This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Bangladesh Liberation War, Genocide of Innocent Bengali People in 1971 and contemporary political events of Bangladesh.
More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

The Exeter South Asia Centre of the College of Humanities of the University of Exeter listed ‘Muktijuddho e-Archive’ as a source for Research materials.
The University of Exeter is a public research university located in Exeter, Devon, South West England, United Kingdom. 
This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

বাংলাদেশে যেভাবে শিবিরের উত্থান

বাংলাদেশে যেভাবে শিবিরের উত্থান

জাহামজেদ





ইসলামি ছাত্র সংঘ নামটার সাথে বাংলাদেশের কমবেশি সব মানুষই পরিচিত। আমিও পরিচিত। কিভাবে পরিচিত, গালি দিতে দিতে পরিচিত, মানুষ আলবদর রাজাকার বলে যখন গালি দেয় সেই গালি শুনে পরিচিত, একাত্তরে দালালি করছে, মানুষ খুন করছে, লুটপাট করছে এসব শুনে পরিচিত। আমি নিজে এই নামটার সাথে পরিচিত হই কৈশোরেই। স্কুলে আমাদের ক্লাসের এক স্যার ছিলেন, আমাদের সবচেয়ে প্রিয় স্যার ভালোবাসার স্যার, যিনি আমাদেরকে ছেলে বলে ডাকতেন, সেই স্যারের কথায় আমরা প্রথম জানতে পারি, আমরা মানে আমাদের ক্লাসের সব বন্ধুরা,ছাত্র সংঘ নামটার ইতিহাস। তখন আমাদের স্কুলের সামণে মোটরসাইকেল নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই দাঁড়িয়ে থাকতেন ভদ্রবেশি দু'তিনজন যুবক। স্যার ক্লাসে এসে আমাদেরকে ওই যুবকদের সম্পর্কে সতর্কবাণী শোনাতেন, বলতেন ওরা শিবির, ওদের থেকে সাবধান, ওরা একাত্তরের ঘাতক, ওরা রাজাকার, ওরা আলবদর, ওরা অনেক মানুষকে একাত্তরে হত্যা করেছে, অনেক লুটপাট করেছে, ওদের কথা কখনো শুনো না, ওদের ডাকে কখনো সাড়া দিও না। স্কুল ছুটি হলে ওরা আমাদেরকে ডাকতো, আমি যেতাম না, আমার বন্ধু নোমান যেত না, হাসান যেত না, আমাদের ক্লাসের কেউই ওদের কাছে যেত না। তারপরও ওরা আমাদেরকে নানা ধরণের প্রলোভন দেখাতো, স্টিকার দিতে চাইতো, ক্যাসেট দিতে চাইতো, ফুলকুঁড়ি নামের একটা সংগঠনে যাওয়ার জন্য বলতো। আমরা ওদের কথা পাত্তা না দিয়ে স্যার কে গিয়ে এসব কথা বলতাম। স্যার কান্নাজড়ানো কন্ঠে আমাদের সাথে গল্প করতেন, বলতেন, বাবারা ওরা হচ্ছে সেইসব পিশাচ, যাদের পূর্বসুরিরা একাত্তরে এদেশে গণহত্যা চালিয়েছিলো, লাখ লাখ মানুষ এরা খুন করেছে, মানুষের সম্পদ লুটপাট করেছে, এরা হায়েনার দল, এরা রক্তচোষা, এদের থেকে তোমরা দুরে থাকবে, জীবনে আমার একটা কথা তোমরা রেখো, কোনোদিন এইসব রাজাকার আলবদর ছাত্র সংঘের মানুষদের সাথে হাত মেলাতে যেও না।। তখন আমরা শুনেছিলাম ইসলামি ছাত্র সংঘের নাম, শুধু আমি না, আমার ক্লাসের প্রায় সবাই শুনেছিল এই পশুদের কথা, বর্বরদের কথা। স্যার আরো বলতেন, স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে যারা তোমাদেরকে প্রলোভিত করার চেষ্টা করে তারা শিবির, তারাই বর্বর পশুদের উত্তসূরি, এরাই ছাত্র সংঘ নামের কুলাঙ্গারদের উত্তরসূরি। তারপর স্যারের চোখে আমরা পানি দেখতাম, স্যার বাইরে তাকাতেন, তার সেই দৃষ্টিতে কি থাকতো আমরা তা বুঝতে পারতাম না। কিন্তু আমরা স্যারের কথা রেখেছিলাম, আমাদের ক্লাসের কেউ শিবির করেনি,কোনোদিন না, আমরা শুধু ঘৃণাই করে গেছি এই পশুদের, এই বর্বরদের। স্যার বেঁচে নেই, সিলেটে গণহত্যা নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্রের সিরিজ করতে গিয়ে আমি পুরো সিলেট চষে বেড়িয়েছি ২০০৬/০৭ সালে। সিলেটের গণহত্যা নিয়ে এই সিরিজের পরই সচলায়তনে আরেকটা সিরিজ লিখবো। প্রামাণ্যচিত্রের কাজে তখন একদিন স্যারের গ্রামে গিয়েছিলাম, তখন অবাক হয়ে আমি শুনেছি, স্যার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, একাত্তরে রাজাকার আলবদরদের সহযেগিতায় স্যারের দুই ভাই ও বাবাকে খুন করে পাক সেনাবাহিনী। অথচ স্যার কখনোই আমাদেরকে এই কথাগুলো বলেননি, স্যার শুধু রাজাকার আলবদর বলে গালি দিতেন, তারপর বাইরে তাকাতেন, তার চোখে জল টলমল করতো, অসম্ভব ভদ্র একজন মানুষ গালি দিতেন এই বলে, শিবির নামের কুলাঙ্গারা আসলে ছাত্রসংঘ।

এই সিরিজটা উৎসর্গ করছি এক মুক্তিযোদ্ধাকে, একাত্তরে স্বজন হারানো এক মানুষকে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও যে মানুষটি যুদ্ধ করে গেছেন দেশবিরোদী শক্তির বিরুদ্ধে, সেই মানুষ, একজন যোদ্ধা, একজন বীর, আমার প্রিয় শিক্ষক শফিকুর রহমানকে...

ইসলামি ছাত্র সংঘ থেকে ইসলামি ছাত্রশিবির:

জিয়াউর রহমান নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, সেক্টর কমানডার ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা দখল এবং ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্য তিনি বাংলাদেশে মৌলবাদী রাজনীতির সূচনা করার সুযোগ করে দেন। বিশেষত, রাজাকার, আল বদর, আল শামসদের শুধু ক্ষমাই করে দেননি, ভবিষ্যতের এসব দেশবিরোধী শক্তির যেন বিচারের মুখোমুখি না দাঁড়াতে হয় তার জন্য ১৯৭২ সালের প্রণীত দালাল আইন ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে বাতিল করে দেন। জিয়াউর রহমানের দালাল আইন বাতিলের ফলে জেলে আটক প্রায় ১১ হাজার রাজাকার সে সময় মুক্ত হয়। তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে রাজাকার, আল বদর, আল শামসদের রাজনৈতি করার সুযোগ দিয়ে রাজনীতিকে ধর্ম ব্যবসায়ী আর মৌলবাদীদের এক রকমের লিজ দেওয়া হলো। একাত্তরের আলবদর রাজাকারদের অনেকেই জেল থেকে বের হয়ে এসে শুর করে আনন্দ উল্লাস। যারা পালিয়ে ছিলো তারাও জনসম্মুখে বের হয়ে এলো। এরপর ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৬ তারিখে ঢাকার সিদ্দিক বাজার কমিউনিটি সেন্টারে আলবদর রাজাকাররা একটি সভায় মিলিত হয়। আলবদরদের সেই সমাবেশে আবার রাজনীতির মাঠে প্রকাশ্যে নামার প্রস্তুতি নেয় ইসলামি ছাত্রসংঘ নামের একাত্তরের ঘাতক সংগঠনটি। কিন্তু ছাত্র জামাতের নীতি নির্ধারকদের মনে এই ভয় ছিলো, ছাত্রসংঘ নামটাকে হয়তো মানুষ একাত্তরে তাদের পৈশাচিক কর্মকান্ডের জন্য ভুলে যাবে না, এই চিন্তা থেকেই তারা ছাত্রসংঘের সংঘ কেটে সেখানে শিবির যোগ করে দেয়। এই শিবির নামটি এসেছে কোথা থেকে, পাকিস্তান আমলে জামাতের শিশু কিশোরদের একটা সংগঠন ছিলো শাহিন শিবির, শাহিন শিবির নিয়ে এসে ইসলামি ছাত্রসংঘের নাম হয়, ইসলামি ছাত্রশিবির। ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রয়ারি স্বৈরাচারের পৃষ্টপোষকতায় বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম হয় একাত্তরের ঘাতক দালাল ও তাদের উত্তরসূরিদের নিয়ে ইসলামি ছাত্র শিবির নামের বর্বর পৈশাচিক এক সংগঠনের।

ইসলামি ছাত্রসংঘ বাদ দিয়ে শুধু শিবির করা হয়, আর সবকিছুই একই থাকে। পতাকা মনোগ্রাম সবই এক। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, পাঠক্রম, এমনকি জেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত নেতৃত্ব কাঠামো সবই এক থাকে ইসলামি ছাত্রসংঘের মতোই।

শুরুতেই এই কথাটা আমরা জেনে রাখি, ইসলামি ছাত্রশিবির মানে ইসলামি ছাত্রসংঘ, ইসলামি ছাত্রসংঘ মানে আলবদর রাজাকার, আলবদর রাজাকার মানে একাত্তরে হাজার হাজার লাখ লাখ মানুষ খুনী, লুটপাটকারী, দালাল।

সবকিছু যদি এক তাহলে কেন এই নাম পরিবর্তন ? নামবদলের কারণ, প্রথমত, আলবদর বাহিনীর সাথে ইসলামি ছাত্রসংঘের সম্পর্ক ছিলো আনুষ্টানিক। জামাতের প্রচেষ্টা ও সহযোগিতায় পাকিস্তানের সামরিক সরকার এই বাহিনী গঠন করে। পরবর্তীতে বদর বাহিনীর মূল নেতৃত্ব ন্যাস্ত হয় ইসলামি ছাত্রসংঘের হাতে। দ্বিতীয়ত, বদর বাহিনীর হিংস্র এবং পৈশাচিক কার্যকলাপ বাংলাদেশের মানুষের মনে একটা স্থায়ী ঘৃণার ভাব সৃষ্টি করেছে। জামাত তখন ভালো করেই জানতো এই ঘৃণাটা কখনো দূর হবে না। ইসলামি ছাত্রসংঘের কথা উঠলেই অবধারিতভাবে আলবদর বাহিনীর কথা চলে আসবে। এর ফলে সংগঠন সম্প্রসারণ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তৃতীয়ত, যদি কখনো স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পরিস্থিতি উদ্ভব ঘটে তখন আইনগত ভাবে ফেসে যেতে পারে ইসলামি ছাত্র সংঘ। সেক্ষেত্রে যাতে সংগঠনের কাজ ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সেজন্য জামাতিরা এই নামবদলের কাজটা প্রথম সুযোগেই সম্পাদন করে ফেলে। চতুর্থত, নতুন কর্মী সংগ্রহের ক্ষেত্রে যদি আলবদর এবং ইসলামি ছাত্রসংঘের সম্পর্কের বিষয়টি নতুন কর্মীদের মনে প্রশ্ন ও সন্দেহ জাগায় তাহলে সেটা সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর হবে। ইসলামি ছাত্রসংঘ নাম বদলে ইসলামি ছাত্রশিবির নামে তাদের কার্যক্রম শুরু করার পর শিবিরের প্রথম সভাপতি হয় মীর কাশেম আলী ও সেক্রেটারি হয় মোহাম্মদ কামরুজ্জামান।

