ওয়েবসাইট সংস্কারের কাজ চলছে, তাই আর্কাইভ ব্যবহারে পাঠক-গবেষকদের কিছুটা বিড়ম্বনায় পরতে হতে পারে।

This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Bangladesh Liberation War, Genocide of Innocent Bengali People in 1971 and contemporary political events of Bangladesh.


More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.




The Exeter South Asia Centre of the College of Humanities of the University of Exeter listed ‘Muktijuddho e-Archive’ as a source for Research materials.

The University of Exeter is a public research university located in Exeter, Devon, South West England, United Kingdom.
This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় বাহিনী - মিঠুন সাহা

November 1971 - Bengali Freedom Fighters - 1
মুক্তিযোদ্ধা / রেমন্ড ডিপার্ডন

মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় বাহিনী
মিঠুন সাহা
ভোরের কাগজ - শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০১৫

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি। সমস্ত মতপার্থক্য, মতবিরোধ এবং ব্যক্তিস্বার্থকে ভুলে বাঙালি প্রথমবারের মতো একজাতি। একটি সত্তা হিসেবে রুখে দাঁড়ায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে। অবিচারের বিরুদ্ধে। শুরু হয় বিশ্বের সবচেয়ে মর্মান্তিক অথচ সফলতম যুদ্ধ। ঐ যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি সিভিল কর্তৃত্ব ছিল যার নাম বাংলাদেশ সরকার। সরকার মুক্তিযুদ্ধকে পরিচালনার জন্য প্রথমে ৪টি এবং পরে ৪ থেকে ৬টি এবং শেষে ৬ থেকে ১১টি সেক্টরে গোটা রণাঙ্গানকে বিভক্ত করে। অধিকন্তু, সেক্টরগুলোকে আবার যুদ্ধের প্রয়োজনে অনেকগুলো সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। সেক্টর কমান্ডারগণ ও সাব-সেক্টর কমান্ডারগণ নিজ নিজ অঞ্চলে সামরিক ফ্রন্টে সফলভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন, এটা নিঃসন্দেহ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কথা আসলেই শুধু এই ১১টি সেক্টরের কথায় বলা হয়। অথচ মুক্তিযুদ্ধ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের যুদ্ধই ছিল না। একটি নিয়মতান্ত্রিক সরকার, যুদ্ধকালে অবরুদ্ধ প্রায় ছয় কোটি মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এই মুক্তিযুদ্ধে। ফলে এটি প্রশ্নাতীতভাবে জনযুদ্ধ ছিল।

যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র যে ভূমিকা রেখেছিল তা বর্ণনাতীত। ১৯৭১ সালের জেনারেশনের এমন কেউ আছেন, যিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্বাধীন বাংলা বেতার ঘোষণার জন্য অপেক্ষায় থাকতেন না? কোটি কোটি বাঙালি, দেশের অভ্যন্তরের মুক্তিযোদ্ধা, সকলের মনোকেন্দ্র। বরেণ্য ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে মুক্তিযুদ্ধের ১২নং সেক্টর হিসেবে অভিহিত করেছেন।

অধ্যাপক মামুন যে সমস্ত বিদেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এ দেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিল, মহায়তা করেছিল নৈতিক ও অন্যান্যভাবে, সেই বিদেশি সিভিল সোসাইটিকে মুক্তিযুদ্ধের ১৩ নং সেক্টর বলে অভিহিত করেছেন। আমরা জানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক দেশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করেনি। অথচ ঐসব দেশসহ সারা বিশ্বের সিভিল সমাজ বাংলাদেশের যৌক্তিক দাবির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিলেন। ফলে এ দেশের মুক্তি আন্দোলন সমগ্র বিশ্বেই তৎকালে অভিঘাত ফেলেছিল।

সাম্প্রতিককালের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনায় অধ্যাপক মামুন বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের অভ্যন্তরে বেশকিছু বাহিনী গঠিত হয়েছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তি প্রচেষ্টায়। আঞ্চলিক এসব বাহিনীগুলো যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেশের মধ্যে অবস্থান করেই পাকিস্তানি বাহিনী ও এ দেশীয় দালালদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। যেমন- কাদেরিয়া বাহিনী, বাতেন বাহিনী, আফসার বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী, হালিম বাহিনী প্রমুখ। তিনি বলছেন, এসব বাহিনীর অবদান যথার্থভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্থান পায়নি। তিনি এসব বাহিনীকে 'Unsung heroes of our Liberation war' বলে অভিহিত করেছেন এবং একই সঙ্গে সমগ্র দেশের এরকম আঞ্চলিক বাহিনীগুলোকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ১৪নং সেক্টর বলছেন।

