This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Bangladesh Liberation War, Genocide of Innocent Bengali People in 1971 and contemporary political events of Bangladesh.
More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

The Exeter South Asia Centre of the College of Humanities of the University of Exeter listed ‘Muktijuddho e-Archive’ as a source for Research materials.
The University of Exeter is a public research university located in Exeter, Devon, South West England, United Kingdom. 
This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

১৯৫ যুদ্ধাপরাধী এবং আটকে পড়া বাঙালি ও পাকিস্তানি - জাফর ওয়াজেদ

১৯৫ যুদ্ধাপরাধী এবং আটকে পড়া বাঙালি ও পাকিস্তানি

জাফর ওয়াজেদ

ঢাকাটাইমস২৪ (১০ জুলাই, ২০১৫)


প্রতীকি ছবিঃ পাকসেনাদের আত্মসমর্পণ (১৬/১২/১৯৭১) - সূত্র

স্বাধীনতার চার দশক পেরিয়ে গেলেও প্রশ্ন তোলা হয় এখনো, কেন ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচার হলো না। বিচার ছাড়াই তাদের কেন পাকিস্তানিদের হাতে ছেড়ে দেয়া হলো। কেন পাকিস্তান প্রতিশ্রুতি দিয়েও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পদক্ষেপ নেয় নি। আটকে পড়া বাঙালিরা পাকিস্তান হতে ফেরত এলেও বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানীরা এখনো কেন পাকিস্তান প্রত্যাবর্তন করছে না। প্রশ্ন যখন আছে, উত্তরও তার রয়েছে দন্ডায়মান। কেন, কি কারণে যুদ্ধবন্দিরা মুক্তি পেল, তার নেপথ্যে ঘটনার ঘনঘটা কম নয়।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার সেনাদের আত্মসমর্পণ পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত এই তিন দেশের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ ও পারস্পরিক টানাপোড়েন শুরু হয়। যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী সেনাদের বিচার নিয়ে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান পরস্পর বিরোধী অবস্থান নেয়। ভারত এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকেই সমর্থন করে। কিন্তু ভারতের তখন তাদের আশ্রিত প্রায় এক লাখ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীর ভরণ-পোষণ নিয়ে হিমশিম খাওয়ার অবস্থা। বাংলাদেশও আটকে পড়া পাকিস্তানিদের দ্রুত প্রত্যাবর্তনে আগ্রহী হয়ে উঠে। কারণ যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পক্ষে তাদের ভরণ-পোষণও অসম্ভব হয়ে ওঠে। যদিও এরা তখন হতেই জেনেভা কনভেনশনের অধীনে । যেমন ছিল পাকিস্তানি যোদ্ধারা। ভারত যেহেতু আন্তর্জাতিক জেনেভা কনভেনশনের সদস্য এবং যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী, তাই যুদ্ধবন্দীদের রক্ষা করার জন্য দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে দায়বদ্ধ । যে কারণে পাকিস্তানি হানাদাররা বাঙালি মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণে আগ্রহী হয় নি। হলে জেনেভা কনভেনশান অনুযায়ী মর্যাদা পেতো না। যদিও যৌথ বা মিত্রবাহিনীর কাছে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু দলিলে মিত্র বাহিনীর বাঙালি পক্ষের স্বাক্ষর নেই। তবে যৌথ বা মিত্র বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের জন্যে যে আহ্বান জানানো হয়েছিল, তাতে যৌথ বাহিনীর কথা উল্লেখ করা হয়। আত্মসমর্পণ দলিলেও বলা হয়, ’আত্মসমর্পণকারী সেনাদের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করা হবে এবং আত্মসমর্পণকারী সকল পাকিস্তানি সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।’ এতে হানাদারদের স্থানীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদররা জেনেভা কনভেনশনের অন্তর্ভূক্ত না হওয়ায়, এদের দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের হাতে ন্যস্ত বলে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছিলেন, যখন তারা পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ভারতে স্থানান্তর করছিলেন।

