This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Liberation War of Bangladesh and Genocide of Innocent Bengali People in 1971.
More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

The Exeter South Asia Centre of the College of Humanities of the University of Exeter listed ‘Muktijuddho e-Archive’ as a source for Research materials.
The University of Exeter is a public research university located in Exeter, Devon, South West England, United Kingdom. 
This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

ইতিহাসের কালো অধ্যায় ও জিয়ার নৃশংস শাসনকাল - সানাউল্লাহ

ইতিহাসের কালো অধ্যায়
জিয়ার নৃশংস শাসনকাল

সানাউল্লাহ


ইতিহাসের কালো অধ্যায়

১.
১৯৭৫ সাল নিয়ে আমাদের জানার আগ্রহ ভীষণ। বাংলাদেশের ৩৮ বছরের ইতিহাসে ওই সময়টা ছিল প্রচণ্ড অস্থিরতা আর বিভ্রান্তির। রাজনীতি নিয়ে জাতি হিসাবে বাঙালির আগ্রহ সম্ভবত বিশ্বে বিরল। এতো দরিদ্র, এতো ছোট অথচ জনবহুল এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশের মানুষের এইরকম রাজনৈতিক সচেতনতা আমি জানি না আর কোথাও দেখা যায় কিনা!

কি ঘটেছিল ১৯৭৫ সালে? স্বাধীন এবং নবীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এই বছরটার কথা কি লজ্জার কালো কালিতে লেখা থাকবে? বলা হবে অন্ধকারের সময়? একের পর এক সব অকল্পনীয় সব ঘটনা। কোনটা ফেলে কোনটার কথা বলবো? সিসিবির পাঠকদের আগ্রহে এই ধারাবাহিকে আমাকে আবার পেছনে যেতে হচ্ছে। এর অনেক কিছুই হয়তো অনেকে জানে। তারপরও সবকিছুকে একটা সূতোয় গাঁথা এবং তার ওপর নিজের পর্যবেক্ষণ যুক্ত করা নিঃসন্দেহে উপভোগ্য বিষয়। আমার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সবাই একমত হবে, এমন উদ্ভট আকাঙ্খা করি না, চাইও না। বরং ভিন্নমত আসলে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক জমে ওঠে। নিজের কোনো বিভ্রান্তি থাকলে সেটাও দূর করার সুযোগ তৈরি হয়।

বছরের শুরুতেই ২ জানুয়ারি দেশের মানুষ হতভম্ব হয়ে যায় আত্মগোপনে থাকা মাওবাদী সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদারের মৃত্যুর খবর শুনে। ভারতের মাওবাদী নকশালপন্থী চারু মজুমদারের অন্ধ অনুসরণে সিরাজ শিকদার সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পথ বেছে নিয়েছিলেন স্বাধীনতার পরপর। নকশালবাড়ি বলে একটা জায়গা থেকে চারু মজুমদার ও তার দলের সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল বলে পরে নকশালপন্থী শব্দটা চরমপন্থী মাওবাদীদের বোঝাতে ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। থানা দখল, পুলিশের অস্ত্র লুট, ব্যাংক লুট, জোতদার (গ্রামের ভূস্বামী) ও আওয়ামী লীগের নেতা-সমর্থকদের হত্যা ছিল তার রাজনৈতিক কৌশল। তার রাজনীতি সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া ছিল সামান্যই। ঢাকা ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী ওই রাজনীতিতে আকৃষ্ট হলেও পশ্চিমবঙ্গে নকশালবাড়ি আন্দোলন যতোটা তরুণ-যুবকদের টেনেছিল বাংলাদেশে সেটা হয়নি। পুলিশ বলেছিল, গ্রেপ্তার হওয়া সিরাজ শিকদার তাদের গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যেতে চাইলে গুলিতে তিনি নিহত হন। কিন্তু পুলিশের ওই বিবৃতি মানুষ তখনো বিশ্বাস করেনি, আজো করেনা। যেমন এখন ক্রসফায়ারে মৃত্যুর একটি গল্পও আমরা বিশ্বাস করিনা।

সিরাজ শিকদারের রাজনীতি, আদর্শ হঠকারিতা মনে হতে পারে, কারো কারো কাছে ভুল মনে হতে পারে- কিন্তু তাই বলে তাকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা!

স্বাধীনতার পরের বছরগুলোতে হাজার হাজার রাজনৈতিক হত্যা হয়েছে, গুপ্তহত্যা, পরিকল্পিত খুন সবই ঘটেছে। তেমনি একটা ঘটনা ছিল ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে ৭ খুনের ঘটনা। সারা দেশ চমকে উঠেছিল এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞে। সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীন কোন্দলের পরিণতি ছিল এই হত্যাকাণ্ড। বর্তমান জাগপা নেতা শফিউল আলম প্রধান ছিল ওই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের হোতা।

তালুকদার মনিরুজ্জামানের বই থেকে উদ্ধুতি দিয়ে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক আবু সাইয়িদ তার “বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড : ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডকুমেন্টস” বইয়ে জানান, ১৯৭২ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৭৩ সালের জুন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ২,০৩৫ টি গুপ্তহত্যা, ৩৩৭টি অপহরণ, ১৯০টি ধর্ষন, ৪,৯০৭টি ডাকাতির ঘটনা ঘটে এবং ৪,০২৫ জন বিভিন্ন চরমপন্থী নানা দলের হাতে খুন হন। ১৯৭৪ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানালেন, জাসদের গণবাহিনী, চীনাপন্থী বিভিন্ন উপদল ও চরমপন্থী নানা সশস্ত্র শক্তির হাতে ১৫০টি ছোট-বড় হাটবাজার লুট, অর্ধশত ব্যাংক ডাকাতি, প্রায় দুই ডজন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি লুট হয়েছে।