এ বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমি এরকম অনেকগুলো আঞ্চলিক বাহিনীর সন্ধান পেয়েছি। এসব বাহিনীগুলো দেশের অবরুদ্ধ মানুষের নিরাপত্তা প্রদান, মনোবল ধরে রাখা ও যৌথ বাহিনীর চূড়ান্ত আঘাত হানার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছিল। আমি মুক্তিযুদ্ধকালে খুলনা বিভাগে (তৎকালীন প্রশাসনিক বিভাগ) প্রাপ্ত এ ধরনের কয়েকটি আঞ্চলিক বাহিনীর কার্যক্রম সংক্ষেপে তুলে ধরছি।

আকবর বাহিনী, মাগুরা

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য মাগুরাতে যে সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়েছিল পরিস্থিতিতি খারাপ হয়ে গেলে কমিটির বেশিরভাগ নেতা ‘সংগ্রাম ফান্ড’সহ ভারতে চলে গেলেন ’৭১র মে মাসের প্রথম দিকেই। সেই নেতৃত্বহীন, নির্দেশনাহীন অবস্থায় মাত্র ৬টা ৩০৩ রাইফেল, ১টি চাইনিজ রাইফেল ও বেশ কয়েক রাউন্ড গুলির ওপর নির্ভর করে শ্রীকোল ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আকবর হোসেন মিয়া গড়ে তোলেন একটি সুশৃঙ্খল মুক্তিবাহিনী। যুদ্ধ চলাকালেই এই বাহিনী পরিচিতি পায় ‘আকবর বাহিনী’ নামে। এই বাহিনীতে ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের মোট ১২৮ জন এবং সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা হাজারেরও বেশি যোদ্ধা ছিল। এ বাহিনীর যোদ্ধাগণ শ্রীপুর, বালিয়াকান্দি, শৈলকুপা, পাংশা, ঝিনাইদাহ, রাজবাড়ী অর্থাৎ ঝিনাইদহের গাড়াগঞ্জ থেকে ফরিদপুরের গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল তাদের দখলে এনেছিলেন। অধিনায়ক আকবর হোসেন মিয়ার দক্ষ নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য সফল অভিযান চালানো হয়েছিল। এসব অভিযানের মধ্যে ছিল শ্রীপুর থানা দখল, শৈলকুপা থানা দখল, ইছাখাদা ও মাগুরা আনসার ক্যাম্প আক্রমণ, নাকোলের যুদ্ধ, কামারখালীর যুদ্ধ, আলফাপুরের যুদ্ধ প্রভৃতি। শত্রুর কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েই এই বাহিনী তাদের অস্ত্রের চাহিদা মিটিয়েছিল। আর বাহিনীর খাদ্য ও অন্যান্য চাহিদা মিটিয়েছিলেন স্থানীয় জনগণ। অধিকৃত অঞ্চলে বাহিনীপ্রধান একটি প্রশাসনও গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে মুক্তাঞ্চল হিসেবে খ্যাত শ্রীপুরের অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আকরাম হোসেনকে। আকবর মিয়া শ্রীপুরের চারপাশে ছোট ছোট মুক্তিযোদ্ধা দল তৈরি করেছিলেন। তিনি গরিব মুক্তিযোদ্ধাদের বেতনেরও ব্যবস্থা করেন। আকবর বাহিনীর কার্যক্রমে সন্তুষ্ট হয়ে ৮নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ মঞ্জুর এই বাহিনীকে ‘শ্রীপুর বাহিনী’ও বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে আকবর হোসেন মিয়াকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। এই বাহিনীর ৪১ জন বীর যোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। এ বাহিনীর বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ ও প্রতিরোধের খবর তখন প্রচারিত হয়েছিল বিবিসি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে। আকবর বাহিনীই ৭ ডিসেম্বর মাগুরা শত্রুমুক্ত করে এবং পরবর্তীতে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে ফরিদপুরে অভিযান চালায়। মুক্তিযুদ্ধে এই বাহিনীর অবদান অসামান্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই বাহিনীর কোনো যোদ্ধাই কোনো পদবিতে ভূষিত হননি।