যুদ্ধবন্দিদের যাতে বিচার হতে না পারে, সে জন্য পাকিস্তান তখন ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে সে দেশে আটকে পড়া ৪ লাখ বাঙালিকে জিম্মি করার হুমকি দেয়। যুদ্ধবন্দিদের দ্রুত পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর জন্য জাতিসংঘসহ মুসলিম দেশগুলো ভারত ও বাংলাদেশকে চাপ দিতে থাকে। একাত্তরের সশস্ত্র যুদ্ধ শেষে তখন শুরু হয় তিন দেশের মধ্যে কূটনৈতিক লড়াই এবং তাতে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোও জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশই প্রথম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীটাকে সামনে নিয়ে আসে, মুজিবনগর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে এম কামরুজ্জামান ১৯৭১এর ২৭ ডিসেম্বরে ঘোষণা দেন যে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ৩০ জন শীর্ষস্থানীয় পাকিস্তানী সরকারি কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে এবং গণহত্যায় সহযোগিতার জন্য অচিরেই তাদের বিচার হবে। এর পরই কলকাতায় একাত্তরে গণহত্যার শিকার সাতজন বাংলাদেশী কর্মকর্তার পরিবারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারের কাছে দোষী পাকিস্তানিদের বিচারে বাংলাদেশকে সহায়তার জন্য আবেদন জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ডিপি ধর বলেন যে, ভারত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন পরীক্ষা করছে। সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যুদ্ধ  শেষ হবার পরই ভারত স্পষ্ট ঘোষণা দেয় যে, যুদ্ধাপরাধী বিচারের ব্যাপারটি বাংলাদেশের এখতিয়ারের ভেতর। কারণ পাকিস্তানী সেনারা আত্মসমর্পণ করেছে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমা-ের কাছে। ফলে এ নিয়ে ভারতের একার বলার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার কিছু নেই। যা কিছু করতে হয় তা বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতেই করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারও ঘোষণা দেয় যে, কূটনৈতিক স্বীকৃতির আগে এবং সম্পর্কের সমতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের  সঙ্গে এ নিয়ে কোনো কথা বলতে সে প্রস্তুত নয়। আর ১৯৭১ এর ডিসেম্বরে ক্ষমতায় বসে ভুট্টো দেখলেন, ক্ষমতা ধরে রাখা সহজ নয়। জাতশত্রু ভারতের কাছে হেরে এবং আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানের তখন করুণ দশা। ভুট্টো জাতিসংঘে দাবি তোলে ভারতকে দ্রুত  তার ৯৩ হাজার সেনাকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠাতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ তখন গোঁ ধরে বসে আছে; তারা পাকিস্তানি সেনাদের যুদ্ধাপরাধের জন্য বিচার করবে। সে উদ্দেশ্যে যুদ্ধাপরাধী অফিসার ও সেনাসদস্যের এক তালিকাও বাংলাদেশ তৈরি করে।  ভুট্টোর জন্য তখন প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল সে বিচার ঠেকানো এবং যুদ্ধাপরাধীসহ সব বন্দিকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া। ভুট্টোর জন্য এই এজেন্ডা পাকিস্তানি জেনারেলরা ঠিক করে দেয় ক্ষমতায় বসার প্রথম দিন থেকেই। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে বাংলাদেশকে স্বীকৃতির প্রশ্ন সে সময় ছিল পাকিস্তানের বিবেচনার বাইরে। বরং যেসব দেশ বাংলাদেশ স্বীকৃতি দিয়েছে, তাদের সঙ্গে কোন কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখবে না বলে পাকিস্তান ঘোষণা দেয়। তাই দেখা যায়, ১৯৭২ এর প্রথম দিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোটা কয়েক দেশের সঙ্গে পাকিস্তান তার সম্পর্কচ্ছেদও করে। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করায় যুক্তরাজ্যের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে পাকিস্তান কমনওয়েলথ থেকেও বেরিয়ে আসে।

৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে। সে অনুযায়ী বিচারের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশ সরকার ২৯ মার্চ ঘোষণা করে যে, জেনারেল নিয়াজী, রাও ফরমান আলীসহ ১১০০ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা হবে। সেজন্য একটি প্রস্তাবনাও উপস্থাপন করা হয়। যাতে শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীর বিচারে দেশী বিদেশী জুরি নিয়োগ এবং অন্যদের জন্য শুধু দেশীয় জুরি নিয়োগের উল্লেখ করা হয়। ভারত বাংলাদেশের এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সেসব পাকিস্তানি সেনাদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরে রাজি হয়, যাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিকভাবে প্রমাণের ভিত্তিতে ‘প্রাইমা ফেসিইকেল’ যোগ করতে পারবে। বাংলাদেশের সংগৃহীত তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ১৯৭২ সালের ১৪ জুন ভারত সরকার নিয়াজীসহ প্রাথমিকভাবে ১৫০ জন যুদ্ধবন্দিকে বিচারের জন্য বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরে রাজী হয়। ১৯৭২ সালের ১৯ জুন বঙ্গবন্ধু পুনরায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলার মাটিতেই তাদের বিচার হবে।