মীর কাশেম আলীর ডাক নাম পিয়ার। ১৯৭১ সালের প্রথম দিকে মীর কাশেম আলী ছিলো জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের চট্টগ্রাম জেলা সভাপতি, পরে রাজাকার কর্মে কৃতিত্বের পুরস্কার হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদকের পদ দেয়া হয় তাকে। স্বাধীন হওয়ার পরপরই সে পালিয়ে যায় সৌদি আরব। ফিরে আসে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরে। তারপর জিয়াউর রহমান সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে। শিবিরের প্রথম সভাপতি হবার পর সে মহানগর জামায়াতের আমির হয়। 'একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়' বই থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরে ইসলামী ছাত্রসংঘের উদ্যোগে মুসলিম ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক সমাবেশে সভাপতির ভাষণে মীর কাশেম আলী বলে, গ্রামগঞ্জের প্রত্যেকটি এলাকায় খুঁজে খুঁজে শত্রুর শেষচিহ্ন মুছে ফেলতে হবে। প্রথম দিকে মীর কাশেম আলী চট্টগ্রামে আলবদর বাহিনীর প্রধান কমান্ডার ছিলো। পরে তার অত্যাচার-নির্যাতনে খুশি হয়ে ঊর্ধ্বতন নেতারা তাকে আলবদর বাহিনীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তিন নম্বরে পদোন্নতি দেয়।

অন্যদিকে কামরুজ্জামান ৭১ সালে ইসলামী ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার নেতা ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময় জামালপুরে প্রথম আলবদর বাহিনী গড়ে উঠে, যার প্রধান সংগঠক ছিলো কামারুজ্জামান। শহীদ বদিউজ্জামানকে ধরে এনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার জঘন্য কর্মটি কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে হয়েছিল। এ ব্যাপারে আরও কয়েকজনসহ তার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার পর মামলা দায়ের হয়েছিল। শেরপুর জেলার শহীদ গোলাম মোস্তফার হত্যাকাণ্ডটিও তার সংঘটিত হয়েছিল কামারুজ্জামানের নির্দেশে। এই বীরকে হাত-পায়ের রগ কেটে, গায়ের মাংস তুলে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিলো কামরুজ্জামানের বাহিনী। তাছাড়া বাড়ি পোড়ানো, লুটপাট, নারী নির্যাতনসহ আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ বইয়ের ১১১-১১২ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে জানা যায়, কামারুজ্জামানের নেতৃত্বেই ময়মনসিংহ জেলার সব ছাত্রসংঘ কর্মীকে আলবদর বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এই দুই আলবদর শিবিরের নেতৃত্বে আসার পর নতুন করে গতি পায় তাদের বাংলাদেশ বিরোধী কার্যকলাপ। একবছরের মধ্যেই তারা শুরু করে তাদের প্রথম অভিযান। ১৯৭৮ সালে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ভের ভাস্কর্য 'অপরাজেয় বাংলা' ভেঙ্গে ফেলার জন্য সাক্ষর শুরু করে। এতে ছাত্রসমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে রাতের অন্ধকারে তারা অপরাজেয় ভাস্কর্য বেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু সচেতন ছাত্রসমাজের প্রতিরোধের মুখে তারা পিছু হঠে এবং সেদিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। এরপর একইভাবে তারা জয়দেবপুরে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে। সেখানেও তারা ব্যর্থ হয়। তারপর তারা ঢাকা ছেড়ে নিজেদেরকে সারাদেশে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করে। শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখলের লড়াই। একাত্তরে মুক্তিবাহিনীর হাতে যেসব আলবদর রাজাকার নিহত হয় তাদের নামানুসারে বিভিন্ন সেল গঠন করে তারা তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে শুরু করে। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে তারা একদিকে যেমন অস্ত্র ও অর্থভান্ডার গড়ে তুলে অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যে কোনো স্মৃতি মুছে ফেলার জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। শুরু হয় চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের দখলদারিত্বের রাজনীতি। এদেশে আবার নতুন করে শুরু হয় আলবদর রাজাকার স্টাইলে তাদের খুনের রাজনীতি।

ছাত্র সংঘ নাম পরিবর্তন করেও শিবিরের খুব একটা লাভ হয় না। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৮ সাল থেকে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। কিন্তু বারবার তারা প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর বাঁধার মুখে পড়ে। সবাই তাদেরকে একাত্তরের ঘাতক আলবদরদের পূর্বসূরি হিসেবেই দেখতে শুরু করে। শিবির তাদের সংবিধানের দুই ধারা মোতাবেক ’আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল ( সঃ ) প্রদর্শিত বিধান অনুযায়ী মানুষের সার্বিক জীবনের পুনর্বিন্যাশ সাধন করে আল্লাহর সন্তোষ অর্জনের’ ডাক দিয়ে আশানুরূপ সাড়া পায় না। ঢাকার মানুষের কাছে, ছাত্রসমাজের কাছে তারা মৌলবাদ আর রাজাকারের উত্তরসূরির মর্যাদা পায়। তাদের ইসলামের ডাককে সবাই ভাওতাবাজি মনে করে। তারপর রাজধানী ঢাকায় নানা কার্যক্রমে ব্যর্থ হয়ে জামাতের নীতিনির্ধারণী মহল শিবিরকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। জামাতের কার্যকরী পরিষদের সভায় ১৯৭৮ সালে এই সিদ্ধান্ত হয়, ছাত্র সংঘ নাম পাল্টিয়েও যেহেতু শিবিরের কোনো লাভ হয়নি, তাই শিবিরকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তখন জামাতের নেতৃত্ব শিবিরকে ঢাকা কেন্দ্রিক না রেখে সারাদেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। তারা শিবিরকে শহর কেন্দ্রিক না রেখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং মফস্বল আর গ্রাম কেন্দ্রিক রাজনীতিতে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করে। এই বিষয়টি পরবর্তীতে শিবিরের উত্থানে সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে।

শিবির: ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে

ইসলামি ছাত্রশিবির, আসুন শুরুতেই আমরা জানি, এরা পশু, এরা বর্বর, এরা পিশাচ, এরা একাত্তরের রাজাকার আলবদরদের উত্তরসূরি।

ইসলামি ছাত্রশিবিরকে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার মূল পরিকল্পনা ছিল মীর কাশেম আলীর। সত্তরের দশকের শেষ দিকে রাজাকারদের যখন স্বৈরাচার সরকার এদেশে প্রতিষ্টার সুযোগ করে দেয়, তখন পালিয়ে থাকা, আত্মগোপনে থাকা অনেকেই প্রকাশ্যে বের হয়ে আসে। জেল থেকে একে একে ছাড়া পেতে শুরু করে দালাল আইনে আটক থাকা আলবদর রাজাকাররা। চট্টগ্রামে শিবিরের বিস্তারে মীর কাশেম আলী তখন জেল থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক আলবদর কর্মীকে ছাত্রশিবিরের স্থানীয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আহবান জানায়। যেহেতু মীর কাশেম আলী নিজে পাকিস্তান আমলে জামাতের ছাত্র সংগঠন ছাত্র সংঘের চট্টগ্রামের সভাপতি ছিলো, তাই সত্তরের দশকের শেষ দিকে শিবির যখন চট্টগ্রামে তাদের রাজনীতির সূচনা করে তখন কাশেম আলী চট্টগ্রামের শিবিরের রাজনীতিতে তার বাহিনীর লোকজনকেই প্রাধান্য দেয়। যাদের একাত্তরে এদেশের মানুষের রক্তে হাত রাঙ্গানো ছিলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যে বাহিনী বর্বরতায় হার মানিয়েছিলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীকেও সেই বর্বর পিশাচ বাহিনীর অনেকেই নিজেদের শরীর বাঁচাতে এবং একটি নিশ্চিত রাজনৈতিক আশ্রয়ের আশ্বাসে ছাত্রশিবিরে যোগ দেয়।

চট্টগ্রামে নিজেদের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তারা শুরুতেই মানুষের মনে একটা আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিতে একাত্তরের মতো বর্বরতার আর্শয় নেয়। মূলত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্টানে নিজেদের অস্তিতের ঘোষণা দিতে এবং শিক্ষা প্রতিষ্টানগুলোতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতেই তারা চট্টগ্রাম থেকেই শুরু করে তাদের হত্যার রাজনীতি। এই হত্যার রাজনীতি শুরু করা হয় শিবির নামটি শুনে মানুষ যাতে ভয় পায়, মানুষ যাতে শিবিরকে সমীহ করে চলে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্টানে ছাত্র সংগঠনগুলো যাতে শিবিরকে রাজনীতির মাঠে প্রবেশের সুযোগ দেয়, সমীহ করে, ইসলামি ছাত্র শিবির নাম শুনে যাতে ভয়ে ছাত্ররা শিবিরে যোগ দেয়, এসব কিছু কারণেই।

আধিপত্য বিস্তারে চট্টগ্রামে শিবির শুরু করে হত্যার রাজনীতি:

বাংলাদেশে ইসলামি ছাত্রশিবিরের হাতে প্রথম খুন হন চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত এজিএস ও ছাত্রলীগ নেতা তবারক হোসেন। ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য দিবালোকে শিবির কর্মীরা রামদা ও কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে তবারক হোসেনকে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তবারক যখন পানি পানি বলে চিৎকার করছিলেন তখন এক শিবির কর্মী তার মুখে প্রস্রাব করে দেয়। একাত্তরের ওদের পূর্বপুরুষদেরকেও ছাত্রশিবিরের পান্ডারা সেদিন বর্বরতায় হার মানিয়েছিলো। এই একটি খুনের মাধ্যমেই শিবির হিংস্রতার পরিচয় দিয়ে মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। যারা এই খুনের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, পরবর্তী সময়ে অনেক পত্রপত্রিকায় তারা বিভিন্ন সময়ে এই হত্যাকান্ড নিয়ে কথা বলেছেন, তারা বলেছেন শিবিরের সেদিনের বর্বরতার কথা, পৈশাচিকতার কথা। প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে একজন হলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি নাজিমউদ্দিন। এই বিষয়ে একটি দৈনিকের সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন,’ শিবিরের সন্ত্রাসীরা সেদিন তবারক হোসেনকে কিরিচ দিয়ে উপুর্যপুরি কুপাতে কুপাতে হত্যা করে। কিরিচের এলোপাতাড়ি কুপে মুমূর্ষ অবস্থায় তবারক যখন পানি পানি বলে চিৎকার করছিলেন তখন এক শিবির কর্মী তার মুখে প্রসাব করে দেয়। পরবর্তীতে সাক্ষীর অভাবে এই হত্যাকান্ডে জড়িত সবাই বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। কারণ, এই বর্বর পশুদের বিরুদ্ধে ভয়ে তখন কেউই রাজি হয়নি।