জিয়া বাহিনী, সুন্দরবন

সমগ্র সুন্দরবন অঞ্চলটি মুক্তিযুদ্ধের সময় ৯নং সেক্টরাধীন ছিল এবং ’৭১-র নভেম্বর মাসের শুরুতে সাব-সেক্টর হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কিন্তু স্বীকৃতি প্রাপ্তির বহু পূর্বেই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় যে ব্যক্তি সুন্দরবন অঞ্চল জুড়ে একটি সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন তিনি হলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চতুর্থ গোলন্দাজ বাহিনীর অফিসার জিয়াউদ্দিন আহমেদ। স্বাধীনতা ঘোষণার পরের দিন ২৭ মার্চ বিকাল হতে জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে পিরোজপুর সরকারি স্কুল মাঠে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। এ সময় হতে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত পিরোজপুরের বিভিন্ন থানা ও বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলের অস্থায়ী ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল দুঃসাহসী জিয়া বাহিনী। এরপর জুন মাসের মাঝামাঝ সুন্দরবনে মাইঠা ক্যাম্প ও আড়াইবাঁকি ক্যাম্প স্থাপনের মধ্যে জিয়া বাহিনী স্থায়ী ঠিকানা ও পরিচিতি লাভ করে। জিয়া বাহিনীতে কমপক্ষে ১৬০০ মুক্তিযোদ্ধা (নিয়মিত আর্মি ব্যাটালিয়ন ও অনিয়মিত বাহিনী) ছিল। সেনাবাহিনীর নিয়মানুসারে পরিচালিত এ বাহিনীতে মোট ১২টি প্রশাসনিক বিভাগ ছিল ও বিশেষ গেরিলা বাহিনী যেমন- টাইগার কোম্পানি, ব্রাভো কোম্পানি ছিল। এছাড়াও মেডিকেল টিম চিকিৎসাসেবা প্রদান করত। ২৬ মার্চ পিরোজপুর অস্ত্রাগার লুট হওয়ার পর জিয়া বাহিনীর কাছে বেশকিছু আসে এবং বিভিন্ন থানা আক্রমণ, রাজাকার ও শত্রুবাহিনীর কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে জিয়া বাহিনী অস্ত্রশস্ত্রে সমৃদ্ধ হয়। তাছাড়া সাব-সেক্টর হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর জিয়া বাহিনী প্রবাসী সরকারের কাছ থেকে বেশকিছু উন্নত অস্ত্র পেয়েছিল। এ বাহিনী পিরোজপুর, বাগেরহাটের সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলসহ সমগ্র সুন্দরবন এলাকায় শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল এসব এলাকার জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় মানুষের পূর্ণ সহযোগিতায় জিয়া বাহিনীর খাদ্য ও অর্থ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়। ৮ ডিসেম্বর পিরোজপুর শত্রুমুক্ত করে জিয়া বাহিনী। যুদ্ধকালে অত্র এলাকার আটকেপড়া সাধারণ মানুষের কাছে দেবতা ও পাকিস্তানি বাহিনী ও দালালদের কাছে যমদূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল জিয়া বাহিনী।

