হয়েছে সেটা আমাদের সময় ছিল না। কিন্তু আমার মনে হয়, বর্তমান সাংবাদিকতাটা খুব বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই ‘পারপাস সার্ভ’ (উদ্দেশ্য সাধন) করার সাংবাদিকতা হচ্ছে। সেটা ‘কর্পোরেট বিজনেস’-এর স্বার্থ হোক, মৌলবাদীদের ‘ফান্ডিং’ হোক, মালিকের স্বার্থ হোক। আগের সাংবাদিকতার মধ্যে আদর্শবাদিতা যতটা ছিল এখন যেন নেই; বহুলাংশে সাংবাদিকতাটা গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার বা কিছু একটা করার ‘প্রোপাগান্ডা’ নির্ভরশীল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কথাটা হয়ত সর্বক্ষেত্রে সত্য নয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে সত্য তো বটেই।



আপনার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলুন?

আমার স্ত্রীর নাম আসমা পারভীন রচি। আমার একটি মেয়ে ও একটি ছেলে। মেয়ের নাম হুমায়রা পারভীন শুক্লা। ছেলে তানবীর হাবীব শুভ। শুক্লা পড়াশোনা করেছে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওখান থেকে সে মাস্টার্স করেছে। তার পরে ‘এশিয়ান কলেজ অব জার্নালিজম’ থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করেছে। ভারতে ও বাংলাদেশে কিছুদিন কাজ করেছে। বাংলাদেশে ওর যখন প্রথম পোস্টিং হলো, তখন আমি চাকরিচ্যুত। অনেক স্ট্র্যাগল করতে হয়েছে ওকে। হারুন হাবীবের মেয়ে বলে অনেকের কাছে সম্মান যেমন পেত, আবার অনেকের কাছে বিড়ম্বনার পাত্রও ছিল। আমাকে নিয়ে প্রতিদিন পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট বের হয়। অধিকাংশই কুরুচিপুর্ণ সমালোচনা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মানুষ বলেই সে চ্যালেঞ্জ আমি গ্রহণ করেছিলাম। শুক্লা এক বছরের মাথায় জার্মান টেলিভিশনে চলে গেল। ৪-৫ বছর সেখানে ছিল। তারপর বিয়ে করল। লন্ডনে গিয়ে আরও পড়ালেখা করল, এখন ওখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। ছেলে শুভ মূলত শিল্পমনস্ক মানুষ। ঢাকায় পড়ালেখার পর লন্ডনে পড়েছে। সেখানেই গ্র্যাজুয়েশন করেছে। বিয়েশাদির পর আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে।



আপনার বিয়ে সম্পর্কে বলছিলেন। বিয়ে করলেন কবে?

১৯৭৪ সালে ৮ নভেম্বর দিনাজপুরে আমাদের বিয়ে। দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ সুগার মিলে। আমার শ্বশুর আবুল কাশেম ম-ল ওখানকার চিফ কেমিস্ট্র ছিলেন। এই নিয়ে একটা গল্প আছে। আমার এলাকা দেওয়ানগঞ্জে যে একটা সুগার মিল আছে তিনি ওখানে চাকরি করতেন। তিনি তো কেমিক্যাল বিজ্ঞানী। মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহারের আমার প্রথম বোমাটি তিনিই বানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আমার পিতৃসম। মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগের সময়। চিনিকলে তার বাড়িতে বসেই আমি গান ও গীতি নকশা লিখতাম। ওস্তাদ ফজলুল হক সুর করতেন। আমার স্ত্রীও গায়ক দলের মধ্যে একজন। সেখান থেকেই পরিচয়। পরে আমার শ্বশুর বদলি হয়ে চলে যান দিনাজপুরে ১৯৭৩ সালে। পারিবারিকভাবে বিয়েটা সম্পন্ন হয় সেতাবগঞ্জে। আমার বিয়ের কয়েকজন সাক্ষী আজও আছেনÑ লেখক, সাংবাদিক রাহাত খান, ড. আলী রেজা খান। ভাঙাচোরা একটা বাসে চেপে তারা আমার সঙ্গে ঢাকা থেকে দিনাজপুর গেলেন। সেখান থেকে ট্রেনে যেতে হলো সেতাবগঞ্জ। আমার ছোট বোনেরাও সঙ্গে ছিল। গভীর রাতে দিনাজপুর নেমে একটা হোটেলে ছিলাম। সকালে উঠে বর সেজে ট্রেনে করে সেতাবগঞ্জে যেতে হবে। তখন দুর্ভিক্ষ চলছিল।



আপনার লেখালেখি সম্পর্কে কিছু শুনি?