স্বাধীনতার পরপর ১৯৭২ সালেই ছাত্রলীগ বিভক্ত হয়েছিল। ২১ জুলাই আওয়ামী লীগপন্থী নূরে আলম সিদ্দিকীর আহ্বানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগ দেন বঙ্গবন্ধু। আর একই সময় পল্টন ময়দানে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে ছাত্রলীগের আরেক সম্মেলন করেন আ স ম আব্দুর রব। ছাত্রলীগের মতো একে একে শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ বিভক্ত হয়। আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে রব, শাজাহান সিরাজ, হাসানুল হক ইনুরাই ওই বছরই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ গঠন করে। কর্নেল আবু তাহের ১৯৭৪ সালে সামরিক বাহিনীর জেসিও-এনসিওদের মধ্যে গঠন করেন “বিপ্লবী গণবাহিনী”।

স্বাধীনতাত্তোর রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ বিরোধীতা যেমন শুরু থেকে দানা বাঁধছিল, তেমনি আওয়ামী লীগ নিজেও দলীয় কোন্দলে ডুবে গিয়েছিল। খন্দকার মোশতাক, মাহবুবুল আলম চাষী, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম চক্র সক্রিয় ছিল কোনোভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে আবারো একটা সম্পর্কে জড়ানো যায় কিনা সেটা নিয়ে। কিন্তু জেলায় জেলায় অবস্থাটা কেমন ছিল। আওয়ামী লীগ নেতারা পরস্পরের বিরুদ্ধে চরম কোন্দলে জড়িয়েছিলেন। রক্ষী বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার, শ্রমিক লীগের নামে “লাল বাহিনী” গড়ে তোলা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার নামে চরম দলবাজি- এসব দেখে দেশের মানুষ দলটি এবং নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়েছে। আর এসবই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। দেখা গেছে, ষড়যন্ত্রকারীরা বরং বঙ্গবন্ধুর প্রশ্রয় পেয়েছে। ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু বেতার ভাষণে বললেন, “তিন হাজার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে চারজন জাতীয় সংসদ সদস্যকে।” ডিসেম্বরের শেষে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।

তারপর ‘৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে ভীষণ সমালোচিত সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস হয়। সংসদে আওয়ামী লীগের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যগরিস্টতা থাকায় এটা করতে বঙ্গবন্ধুকে কোনো সমস্যায় পরতে হয়নি। তিনি রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নিলেন। জাতীয় দল ঘোষণা হলো। সরকার পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার প্রচলন হলো। পরে ২৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় দল হিসাবে “বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ- বাকশাল” গঠিত হয়। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থকদের মধ্যে ভীষণ উচ্ছাস দখো গেলেও সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন মানুষ পছন্দ করেনি।

বঙ্গবন্ধু নিজে সারা জীবন সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। আর তিনিই কিনা একদলীয় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি বেছে নিলেন! তিনি বলেছিলেন, এটা সাময়িক ব্যবস্থা। দেশের অবস্থার উন্নতি হলেই আবার সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাবেন। কিন্তু সেটা আদৌ হতো কিনা কে জানে? অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ছাড়া বহুদলীয় ব্যবস্থায় ফেরা সহজ হতো না। এ নিয়ে আলোচনা-বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু কি হলে কি হতো, এমনসব হিসাব-নিকাশের উর্ধে চলে গেলেন বঙ্গবন্ধু। অনেকে তাকে “জাতির পিতা বা জাতির জনক” বললেও আমি উনাকে “বাংলাদেশের স্থপতি” বলাটা যথার্থ মনে করি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতিক হিসাবে যতোটা সফল ছিলেন, সরকার পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনায় তার দক্ষতা নিয়ে ততোটাই প্রশ্ন রেখে গেছেন। দলের লোকজন, আত্মীয়-স্বজনের ব্যাপারে তার ভালোবাসা বা প্রশ্রয় ছিল অন্ধের মতো। এমনকি রাজনৈতিক শত্রুকেও তিনি আগলে রেখেছেন। তাকে হত্যার আশংকা সেই ‘৭৪ সাল থেকে ভারতীয়, সোভিয়েত গোয়েন্দারা জানান দিয়েছিল। কিন্তু নিজের দেশের মানুষ তাকে হত্যা করতে পারে এমন বিশ্বাসই তার ছিল না। ‘মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ’- রবীন্দ্রনাথের এই দর্শন তার মতো করে কে আর অনুসরণ করেছিল?