রফিক বাহিনী, বাগেরহাট

রফিক বাহিনীর সংগঠক ছিলেন বাগেরহাট মহকুমার ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ভাসানী গ্রুপ ও ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের বিশিষ্ট নেতা রফিকুল ইসলাম (খোকন)। ১৯৭১ সালের ৯ মার্চ বাগেরহাট মহকুমা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয় এবং এ কমিটির তত্ত্বাবধানে মহকুমার বিভিন্ন অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে উঠতে থাকে। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষিতে রফিকুল ইসলাম বাগেরহাট সংগ্রাম কমিটি নিয়ন্ত্রিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সমান্তরালে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি বাহিনী গঠন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাগেরহাট শহরের উত্তর দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদীর অপর তীর থেকে প্রায় ৬ কি.মি. উত্তরে অবস্থিত চিরুলিয়া বিষ্ণুপুর গ্রাম ছিল রফিক বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি। এ বাহিনীর প্রধান কমান্ডার ছিলেন রফিকুল ইসলাম (খোকন)। সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন শেখ আনিছুর রহমান ও প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন শেখ আমজাদ আলী গোরাই। প্রথমদিকে এ বাহিনীর সদস্য ছিলেন মূলত বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছাত্র ও যুব কর্মীগণ। পরবর্তীতে দল-মত-নির্বিশেষে মুক্তিযোদ্ধারা এই বাহিনীতে যোগ দেন। বাহিনী গঠনের শুরুতেই ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী আসাদের সরবরাহকৃত একটি রিভলবারই ছিল সম্বল। এরপর পিরোজপুরের ফজলু বাহিনীর কাছ থেকে পাওয়া ১৯টি ৩০৩ রাইফেল ২৭ এপ্রিল বাগেরহাট শহরে টহলরত একটি পুলিশ দলকে আক্রমণ করে ৫টি ও এক আনসার সদস্যের কাছ থেকে ১টি রাইফেল ছিনিয়ে নেয়ার মাধ্যমে বাহিনীর অস্ত্রবল বাড়তে থাকে। এরপর বিভিন্ন থানা আক্রমণ, রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ ও শত্রুসৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাদের অস্ত্র, গোলাবারুদ ছিনিয়ে নিয়েই রফিক বাহিনীর অস্ত্রাগার সমৃদ্ধ হয়। এ বাহনী মূলত এপ্রিল থেকেই গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করে। প্রাথমিক অবস্থায় এ বাহিনী সরাসরি প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু অস্ত্রবল ও দক্ষ লোকবলের কারণে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ ছাড়াও রফিক বাহিনী স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবেও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। মুজিব বাহিনীর কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বাধীন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী মানস ঘোষের বাহিনী, হবি বাহিনী প্রমুখ বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। রফিক বাহিনী ছোট-বড় কমপক্ষে ২০টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মুজিবনগর সরকারের কোনোরূপ সহযোগিতা ছাড়াই রফিক বাহিনীর যোগ্ধাগণ এ অঞ্চলের প্রায় ১৫০ বর্গ কি.মি. এলাকা নিজ দখলে রাখতে সক্ষম হন। কোনো অঞ্চলের অধিকার তো হারাননি বরং অধিকৃত অঞ্চলের পরিমাণ বাড়াতে থাকেন এ বাহিনীর তৎপরতায় বাগেরহাটের মুনিগঞ্জ খেয়াঘাট থেকে চিতলমারী পর্যন্ত এক বিরাট এলাকা মুক্তাঞ্চল হিসেবে গড়ে ওঠে। এর মধ্যে ছিল গোটাপাড়া, বিষ্ণুপুর, চিতলমারী, ধোপাকালী, বেমজা, সন্তোষপুর, চরবানিয়া প্রভৃতি অঞ্চল। রফিক বাহিনীর প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হলেন গোলাম মোস্তফা হিল্লোল। এ ছাড়াও এ বাহিনীর বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন।

মানস বাহিনী, বাগেরহাট

বর্তমান বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার বাহিরদিয়া মানসা অঞ্চলে গড়ে ওঠে মানস বাহিনী। মানস ঘোষ ছিলেন এই বাহিনীর প্রধান। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটির জেলা পর্যায়ের একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা হিসেবে তিনি সুপরিচিত ছিলেন। সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন পূর্ব বাংলা গঠনের পক্ষপাতী এই নেতা মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই এ এলাকায় একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই সমগ্র দেশে যখন গণহত্যা, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ব্যাপক আকার ধারণ করে তখন ফকিরহাট থানার স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীও বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। এ থানার মানুষ যখন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় সহযোগীদের অত্যাচার-নির্যাতনের ভয়ে আতঙ্কিত সন্ত্রস্ত। তখন মানস ঘোষ তার সহযোগীদের নিয়ে এই এলাকায় একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলেন। প্রথম দিকে রফিক বাহিনীর সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয়পূর্বক মানস বাহিনী কার্যক্রম চালাত। ফকিরহাট থানার নলধা-মৌভোগ ইউনিয়ন, পিলতাঙ্গ ইউনিয়ন, বাহিরদিয়া-মানসা ইউনিয়ন, মোল্লাহাট থানার গাওলা-৩ গাংনী ইউনিয়ন, খুলনা সদর থানার (বর্তমান রূপসা থানা) ঘাটভোগ প্রভৃতি এলাকায় মানস ঘোষের গণবাহিনী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। খুলনা অস্ত্রাগার লুট হওয়ার পর মানস বাহিনীও বেশকিছু অস্ত্র পেয়েছিল। এ ছাড়া অত্র এলাকার দুষ্কৃতকারী, লাইসেন্সধারী ও স্বাধীনতা বিরোধীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া অস্ত্রই ছিল এ বাহিনীর মূল ভরসা। একাত্তরের মার্চের শুরু থেকে মধ্য আগস্ট পর্যন্ত মানস বাহিনী উল্লিখিত অঞ্চলে খুব সক্রিয় ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে বিশেষ করে সোভিয়েত-ভারত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর চীনপন্থী মানস ঘোষ মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কাজ করতে শুরু করেন। তবে এ কথা নিঃসন্দেহে স্বীকার্য যে, বিজয় অর্জিত হওয়া পর্যন্ত ঐ এলাকার অবরুদ্ধ সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্যাতনের শিকার প্রায় হয়নি বললেই চলে।

