This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Bangladesh Liberation War, Genocide of Innocent Bengali People in 1971 and contemporary political events of Bangladesh.
More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

The Exeter South Asia Centre of the College of Humanities of the University of Exeter listed ‘Muktijuddho e-Archive’ as a source for Research materials.
The University of Exeter is a public research university located in Exeter, Devon, South West England, United Kingdom. 
This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

ডেটলাইন ২৬ মার্চ: সেই কালরাতের প্রথম শহীদ শিশু

ডেটলাইন ২৬ মার্চ: সেই কালরাতের প্রথম শহীদ শিশু

দৈনিক সমকাল - ৩০ মার্চ, ২০১৩ সংখ্যা

আবদুল্লাহ পায়েল


[ মূল রিপোর্টের ইমেজ লিংক ]

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের টুকরো টুকরো এক একটি জ্যোতির্ময় মুহূর্ত। হঠাৎ একটি আলোকচিত্রের সামনে এসে থমকে দাঁড়াই। ছোট্ট একটি নিষ্পাপ মুখ। পড়ে আছে নিথর দেহ। বুকটা যেন খানিকটা কেঁপে ওঠে। ছবিটি সম্পর্কে কৌতূহল বেড়ে যায়। বিস্তারিত খোঁজ নিতেই বেরিয়ে এলো আনন্দ-বেদনার এক মিশ্র অনুভূতি। ছবির এই শিশুটিই বাংলাদেশের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রথম সর্বকনিষ্ঠ বা শিশু শহীদ। ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে যাকে নির্মমভাবে হত্যা করে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী। বেশ কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করে পুরান ঢাকায় পাওয়া গেল বাংলাদেশের প্রথম শিশু শহীদ বুদ্ধদেব সূরের পরিবারকে। তাদের সঙ্গে আলাপ করে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরের সেই বর্বরতার কথা জানাচ্ছেন আবদুল্লাহ পায়েল।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে একটা ছবির মধ্যে চোখ আটকে গেল। কোনার দিকের সেই ছবিটার সংযুক্তি পড়ে মন ভরল না। ছবিতে দেখা যাচ্ছে পড়ে থাকা একজন বয়স্ক মানুষের দুই পায়ের পাতা। পায়ের উপরের অংশ লুঙ্গিতে ঢেকে আছে। লোকটির ঊরু পর্যন্ত ক্যামেরার ফ্রেমে এসেছে। ঠিক তার পায়ের পাতা দুটোর পাশে চোখ পড়তেই গা শিউরে ওঠে। ছোট্ট একটা শিশুর বুকের মাঝখানে এ ফোঁড়-ও ফোঁড় করা একটা গর্ত। নীরব-নিথর দেহ। ছবির নিচে লেখা_ মুক্তিযুদ্ধের শিশু শহীদ। নাম_ বুদ্ধদেব সুর। সঙ্গে আরও লেখা_ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শনিবার শহীদ হয়েছে। শুধু এইটুকু জেনে মন ভরল না। আরও কিছু জানানো উচিত ছিল। ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রায় সব স্মৃতিই সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে কতগুলো ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করা হয়েছে। কতগুলো আবার স্বপ্রণোদিত হয়ে কেউ কেউ জাদুঘরকে দান করেছেন। পরিদর্শনকারীর জানা এবং বোঝার সুবিধার জন্য সংগৃহীত এসব সংগ্রহের সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সংযুক্তি দেওয়া আছ। কিন্তু এই ছবিটাতে এর চাইতে বেশি তথ্য নেই। ছবিটি সম্পর্কে কথা হয় মেজর (অব.) আমিন আহমেদ চৌধুরী বীরপ্রতীকের সঙ্গে। তিনি জানান_ ২৬ মার্চ সবচেয়ে বেশি কিলিং হয়েছে জগন্নাথ হল, রাজারবাগ, সুইপার কলোনি, ফার্মগেট ও