আমার লেখালেখির একটা গ-ি আছে। সেটা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিচারণ, প্রবন্ধ, পত্রিকার কলাম যা কিছুই লিখেছি তার সিংহভাগ মুক্তিযুদ্ধ। এ কারণে আমার প্রতি একটা অভিযোগও আছে যে, এই লেখক কি আর বিষয় পায় না? সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যক্তিক কতকিছুই তো আছে। আমার কাছে মনে হয়, আমি বলি এবং লিখিও যে, মুক্তিযুদ্ধটা হচ্ছে বাঙালি জাতির এমন এক বড় বিষয় যে, একজন-দুজন সারা জীবন লিখলেও তা শেষ হওয়ার নয়। কাজেই আমার জীবনটা না হয় আমি এই বিষয়টার উপরই কাটিয়ে দিলাম।

আরেকটা দিক হচ্ছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটা ৪৪ বছর পরও প্রাসঙ্গিক। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যে চ্যালেঞ্জটা ১৯৭১ সালে ছিল সে চ্যালেঞ্জ যায়নি। বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্য দিয়ে চ্যালেঞ্জটা আরও জোরদার হয়েছে। সামরিক শাসন যতবার এসেছে তারা এই চ্যালেঞ্জটাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের একজন সৈনিক হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, আমি ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছি, কলম হাতে যুদ্ধ করেছি। এখন তো অস্ত্র হাতে যুদ্ধের সুযোগ নেই, কিন্তু কলমের যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে পারলে শান্তি পাব।



বর্তমান রাজনীতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বর্তমান রাজনীতি সম্পর্কে, সংক্ষিপ্তভাবে যদি বলি, আমার কাছে মনে হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির আস্ফালন প্রকট আকার ধারণ করেছে। যারা এ রাষ্ট্রের জন্মের বিরোধিতা করেছিল তারা হয়ত মনে করছে, এখন একটা সুযোগ এসেছেÑ কারণ তারা সংগঠিত হয়েছে টাকায়, অস্ত্রে। তাই তারা ভাবছে, এখন মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে তাদের পরাজিত করতে হবে, চ্যালেঞ্জ করতে হবে।

২০১৩ সালে যেটা দেখেছি। জামায়াতে ইসলামী যেভাবে সারা দেশে সহিংসতা করেছে, সেটাকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বলার কোনো সুযোগ নেই। তারা পুলিশকে আক্রমণ করেছে, রাস্তাঘাট পুড়িয়ে দিয়েছে, রেল লাইন উড়িয়েছে, রেজিস্ট্রি অফিস পুড়িয়েছে। একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তারা তৈরি করেছে। এক কথায় তারা একটা গেরিলা যুদ্ধ করেছে এবং তা প্রকাশ্যেই। কারণ তারা যুদ্ধাপরাধ বিচার ঠেকাতে চায়।



যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কি মুক্তিযুদ্ধের পর পর শুরু হয়েছিল?

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তো স্বাধীনতার পর পরই শুরু হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমান সবাইকে ছেড়ে দিয়েছে। এমন কি যাদের বিচার হয়েছিল, শাস্তি হয়েছিল, তাদেরও জেল থেকে ছেড়ে দিয়েছে। ফলে জিয়াউর রহমানের পুরোটা সময়, খালেদা জিয়ার পুরোটা সময়, এরশাদের পুরোটা সময় যুদ্ধাপরাধীরা ক্রমান্বয়ে আর্থিকভাবে, সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে শক্তিশালী হয়েছে। যে কারণে তারা আজ সাহসটা দেখাতে পারছে। একটা কথা স্পষ্ট করেই বলি, বাংলাদেশ একটা গণতান্ত্রিক দেশ, একটা সংবিধান আছে তার। এখানে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করলেই কেউ রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে যায় না, যেতে পারে না। কিন্তু মজার ব্যাপারটা হচ্ছে, যখন রাজনৈতিক কর্মকা-ের নামে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালানো হচ্ছে, তখন আওয়ামী লীগকেই আবারও নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে বাংলাদেশ বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, এখন চার যুগ পর নতুন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। এটা তো ঐতিহাসিক সত্য।



২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কীভাবে দেখেন?

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির যে নির্বাচন তা নিয়ে কথা উঠছে। হ্যাঁ, এক অর্থে এটা স্বাভাবিক অবস্থার কোনো নির্বাচন নয়। কম লোক গিয়েছে, অনেক জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি ইত্যাদি। কিন্তু নির্বাচনটা না হলে কী হতো? হয় সামরিক শাসন, না হয় ‘স্টেট অব ইমার্জেন্সি’। কতদিন চলত ঠিক নেই। গণতন্ত্র থাকত না। কাজেই সে নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক রক্ষার, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবার।



তাহলে সংবিধান রক্ষায় নির্বাচন হয়েছে?

নিশ্চয়ই। শেখ হাসিনার সরকার সাহসের প্রশংসার দাবি রাখে। তারা সাহস, শক্তি দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নিয়ে বিরোধিতাকারীদের নতুন করে পরাজিত করেছে। এটা কোনো সাধারণ, স্বাভাবিক নির্বাচন নয়। হ্যাঁ, নির্বাচন কেউ না করতেই পারে। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত কি তাই করেছে? না করেনি। তারা সাত শর  মতো স্কুলঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। প্রিজাইডিং অফিসারকে মেরেছে। তারা একটা যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে তা মোকাবেলা করতে হয়েছে। আমি এভাবেই দেখি।



বিএনপির অভিযোগ তাদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে?