সিদ্দিক বাহিনী, ভোলা

১৯৭০ সালের মহাপ্রলয়ে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পূর্ব বাংলার উপক‚লীয় অঞ্চল (বর্তমান একমাত্র দ্বীপ জেলা) ভোলাতে ছুটিতে এসেছিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টের ল্যান্স নায়েক সিদ্দিকুর রহমান। সঙ্গে ছিলেন আরো কয়েকজন সেনা সদস্য। ভোলাতে সংগ্রাম কমিটি গঠিত হলে তিনি সংগ্রাম কমিটির নেতাদের জানালেন, ‘আমাদেরকে কয়েকটি অস্ত্র দিলে আমরা যুদ্ধ করতে পারি, আমরা ওখানে ফিরে যেতে চাই না।’ ২৭ মার্চ ভোলা ট্রেজারি থেকে কিছু অস্ত্র সংগ্রহ করা হলে সিদ্দিকুর রহমান ও তার সঙ্গীরা বেশ কয়েকটি ৩০৩ রাইফেল পান। এগুলো নিয়েই শুরু। ভোলার দৌলতখান, বোরহান উদ্দিনে তার সহযোগিতায় বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষণ শিবির চালু হয় ও দেওলা হাজীবাড়িতে ভোলার মুক্তিযোদ্ধাদের সদর দপ্তর স্বরূপ হাজীবাড়ি ক্যাম্প খোলা হয়। সিদ্দিকুর রহমানের প্রচেষ্টায় সিরাজ সিকদারের গ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে ওসমানগঞ্জের যুদ্ধে সাফল্য এ বাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে। এ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় ও সিদ্দিক বাহিনী কর্তৃক পাকিদের অস্ত্রশস্ত্র আটক ভোলাতে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। এরপর দেউলার যুদ্ধে সিদ্দিক বাহিনীর একপেশে জয় এ বাহিনীর কার্যক্রম সর্বজন স্বীকার করে নেয়। এমনকি সিদ্দিকুর রহমানকে ভোলার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় এবং তাকে হাইকমান্ড উপাধি দেয়া হয়। এরপর সিদ্দিক বাহিনীর যোদ্ধারা ছোট-বড় কমপক্ষে ১৫টি সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পুরো ভোলা ছিল সিদ্দিক বাহিনীর কার্য এলাকা। মূলত শত্রুর কাছ থেকে জিতে নেয়া অস্ত্রই ছিল এ বাহিনীর অস্ত্রের উৎস। সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য ও পালিয়ে আসা সদস্য, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র ও সাধারণ জনতা ছিল সিদ্দিক বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা। তবে অক্টোবর মাসের শেষ দিক হতেই ভোলার সর্বশ্রেণির মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্ব আসে সিদ্দিকুর রহমানের হাতে। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পরামর্শ করে ভোলার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। অবশেষে ১০ ডিসেম্বর ভোলা শত্রুমুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রে সিদ্দিক বাহিনীর ভূমিকা ছিল সর্বাপেক্ষা অগ্রগণ্য।

জাহাঙ্গীর বাহাদুরের বাহিনী, পিরোজপুর

ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় পিরোজপুরে গড়ে ওঠা স্থানীয় বাহিনীসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি হলো জাহাঙ্গীর বহাদুরের বাহিনী। স্বরূপকাঠীর নূর মোহাম্মদের ছেলে জাহাঙ্গীর বাহাদুর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই স্বরূপকাঠী কলেজ মাঠসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাতেন। এ কাজে তিনি সহযোগিতা পেয়েছিলেন বড় ভাই আলমগীর বাহাদুরের। জাহাঙ্গীর বাহাদুরের বাহিনীর কার্যক্রম বিস্তৃত ছিল স্বরূপকাঠী, নাজিরপুর ও বানারীপাড়া এলাকায়। তিনি এ এলাকার কমান্ডার ছিলেন। ওই এলাকায় সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধে এ বাহিনী বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এ বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিল বেসামরিক ব্যক্তিত্ব এবং বেশ কয়েকজন ছিল সেনা সদস্য। এ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ৫০ জন। ক্ষুদ্র হলেও উল্লিখিত এলাকায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয় জাহাঙ্গীর বাহাদুরের বাহিনী। কখনো কখনো অন্য মুক্তিযোদ্ধা দলের সঙ্গে যৌথভাবেও এ বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনী ও এ দেশীয় কুলাঙ্গার দালালদের বিরুদ্ধে যুক্ত করেছিল। জাহাঙ্গীর বাহাদুর ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুক্তিযুদ্ধে। তার আপন দুই ভাইসহ পরিবারের বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তরপরও তিনি হাল ছাড়েননি। অবরুদ্ধ এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে সাহস জোগানো, তাদের নিরাপত্তা দেয়া, শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ও সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়াসহ নানা ইতিবাচক কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে এই এলাকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশের নাম জাহাঙ্গীর বাহাদুরের বাহিনী।