১৯৭২ সালের ২৮ জুন থেকে ৩ জুলাই ভারতের শৈলশহর সিমলায় অনুষ্ঠিত হয় ইন্দিরা-ভুট্টো বৈঠক। ১৮ বছর বয়সী ভুট্টো কন্যা বেনজীরও এই সময় উপস্থিত ছিলেন। এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে ইন্দিরা তাদের অভ্যর্থনা জানান। প্রথমে ইন্দিরা ও ভুট্টোর মধ্যে বৈঠক হয় অন্য কোন উপদেষ্টা বা পরামর্শক ছাড়াই। এরপর উভয় সরকারের উপদেষ্টা ও পরামর্শদাতাদের উপস্থিতিতে ইন্দিরা ভুট্টোর মধ্যে আরো কয়েক দফা বৈঠক হয়। অতপর দুই দেশের মধ্যে অতীতের সমস্ত সংঘর্ষ ও যুদ্ধংদেহী মনোভাবের অবসান ঘটিয়ে বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং উপমহাদেশে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংকল্প ব্যক্ত করে ইন্দিরা ও ভুট্টো এক চুক্তি সই করেন। এটাই ’সিমলা চুক্তি’ নামে খ্যাত। সামরিক ও রাজনৈতিক নানা দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নিয়ে বৈঠকে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশের স্বীকৃতি বা যুদ্ধবন্দি ফেরত নিয়ে কোনো আলোচনা হয় নি। চুক্তিতে কাশ্মীর সীমান্তসহ দ্বিপাক্ষিক কতিপয় বিষয় যেমন পাকিস্তানের যে অঞ্চল ভারত দখল করেছে, তা ছেড়ে দেওয়া নিয়ে চুক্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। সিমলা চুক্তির পর পরই বঙ্গবন্ধু মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশের মাটিতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। প্রতিবাদ জানায় ভুট্টো, ‘পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের বিচার করার কোনো অধিকার বাংলাদেশের নেই। কারণ পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে ভারতীয় বাহিনীর কাছে। তখন ভারত সরকার বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, প্রকৃত সত্য এই যে, পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে ভারতীয় বাহিনী এবং বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত মিত্রবাহিনীর কাছে। আর সে কারণেই যুদ্ধ বন্দিদের প্রশ্নে যে কোন সিদ্ধান্ত ভারত ও বাংলাদেশের মতৈক্যের ভিত্তিতেই গৃহীত হবে।

পাকিস্তান সরকার সে দেশে আটকে পড়া ৪ লাখ বাঙালিকে তখন ‘জিম্মি’ করে যুদ্ধবন্দিদের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য। বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশকারী সন্দেহে বহুজনকে বন্দিশালায় আটকে রাখে। প্রায় ১৬ হাজার বাঙালি সরকারি কর্মকর্তা, যাদের একাত্তরেই চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল, তাদের পাকিস্তান ত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। । যুদ্ধ শেষ হবার পর পাকিস্তান সেখানে  আটকে পড়া বাঙালিদের পরিবারসহ অমানবিক পরিবেশে বন্দিদশায় রাখে। অনেক বাঙালি আফগানিস্তানের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে দেশে আসার পথে মারা যান। যারা আফগানিস্তান হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই সব বাঙালিদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ভুট্টো সরকার মাথাপিছু এক হাজার রূপি পুরষ্কার ঘোষণা করেছিল। বাঙালি বিদ্বেষী  অনেক পাকিস্থানী  অসত্য অভিযোগ এনে প্রতিবেশী অনেক বাঙালিকে পরিবারসহ ধরিয়ে দেয়। যাদের পুলিশী নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি পাকিস্তানে বাঙালিদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন পেশ করেছিল। যাতে বলা হয়েছিল,’হাজার হাজার বাঙালি বিনাবিচারে জেলে আটক আছে। পাকিস্তান ত্যাগ করতে পারে এই অভিযোগে বাঙালিদের গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রতিদিনই তাদের হয়রানি করা হচ্ছে এবং তারা বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার। বিশেষ করে বাঙালিদের মধ্যে যারা উঁচু পদে রয়েছেন এবং বিত্তবান তারা দুর্বিসহ অবস্থায় রয়েছে। বাঙালিদের ‘নিগার’ বা নিচুজাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যারা ইতোমধ্যেই নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার, তাদের প্রতি অত্যন্ত খারাপ আচরণ করা হচ্ছে। তবে সেনাবাহিনীসহ সরকারি উঁচু পদে অনেক বাঙালি পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে চাকরিরত ছিলেন।’ যেসব বাঙালি নারী বা পুরুষ পাকিস্তানী বিয়ে করেছেন, তাদের অবশিষ্টাংশ পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে বহাল তবিয়তে সে দেশে রয়ে যায়। ভুট্টো প্রকাশ্য জোর গলায় বলেনও, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাংলাদেশের প্রস্তাবের বিপরীতে পাকিস্থান আটকে পড়া বাঙালিদের জিম্মি করতে বাধ্য হয়েছে।