২.
কিছু সেনা কর্মকর্তা ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেছিল। বিশেষ করে খুনি চক্র এবং বঙ্গবন্ধুর বিরোধীরা এমন একটা প্রচার দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে এসেছে। মেজর শরিফুল হক ডালিমের স্ত্রীর সঙ্গে সে সময়ের রেডক্রসের চেয়ারম্যান গাজী গোলাম মোস্তফার অসদাচরণকে এ ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে । বলা হয়, এ কারণে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। এক সময় তো এই অপপ্রচারটা ছিল শেখ কামালকে নিয়ে। বলা হতো, শেখ কামাল নাকি মেজর ডালিমের স্ত্রীকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন! কিন্তু সেটা যে ডাহা মিথ্যা তা জেনেছিলাম অনেক পরে, এ বিষয়ে বিভিন্ন বই পড়ে।

দীর্ঘদিন মিথ্যা শুনতে থাকলে এক সময় সেটাই সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। এটা আমার কথা না। হিটলারের প্রচারণা প্রধান গোয়েবলসের বহুল ব্যবহৃত ও আলোচিত উক্তিটি যে কতো সত্য তা আমি নিজের অভিজ্ঞতায় শিখেছি। সম্প্রতি মেজর ডালিমের ওয়েবসাইটের খবর দিলেন ফৌজদারহাটের এক বড় ভাই। সেখানে ওই বহু আলোচিত-সমালোচিত ঘটনা সম্পর্কে তার ভাষ্য পড়লাম।

এটা ছিল ১৯৭৪ সালের ঘটনা। মেজর ডালিমের বর্ণনায়, “১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি ……আমার খালাতো বোন তাহ্‌মিনার বিয়ে ঠিক হল কর্নেল রেজার সাথে। দু’পক্ষই আমার বিশেষ ঘনিষ্ট। তাই সব ব্যাপারে মধ্যস্থতা করতে হচ্ছিল আমাকে এবং নিম্মীকেই (ডালিমের স্ত্রী)। ঢাকা লেডিস ক্লাবে বিয়ের বন্দোবস্ত করা হয়েছে।” ওই অনুষ্ঠানে একটি ঘটনায় ডালিমের শ্যালক বাপ্পীর সঙ্গে তখনকার রেডক্রসের চেয়ারম্যান গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলেদের বিরোধ দেখা দেয়। ডালিম লিখেছে, বিয়ের অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে “হঠাৎ দু’টো মাইক্রোবাস এবং একটা কার এসে ঢুকল লেডিস ক্লাবে। কার থেকে নামলেন স্বয়ং গাজী গোলাম মোস্তফা আর মাইক্রোবাস দু’টো থেকে নামল প্রায় ১০-১২ জন অস্ত্রধারী বেসামরিক ব্যক্তি।” গাজী গোলাম মোস্তফার সহযোগীরা প্রথমে মুক্তিযোদ্ধা আলম ও চুল্লুকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। এর মধ্যে চুল্লুর মুখে গাজীর লোকেরা অস্ত্র দিয়ে আঘাত করায় তার ভীষণ রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তারা ডালিমকেও জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। এ অবস্থায় ডালিমের স্ত্রীও তার স্বামীকে একা যেতে দিতে চাইলেন না। তিনি এবং কনে তাহমিনার আম্মাও মাইক্রোবাসে উঠলেন।

গাড়িবহর শেরেবাংলা নগরের দিকে এগোতে থাকলে ডালিম ধারণা করছিলেন, গাজী গোলাম মোস্তফা তাকে রক্ষীবাহিনীর ক্যাস্পে নিয়ে নির্যাতন করবেন। তাই তিনি বললেন, “গাজী সাহেব আপনি আমাদের নিয়ে যাই চিন্তা করে থাকেন না কেন; লেডিস ক্লাব থেকে আমাদের উঠিয়ে আনতে কিন্তু সবাই আপনাকে দেখেছে। তাই কোন কিছু করে সেটাকে বেমালুম হজম করে যাওয়া আপনার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হবে না।” এরপর গাজী তাদের ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসার সামনে নিয়ে আসেন। বাইরের রাস্তায় এদের রেখে গাজী বাড়ির ভেতরে যান।

ডালিম তার ওয়েবসাইটে লিখেছেন, তাদের এভাবে তুলে আনার ঘটনা জানার পর তার ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা কামরুল হক স্বপন বীর বিক্রম (বর্তমানে ব্যারিস্টার তাপসের ওপর বোমা হামলা মামলায় গ্রেপ্তার আছেন) এবং তার ছোট বোন মহুয়ার স্বামী আবুল খায়ের লিটু (বর্তমানে ব্যবসায়ী ও বেঙ্গল গ্রুপের কর্নধার) ছুটে যায় এসপি মাহবুবের (বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা) বাসায়। উদ্দেশ্য মাহবুবের সাহায্যে গাজীকে খুঁজে বের করা। তারা বেইলি রোডের বাসায় এসপি মাহবুবের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। ডালিম জানান, এ সময় বঙ্গবন্ধুই মাহবুবকে ফোন করে তার বাসায় ডাকেন।