এই ঘটনার পর ছাত্রশিবির সাধারণ ছাত্র ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের মনে ভয় ঢুকিয়ে চট্টগ্রামে নিজেদের একটা অবস্থান তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়। তারপর তারা তাদের রাজনীতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে । সেই লক্ষ্যে তারা নিজেদের মতাদর্শে বিশ্বাসী ছাত্রদের দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু করে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম নগরীতে কাজ করতে থাকে ছাত্রশিবিরের ভিন্ন ভিন্ন ইউনিট। নগরীর কলেজগুলোর দখল নেওয়ার জন্য তারা দফায় দফায় সংঘর্ষে লিপ্ত হয় ছাত্রলীগ আর ছাত্র ইউনিয়নের সাথে। তখন তারা চট্টগ্রাম নগরীর কলেজগুলোতে শুরু করে রগ কাটার রাজনীতি। তাদের বিরুদ্ধে যারাই কথা বলতো তাদের হাত পায়ের রগ কেটে দিতে শুরু করলো শিবিরের পশুরা।

ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় টার্গেট করে তৎকালীন সময়ে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে। তারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্দিকে নিজেদের আস্তানা গড়ে তুলে। শিবিরের অনেক কর্মী ও নেতারা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিজেদের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের এলাকায় বিয়ে করে সংসার করতেও শুরু করে। তারা স্থানীয় অধিবাসীদের নানা ধরণের আর্থিক সুযোগ সুবিধা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্দিকের গ্রামগুলোতে মেস ও ছাত্রাবাস গড়ে তুলে। তারপর সেখানে শিবির নিজেদেরকে দরিদ্র কর্মীদেরকে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। প্রথমদিকে তারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের বাধার সম্মুখীন হলেও এরশাদ সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরোপুরি নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। আশির দশকে তারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সিরাজুস-সালেহীন বাহিনী গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে তান্ডবলীলা চালায়। এই বাহিনীর নাম শুনলেই তখন দেশের মানুষের চোখে এসে ভাসতো এক হিংস্র বর্বর কাহিনীর কথা। যারা কোনো কারণ ছাড়াই তখন শুধুমাত্র মানুষের মনে আতঙ্ক ঢুকানোর জন্যই যার তার হাত পায়ের রগ কাটতে শুরু করে। এই বাহিনীর তান্ডবের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে সাধারন ছাত্রছাত্রীরাও। তৎকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র ব্যক্তিগত আলাপে আমাকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি রগকাটার রাজনীতি শুরু না করতো তাহলে শিবির কখনোই নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারতো না। শিবির বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মনে তাদের হিংস্র কার্যকলাপের মাধ্যমে ভয় ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ক্যাম্পাসে তারা খুব সহজেই নিজেদের অবস্থান নিয়ে ফেলে। তাছাড়া তখন যারা ছাত্রলীগ বা বাম রাজনীতি করতেন, তাদের অনেকেই চট্টগ্রাম নগরীতে থাকতেন। অন্যদিকে শিবির বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোকে নিজেদের জনবল ও শক্তি বাড়িয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের এলাকায় বাড়ি ঘর মেস ছাত্রাবাস করে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটাকে নিজেদের জন্য অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্রে রেখে বৃত্তাকারে তারা একটি প্রতিরক্ষা দুর্গ গঠন করে। যার ফলশ্রুতিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি ছাত্রশিবিরের এত মজবুত অবস্থান তৈরি হয়ে যায়।

চট্টগাম কলেজে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ১৯৮৪ সালের ২৮ মে ইসলামি ছাত্রশিবির কর্মীরা চট্টগ্রাম কলেজের মেধাবী ছাত্র শাহাদাত হোসেনকে ঘুমের মধ্যে জবাই হত্যা করে। শাহাদাত হোসেন সে রাতে তার উচ্চ মাধ্যমিকের ব্যবহারিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ঘুমোতে যান। ঘুমের মধ্যেই হারুন ও ইউসুফ গলায় ছুরি চালিয়ে জবাই করে হত্যা করে শাহাদাতকে। শাহাদাতের অপরাধ ছিলো সে হারুন ও ইফসুফের কথায় ছাত্রশিবিরে যোগ দেয়নি ! পরবর্তীতে শাহাদাত হত্যাকান্ডের জন্য এই দুজনের সাজা হয়। কিন্তু দু’বছর পরই উচ্চ আদালতের রায়ে দুজনে শাহাদাত হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় জামিনে জেল থেকে বের হয়ে আসে। পরবর্তীতে এই মামলা থেকে হারুণ ও ইউসুফ বেকসুর খালাস পেয়ে যায় ! শাহাদাত হত্যাকান্ডের পর আবার আঁতকে উঠে ছাত্রসমাজ, চট্টগ্রামের কলেজগুলোতে শুরু হয় শিবির বিরোধী আন্দোলন। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবির নামের সংগঠন, যারা ইসলামের পতাকা উড়িয়ে সৎ লোকের শাষণের ডাক দেয়, তারাই হত্যা আর রগকাটার রাজনীতি শুরু করে ততদিনে চট্টগ্রামে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে ফেলেছে। তখন তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যারা গিয়েছে তাদেরকে শিবির নামের পশুরা কঠোরভাবে দমন করার চেষ্ঠা করেছে। তাদের বিরুদ্ধে যারা কথা বলেছে, যারাই শিবির হঠাও আন্দোলন করেছে তাদের অনেকের হাত পায়ের রগ কেটে দিয়েছে শিবিরের সন্ত্রাসীরা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির প্রথম হত্যা করে ছাত্রমৈত্রী নেতা ফারুককে। ১৯৯০ সালের ২২ ডিসেম্বর ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ এক মিছিলে গুলি চালিয়ে তারা ফারুককে হত্যা করে। ১৯৯৩ সালে শিবির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এনামুল হকের ছেলে ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ মুছাকে শিবির কর্মীরা নৃশংস ভাবে হত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য। এরপর তারা এই বিদ্যাপীঠে নিজেদের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকগুলো হল দখলে নেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রামগুলোতে মেস ও ছাত্রাবাসের সংখ্যা বাড়াতে থাকে। মূলত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের মিনি ক্যান্টনমেন্ট হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের গ্রামগুলো।

অন্যদিকে সন্ত্রাস ও হত্যার রাজনীতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম কলেজ ও সরকারি মহসিন কলেজ পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিয়ে ইসলামি ছাত্রশিবির। ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট দখল করার জন্য ইসলামি ছাত্র শিবিরের ক্যাডাররা ছাত্র সংসদের ভিপি মোহাম্মদ জমির ও ছাত্রদলের সাধারন সম্পাদক ফরিদউদ্দিনকে গুলি করার পর তাদের হাত পায়ের রগ কেটে হত্যা করে। একই বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই মোজাম্মেল কচেজে হামলা চালিয়ে শিবির ক্যাডাররা হত্যা করে বকুল নামের এক শিবির কর্মীকে। ১৯৯৮ সালের ৬ মে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত আমানত হলে হামলা চালায় শিবির। এসময় তাদেও হামলায় ভর্তি হন বরিশাল থেকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা ছাত্র আইয়ুব আলী। ২২ আগস্ট ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী সঞ্জয় তলাপাত্রকে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে শিবির দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়ংকর হত্যাকান্ড ঘাঁয় চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে। ২০০০ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন অবস্থায় শিবির চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট মোড়ে একটি মাইক্রোবাসে থাকা ছাত্রলীগের ৮ নেতা কর্মীকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। এই হত্যাকান্ড দেখে দেশের মানুষ আবার তাদের বর্বরোচিত নারকীয়তার সাথে নতুন করে পরিচিত হয়। এই হত্যাকান্ডের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন অবস্থায় শিবিরের অবস্থান যখন হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিলো তখনই তারা ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। এরই ধারাবাহিকতায় একেবারে পরিকল্পিত ভাবে শিবির ক্যাডাররা গুলি করে হত্যা করে ছাত্রলীগের ৮ নেতাকর্মীকে। এরপর ২০০১ সালে ২৯ ডিসেম্বর ফতেয়াবাদের ছড়ারকুল এলাকায় শিবির ক্যাডাররা ব্রাশফায়ারে হত্যা করে ছাত্রলীগ নেতা আলী মর্তুজাকে। সর্বশেষ শিবির ক্যাডাররা এ বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি নগরীর ষোলশহর রেলস্টেশনে কুপিয়ে হত্যা করে রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র এ এম মহিউদ্দিন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। মহিউদ্দিন খুন হওয়ার পর শিবির মহিউদ্দিনকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করে ! এছাড়া শিবির ক্যাডাররা গোপাল কৃষ্ণ মূহুরীকেও হত্যা করে। দুর্গম এলাকা ফটিকছড়িতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে তারা পর্যায়ক্রমে ছাত্রলীগের বেশ কজন নেতাকর্মীকে হত্যা করে। তাদের এই হত্যা ও রগকাটা রাজনীতির, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কার্যকলাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কতৃপর্ক্ষ ইসলামি ছাত্রশিবিরকে সন্ত্রাসী সংগঠস হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অধিভূক্ত ন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর স্টাডি অব টেরোরিজম এন্ড রেসপন্স টু টেরোরিজমের তৈরি ফাইলে ছাত্রশিবিরের ব্যাপারে বলা হয়, ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জঙ্গি তৎপরতা চালানো ছাড়াও শিবির আন্তজার্তিক পর্যায়ের জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাথে নিজেদের একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও নগরীর ৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিবির নিজেদের দখলে রেখেছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্টানের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে শিবির নিয়মিত নানা অজুহাতে চাঁদা আদায় করে। এছাড়া তারা চট্টগ্রামে অস্ত্রের ব্যবসাও করে। অস্ত্রের ব্যবসার জন্য তাদের রয়েছে দেশব্যাপী এক বিশাল নেটওয়ার্ক। চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে তাদের পরিচালিত মাদ্রাসা। যেগুলোতে তারা শিবির কর্মীদেরকে নানা ধরণের অস্ত্র তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া ছাড়াও জঙ্গিবাদে উদ্ভূদ্ধ করে থাকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বা নগরীর অন্যান্য কলেজে যখন শিবিরের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কোনো সংঘর্ষে জড়াতে হয় অথবা তারা যখন প্রতিপক্ষের উপরে হামলা করতে যায় তখন এসব মাদ্রাসার ট্রেনিংপ্রাপ্ত ক্যাডাররাই মূলত এসব কাজ করে থাকে।