আটকে পড়া বাঙালিদের ফেরত আনার জন্য তাদের পরিবার ঢাকাসহ সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। প্রয়োজনে যুদ্ধাপরাধীদের বিনিময়ে তাদের স্বজনদের ফেরত আনার দাবি জানাতে থাকে। এই দাবিতে তারা সমাবেশ এবং অনশন পালন অব্যাহত রাখে। ১৯৭২ সালের ৪ মে পুরো ঢাকা শহর জুড়ে জনতার বিক্ষোভ মিছিল বের হয় বাঙালিদের ফিরিয়ে আনার দাবিতে। সরকারের উপর তারা ক্রমাগত চাপ বাড়াতে থাকে। আটকে পড়া বাঙালিদের ব্যাপারে বাংলাদেশ তখন বিশ্ব জনমতের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের মহাসচিবের এ ব্যাপারে  সাহায্য কামনা করে ভারতের মাধ্যমে আবেদন জানায়। অপরদিকে হানাদার বাহিনীর নৃশংসতায় নিহত শহীদদের পরিবারগুলো সারাদেশে সভা সমাবেশ করতে থাকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার দালাল আইন জারি করে। আলবদর, রাজাকারসহ দালালদের গ্রেফতার অব্যাহত ও বিচার কাজ চালু করে। চীনাপন্থী দল উপদলও গ্রুপ এবং মওলানা ভাসানী এই আইন বাতিলের দাবি জানাতে থাকে। তারা এই আইনে কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না বলে সভা সমাবেশ ও মিছিলে হুঁশিয়ারি জারি করে। ন্যাপ, সিপিবিসহ কয়েকটি দল আটকেপড়া পাকিস্তানীদের দ্রুত পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর দাবি তুলতে থাকে। নানামুখী চাপে তখন বঙ্গবন্ধু সরকার। অপরদিকে ভুট্টো বুঝতে পেরেছেন, আটকে পড়া বাঙালিদের ফেরত নিতে শেখ মুজিবের সরকার চাপের মুখে রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে দেরি না করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে কর্মরত সেনাসদস্য ও চাকরিজীবী কয়েকশ’ বাঙালিকে গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগ এনে গ্রেফতার করে। বঙ্গবন্ধু তাদের মুক্তি প্রদানের দাবি জানালেও ভুট্টো তাতে সাড়া দেয় নি। বরং আটকেপড়াদের বিনিময়ে সকল যুদ্ধবন্দিদের ফেরত নিতে ষড়যন্ত্র আঁটে। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভুট্টো বিহারি অধ্যুষিত সিন্ধুপ্রদেশে ’বিহারি বাঁচাও’ নামে মিছিল সমাবেশ করান এবং আন্তর্জাতিক মহলকে এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে আবেদন জানালেও ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখান নি।
১৯৮৯ সালে দিল্লি হতে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ওমান এরিয়াস’ গ্রন্থে অধ্যাপক ডেনিস রাইট উল্লেখ করেছিলেন সে সময়ের কথা ‘বিকৃত বিচারের বদলে যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নটি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয় দেশের জন্যই একটি ’কূটনৈতিক তুরুপের তাস ’-এ পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ তাকে ব্যবহার করবে পাকিস্তানের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য। আর পাকিস্তান স্বীকৃতি দেওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে দাবি করবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নাকচ করার জন্য।’
আটকে পড়া পাকিস্তানী সেনাদের নিয়েও বিপাকে পড়ে ভারত। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী এদের নিরাপত্তা, খাওয়া-দাওয়াসহ ভরণ পোষণ এবং ভাতা প্রদান করতে হতো ভারতকেই। এখাতে প্রতি মাসে ব্যয় দাঁড়াচ্ছিল এক লাখ ডলার। যুদ্ধ শেষ, যুদ্ধবিরতি চুক্তিও সই হয়েছে, পরাজিতরা আত্মসমর্পণও করেছে, সুতরাং তাদের আর আটকে রাখার পক্ষে কোন যুক্তিও ভারতের সামনে তখন ছিল না। ভারত আকাশবাণীর  বিশেষ চ্যানেল চালু করে, যেখান থেকে যুদ্ধবন্দিরা পাকিস্তানে তাদের পরিবারের কাছে নিজের অবস্থা জানান দিয়ে বার্তা প্রচার করতো। তাই দেখা যায়, বিষয়টির নিষ্পত্তির জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব কূর্ট ওয়াল্ডাইম ভারত সফরে এসে ইন্দিরা গান্ধীকে পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পরামর্শ দেন। ইন্দিরা অবশ্য সরাসরি জানিয়ে দেন, বাংলাদেশের মতামত অগ্রাহ্য করে ভারত একতরফাভাবে কিছু করতে পারে না, করবেও না। ইন্দিরা জানতেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে শেখ মুজিব দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধাপরাধীদের প্রথম তালিকায় ১৫০০ পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা ও সেনা সদস্যের নাম প্রকাশ করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যথাযথ তথ্য প্রমাণ হাজির করার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকায় তালিকা কমিয়ে আনে। শেষে তা দাঁড়ায় ১৯৫ জন। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি এই তালিকা করে। ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে যুদ্ধবন্দি বিষয়ে প্রথম আইন পাশ করা হয়।