মেজর ডালিমের বর্ণনায় জানা যাক পরবর্তী ঘটনাবলী। বঙ্গবন্ধু বললেন,
“-মাহবুব তুই জলদি চলে আয় আমার বাসায়। গাজী এক মেজর আর তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের ধইরা আনছে এক বিয়ার অনুষ্ঠান থ্যাইকা। ঐ মেজর গাজীর বউ-এর সাথে ইয়ার্কি মারার চেষ্টা করছিল। উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে। বেশি বাড় বাড়ছে সেনাবাহিনীর অফিসারগুলির।
সব শুনে মাহবুব জানতে চাইলো,
-স্যার গাজী সাহেবকে জিজ্ঞেস করুন মেজর ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের কোথায় রেখেছেন তিনি?
-ওদের সাথে কইরা লইয়া আইছে গাজী। গেইটের বাইরেই গাড়িতে রাখা হইছে বদমাইশগুলারে। জানালেন প্রধানমন্ত্রী।
-স্যার গাজী সাহেব ডালিম আর নিম্মীকেই তুলে এনেছে লেডিস ক্লাব থেকে। ওখানে ডালিমের খালাতো বোনের বিয়ে হচ্ছিল আজ। জানাল মাহবুব।
-কছ কি তুই! প্রধানমন্ত্রী অবাক হলেন।
-আমি সত্যিই বলছি স্যার। আপনি ওদের খবর নেন আমি এক্ষুণি আসছি।
এই কথোপকথনের পরই মাহবুব লিটুকে সঙ্গে করে চলে আসে ৩২নং ধানমন্ডিতে। মাহ্‌বুবের ভিতরে যাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রেহানা, কামাল ছুটে বাইরে এসে আমাদের ভিতরে নিয়ে যায়। আলম ও চুল্লুর রক্তক্ষরণ দেখে শেখ সাহেব ও অন্যান্য সবাই শংকিত হয়ে উঠেন।
-হারামজাদা, এইডা কি করছস তুই?
গাজীকে উদ্দেশ্য করে গর্জে উঠলেন শেখ মুজিব। চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে নিম্মী এবং আমাকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি।”

এর মধ্যে সেনা কর্মকর্তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর জানাজানি হয়ে যায়। তখন ঢাকা শহরে অস্ত্র উদ্ধার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী মোতায়েন ছিল। সেনাবাহিনীর একটি দল ঢুকে পড়ে গাজীর বাসায়। আর ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসার পরিস্থিতি সম্পর্কে ডালিম লিখেছেন, “হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। রেড ফোন। শেখ সাহেব নিজেই তুলে নিলেন রিসিভার। গাজীর বাসা থেকে ফোন এসেছে। বাসা থেকে খবর দিল আর্মি গাজীর বাসা রেইড করে সবাইকে ধরে নিয়ে গেছে। শুধু তাই নয় সমস্ত শহরে আর্মি চেকপোষ্ট বসিয়ে প্রতিটি গাড়ি চেক করছে। ক্যান্টনমেন্ট থেকে কিডন্যাপিং এর খবর পাওয়ার পরপরই ইয়ং-অফিসাররা যে যেখনেই ছিল সবাই বেরিয়ে পড়েছে এবং খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে মেজর ডালিম ও তার স্ত্রী নিম্মীকে। সমস্ত শহরে হৈচৈ পড়ে গেছে। গাজীরও কোন খবর নেই। গাজীকে এবং তার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদেরও খুঁজছে আর্মি তন্নতন্ন করে সম্ভাব্য সব জায়গায়। টেলিফোন পাওয়ার পর শেখ সাহেবের মুখটা কালো হয়ে গেল।”

বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে এ নিয়ে সালিশ হলো। বঙ্গবন্ধু নিম্মীর কাছে গাজীকে ক্ষমা চাইতে বললেন। সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ এসময় ৩২ নম্বরে চলে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুই তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। স্বস্ত্রীক সেনা কর্মকর্তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সেনানিবাসেও প্রতিক্রিয়া হলো। এ সব ঘটনা ও প্রতিক্রিয়ার অনেক কিছু জানা যায় কর্নেল শাফায়াত জামিল (অবঃ)-এর লেখা “একাওরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর” এবং মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অবঃ) বীর বিক্রমের “এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক” বই দুটো থেকে। আর এ ঘটনায় যেহেতু ডালিমের বর্ণনায় মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলম ও চুল্লুর নাম এসেছে, তাই তাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা যায়। দুজনই আমার পরিচিত। চুল্লু ভাইয়ের নম্বারটা মোবাইলেই ছিল। ফোনে তার কাছে জানলাম ওই দিনের ঘটনা।

চুল্লু ভাই আওয়ামী লীগের আগের শাসনামলে (১৯৯৬-২০০১) শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেকের ছোট ভাই। খুবই সরল-সোজা মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের সময় চুল্লু ভাই ২ নম্বর সেক্টরে খালেদ মোশাররফের অধীনে ঢাকার গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন। বড় ভাই সাদেক সাহেবের বাসা ছিল তাদের অস্ত্র রাখার জায়গা। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে শহীদ রুমির সহযোগী ছিলেন আলম ভাই ও চুল্লু ভাই। ১৯৭১-এর ২৯ ও ৩০ আগস্ট পাক সেনারা ঢাকার গেরিলা যোদ্ধা ও তাদের সহযোগী বদিউল আলম (প্রাক্তন ফৌজিয়ান, বীর উত্তম, শহীদ), সামাদ, রুমি, জামি, শরীফ ইমাম, সুরকার আলতাফ মাহমুদ, আজাদ- এদের সঙ্গে চুল্লু ভাইকে ধরেছিল। এই মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশ আর ফিরে আসেননি। আর ১৭ ডিসেম্বর পর চুল্লু ভাই কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ছাড়া পান।

চুল্লু ভাই জানালেন, গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলেরা বিয়ের অনুষ্ঠানে বাপ্পীর সঙ্গে বেয়াদবি করে। ডালিম এ কারণে ওদের চড়-থাপ্পর মেরেছিল। বিয়ের অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে গাজী গোলাম মোস্তফা তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে হাজির হন। তিনি জানান, গাজী তখন রেডক্রসের চেয়ারম্যান ছাড়াও সংসদ সদস্য ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। ৫/৬ জনের সশস্ত্র নিরাপত্তা কর্মী নিয়ে তিনি সে সময় চলাফেরা করতেন। আমার ধারণা, ওই সময়ে সর্বহারা পার্টি ও জাসদের সশস্ত্র রাজনীতির কারণে আওয়ামী লীগের অনেকেরই ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ছিল।