বর্তমানে চট্টগ্রামে শিবির পরিচালিত অনেক ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্টান আছে। এই শিক্ষা প্রতিষ্টানগুলোর মধ্যে যেমন কিন্ডারগার্টেন স্কুল আছে, তেমনি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাও আছে। আরো আছে শিবির পরিচালিত নানা ধরণের কোচিং সেন্টার। নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা কিন্ডারগার্টেনের কোমলমতি শিশুদের হাতে তুলে দেয় রঙ বেরঙের স্টিকার ও কিশোরকন্ঠ নামের একটা ম্যাগাজিন। এই কিশোরকন্ঠ নামের ম্যাগাজিন দিয়েই তারা প্রাথমিক ভাবে বশীভুত করে শিশু কিশোরদের ।

এছাড়া ফুলকুঁড়ি আসর তো আছেই। ফুলকুঁড়ি আসর নামের শিবিরের এই সংগঠনটি গড়ে উঠে ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর এরপর ছাত্র শিবিরের কার্যক্রমের সাথে এই সংগঠনটির কার্যক্রমও দেশব্যাপী বিস্তৃত করে শিবির। ফুলকুঁড়ির নানা ধরণের সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ ( ইসলামিক ) শিশু কিশোরদেরকে জড়িয়ে, পাঠাগার থেকে শিশু কিশোরদেরকে ইসলামিক বই পড়তে দিয়ে তারা পড়তে দিয়ে কোমলমতি শিশু কিশোরদেরকে তারা শিবির নামের ঘৃণ্য সংগঠনে টেনে আনছে। গ্রাম থেকে যে ছেলেরা চট্টগ্রাম নগরীর কলেজ অথবা যারা চট্টগ্রামের বাইরে থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে তাদেরকে হলে বা মেসে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে, নানা ধরণের আর্থিক সাহায্য সহযেগিতা করে, লেখাপড়া শেষে জামাত পরিচালিত প্রতিষ্টানে চাকরির নিশ্চয়তার কথা বলে তারা সহজ সরল গ্রামের ছেলেদেরকে খুব সহজেই শিবিরের রাজনীতিতে ঢুকিয়ে ফেলে।

‘আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা শিবিরকে প্রতিহত করার যে ঘোষণা দিয়েছে, আমরা তাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছি। পৃথিবীর সকল অস্ত্র জড়ো করে আমাদের পরাস্ত করা যাবে না।’ - রেজাউল করিম, সভাপতি, ছাত্রশিবির (দৈনিক সংগ্রাম, ১৯.০১.২০১০)

ইসলামি ছাত্রশিবিরের ৩৩তম কেন্দ্রীয় সম্মেলনে গত ১৯ জানুয়ারি ২০১০ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এই কথা বলে শিবিরের কেন্দ্রিয় সভাপতি ।

ছাত্রজীবনে যে স্বপ্ন বুকে নিয়ে ইসলামী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিলাম, এখন আল্লাহ্তায়ালা ছাত্রশিবিরের মাধ্যমে সে স্বপ্ন পূরণের ব্যবস্থা করেছেন।’ -মতিউর রহমান নিজামী (দৈনিক সংগ্রাম, ১৯.০১.২০১০)

একই অনুষ্টানে প্রধান অতিথির ভাষণে এই কথা বলে জামাতের আমির মতিউর রহমান নিজামী।

উপরে উল্ল্যেখিত দুজনের বক্তব্য পরিস্কারভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিবির সভাপতি তার বক্তব্যে শিবিরের শক্তি আর সামর্থের দাপট দেখিয়েছে। চোথে আঙ্গুল দিয়ে রাস্ট্রকে দেখাতে চেয়েছে, দেখো, আমরা তোমাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেই, আমরা প্রকাশ্যে বলতে পারি, তোমাদের যত অস্ত্র আছে তার চেয়ে বেশি অস্ত্র আমাদের কাছে আছে। অন্যদিকে নিজামী তার বক্তব্যে কি বলতে চেয়েছে, তবে কি একাত্তরে এত এত রক্ত দেখে, এত এত খুন করেও তার মন ভরেনি? তার আরো রক্তের প্রয়োজন? আরো লাশের প্রয়োজন?

স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম কি তাহলে জামাত শিবিরের নতুন স্বপ্ন? একাত্তরে যে হত্যাগুলো করতে পারেনি নিজামীর আলবদর রাজাকার বাহিনী, স্বাধীন বাংলাদেশে নিজামীদের অসমাপ্ত কাজ এখন কি তাহলে শিবির করবে?

শুধু শিবির সভাপতি বা নিজামীই না, তৃণমূলেও শিবিরের নেতারা এমন আগ্রাসী ও আক্রমনাত্বক বক্তব্য দিয়ে থাকে, সেটা কুষ্টিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় হোক, ভোলার কোনো চর হোক, অথবা হবিগঞ্জের প্রতন্ত্য অঞ্চলের কোনো গ্রামই হোক, সব জায়গাতেই শিবিরের বক্তব্যের ধরণ এক, আক্রমণের ভাষা এক।

প্রতিষ্টার পর রাজধানী ঢাকায় বাঁধা পেয়ে শিবির মফস্বল, গ্রামকেন্দ্রিক আর শিক্ষাঙ্গন টার্গেট করে যে রাজনীতির পরিকল্পনা করে চট্টগ্রামের পর তারা এই হিংস্র ও খুনের রাজনীতির সফল প্রয়োগ করে রাজশাহীতে।


রাজশাহীতে শিবির যেভাবে ডালপালা মেলেছে:

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গন দখলের যে রাজনীতি শুরু করে শিবির তার ধারাবাহিকতায় তারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৭৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা চত্বরে এক জনসভার মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যারয়ে শুরুতেই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন ছাত্রমৈত্রী আর জাসদ ছাত্রলীগের বাঁধার মুখে পড়ে। কিন্তু হত্যা আর রগকাটার রাজনীতি শুরু করে শিবির সেই বাধাকেও তুচ্ছ করে ফেলে। একপর্যায়ে শিবির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে শিবির চট্টগ্রামের মতো একই কায়দায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্রে রেখে বিশ্ববিদ্যারয়ের চারপাশে তাদের শক্তিমত্তা বাড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ্ববর্তী গ্রামগুলোকে তারা বানিয়েছে তাদের মিনি ক্যান্টনমেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রাম মেহেরচন্ডী, বিনোদপুর, বুধপাড়ায় শিবিরের অনেক কর্মী ও ক্যাডার স্থানীয় মেয়েদেরকে বিয়ে করে এসব গ্রামে নিজেদের শক্তি বাড়িযেছে। এছাড়া আত্মীয়তা সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার কারণে শিবিরের এসব কর্মী ও ক্যাডারদের কথায় স্থানীয় অনেকেই জামাত শিবিরের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। একে একে শিবির বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। অন্যদিকে গোটা রাজশাহী মহানগর জুড়ে প্রগতিশীল ও বাম সংগঠনগুলোর ব্যর্থতা, অদক্ষতা, কর্মক্ষমহীনতা, অসততা যত বেড়েছে শিবির বিপুল উদ্যোগে সেই ফাঁকা জায়গায় তাদের বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। মহানগরী জুড়ে কোচিং সেন্টার, মেস, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ নানারকম ক্ষুদ্র ব্যবসায় তারা লগ্নি করেছে। এই অর্থলগ্নির একটা বড় অংশ শিবির সংগঠনের পেছনে খরচ করা হয়েছে। এই আর্থিক প্রণোদনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা গ্রামের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেক সমস্যা লাঘব করেছে। টিউশনি, লজিং ইত্যাদি জুগিয়ে ছাত্রজীবনে আর্থিক সহায়তার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরির নিশ্চয়তার ধারাবাহিক পথ তৈরি করে জামায়াত তাদের ছাত্র সংগঠনকে মজবুত করার কাজে লাগিয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে যে আর্থিক কর্মকান্ড তার প্রায় পুরোটাই এখন জামায়াত-শিবিরের নিয়ন্ত্রণে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডারসহ সকল রকমের স্টেশনারি, পরিবহন বাণিজ্যের মূল অংশের নিয়ন্ত্রক এখন শিবির-জামায়াত। শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন দোকান, বাজার, পার্শ্ববর্তী গ্রামে দীর্ঘদিনের শ্রমে শিবির সমর্থকদের জুটিয়ে জামায়াত তাদের একটি শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেছে। প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো যখন ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বোঝেনি তখন জামায়াত শিবির রাজশাহী মহানগরী এবং বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে সংগঠনের স্বার্থকে পরিপুষ্ট করেছে। জামায়াত বিশ্বাস করেছে এই এলাকায় জামায়াতের অবস্থান শক্ত হলে, এখানকার প্রশাসন এবং সকল আর্থিক ব্যবস্থাপনাও তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে। তাদের এই বিশ্বাসকে তারা কর্মে পরিণত করেছে। এই পরিকল্পনা রাজশাহী জেলা এবং পার্শ্ববর্তী জেলা বগুড়া, নাটোরের একাংশ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতে তারা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।

গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে বিএনপির দুই মন্ত্রী রাজশাহীর ব্যারিস্টার আমিনুল হক, নাটোরের রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, রাজশাহীর সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, জামায়াতের সাংগঠনিক-আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে মুক্তহস্তে সমর্থন জুগিয়ে গেছে।

রাজশাহীতে আধিপত্য বিস্তারে শিবিরের তান্ডব ও হত্যা:

১. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে শিবির চট্টগ্রামের মর মতোই নৃশংসতার পথ বেছে নেয়। সর্বপ্রথম ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ শিবির ক্যাডাররা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বাসভর্তি বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে এসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের উপর হামলা চালায়। এই সহিংস ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

২. রাজশাহী মেডিকেল কলেজ মেইন হোস্টেলের সামনে ১৯৮৮ সালের ৩ মে প্রকাশ্য দিবালোকে শিক্ষাথীদের সামনে ছাত্রমৈত্রী নেতা ডাক্তার জামিল আক্তার রতনকে কুপিয়ে ও হাত পায়ের রগ কেটে হত্যা করে শিবিরের ক্যাডাররা

৩. চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে ১৯৮৮ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জাসদ নেতা জালালকে তার নিজ বাড়ীর সামনে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা।

৪. বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা যখন ঘুমিয়ে ঠিক সেই সময়ে , ১৯৮৮ সালের ১৭ জুলাই ভোর রাতে বহিরাগত শিবির ক্যাডাররা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে জাসদ ছাত্রলীগের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি ও সিনেট সদস্য আইয়ূব আলী খান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সিনেট সদস্য আহসানুল কবির বাদল এবং হল সংসদের ভিপি নওশাদের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়।

৫. একই বছরের আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোঃ ইউনুসের বাসভবনে শিবির বোমা হামলা করে।

৬. ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সন্ত্রাসীদের হাতে জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসির আরাফাত খুন হন। এদিন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ছাত্র হল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়।

৭. শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে হরতাল কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে জাসদের মিছিলে ১৯৯২ সালের ১৯ জুন শিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। শিবিরের হামলায় ঐদিন সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে জাসদ নেতা মুকিম মারাত্মক আহত হন এবং ২৪ জুন তিনি মারা যান।