শাঁখারীবাজারে। শাঁখারীবাজার ছাড়া অন্য জায়গায় হত্যার পর লাশ মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। ২৬ তারিখ সকাল ১০টার দিকে ফার্মগেট হয়ে জিপে যখন আমিন আহমেদ চৌধুরী যাচ্ছিলেন তখন তৎকালীন আওলাদ মার্কেটের (এখন কলমিলতা হোটেল) পাশে অনেক লাশের সঙ্গে দুটি দেড়-কি দুই বছরের শিশুর লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। তিনি নিশ্চিত করেন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এই ছবিটি ফার্মগেটের নয়। বইপত্র ঘেঁটেও তেমন তথ্য না পেয়ে অগত্যা মাঠে নামতে হলো। শাঁখারীবাজার ঘুরে, সব তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং ছবির ধরন দেখে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেল ছবিটি শাঁখারীবাজারের। শাঁখারীবাজারে একদিনশাঁখারীবাজারের বিখ্যাত কল্পনা বোর্ডিং। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানে সভা করেছেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর তিনি এখানে এসে কল্পনা বোর্ডিংয়ের সামনে বসেছিলেন। সেই কল্পনা বোর্ডিংয়ে বসে কথা হলো বোডিংয়ের পরিচালক বিদ্যুৎ নাগের সঙ্গে। ছবি সম্পর্কে জানতে চাইলে ভদ্রলোক গোটা শাঁখারীবাজারের একটা ফিরিস্তি দিলেন। কীভাবে হামলা হলো, কে কে মরেছে_ সব যেন তার মুখস্থ। বলে চললেন, ১৯৭১ সালের মার্চের ২৬ তারিখ প্রথম প্রহরে অর্থাৎ ২৫ তারিখ রাতের ২ কি ৩টার দিকে পাকবাহিনী শাঁখারীবাজারের পশ্চিম মাথার কোতোয়ালি থানা অ্যামবুশ করে এবং বাঙালি পুলিশ সদস্যদের হত্যা করে। পুরান ঢাকার এই এলাকায় ভোর পর্যন্ত চলে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বাড়ির পর বাড়ি। মানুষ যে যেভাবে পারে ঘর-বাড়ি ছেড়ে এদিক-ওদিক আশ্রয় নেয় প্রাণ বাঁচাতে। এই পাশটা পশ্চিম দিক মানে কোতোয়ালি থানার দিক থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শাঁখারীবাজারের ৫২ নম্বর বাড়িতে প্রথম আগুন দেয়। এখানে বেশ কয়েকজনকে নির্বিচারে গুলি করে মেরে ফেলে ওরা। তার মধ্যে প্রাণ গোপাল সূরের একটা শিশুপুত্রকে ওরা মেরে ফেলেছিল। তবে সেটাই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত ছবি কি-না, তা বলতে পারলেন না বিদ্যুৎ নাগ। প্রাণ গোপালের দোকান ৬৩ নম্বর শাঁখারীবাজারে।৬৩ সূর প্রোডাক্টসের মালিক প্রাণ গোপাল সূর। তবে সূর প্রোডাক্টসে গিয়ে আর প্রাণ গোপালকে পাওয়া গেল না। বসে আছেন তার ছেলে বাসুদেব সুর। বাসুদেব জানালেন, তার বাবা প্রাণ গোপাল স্বর্গবাসী হয়েছেন অনেক আগেই। তিনিই এখন দোকান সামলান। তার মা ভগবতী সুরের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে বাসুদেব জানালেন, মা ঢাকায় নেই। খুব সুন্দর করে টেনে টেনে কথা বলেন বাসুদেব। বসিয়ে বললেন, কী জানতে চান? আমাদের তো সব গেছে। যা-ও খুপরি ঘরগুলো আছে সেগুলোকেও আপনারা চিড়িয়াখানা বানাতে চান। আমরা হব চিড়িয়া, আপনারা বহির্বিশ্বের মানুষ নিয়ে আসবেন, আমরা লোহার শিক ধরে ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকব। আপনারা দেখবেন। আরে ভাই, এক একটা বাড়িতে গড়ে ৫০-৬০ জন মানুষ থাকে। এই বাড়িগুলো যদি সংরক্ষণ করেন, তাহলে মানুষগুলো কোথায় যাবে_ সেই চিন্তাটা আগে করতে হবে তো।বাসুদেবকে বুঝিয়ে বললাম, আমার আসার কারণ তা নয়। উনি বোধ করি বুঝলেন এবং থামলেন।