বিয়ের অনুষ্ঠানে এসেই গাজী ও তার সশস্ত্র লোকেরা হম্বিতম্ভি করায় তাদের শান্ত করতে হাবিবুল আলম ও চুল্লূ এগিয়ে যান। গাজীর লোকেরা তাদের হাত তুলতে বলে। আলম ভাই হাত তুললেও চুল্লু ভাই রাজি হননি। তক্ষনি গাজীর লোকেরা তাকে মারধর করে। ওদের একজনের রাইফেলের বাটের আঘাতে চুল্লু ভাইয়ের নাক-মুখ রক্তাক্ত হয়। এরপর তাদের তুলে নেয়া হয় মাইক্রোবাসে। একইভাবে ডালিম, তার বউ এবং বিয়ের কনে তাহমিনার মাকেও গাড়িতে তোলা হয়। পুরো বিষয়টা ছিল গাজীর মাস্তানি। চুল্লু ভাই মনে করেন, শেরেবাংলা নগরে নিয়ে তাদের হত্যার পরিকল্পনা করেছিল গাজী। ওখানে তখন সংসদ ভবন নির্মানের জন্য প্রচুর ইট-পাথর, বালুসহ নির্মান সামগ্রী স্তুপ করা ছিল। সেখানে ইটের স্তুপে তাদের মেরে ডাকাতির ঘটনা সাজানো যেত। কিন্তু লেডিস ক্লাবে এতো লোকের সামনে থেকে তুলে আনায় এ ঘটনা সামাল দেয়া কঠিন হতো। তাই শেষে মত বদলে গাজী এদের নিয়ে ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর কাছে যান। ৩২ নম্বরে আহত, রক্তাক্ত চুল্লু ভাইয়ের সুশ্রষা করেন শেখ কামাল। বঙ্গবন্ধুও সত্য ঘটনা জেনে ক্ষুব্ধ হন।

এ ঘটনায় পানি অনেক ঘোলা হয়। কর্নেল শাফায়াত জামিল তার “একাওরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর” বইতে লিখেন, ঘটনার পরদিন সে সময়ের কর্নেল এইচ এম এরশাদ একদল তরুণ সেনা কর্মকর্তাকে নিয়ে সেনা উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়ার অফিসে যান। এরশাদ এ সময় সরাসরি সেনা হস্তক্ষেপ দাবি করেন। শাফায়াত জামিল নিজে ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন বলে দাবি করেন। তিনি লিখেন, জিয়াউর রহমান এরশাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাকে তিরস্কার করেন। জিয়া এ সময় বলেন, এরশাদের এই আচরণ কোর্ট মার্শাল হওয়ার যোগ্য।

পরে ওইদিনই বিকেলে বঙ্গবন্ধু তার কার্যালয়ে সেনাপ্রধান, উপপ্রধান, এরশাদ ও শাফায়াত জামিলকে ডেকে নেন। বঙ্গবন্ধু এরশাদের আচরণের জন্য সবাইকে কঠোরভাবে তিরস্কার করেন। কিন্তু সেনাপ্রধান এরশাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। শাফায়াত জামিল তার বইতে সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বিষয়টি নিয়ে মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী তার “এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক” বইতে লিখেছেন, বিয়ের অনুষ্ঠানের ঘটনার প্রতিশোধ হিসাবে মেজর ডালিম তার কিছু সঙ্গী সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিক নিয়ে গাজী গোলাম মোস্তফার বাসা আক্রমণ ও তচনচ করে। এর ফলে সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে প্রশাসনিক আদেশে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন, মেজর ডালিম এবং মেজর এস এইচ এম বি নুর চৌধুরী। এরা দুজনই ১৯৭৫-এর আগস্টে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।

মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা এই সেনা কর্মকর্তা জিয়ার অনুসারী এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে আওয়ামী লীগের সমালোচক। আর মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা কর্নেল শাফায়াত জামিল আড়ালেই থাকেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় ঢাকায় ৪৬ ব্রিগেডের অধিনায়ক ছিলেন। তার অধীনের সেনা কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ ও পরবর্তী ঘটনাবলী নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা নিয়ে সে সময়ের সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ ও শাফায়াত জামিলের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ আছে। তবে এরা দুজনই আজো বঙ্গবন্ধুর সমর্থক।

১৫ আগস্টের পর দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনাকে ব্যক্তিগত আক্রোশের ফল হিসেবে চালানোর চেষ্টা কম হয়নি। এক্ষেত্রে গাজী গোলাম মোস্তফা, শেখ কামাল, মেজর ডালিম, ডালিমের স্ত্রীর নাম বারবার এসেছে। ঘটনা যদি সত্য হয়, তাহলে মেজর ডালিম বা নুরের ক্ষোভ থাকার কথা গাজীর বিরুদ্ধে। ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু, তার স্বজনদের বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছে। গাজী গোলাম মোস্তফা ছিলেন অক্ষত। তার বাড়িতে একজন সৈনিকও যায়নি। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় দুর্নীতির অভিযোগে। এই অভিযোগেরও আবার কোনো প্রমাণ মেলেনি।