৮. ১৯৯২ সালের আগস্ট মাসে শিবির নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয় পাশ্ববর্তি নতুন বুধপাড়া গ্রামে শিবির ক্যাডার মোজাম্মেলের বাড়ীতে বোমা বানানোর সময় শিবির ক্যাডার আজিবর সহ অজ্ঞাতনামা অন্তত আরো তিন জন নিহত হয়।

৯. শিবিরের খুনীরা ১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিবির সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। ছাত্রদল ও সাবেক ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মিলে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ওপর শিবিরের হামলায় ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নতুন এবং ছাত্র ইউনিয়নের তপন সহ ৫ জন ছাত্র নিহত হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ঐদিন শিবির সবচেয়ে বড় তান্ডব চালায় ।

১০. বহিরাগত সশস্ত্র শিবির কমীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শেরেবাংলা হলে হামলা চালিয়ে ছাত্রমৈত্রী নেতা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার জুবায়েদ চৌধুরী রিমুকে ১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে।

১১. শিবির কমীরা বিশ্ববিদ্যালয় পাশ্ববতী চৌদ্দপাই নামক স্থানে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী একটি বাসে হামলা চালিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপমকে ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাসের যাত্রীদের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে।

১২. ১৯৯৬ সালে জাসাস বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা।

১৩. রাবি অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহাকে ২০০১ সালে শিবির কর্মীরা হাত পা বেধে জবাই করে হত্যা করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরা হস্তক্ষেপে ঐদিন তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

১৪. ২০০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মোঃ ইউনুসকে ফজরের নামাজ পড়তে যাবার সময় কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা । এর আগে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে দুই দফায় ছাত্র শিবির অধ্যাপক ইউনুসকে হত্যার চেষ্টা করেছিল।

১৫. ২০০৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জামাতপন্থী শিক্ষক মহিউদ্দিন এবং ছাত্র শিবির সভাপতি মাহবুব আলম সালেহী সহ আরো দুইজন শিবির ক্যাডার মিলে একযোগে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে রাবি’র ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবু তাহেরকে হত্যা করে। বর্তমানে সালেহী এই মামলা থেকে খালাস পেয়ে শিবিরের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

১৬. চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি রাতের আধারে বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করে তার লাশ ম্যানহোলে ফেলে রাখে শিবিরের খুনী পিশাচরা ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের চাঁদাবাজি:

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি শিবির ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায় এলাকায় ব্যাপক চাঁদাবাজি করে থাকে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডারসহ সকল রকমের স্টেশনারি, পরিবহন বাণিজ্যের মূল অংশের নিয়ন্ত্রন ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দোকান ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্টান থেকে শিবির নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করে। এমনকি তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে বায়তুল মালের নামে চাঁদাবাজি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের চাঁদাবাজি থেকে রেহাই পায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বল্প বেতনের মালী-ঝাড়ুদার থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের ক্ষুদ্র দোকানির কেউই। ফারুক হত্যাকান্ডের পরপরই শিবিরের বেশ কিছু গোপন নথি উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার করা শিবিরের গোপন নথিপত্রে মিলেছে এসব চাঁদাবাজির ফিরিস্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ছাত্রশিবির নিয়ন্ত্রিত কগুলোতে দফায় দফায় তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ উদ্ধার করেছে তাদের চাঁদাবাজির তালিকা। তালিকায় দেখা গেছে, গত জানুয়ারি মাসেও তারা চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছে বহু বছরের অভ্যাসবশে। শিবিরের নির্বিচার চাঁদাবাজি থেকে বাদ পড়েনি ওই হলের কর্মচারীরাও। সোহরাওয়ার্দী হল থেকে উদ্ধার করা শিবিরের চাঁদাবাজির তালিকায় দেখা যায়, তারা হলের ২৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে নিয়মিত ধার্য করা চাঁদা তুলত। এদের মধ্যে হলের মালী চান মিয়া ও লোকমানের কাছ থেকে ১শ টাকা করে, মালী জাবেরের কাছ থেকে ১শ টাকা, ঝাড়ুদার সাইদুরের কাছ থেকে ১শ টাকা, প্রহরী আলাউদ্দিন, চান মিয়া, মোহাম্মদ আলী ও রাজ্জাকের কাছ থেকে ৫০ টাকা করে, প্রহরী আমজাদের কাছ থেকে ৩০ টাকা, ক্যান্টিন ম্যানেজার আবুল হাশেমের কাছ থেকে ১শ টাকা, লাইব্রেরি কর্মচারী আজহার আলীর কাছ থেকে ১শ টাকা, ডাইনিং কর্মচারী ইসমাইলের কাছ থেকে ৫০ টাকা, গেমরুমের কর্মচারী আলী ও আশরাফের কাছ থেকে ১শ টাকা করে, ক্রীড়া শিক মন্টু সিংয়ের কাছ থেকে ৩শ টাকা এবং ডাইনিং কর্মচারী হকের কাছ থেকে ১শ টাকা করে চাঁদা আদায় করেছে শিবির। সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও চাঁদাবাজি করেছে শিবির। সোহরাওয়ার্দী হল থেকে উদ্ধার করা শিবিরের চাঁদা আদায়ের একটি রসিদে দেখা গেছে তারা নানা প্রক্রিয়ায় হলের সাধারণ শিার্থীদের কাছ থেকে ৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত নিয়মিত চাঁদা আদায় করেছে । সোহরাওয়ার্দী হলের কাছেই বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন বাজার এলাকা। হলের আশপাশেও রয়েছে বেশকিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকান। স্বল্প পুঁজির এসব ব্যবসায়ীর কাছে থেকেও নিয়মিত চাঁদা নিত শিবির। হল থেকে উদ্ধার করা শিবিরের চাঁদাবাজির তালিকায় দেখা যায় গত জানুয়ারি মাসে স্টেশন বাজার এলাকার সেলুন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১শ টাকা, চা দোকানি আজিজের কাছ থেকে ১শ টাকা, ফল ব্যবসায়ী চান মিয়ার কাছ থেকে ১শ টাকা, হাবিব ভ্যারাইটির কাছ থেকে ৩শ টাকা, বটতলা হোটেল থেকে ২শ টাকা, ফটোকপি ব্যবসায়ী লিখনের কাছ থেকে ১শ টাকা, ক্ষুদ্র দোকানি মিন্টুর কাছ থেকে ৫০ টাকা, মোবাইল ব্যবসায়ী মুনিরের কাছ থেকে ৫০ টাকা, বিসমিল্লাহ হোটেল ৫০ টাকা, মোবাইল ব্যবসায়ী নাজিরের কাছ থেকে ২শ টাকা, ক্ষুদ্র দোকানি গাফফার ও মাজদারের কাছ থেকে ১শ টাকা, মনোহারী দোকানি মামুনের কাছ থেকে ৬শ টাকা এবং মোবাইল ব্যবসায়ী আনিসুরের কাছ থেকে ৫০ টাকা চাঁদা আদায় করেছে শিবির ক্যাডাররা। ৮ ফেব্রুয়ারির পর ক্যাম্পাসে শিবিরের দাপট কমলেও এসব চাঁদাবাজি নিয়ে মুখ খুলতেও ভয় পান এসব ব্যবসায়ী। একজন ক্ষুদ্র মোবাইল ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ভাই, ভয়ে নিয়মিত টাকা দিছি। না দিলে খালি ঝাড়ি মারত।’ এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মুসতাক আহমেদ বলেন, ‘দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের কাছ থেকে যারা এমন নির্দয়ভাবে চাঁদাবাজি করেছে এদের চেয়ে বর্বর কেউ থাকতে পারে না। এদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

পরীক্ষায় পাশের ক্ষেত্রেও দুর্নীতি:

চাঁদাবাজি আর খুনের রাজনীতি ছাড়াও পরীক্ষায় পাশের ক্ষেত্রেও দুর্নীতির আশ্রয় নেয় শিবিরের নেতা কর্মীরা। তারা সংশ্লিস্ট বিভাগের জামাত শিবির সমর্থিত শিক্ষকদের সহযোগিতায় নিজেদের রুমে পরীক্ষার খাতা নিয়ে এসে উত্তর লিখে তারপর সেই খাতা জমা দিয়ে দেয়। রেজাল্ট বের হওয়ার পর দেখা যায় শিবিরের অনেক নেতাকর্মী ও ক্যাডার প্রথম শ্রেণীতে পাশ করে। ফারুক হত্যাকান্ডের পর এসব বিষয় পুলিশের অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে।

সিলেট:

পীর আউলিয়া আর রক্ষণশীল মানুষের শহর হওয়ার কারণে সিলেটে ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনীতি শুরু করতে শিবিরকে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। কিন্তু সিলেটের রাজনীতির মাঠে তাদেরকে অনাহুত হিসেবেই দেখতে শুরু করে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলো। আশির দশকের শুরুতে রাজনীতি শুরু করার সুবাদে শিবির সিলেটের রাজনীতির মাঠে অনেকটা সুবিধা পেয়ে যায়। আওয়ামী ছাত্রলীগের অবস্থা তখন খুব একটা শক্তিশালী নয়, সেই সময়ে সিলেট শহরে ছাত্রদল ছিলো না বললেই চলে, মাঠ মোটামুটি ফাঁকাই ছিলো। কিন্তু জাসদ ছাত্রলীগ তাদের জন্য বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। জাসদ ছাত্রলীগ শুরু থেকেই সিলেটে শিবির প্রতিরোধে নামে, শিবিরের প্রকাশ্য তৎপরতার বিরুদ্ধে তারা রুখে দাঁড়ায়। তখন সিলেট শহরের খুব কম ছেলেই শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলো বলে তারা খুব একটা সুবিধাও করতে পারে না। তখন তারা সিলেটে শিবিরকে শক্তিশালী করতে বিকল্প পন্থা অবলম্বন করে। বিভিন্ন জায়গা থেকে তারা জামাত ও শিবিরের নেতাকর্মীদের সিলেটে পাঠাতে শুরু করে। এই তালিকায় দরিদ্র ঘরের সন্তান যেমন আছে, তেমনি পয়সাওয়ালা বাপের ( অবশ্যই সেই বাপ জামাতি অথবা রাজাকার ) ছেলেরাও নানা ধরণের ব্যবসা করতে সিলেটে আসে, জামাতি কেউ আসে সিলেট মেডিকেলে চাকরি করতে, কেউ আসে কলেজে চাকরি নিয়ে, আবার কেউ সিলেটে পড়তে আসে। সিলেটে শিবিরের রাজনীতিতে প্রথমদিকে তাই সিলেটিরা ছিলো না, কিন্তু সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই গোলাম আযম পন্থী অনেক জামাতি যুদ্ধাপরাধী পাকিস্থান প্রেমী সিলেটি ছিলো। জিয়ার ক্ষমতারোহণের পরপরই এরা প্রকাশ্যে বের হয়ে আসে। এমনকি বাংলাদেশে যখন গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ছিলো না, সেই ১৯৭৫ সালে গোলাম আযমের ছেলে সাবেক সেনা কর্মকর্তা আযমী সিলেটের এক জামাত নেতার বাসায় থেকে মেয়েদের একটা স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে। ঐ স্কুলের নাম সিলেট অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, অথচ আযমীর সার্টিফিকেটে লেখা ছিলো সিলেট অগ্রগামী উচ্চ বিদ্যালয় ( এই বিষয়ে ভবিষ্যতে বিস্তারিত একটা পোস্ট দেবো )। কথিত আছে আযমী তখন সিলেটে তার এক চাচার বাসায় থেকে লেখাপড়া করেছে। কিন্তু সিলেটে তখন গোলাম আযমের কোনো ভাই থাকতেন না। আযমী এক জামাত নেতার বাসায় থেকেই সিলেটে লেখাপড়া করেছে। এই বিষয়টি থেকে খুব সহজেই বোঝা যায়, সিলেটে আশির দশকের শুরুতে শিবিরের কোনো অবস্থান না থাকলে প্রচুর জামাতি ছিলেন। এই জামাতিরা পরবর্তী সময়ে এরশাদের শাসনামলে সিলেটে শিবিরকে ছড়িয়ে দেয়। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোর মতো তাদের পরিকল্পনা ছিলো দীর্ঘমেয়াদি। এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কারণেই তারা একসময় রাজনৈতিকভাবে সিলেটে অবস্থান নিয়ে ফেলে।


কি ছিলো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় ?