এবার (২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী তিন মাস) বিএনপি যা করল মানুষ পুড়িয়ে মারা, এটা কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে পড়ে না। হ্যাঁ, স্বীকার করি বিরোধী শক্তিকে অবশ্যই একটা ‘স্পেস’ দিতে হবে। কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। সরকারের সমালোচনা দিতে হবে। তবে কেন দেয়নি। খালেদা জিয়া এবং তার দল প্রমাণ করেছে তারা কী ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে চেয়েছিল। তাই তাদের সঙ্গে যে আচরণ করা উচিত সরকার হয়ত সে আচরণই করছে।

তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় আমি বর্তমান সরকার এবং মুক্তিযুদ্ধপন্থিদের সতর্ক করতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ বিরোধীরা যে আন্দোলন শুরু করেছে সে আন্দোলন শুধুমাত্র একটা বা দুটো লড়াইয়ে শেষ হয়ে যাবে না। কাজেই আত্মতুষ্টির কিছু নেই। ওরা দীর্ঘস্থায়ী একটা সমরের প্রস্তুতি নিয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের শোধ তারা নেবেই। তাদের সঙ্গে পাকিস্তান তো আছেই, আরো কিছু আন্তর্জাতিক মদদদাতাও আছে।



আপনার পরামর্শ কী?

কাজেই এ সরকারকে শুধু একÑদুটো ‘ব্যাটেল’ এ জিতলে হবে না, ‘ফাইনাল ওয়ারে’ জিততে হবে। কাজেই আত্মতুষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে সম্মিলিতভাবে এই রাষ্ট্র ও প্রগতি বিরোধী আগ্রাসন রোধ করতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ এটা শুধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দায়মুক্তি নয়, মুক্তিযুদ্ধের যে কাজটি অসম্পন্ন রয়ে গেছে, যা না হলে মুক্তিযুদ্ধই সম্পন্ন হবে না, সেটাকে পূরণ করার। এই ঐতিহাসিক বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম নতুন করে মুক্তযুদ্ধ দেখছে। যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধগুলো দেখছে। এরা কারা? ধর্মের নামে, ভারত বিরোধিতার নামে, পাকিস্তান পছন্দের নামে এরা বাংলাদেশে কী করেছে, তাই দেখছে নতুন প্রজন্মরা।



এক নজরে হারুন হাবীব

মুক্তিযুদ্ধের নিবেদিতপ্রাণ মানুষ হারুন হাবীব। একাত্তরের গেরিলা যোদ্ধা ও রণাঙ্গন সংবাদদাতা। রণাঙ্গন থেকে ফিরে যে কয়েকজন সমাজ সচেতন মানুষ সাংবাদিকতা ও সাহিত্যকে বেছে নেন, হারুন হাবীব তাঁদের অন্যতম। তিনি একাধারে গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার। একই সঙ্গে সমাজসচেতন লড়াকু মানুষ তিনি, যিনি দীর্ঘকাল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম, বর্তমানে ‘সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরাম’-এর মহাসচিব।

জন্ম ১৯৪৮। পেশা : সাংবাদিকতা ও সাহিত্য। শিক্ষাগত যোগ্যতা : এম. এ সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৪। সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব : প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : উপন্যাসÑসোনালি ঈগল ও উদ্বাস্তু সময়, পাঁচপুরুষ, প্রিয়যোদ্ধা, প্রিয়তম। গল্পগ্রন্থ : ছোটগল্পসমগ্র ১৯৭১, গল্পসপ্তক, বিদ্রোহী ও আপন পদাবলী, লালশার্ট ও পিতৃপুরুষ, স্বর্ণপক্ষ ঈগল, মুক্তিযুদ্ধ। নির্বাচিত গল্প, প্রবন্ধ ও স্মৃতিচারণ : মুক্তিযুদ্ধ বিজয় ও ব্যর্থতা। মুক্তিযুদ্ধÑডেডলাইন আগরতলা, জনযুদ্ধের উপাখ্যান, রবীন্দ্রনাথের ত্রিপুরা, গণহত্যা প্রতিরোধ স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত প্রবন্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধ, মুক্তিযুদ্ধ পালাবদলের ইতিহাস, ইধহমষধফবংয : ইষড়ড়ফ ধহফ ইৎঁঃধষরঃু, ইধহমষধফবংয : মবহড়পরফব ১৯৭১। নাটক : অগ্রাহ্য দন্ডোৎসব, পোস্টার ৭১। মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে সার্বিক অবদানের জন্য ২০১৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন।



লেখক তালিকা