শেখ কামালকে “ব্যাংক ডাকাত” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার একটা চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। ১৯৭৪ সাল থেকে এই প্রচারণার শুরু। আমিও এই প্রচারে বিভ্রান্ত ছিলাম দীর্ঘদিন। আমি নিশ্চিত এই লেখার পাঠকদের অনেকে এখনো বিশ্বাস করেন, দলবল নিয়ে ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে শেখ কামাল গুলিবিদ্ধ হন। সুযোগ পেলেই বিএনপি নেতারা, এমনকি বেগম খালেদা জিয়া নিজেও শেখ কামালকে ‘ব্যাংক ডাকাত’ বলে থাকেন। জাতীয় সংসদের সাম্প্রতিক কার্যবিবরণীতেও তাদের এমন বক্তব্য পাওয়া যাবে।

এ নিয়ে মেজর জেনারেল মইন তার “এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক” বইতে স্বাধীনতাত্তোর অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নানা তথ্য দেন। তিনি লিখেন, ১৯৭৩ সালের বিজয় দিবসের আগের রাতে ঢাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে, সিরাজ শিকদার তার দলবল নিয়ে এসে শহরের বিভিন্নস্থানে হামলা চালাতে পারেন। এ অবস্থায় সাদা পোশাকে পুলিশ গাড়ি নিয়ে শহরজুড়ে টহল দিতে থাকে। সর্বহারা পার্টির লোকজনের খোঁজে শেখ কামালও তার বন্ধুদের নিয়ে মাইক্রোবাসে করে ধানমন্ডি এলাকায় বের হন। সিরাজ শিকদারের খোঁজে টহলরত পুলিশ মাইক্রোবাসটি দেখতে পায় এবং আতংকিত হয়ে কোনো সতর্ক সংকেত না দিয়েই গুলি চালায়। শেখ কামাল ও তার বন্ধুরা গুলিবিদ্ধ হন। গুলি শেখ কামালের কাঁধে লাগে। তাকে তখনকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

জেনারেল মইন তখন ৪৬ ব্রিগেডের অধিনায়ক। বিজয় দিবসে মানিক মিয়া এভিনিউতে সম্মিলিত সামরিক প্যারেড পরিচালনা করেন তিনি। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সালাম নেন। জেনারেল মইন লিখেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব অত্যন্ত গম্ভীর ও মলিন মুখে বসে ছিলেন। কারো সঙ্গেই তেমন কথা বলেননি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে জেনারেল মইন বইতে লিখেন, ওইদিন শেখ মুজিব তার সঙ্গেও কথা বলেননি। ‘৭২ সাল থেকে অনেকবারই তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। কিন্তু এতোটা মর্মাহত কখনো তাকে আগে দেখেননি। মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধের সময় জেনারেল ওসমানীর এডিসি শেখ কামালও জেনারেল মইনের ঘনিষ্ট ছিলেন। প্যারেড শেষে মইন পিজিতে যান শেখ কামালকে দেখতে। হাসপাতালে বেগম মুজিব শেখ কামালের পাশে বসেছিলেন। মইন লিখেন, প্রধানমন্ত্রী তার ছেলের ওই রাতের অবাঞ্ছিত ঘোরাফেরায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এবং শেখ কামালকে হাসপাতালে দেখতে যেতে প্রথমে অস্বীকৃতি জানান। পরে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে যান।

জেনারেল মইনকে এখানে উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না। ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা শেষে তিনি লিখেন, “এদিকে স্বাধীনতাবিরোধী ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষীরা এই ঘটনাকে ভিন্নরূপে প্রচার করে। ‘ব্যাংক ডাকাতি’ করতে গিয়ে কামাল পুলিশের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে তারা প্রচারণা চালায় এবং দেশ-বিদেশে ভুল তথ্য ছড়াতে থাকে। যদিও এসব প্রচারণায় সত্যের লেশমাত্র ছিল না।”

ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালীদের ছেলেমেয়েরা সব সময়েই রাজনীতিতে নানা সমস্যা তৈরি করে থাকে। শেখ কামালকে আমি কখনো দেখিনি। তবে কেন যেন অল্প বয়স থেকেই তার সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা আমার হয়ে আছে। সত্য জানার পরও সে ধারণা পুরো দূর হয়নি। তবে এটা বুঝতে পারছি, শেখ কামাল সম্পর্কে বিরূপ প্রচারও প্রচুর হয়েছে। ইতিহাসের সত্যানুসন্ধানে এসবের অনেকই মিথ্যাচার, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার হিসেবে প্রমাণ হচ্ছে এবং হয়তো আরো হবে। তবে বঙ্গবন্ধুর ছেলে হওয়ার সুবাদে শেখ কামাল যে ক্ষমতার নানা অপব্যবহার করেছেন তা নিয়ে সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা এর নজির বারবারই দেখে আসছি।


জিয়ার নৃশংস শাসনকাল

‘৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে একই খুনি চক্র। এরই ধারাবাহিকতায় গায়ে ভারতপন্থী লেবাস পড়িয়ে হত্যা করা হয় খালেদ মোশাররফ, হায়দারসহ সেনা কর্মকর্তাদের। ৭ নভেম্বর মূলতঃ সেনা সদস্যদের এক বিশৃঙ্খল অভ্যূত্থানে জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান। কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে গণবাহিনী তাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়। তাহেরসহ জাসদ নেতারা মনে করেছিলেন, জিয়া তাদের বিপ্লবী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু ক্ষমতায় বসেই জিয়া তার মুক্তিদাতাদের উপর খড়গহস্ত হন।