শিবিরের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মধ্যে ছিলো নগরীতে স্কুল কলেজ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে মওদুদীবাদী নিজেদের মতাদর্শে প্রচারণা চালানো। যেহেতু তারা সিলেটে তখন খুব একটা ভালো অবস্থানে ছিলো না, তাই তারা বর্তমানের কথা না ভেবে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে শুরু করে। এই কারণে তারা টার্গেট করে স্কুলগামী ছাত্রদেরকে। পুরোপুরি প্রকাশ্যে না হলেও তখন তারা একটু একটু করে সিলেটের বিভিন্ন কলেজে নিজেদের কার্যক্রম শুরু করে। ফুলকুঁড়ি আসরের নামে তারা ছোট ছোট স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে নানা ধরণের কার্যক্রম হাতে নেয়। নিজেদের শক্তি বাড়াতে তারা দরিদ্র ঘরের ছেলেদের নানা ধরণের চাকরি ও ব্যবসার নিশ্চয়তা দিয়ে শিবিরে টানতে থাকে। এছাড়া সিলেটের বাইরে থেকে যে ছেলেরা সিলেটের এমসি কলেজ, মদনমোহন কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও আলিয়া মাদ্রাসাতে পড়তে আসতো তাদেরকে সিলেটে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার পাশাপাশি নানা ধরণের আর্থিক সুবিধাও দেয়া শুরু করে। যারা শিবিরের বিভিন্ন ইউনিটের দায়িত্বশীল পদে ছিলো তাদেরকে মাসে নির্দিস্ট অংকের একটা ভাতা ( মাসিক বেতন ) প্রদান করতে শুর করলো। এই টাকার যোগান শিবিরের নিজেদের চাঁদা বায়তুল মাল থেকেই দেয়া হতো। এছাড়া প্রবাসী অনেক জামাতি নিজেদের মেয়েদের সাথে সিলেটের স্থানীয় শিবির কর্মীদের বিয়ে দেওয়ার ফলে অনেকের ভিতরে এই ধারণা ঢুকে যায়, শিবির করলে জামাতের এসব সমর্থকের মেয়ে বিয়ে করে বিদেশে যাওয়া যাবে। এই রীতিটা এখনো চালু আছে।

ভবিষ্যতে শিবিরের শক্তি বাড়াতে আশির দশকের শুরতে জামাত সিলেটে প্রতিষ্টা করে শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া মিরাবাজার নামের একটি স্কুল। এই স্কুল প্রতিষ্টা করে একাত্তরে সিলেটের আলবদর বাহিনীর প্রধান মাওলানা ফরিদউদ্দিন। মুক্তিযুদ্ধের পরপর ফরিদউদ্দিন আত্মগোপনে চলে যায় এবং জিয়ার শাসনামলে সে দক্ষিণ সুরমার গহরপুরে একটি মাদ্রাসায় মোয়াজ্জিন হিসেবে কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে প্রবাসী জামাতিদের সাহায্য নিয়ে সে এই স্কুল প্রতিষ্টা করে নিজেই এই স্কুলের অধ্যক্ষ হয়ে নিজের নামের সাথে অধ্যক্ষ পদবী জুড়ে দেয়। এই ফরিদউদ্দিন ২০০১ সালে চারদলের হয়ে নির্বাচন করে সংসদ সদস্যও মনোনীত হয়।

শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়াকে শিবির নিজেদের কর্মী তৈরির কারখানা হিসেবে পেয়ে যায়। এই স্কুলে তারা প্রকাশ্যে শিবিরে যোগ দেওয়ার জন্য ছেলেদেরকে আহবান জানায়। এছাড়া স্কুলের সব শিক্ষক জামাতপন্থী হওয়ার কারণে ক্লাসেও তারা শিবিরের গুণগাণ গাইতে থাকেন। এর ফলে অনেক নিষ্পাপ শিশু কিশোর শিবির কি জিনিষ এটা বোঝার আগেই শিবিরের ফরম পূরণ করে শিবিরের সদস্য হয়ে যায়। এই স্কুলে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না এবং ছাত্রদেরকে বাধ্যতামূলক মাথায় টুপি পড়ে স্কুলে যাওয়ার নিয়ম করা হয়। এই স্কুল থেকেই পরবর্তীতে সিলেটে শিবিরের নেতা ও কর্মী বের হয়ে আসে।

এই স্কুল ছাড়াও জামাত শিবির পরবর্তী সময়ে সিলেটে প্রতিষ্টা করে পাঠানটুলা জামেয়া, আল আমিন জামেয়া নামের দুটি স্কুল। বর্তমানে তারা সিলেট সায়েন্স কলেজ ও জালালাবাদ ইউনিভার্সিটি কলেজ নামের দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ নামের একটি মহিলা মেডিকেল কলেজও জামাতিরা প্রতিষ্টা করেছে।

শাহজালাল জামেয়া প্রতিষ্টার পাশাপাশি শিবির সিলেটকে চারটি এলাকায় ভাগ করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে। এছাড়া তারা সিলেটের মদনমোহন কলেজ ও আলিয়া মাদ্রাসায় নিজেদে অবস্থান তৈরি করে ফেলে। আলিয়া মাদ্রাসাতে অবস্থান নিতে গিয়ে শিবির আলিয়া মাদ্রাসার অন্যান্য ইসলামি দলগুলোর সমর্থকদের হাত পায়ের রগ ও জিহবা কাটতে শুরু করে। সমগ্র সিলেট জুড়ে জামাত শিবির পরিচালিত প্রায় ৫০ টির মতো মাদ্রাসা আছে। এসব মাদ্রাসায় শিবিরের সাথী ও সদস্যরা নিয়মিত গিয়ে মাদ্রাসার ছাত্রদের বিভিন্ন ধরণের নাশকতামূলক কাজ ও অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে সিলেট শহরকে কেন্দ্রে রেখে তারা বৃত্তাকারে চারপাশে শিবিরকে ছড়িয়ে দেওয়া শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট দখল করতে গিয়ে তারা বরইকান্দি এলাকাকে নিজেদের একটা শক্ত ঘাঁটি হিসেবে প্রতিষ্টা করে ফেলে। এছাড়া শহরের দরগা মহল্লার পায়রা আবাসিক এলাকাকে নিজেদের একটা শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলে। সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় তারা ওয়াজ মাহফিল ও ইসলামি সভা সমাবেশ করে রক্ষণশীল পরিবারের ছেলে ছাড়াও সাধারণ ছেলেদেরকে শিবিরের রাজনীতিতে ভিড়িয়ে নেয়। তারা সিলেটে সাঈদীকে নিজেদের প্রচারণার কাজে ইসলামের মহান দূত হিসেবে প্রতন্ত এলাকায় বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে নিয়ে এসে জামাত শিবিরের গুণগান গাওয়াতে শুরু করে। সাইদীর ওয়াজ নিয়ে সম্প্রতি একজন ব্লগার সাঈদীর ভন্ডামির কথা লিখেছেন।

সিলেট শহরে নিজেদের প্রতিষ্টা পেতে গিয়ে শিবিরকে বারবার জাসদ ছাত্রলীগের বাঁধার মুখে পড়তে হয়। জাসদ ছাত্রলীগ যেনো তখন পণ করে বসেছিলো শিবিরকে তারা সিলেটে অবস্থান নিতে দিবে না। অন্যদিকে শিবির শহরে নিজেদের অবস্থান করে নেওয়ার জন্য বেছে নেয় সহিংস হত্যার রাজনীতি।

সিলেটে শিবিরের খুনের রাজনীতি

কোনঠাসা শিবির সিলেটে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার জন্য খুনের রাজনীতিতে নেমে পড়ে। আর সিলেটে প্রথম খুনের রাজনীতিরও সুচনা করে ইসলামি ছাত্রশিবির। একেবারে কোনঠাসা জামাত শিবির সিলেটে নিজেদের অবস্থান করে নিতে ১৯৮৮ সালের একই দিনে খুন করে জাসদ ছাত্রলীগের তিন অকুতোভয় সৈনিক মুনির তপন ও জুয়েলকে। এই তিনজনের অপরাধ ছিলো, তারা সিলেটে জামাত শিবিরের অবস্থানের বিপক্ষে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন জাসদ ছাত্রলীগ সিলেট শহর থেকে শিবির উৎখাত করার পরিকল্পনা নেয়। কিন্তু শিবিরের নারকীয় তাণ্ডবলীলার কাছে তারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। জাসদ ছাত্রলীগের দুর্গে চরম আঘাত করে সিলেটে খুনের রাজনীতির শুরু ও নিজেদের অবস্থান করে নেয় জামাত শিবির ১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। একদিনেই জাসদ ছাত্রলীগের নিবেদিতপ্রাণ মুনির, তপন ও জুয়েল এই তিন কর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা পিশাচরা। সেই সময়ে শিবিরের তান্ডবে সিলেট নগরীতে আহত হয় অনেকেই।

১৯৯৮ সালের ২৪ মে শিবির হত্যা করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের মেধাবী ছাত্র ও ছাত্রলীগ নেতা সৌমিত্র বিশ্বাসকে । শামসুদ্দিন ছাত্রাবাসে ক্রিকেট খেলা দেখা নিয়ে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হলে শিবির ক্যাডাররা নগরীর ব্লু বার্ড স্কুলের সামনে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে সৌমিত্রকে।

হামিদ আহমদ খান দোয়েল নামের এক ছাত্রদল কর্মীকে ২০০২ সালে ৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের মদনমোহন কলেজের ক্যাম্পাসে কুপিয়ে হত্যা করে শিবিরের ঘাতকরা। দোয়েল হত্যারকান্ডের মতো কোনো নৃশংস এবং বর্বরোচিত খুন এর আগে সিলেটে কখনো হয়নি।

সিলেট ভেটেরিনারী কলেজের মেধাবী ছাত্র রফিকুল হাসান সোহাগকে ২০০৪ সালের ৩১ আগস্ট নৃশংসভাবে খুন করে শিবির ক্যাডাররা। সোহাগ কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন এবং কলেজ ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