সিরাজ সিকদার বাহিনী

সিরাজ সিকদার ছিলেন একজন বামপন্থী রাজনীতিবিদ। ১৯৬৮ সালে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন নামে তিনি একটি শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলেন। ’৬৯-র গণআন্দোলনের সঙ্গে এই সংগঠন ধীরে ধীরে জড়িত হয় এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সিরাজ সিকদারের দিকনির্দেশনায় বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা অঞ্চলের সিরাজ সিকদারের বাহিনী তাদের কার্যক্রম চালাতে থাকে। মুটিয়াকাঠি, সোহাগদল, কৌড়িখাড়া, ভোলার চরফ্যাশন, স্বরূপকাঠী প্রভৃতি স্থানে এ বাহিনীর ব্যাপক কার্যক্রম শুরু হয়। এছাড়া, বরিশালের আটঘর কুরিয়ানা ছিল সিরাজ সিকদার বাহিনীর মূল ঘাঁটি। প্রায় একশজন বামপন্থী যোদ্ধার এই বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত ছিল। যুদ্ধের শুরুতেই স্থানীয় রাজাকার, দালাল, শান্তি কমিটির নেতাদের ওপর একাধিক আক্রমণ চালিয়ে এই বাহিনী সাধারণ জনগণের আস্থা অর্জন করে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় এই বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর বেশ কয়েকটি সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ে। ভোলাতে প্রথম পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ শুরু করে এই সিরাজ সিকদার গ্রুপ। সিরাজ সিকদার গ্রুপের অস্ত্রের জোগান ছিল পূর্ব থেকেই তাদের কাছে থাকা বেশকিছু অস্ত্রশস্ত্র ও স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কিছু অস্ত্র। এই বাহিনীর সঙ্গে বেশ কয়েকজন নারী মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর আটঘর কুরিয়ানা আক্রমণের পর মূলত এই বাহিনী ঝিমিয়ে পড়ে। অনেক মুক্তিযোদ্ধা অন্যান্য মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। এই বাহিনী কখনো কখনো অন্যান্য মুক্তিবাহিনীর সঙ্গেও যৌথভাবে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তবে সর্বহারা পার্টি গঠনের পর এ বাহিনীর কিছু কার্যক্রম বেশ সমালোচনার শিকার হয়। তারপরও সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের আস্থা অর্জন করেছিল এই সিরাজ সিকদার বাহিনী। বিশেষ করে রাজাকার, দালাল, লুটেরাদের অত্যাচার, নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে সিরাজ সিকদার বাহিনী ছিল ঐসব অঞ্চলের মনুষের আস্থার নাম।

উল্লিখিত আঞ্চলিক বাহিনীসমূহের বাইরেও বরিশালে আমরা বেশ কয়েকটা আঞ্চলিক বাহিনীর সন্ধান পেয়েছি। শিক্ষক আব্দুল গফুরের বাহিনী, হিজলা-মুলাদি অঞ্চলের কুদ্দুস মোল্লার বাহিনী, বাখেরগঞ্জের জাফর বাহিনী, নাসির বাহিনী প্রভৃতি। ভৌগোলিক কারণে বেশ দুর্গম হওয়ায় এ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই এসব বাহিনী গড়ে ওঠে। প্রবাসী সরকারের অনুগত এসব ছোট ছোট বাহিনীই মূলত বরিশালের মুক্তিযুদ্ধের প্রাণ ’৭০-র প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ঐ অঞ্চলে থেকে যাওয়া বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, আনসারের বেশিরভাগ সদস্যই এসব বাহিনীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। বস্তুত, ভারত থেকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত এফএফ মুজিব বাহিনী এবং যৌথ বাহিনীর অবস্থান ও নিরাপত্তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল উল্লিখিত বাহিনীসমূহ। আর এর ফলেই মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন ত্বরান্বিত হয়েছিল।



লেখক তালিকা