‘৭৬ সালের শুরু থেকেই জিয়াউর রহমান ক্ষমতার ওপর নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করলেন। বিচারপতি সায়েমকে সামনে রেখে প্রথমে, তারপর তাকে হটিয়ে নিজেই পুরো ক্ষমতা হাতে নেন জিয়া। ছোট-খাট আকারের স্লিম, প্রকাশ্যে প্রায় সব সময় কালো সানগ্লাস চোখে পড়া এই মানুষটা আওয়ামী লীগ বিরোধী জনমত আর রাজনৈতিক শক্তির কাছে মুজিবের বিকল্প নেতা হিসাবে আবির্ভূত হলেন। এ ব্যাপারে অনেকের মতো আমারো একটা বিশ্লেষন আছে।

‘৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্তির আন্দোলনে বাঙালি মুসলমানের ভূমিকাই ছিল প্রধান। “কান মে বিড়ি, মু মে পান, লাড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” আন্দোলন বাঙালি মুসলমানকে যতোটা নাড়া দিয়েছিল, পাকিস্তানের পশ্চিম অংশকে ততোটা নয়। এটা ইতিহাসের কথা। সেই বাঙালির মাত্র ২৪ বছরের মধ্যে মোহভঙ্গের ঘটনা, অবিশ্বাস্যই বটে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ অকল্পনীয় সংখ্যাগরিষ্টতা পেলেও আওয়ামী লীগ বিরোধীরা কিন্তু ভোট কম পায়নি। গণতন্ত্রের এই সংখ্যার খেলাটা আমরা এখন নিশ্চয়ই জানি। এখন আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে ভোটের পার্থক্য ৫ থেকে ৭ শতাংশ বা ১০ শতাংশ হলে সংসদে আসনের পার্থক্য দেড়শ থেকে প্রায় আড়াইশ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশবিরোধী এই রাজনৈতিক শক্তি মুক্তিযুদ্ধে পরাস্ত হলেও হারিয়ে যায়নি। তারা মঞ্চ খুঁজছিল, জায়গা খুঁজছিল, নেতা চাইছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগের দুর্বলতা, দলের ভেতর অনৈক্য-দলাদলি, দুর্নীতি, দুর্ভিক্ষ, জনপ্রিয়তায় ধ্বস এই শক্তিকে উত্থানের সুযোগ করে দেয়। মুসলিম লীগ, জামায়াতের রাজনীতি তখন নিষিদ্ধ ছিল। বাংলাদেশবিরোধী এই রাজনৈতিক শক্তি যেমন আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়ে, তেমনি জাসদসহ আওয়ামী লীগবিরোধী শিবিরেও আশ্রয় নেয়। কর্নেল তাহের ও জাসদের অদূরদর্শী এবং সিপাহী জনতার অভ্যূত্থানের নামে বিপ্লবের তথাকথিত বালখিল্য রাজনীতি জিয়াউর রহমানকে নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে।

জিয়ার মতো খালেদ মোশাররফও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এই দুজনের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের ইতিহাসও ভিন্ন। জিয়া অনেকটা পরিস্থিতির চাপে আর খালেদ মোশাররফ পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে খালেদ মোশাররফের যতো বীরত্বগাঁথা পাওয়া যায়, জিয়ার ততোটা নয়। খালেদ ছিলেন মনেপ্রাণেই একজন বিপ্লবী। ‘৭৫-এর ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যূত্থান সফল হলে হয়তো ইতিহাস আজ অন্যভাবে লেখা হতো বলে আমার মনে হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ে খালেদ মোশাররফকে আমার সময়ের সবচেয়ে “মিসআন্ডারস্টুড” (এই শব্দটার যথার্থ বাংলা পাচ্ছি না) চরিত্র মনে হয়।

মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা, বিশেষ করে সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যে খালেদ মোশাররফ সম্ভবত ছিলেন সবচেয়ে মেধাবী। তার সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে শোনা তার একটা উদ্ধৃতি আমি কখনোই ভুলতে পারি না। মুক্তিযুদ্ধে মূলতঃ গেরিলা যোদ্ধাদের সংগঠিত করেন সেক্টর দুই-এর এই প্রধান। এক সম্মোহনী চরিত্রের অধিকারী ছিলেন তিনি। অনেকটা চেগুয়েভারার মতো। তার ভাষণ শুনে গেরিলারা পতঙ্গের মতো মরনপণ লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তো। খালেদ মোশাররফ সে সময় প্রায়ই বলতেন, “স্বাধীন দেশের সরকার জীবিত গেরিলাদের চায় না, নো গভর্নমেন্ট ওয়ান্টস অ্যান অ্যালাইভ গেরিলা, নিতে পারে না………”।

কিন্তু ৭ নভেম্বর পরিকল্পিতভাবে খালেদ মোশাররফ ও হায়দার- মুক্তিযুদ্ধের দুই সহযোদ্ধাকে ‘৭৫-এর খুনি বাহিনী হত্যা করে। নাকি এ কাজ করেছিল গণবাহিনী? জিয়া সফল হলেন, বিভ্রান্ত বিপ্লবী তাহের কোলে তুলে জিয়াকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিলেন। ইতিহাস বলে তাহের যতোটা জিয়াকে বিশ্বাস করেছিলেন, জিয়া ততোটাই তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। এর অর্থ জিয়ার একটা লুকোনো রাজনীতি ছিল। তাহের তার সব কার্ডই জিয়াকে দেখিয়ে ফেলেছিলেন। ফলে প্রথম সুযোগেই তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে জিয়াউর রহমান ‘৭৫-এর ৭ নভেম্বর তাকে বাঁচানোর প্রতিদান দিয়েছিলেন! জাসদের রাজনীতি দেশকে কতোটা পেছনে ঠেলে দিয়েছিল তা আজ আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা।