এই ছয় খুনের জন্য শিবিরের অনেক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলেও কারো কোনো সাজা হয়নি। এছাড়া খুনীরা আজ ব্যবসা করে সিলেটে প্রতিষ্ঠিত। এই হত্যাকান্ডগুলোর বিচার না হওয়ার কারণে শিবির সিলেটে বেপরোয়া ভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সিলেটে শিবিরের ঘাঁটি যেসব জায়গায় 

সিলেটে শহরে শিবিরের প্রধান ঘাঁটি হচ্ছে নগরীর পায়রা আবাসিক এলাকা ও আলিয়া মাদ্রাসা। পায়রা আবাসিক এলাকায় অনেক জামাত শিবিরের নেতা বাস করেন। এখান থেকেই মারামারি করার জন্য শিবিরের অস্ত্র বিভিন্ন জায়গায় পৌছে দেওয়া হয়। পায়রা আবাসিক এলাকার বেশ কয়েকটি বাসাকে মেস হিসেবে ব্যবহার করে শিবির তাদের ক্যাডারদেরকে এসব মেসে স্থায়ীভাবে বসবাস করার সুযোগ করে দিচ্ছে। এছাড়া হত্যা বা অন্য কোনো বড় ধরণের হামলা হাঙ্গামার সাথে জড়িত শিবির ক্যাডাররা পায়রা আবাসকি এলাকায় এসে জামাত নেতাদের বাসায় আত্মগোপন করে থাকে। শাবির নামকরণ আন্দোলনে শিবিরের ক্যাডারদের হাতে প্রকাশ্যে পায়রা আবাসিক এলাকা থেকে অস্ত্র পৌছে দেওয়া হয়। এককালে চট্টগ্রামের শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ ও নাসির বিভিন্ন অপরাধ করেই সিলেটে পায়রা আবাসিক এলাকার জামাত শিবিরের বাসাগুলোতে এসে অবস্থান নিতো। গোলাম আযমের ছেলে আযমীও পায়রা আবাসিক এলাকায় একটি বাসায় ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তীতে আযমী যখন সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্তা হিসেবে জালালাবাদ সেনানিবাসে আসেন তখন তিনি প্রায়ই পায়রা আবাসিক এলাকার একটি বাসায় যেতেন। এছাড়া পায়রা আবাসিক এলাকার কুখ্যাত আরেক স্বাধীনতা বিরোধীর বাসায় আযমী প্রায়ই দেখা যেতো। সিলেটে শিবিরের যত ক্যাডার আছে তার অর্ধেক বাস করে এই পায়রা আবাসিক এলাকায়। এরা শিবিরের বিভিন্ন ইউনিটের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিপক্ষ ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ ছাত্রদের উপরে শিবির যেসব হামলা চালায় সেগুলো পরিচালনা করে থাকে।

আলিয়া মাদ্রাসা হচ্ছে শিবিরের মিনি ক্যান্টনমেন্ট। এখানে শিবির সদস্যদের মারামারি ও অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় শিবির পরিচালিত এসব কর্মকান্ডের প্রকিবাদ করায় শাহজালাল দরগাহ মাদ্রাসার বেশ কিছু ছাত্রের জিহ্বা কেটে ফেলে শিবির সন্ত্রাসীরা। এছাড়া আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে শিবির প্রায়ই নানা ধরণের মাহফিল ওয়াজ ও সভা সমাবেশের আয়োজন করে। ঈদের দিন আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে যে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়, তার উদ্যোক্তাও শিবির। সিলেটে জামাত শিবির পরিবার আলিয়ার মাঠে একসাথেই সবাই নামাজ আদায় করে।

নগরীর মদিনা মার্কেটের ধানসিঁড়ি, পল্লবী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) পূর্ব পাশে ধামালিপাড়ায় শিবিরের বড় তিনটি আস্তানা আছে, বিডিআর সেক্টর হেড কোয়ার্টারের দ্বিতীয় গেটের বিপরীতে একটি কটেজ, শাবি গেটের বিপরীতে একটি বাসা, আখালিয়া নয়াবাজারের দুটি বাসা, শাবি দ্বিতীয় হল সংলগ্ন একটি বাসা, আখালিয়া সুরমা আবাসিক এলাকা, সুবিদবাজার পল্লবী আবাসিক এলাকার একটি টাওয়ার, আখালিয়াস্থ যুগীপাড়া, শাবির পেছনে দুটি মেসে শিবির নিজেদের আস্তানা গড়ে তুলেছে। এই আস্তানাগুলো মূলত শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে। এক গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শিবিরে সিলেটে ৭৫০ সাথী ও প্রায় ২০০ কিলার রয়েছে। এরা যে কোনো সময় সংগঠনের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত থাকে। এদের বেশিরভাগই জামাত শিবির পরিচালিত বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্র।

সাধারণ পরিবারের ছেলেরা শিবির কেন করছে 

শিবির তাদের কর্মী সমর্থকদের আলাদা আলাদা চারটি ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। কেউ শিবির করতে চাইলে প্রথমে তাকে শিবিরের সমর্থক হতে হয়, তার পরের ধাপ কর্মী, এরপর পরীক্ষিত কর্মীদের বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে সাথী করা হয়, এবং সর্বশেষ ধাপ হচ্ছে সদস্য। সাথী বা সদস্য হতে হলে কেন্দ্রীয় অনুমোদন লাগে। মূলত সাথী ও সদস্য হওয়ার পরই একজন সদস্যকে শিবির তাদের বিভিন্ন জঙ্গিবাদি প্রশিক্ষণে নিয়ে যায়, এদেরকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, এদের মাধ্যমে বিভিন্ন হত্যাকান্ড পরিচালনা করা হয়, অস্ত্র এবং সংগঠনের গোপন দলিল, হিসেবপত্র, কর্ম পরিকল্পনা সহ সংগঠনের গোপনীয় কার্যাদির সব কিছু সাথী ও সদস্যরা করে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাধারণ দরিদ্র পরিবারের ছেলেরাই শিবিরের কর্মকান্ডে বেশি জড়ায়। শিবির যেহেতু একটি ক্যাডার ভিত্তিক সংগঠন এবং শ্রম দিয়ে যে কারো নেতৃত্বে আসার সুযোগ আছে, তাই নিজেদের প্রতিষ্টা করতে গ্রাম থেকে শহরে আসা দরিদ্র পরিবারের ছেলেরা খুব সহজেই শিবিরের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে পড়ে, অন্যভাবে বললে বলতে হয়, শিবিরের পাতা ফাঁদে পা দেয়। জামায়াত তাদের রাজনৈতিক গুরু হিসেবে মওদুদীকে উপস্থাপন করলেও তারা মিসরের হাসান আল বান্নাকেও অনেক ক্ষেত্রে অনুসরণ করে থাকে। হাসান আল বান্না মিশরের 'ইখওয়ান আল মুসলিমীন' দলের প্রতিষ্ঠাতা। হাসান আল বান্নার জীবন অনেক বৈচিত্র্যময় ও ঘটনাবহুল। খুবই সাধারণ ও দরিদ্র ঘরের সন্তান হয়েও হাসান আল বান্না পরে একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠনের (ইখওয়ান) প্রধান হয়ে যান। হাসান আল বান্নার শ্লোগানের সাথে জামাত শিবিরের শ্লোগানের অনেক মিল আছে। হাসান আল বান্না ধর্মীয় সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিচ্যুতি মুসলমানদের পতনের কারণ হিসেবে দেখান। এজন্য তিনি প্রথমে 'পাপ প্রতিরোধ সমিতি' গঠন করেন। তাঁর আহ্বানে নিম্নবিত্ত, ভূমিহীন কৃষক ও ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বেশি সাড়া দেয়। সাধারণত সমাজের হতাশাগ্রস্ত মানুষই 'আল্লাহর নামে' পরিচালিত হাসান আল বান্নার ইখওয়ানের অনুসারী হয়ে ওঠে। ঠিক একই ভাবে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীও আল্লাহর নামের আড়ালে তাদের সকল অপকর্মকে ঢেকে দিতে চায়, এবং তারা আল্লাহ রাসূলের কথা বলেই মানুষের কাছে পৌছাতে চায়। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গরিব ঘরের সন্তান, স্কুল পালানো বখে যাওয়া বালক অথবা মা-বাবার মানতের কারণে অনেককে স্কুলে না পাঠিয়ে মাদ্রাসায় পাঠানো হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ মাদ্রাসা আর্থিক দীনতার মধ্য দিয়ে চলে। এখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরাও সমাজের সচ্ছল ব্যক্তিদের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। দৈনন্দিন পরনির্ভরতা ও এক ধরনের কঠোর জীবন-যাপনের মধ্যে থেকে ক্রমপরিবর্তনশীল সমাজ ও জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে তারা পিছনে পড়ে যায়। এসব ছাত্র এক সময় ধর্মীয় শ্লোগানে মগ্ন হয়ে ছাত্রশিবিরের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধাদি ছাড়াও অন্যান্য সুবিধা পেয়ে তাদের অনুসারী কর্মী সমর্থক ও সাথী হয়ে যায়।

হাসান আল বান্নার ইখওয়ান দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও জামায়াত-শিবিরের সাংগঠনিক কাঠামো একই ধরনের। দলের নিয়ম-কানুন অনেকটা ফ্যাসিস্ট। দলটি কয়েকটি অংশে বিভক্ত। প্রত্যেকটি অংশের আবার অনেক সেল রয়েছে। প্রত্যেক সেলের একজন নেতা থাকে এবং যে কোনো বিষয়ে নেতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত থাকে। নেতার নির্দেশ অমান্য করলে অনেক বড় শাস্তি পেতে হয়। এছাড়া নেতার প্রতি প্রত্যেক সদস্যেকে শর্তহীন আনুগত্য মেনে চলতে হয়। এক্ষেত্রে নেতার মতের উপরে সদস্যদের নিজস্ব মতপ্রকাশের কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশে জামায়াত-শিবিরও একই নিয়মে পরিচালিত। তাদের সংগঠনের প্রতিটি ইউনিটের সাপ্তাহিক সভা হয়। সংশ্লিষ্ট ইউনিটের প্রত্যেক সদস্য তার কাজকর্মের সাপ্তাহিক রিপোর্ট প্রদান করে। শিবিরের দলীয় কিছু গোপনীয় কাগজপত্রে দেখা যায় যে, দলীয় সদস্যবৃন্দের বাইরে তাদের অমুসলিম 'বন্ধু' ও 'সমর্থক' রয়েছে। সঙ্কটকালে তারা বিভিন্ন সুবিধার বিনিময়ে এদেরকে গোয়েন্দা হিসেবে ব্যবহার করে । প্রত্যেক সেলের নেতা তার সদস্যদের ভাল-মন্দ খোঁজখবর নেয় এবং বিপদে এগিয়ে যায়। এভাবে নিজেদের মধ্যে সহমর্মিতা ও এক ধরনের চেইন অব কমান্ড গড়ে ওঠে। দলে সদস্যভুক্তির পর নেতৃত্বের শীর্ষে উঠতে বিভিন্ন পর্যায়ে এক ধরনের পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে তাদের। এতে উত্তীর্ণ হলে পরবর্তী ধাপে যাবার সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রত্যেক স্তরের সদস্যদের কিছু আর্থিক সুবিধা আছে। শিবিরের কর্মীদেরকে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেল প্রদান করা হয়। এ ছাড়া পদের গুরুত্ব অনুযায়ী কিছু বেতনেরও ব্যবস্থা আছে।