একটুখানি দম নিয়ে ফের মুখ খুলি আমি, '৭১-এর ২৬ মার্চে যে ধ্বংসযজ্ঞ আর হত্যাকাণ্ড হয়েছে, সেই চিত্র তুলে ধরতে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে একটা ছবি গেছে। যা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ৫২ নম্বর বাড়িতে এমন একটা শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল। আপনারা তো তখন ৫২ নম্বরের বাসিন্দা ছিলেন?' কী যেন ভাবলেন বাসুদেব। তার পর পাশের বাড়িতে চলে গেলেন। একটু পর ফিরলেন হাতে দুটি লেমিনেটিং ছবি নিয়ে। সামনে মেলে ধরে বললেন, 'দেখুন তো, এই ছবিটা খুঁজছেন নাকি?' ছবির দিকে একনজর তাকাতেই আমার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই ছবিটাই তো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আছে। এই ছবির খোঁজেই তো আমার আসা। যেন আগে থেকেই বাসুদেব জানতেন আমি কী জানতে চাই। আমি প্রশ্ন করার আগেই শুরু করলেন, 'সেদিন (২৬ মার্চ) ভোর রাতে কোতোয়ালি থানা দখলে নেওয়ার পর পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকারদের সহায়তায় দুপুরের পর থেকে হত্যাকাণ্ড আর অগি্নসংযোগ শুরু করে। বিকেলের দিকে বেশিরভাগ বাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। সিমেন্টের বাড়ি হলেও ঘরের দরজা ছিল কাঠের, যার কারণে দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ৫২ নম্বর বাড়িটিতেও ছোবল পড়ে ওদের। গোটা শাঁখারীবাজার এলাকায় আগুন দেওয়া, হত্যা এবং লুটপাটের যেন উৎসব শুরু হয়। পাকিস্তানিরা কাজগুলো করে এই এলাকারই নাম জানা-মুখ চেনা কিছু লোকের মাধ্যমে।'৭১-এ আমার বয়স তখন ছয় সাত বছর হবে। ২৬ তারিখ সন্ধ্যার একটু আগের কথা। আমি গিয়েছি আমাদের বাড়িতে। বাবা, মা, মেসো মশাই আর আমার ছোট ভাই বুদ্ধু (বুদ্ধদেব সূর) ছিল মেসোর বাড়িতে। তখন বুদ্ধুর বয়স তিন কি সাড়ে তিন। হঠাৎ পাকিস্তানি সৈন্যরা মেসোর বাসার ছাদে উঠে 'চন্দন কোন হে' বলে নাম ধরে ডাকতে শুরু করে। সেই সময় বুদ্ধু ছিল আমার মেসো চন্দন সূরের কোলে। ওরা মেসোকে নিচে নামিয়ে আনে। রাস্তায় নেমেই মেসোকে ওরা গুলি করে হত্যা করে।এ পর্যন্ত বলে থামলেন বাসুদেব। তারপর ভারী হয়ে যাওয়া গলায় জানালেন, আর কিছু বলতে চান না। বাসুদেব বলেন, 'বলে কী হবে?' আমিও প্রশ্ন না করে একটু সময় নিই। কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে আবারও নিজে থেকেই বলতে শুরু করলেন, 'মেসোর কোলে তখনও বুদ্ধু। ওকে রাস্তায় ফেলে নিষ্পাপ শিশুটির বুকে বেয়নেট চালায় পশুরা। মুহূর্তেই এ ফোঁড়-ও ফোঁড় হয়ে যায় বুদ্ধুর বুক। এটাই সেই ছবি।'এই ঘটনা সেদিন খুব কাছ থেকে অনেকই দেখেছেন। বুদ্ধুর মা ভগবতী সূর ওপর থেকে অসহায়ের মতো দেখেছেন। নেমে আসতে আসতে সব শেষ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাণ গোপাল সূরের ৩৬ নম্বর শাঁখারীবাজারের ঠিকানায় ২০০০ টাকার একটি চেক পাঠিয়েছিলেন সহমর্মিতা জানিয়ে। সেই চেকের সঙ্গে চিঠিটা আজও সযত্নে লালন করে রেখেছেন বুদ্ধুর ভাই বাসুদেব সূর।বুদ্ধুকে মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শিশু শহীদ ধরা যায় কি-না, জানতে চাইলে মেজর (অব.) আমিন আহমেদ চৌধুরী বীরপ্রতীক বলেন, 'আমরা এভাবে বলতে পারি, হত্যার উদ্দেশ্যে সামনাসামনি পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক হত্যা করা, পরিচয় পাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রথম শিশু শহীদ বুদ্ধদেব সূর'।



লেখক তালিকা