জিয়ার ক্ষমতা দখল দেশকে স্বাধীনতার উল্টো পথে নিয়ে গেল। তিনি মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের আশ্রয়দাতা হয়ে উঠলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানি দালাল শাহ আজিজ, খান এ সবুরকে রক্ষা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। আর তাদের পূনর্বাসন করেন জিয়া। এরকম আরো অনেক নাম বলা যায়। জিয়া সেনাপ্রধানও করেছিলেন পাকিন্তানপন্থী এক বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা এইচ এম এরশাদকে। কিন্তু জিয়া শান্তিতে ছিলেন না। বলা হয়, তার ৫ বছরের শাসনামলে কমপক্ষে ১৯ থেকে ২১টি সেনা অভ্যূত্থানের চেষ্টা হয়েছিল। এরই একটায় ১৯৮১ সালে ৩০ মে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন।

জিয়ার শাসনামলে একটি ঘটনা আমাদের পরিবারকে নাড়া দিয়েছিল। যা আমার পরবর্তী রাজনৈতিক চিন্তায় অজান্তেই অনেকটা প্রভাব ফেলে। ১৯৭৭ সালে সেপ্টেম্বরের শেষে জাপানের একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন “রেড আর্মি” জাপান এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ অপহরণ করে এনে ঢাকা বিমানবন্দরে নামায়। সেটা ছিল বর্তমানের পুরনো বিমানবন্দর। একই সময়ে অর্থাৎ ২ অক্টোবর বিমানবাহিনীতে একটা ব্যর্থ অভ্যূত্থান হয়। এই অভ্যূত্থান চেষ্টাটা আসলে কেন হয়েছিল, আদৌ এর পেছনে বিমানবাহিনীর নিচের পর্যায়ের লোকজন জড়িত ছিল কিনা- সেটা একটা বড় রহস্যই রয়ে গেছে এখনো। ঠিক এর আগে আগে ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭ বগুড়া সেনানিবাসে ২২ বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটা অভ্যূত্থান চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

আমরা কলেজে বসে ওই জাপানি উড়ে[জাহাজ অপহরণের খবর পেয়েছিলাম। অভ্যূত্থানের খবর পেলাম ছুটিতে বাসায় এসে। তখন শুনেছিলাম আমাদের বাকী মামার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বাকী মামা আমার মায়ের চাচাতো ভাই। তিনি ছিলেন কুমিল্লা সদর থেকে এবার নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সাংসদ এ কে এম বাহাউদ্দিন বাহারের মেঝ ভাই। বাকী মামা বিমানবাহিনীতে ছিলেন। দারুণ স্মার্ট, নায়ক নায়ক চেহারা ছিল তার। আমি ভীষণ পছন্দ করতাম তাকে।

আমার জন্মের এক বছর পর ১৯৬৩ সালে বাকী মামা এয়ারম্যান হিসাবে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। জাপানি এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজটি অপহরণের সময় ফ্লাইট সার্জেন্ট এ কে এম মাঈনউদ্দিন (বাকী মামা) বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি তখন এয়ার কমান্ডোতে কর্মরত ছিলেন। ২ অক্টোবরের অভ্যূত্থানের পর বাকী মামার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তার ভাইয়েরা মামার খোঁজে সব স্থানে গেছেন। গিয়েছিলেন তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধান এম এ জি তওয়াবের কাছেও। এর বেশ কিছুদিন পর কুমিল্লার মুন্সেফবাড়িতে সরকারের পক্ষ থেকে একটি চিঠি আসে। এতে লেখা ছিল অভ্যূত্থান চেষ্টায় জড়িত থাকায় তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ফাঁসি হলেও তার মরদেহটা তো পরিবার পাবে! কিসের কি? আজো আমাদের মামারা, বাকী মামার ভাইয়েরা জানেন না কোথায় তাদের ভাইকে কবর দেওয়া হয়েছে। কি ভয়ংকর বর্বরতা! কি অকল্পনীয় নৃশংসতা!

জিয়াউর রহমানের শাসনকালটা সামরিক বাহিনী ভীষণ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। একের পর এক অভ্যূত্থান চেষ্টা, নজিরবিহীন হত্যাযজ্ঞ, ভয়াবহ নৃশংসতা ছিল তার শাসনামলের প্রায় অনালোচিত এক কালো অধ্যায়। ১৯৭৭-এর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের ওই ব্যর্থ অভ্যূত্থানের বলি হয়েছিল মোট ১ হাজার ১৪৩ জন সেনা সদস্য ও বিমান সেনা। তাদের গোপন বিচারে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। বিচারের নামে তখন রীতিমতো প্রহসন হয়েছিল। শুধু বিমান সেনাই হত্যা করা হয়েছিল ৫৬১ জন।

সময়টা মনে নেই, আমরা কলেজে ঢোকার পর জিয়াউর রহমান ও বেরোনোর আগে এইচ এম এরশাদকে ক্যাডেট কলেজ গভার্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসাবে পেয়েছিলাম। দুজনই ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ সফরে এসেছিলেন। তবে এই দুই চরিত্রের কেউ আমাকে কখনো আকৃষ্ট করতে পারেননি।



লেখক তালিকা