অন্য সংগঠনের অভ্যন্তরে শিবির

এছাড়া শিবির নিজেদের স্বার্থে অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর ভিতরে নিজেদের সাথী ও কর্মীদেরকে ঢুকিয়ে দেয়। এদের মাধ্যমে তারা খুব সহজেই অন্য সংগঠনগুলোর পরিকল্পনা ও কার্যক্রম সম্পর্কে আগে থেকেই সবকিছু জেনে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বকর নিহত হওয়ার পর তাই জানা যায়, বকরের হত্যার সাথে জড়িত ছাত্রলীগ নেতা ফারুক একসময় শিবির করতো। এছাড়া দেশে এখন এই কথাটা প্রায়ই শোনা যাচ্ছে, ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের ভিতরে শিবির ঢুকে গেছে। এই বিষয়ে সরাসরি কোনো প্রমাণ না থাকলেও শিবিরের সংগঠন পরিকল্পনার স্বার্থে অন্য ছাত্র সংগঠনে তাদের কর্মী ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া তাদের বেশ কিছু বিধর্মী বন্ধুও থাকে, অন্যান্য ধর্মের এসব ছাত্রদেরকে নিয়ে শিবির প্রায়ই চায়নিজ রেস্তোরায় খানাপিনার আয়োজন করে। এছাড়া এদেরকে বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধা দিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। যখন কোনো ক্যাম্পাসে বড় ধরণের সংঘাতে অথবা সংকটময় অবস্থায় পড়ে যায় তখন শিবির তাদের অন্য ধর্মাবলম্বী এসব বন্ধুদের কাজে লাগায়।

শিবিরের খুনী ও সন্ত্রাসীরা পার পেয়ে যায় যেসব কারণে 

শিবিরের তৃণমূল পর্যায়েও কিছু করতে হলে কেন্দ্রের অনুমোদন নিতে হয়। এছাড়া কোন সাথী কোন এলাকায় থাকবে, কোন সদস্য কোন এলাকায় দায়িত্ব পালন করবে, কর্মীদের কি কি কাজ করতে হবে, সমর্থকদের কিভাবে দলে পুরোপুরি জড়িয়ে ফেলতে হবে এসব নির্দেশনা কেন্দ্র থেকেই দেওয়া হয়। শিবিরের দায়িত্ব দিয়ে কোন কলেজে কাকে পাঠানো হবে, শিবিরের সাথী ও সমর্থকদের এইচএসসি পাশ করে কোন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তি হতে হবে এটাও কেন্দ্র থেকে ঠিক করে দেওয়া হয়। এছাড়া কোনো একটা হত্যাকান্ড ঘটানোর পর যারা হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকে তাদেরকে আত্মগোপনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ খুনের সাথে জড়িত থাকলে তাকে সিলেটে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং তার খাওয়া দাওয়া আবাসন সহ সবকিছুর ব্যবস্থা সংগঠন থেকে করা হয়। এরপর হত্যা মামলা শেষ হয়ে গেলে অথবা আইনী ভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে ঐ ঘটনার সাথে জড়িতরা প্রকাশ্যে বের হয়ে আসে। তখন তাদেরকে যে এলাকায় তারা ঘটনা ঘটিয়েছে ঐ এলাকা থেকে সরিয়ে অন্য এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে একজন খুনী খুব সহজেই নিজেকে সাধারণের সাথে মিশিয়ে স্বাভাবিক ভাবে চলাফেরা করতে পারে। এছাড়া একজন সদস্য জেলে থাকাকালীন সময়ে তার সব আইনী খরচ বহন করা করা ছাড়াও পরিবারের ভরণ পোষণও শিবির বহন করে থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, আলোচিত কোনো হত্যাকান্ড ঘটানোর পর যখন দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয় ( যেমন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারুক হত্যাকান্ড ) তখন হত্যার সাথে জড়িতদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এজন্য শিবিরের সাথী হওয়ার সাথে সাথেই একজন কর্মীকে সংগঠন থেকে পাসপোর্ট করে দেওয়া হয়। যারা বিদেশে চলে যায়, তারা ওখানে গিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের নামে শিবিরের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে এবং প্রতিমাসে বিপুল পরিমান টাকা শিবিরের ফান্ডে অনুদান হিসেবে পাঠায়।

পৃথিবীর নানা প্রান্তে নানা নামে শিবির 

দেশের বাইরেও ভিন্ন ভিন্ন নামে ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই নাম পরিবর্তনের কারণ হিসেবে জানা যায়, সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা ও জাতীয়তাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে শিবিরের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। যাতে সে দেশের নাগরিকদের মধ্যে একে বিদেশী সংগঠন বলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি না হয়। এছাড়া সংগঠনে যাতে অন্যান্য মতাদর্শের মানুষকে সহজে জড়ানো যায় এই কারণেও শিবির নাম না দিয়ে ভিন্ন নামে সংগঠন পরিচালনা করা হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার চোখ এড়াতে এবং বিশ্বব্যাপী শিবিরের নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি লুকাতে একেক দেশে একেক নাম দেয়া হয়েছে এ সংগঠনের। আরো মজার তথ্য হচ্ছে, একই কারণে বিদেশে এসব সংগঠন কাগজে-কলমে পরিচালনা করে সে দেশের নাগরিকরাই।

সাধারণত শিবিরের উদ্যোগেই দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ পর্যায়ের নেতাদের স্টুডেন্ট বা অন্য কোনো ভিসায় এসব দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া যারা হত্যা বা মামলা সংক্রান্ত ঝামেলায় জড়িয়ে যায় তাদেরকেও বিদেশে পাঠিয়ে এসব সংগঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মাঝে মাঝে বাংলাদেশ থেকে শিবির ও জামাতের কোনো কোনো নেতা গিয়ে বাইরের দেশের নেতাদের দিকনির্দেশনা দিয়ে আসে। সেখানে বসবাস করা নেতারা সে দেশের নাগরিকদের সঙ্গে মিশে সাংগঠনিক এসব নির্দেশনা সুকৌশলে বাস্তবায়ন করে।

কোন দেশে কী নামে শিবির 

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির নাম পরিবর্তন করে ভারতে হয়েছে 'স্টুডেন্ট ইসলামিক অরগানাইজেশন অব ইন্ডিয়া'। একইভাবে এ সংগঠন 'শ্রীলংকা ইসলামিক মুভমেন্ট' নামে শ্রীলংকায়, পাকিস্তানে 'ইসলামী জামায়াতই তালাবা', সিঙ্গাপুরে 'দ্য মুসলিম কনভার্টস অ্যাসোসিয়েশন', মিয়ানমারে 'ইত্তিহাদ আল-তুল্লাব আল মুসলিমিন', ইন্দোনেশিয়ায় 'এল-ইসলামী লিল-তুল্লাব', তাইওয়ানে 'ইসলামিক কালচার ইনস্টিটিউট', মালয়েশিয়ায় 'মুসলিম ইউথ মুভমেন্ট অব মালয়েশিয়া', ফিজিতে 'ফিজি মুসলিম ইউথ মুভমেন্ট', নেপালে 'ইসলামী ইউয়া সান', কোরিয়ায় 'কোরিয়া মুসলিম ফেডারেশন', জাপানে 'মুসাতো সি', থাইল্যান্ডে 'দ্যা মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন', কাজাখস্তানে 'ডিরেক্টর অব ইফসো ইন সেন্ট্রাল এশিয়া', ঘানায় 'ইত্তিহাদ ইল-তালিবি ইল-মুসলিমিন', আলজেরিয়ায় 'ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন', জর্দানে 'জর্দানিয়ান স্টুডেন্ট ইউনিয়ন', তুনুসে 'ই-ইত্তিহাদ ই এম লিল-তালিবি', সুদানে 'ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন ফর মুসলিম ওমেন' ও 'ইল-ইত্তিহাদ লিল তুল্লাব', মৌরিতানিয়ায় 'ক্লাব ফর ইয়থ মৌরিতানিয়া', আইভরি কোস্টে 'অ্যাসোসিয়েশন দেস ইলেভেস', মরিশাসে 'মুসলিম স্টুডেন্ট মুভমেন্ট', কেনিয়ায় 'ইয়ং মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন', দক্ষিণ আফ্রিকায় 'মুসলিম ইয়থ মুভমেন্ট' ও 'ইসলামিক দাওয়াহ মুভমেন্ট', তাঞ্জানিয়ায় 'মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন', নাইজেরিয়ায় 'এমএসএস ইসলামিক সেন্টার', উগান্ডায় 'মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন', বেলজিয়ামে 'ইউনিয়ন ইসলামিক', ফ্রান্সে 'অ্যাসোসিয়েশন দ্য মুসলমাঁ', জার্মানিতে 'মুসলিম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন', ইউরোপে 'ইয়থ মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন', ইতালিতে 'হোল্লাদ সেনত্রো ইসলামিকো দ্য মিলানো', স্পেনে 'অ্যাসোসিয়েশন ইসলামিকা আল-আন্দালুস', সুইজারল্যান্ডে 'অ্যাসোসিয়েশঁ কালচারেলোই ডেস', সাইপ্রাসে 'ইয়থ ফাউন্ডেশন', আলবেনিয়ায় 'ইত্তিহাদ ইল-তালিবি দ্য মুসলিমিন', পোল্যান্ডে 'মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন', হাঙ্গেরিতে 'মুসলিম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন', সুইডেনে 'ফেডারেশন অব ইসলামিক স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন', যুক্তরাষ্ট্রে 'ফেডারেশন অব অস্ট্রেলিয়ান মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যান্ড ইয়থ', ইংল্যান্ডে 'এফওএসআইএস' এবং ইউক্রেনে 'স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার'।

দেশের মতো শিবিরের বিদেশের এসব শাখাও নিয়ন্ত্রণ করছে জামাত। সংগঠনের কর্মপদ্ধতি ও পরিবেশ অনুযায়ী কখন কী ধরনের কার্যক্রম হাতে নিতে হবে সে বিষয়ে জামাতের পরামর্শে কর্মপদ্ধতি ঠিক করা হয় বলে জানা গেছে। বিদেশের এসব সংগঠন জামাত-শিবিরের দেশের বাইরের নিরাপদ আস্তানা। দেশে বড় ধরনের অরাজকতা এবং হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে এসব সংগঠনের ছত্রছায়ায়ই বিদেশে আশ্রয় নেয় শিবিরের খুনী সন্ত্রাসীরা । এছাড়া এসব সংগঠন থেকে প্রতিমাসে শিবিরের ফান্ডে লাখ লাখ টাকা পাঠানো হয়।



লেখক তালিকা