দিল্লী থেকে ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ; সার্চ ফর নিউ রিলেশনশিপ’ গ্রন্থে অধ্যাপক মুহম্মদ আইউব লিখেছেন, ‘ভূট্টো জানতেন, তার দেশের আটক যুদ্ধবন্দি ভারতের জন্যে বোঝাস্বরূপ। আজ বা কাল হোক, ভারতকে সব যুদ্ধবন্দি ছেড়ে দিতেই হবে। ফলে এই প্রশ্নে দেন দরবার করে কোনো বাড়তি ফায়দা আদায় হবে না। ভূট্টো বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও হেনস্তা করার জন্য উঠে পড়ে লাগেন। পুরো ১৯৭২ সাল তাই ভুট্টো বাংলাদেশকে ভারতের অধিকৃত অঞ্চল বলে ঘোষণা করতো। ১৯৭২ সালের ১০ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে ভূট্টো বলেন, বাংলাদেশ ভেবেছে যে, আমাদের বন্দিদের মুক্ত করার ব্যাপারে তাদের ভেটো ক্ষমতা আছে। ভেটো আমাদের হাতেও একটা আছে।” ভুট্টো জানান যে, পাকিস্তানের অনুরোধে চীন জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের বিষয়ে ভেটো দিবে। সে সময় সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্যে বৈদেশিক সাহায্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সুতরাং জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে। তাই বাংলাদেশ সাহায্য পাবার জন্য আবেদন করে। ২৫ আগস্ট চীন নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের বিষয়ে ভোট দেয়। বাংলাদেশের অপরাধ তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করা। তদুপরি বাংলাদেশ বিচারের অবস্থান থেকে সরে আসে নি। দূতিয়ালীর জন্য বঙ্গবন্ধু চীনেও প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন গোপনে। চীন তখন পাকিস্তানের বিষয়ে অন্ধ এবং গণহত্যাকারীদের বিচারের বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেয়। ফলে বাংলাদেশের দূতিয়ালি সফল হতে পারে নি। চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করেছিল পুরো একাত্তর সালসহ ৭৫এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত।

১৯৭২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভুট্টো ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন, ‘কয়েকশ’ পাকিস্তানি বন্দিদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করার জন্য রেখে বাকীদের ছেড়ে দেওয়া হলে তার আপত্তি নেই। কিন্তু ১৯৭৩ সালে ভুট্টো তার মত পরিবর্তন করে বলেন, ‘পাকিস্তানী বন্দিদের বিচার করা হলে সে আটকেপড়া বাঙালিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (হু কিল্ড মুজিব, এএল খতিব)। ১৮৭২ সালের নভেম্বরে ভারত আটক পাকিস্তানি সেনাপরিবারের প্রায় ৬ হাজার সদস্যকে মুক্তি দেয়। বিপরীতে পাকিস্তানও আটকে পড়া ১০ হাজার বাঙালি নারী ও শিশুর একটি দলকে বাংলাদেশে প্রত্যাবাসনে সম্মত হয়। কিন্তু পাকিস্তানে আটক অধিকাংশ বাঙালির কী হবে, সে নিয়ে উৎকন্ঠা বাড়তে থাকে বাংলাদেশের। যুদ্ধবন্দি ও আটকেপড়া বাঙালিদের বিনিময় নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতার আড়ালে চাপা পড়ে যেতে থাকে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফেরত যাবার বিষয়টি। জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন এদের শরণার্থী হিসেবে মর্যাদা দেয়। এরা যেসব ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়, তা জেনেভা ক্যাম্প নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। প্রায় ৬ লাখ বিহারী পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সে দেশে ফিরে যাবার জন্য তালিকাভুক্ত হয়। এদের একটা অংশ ১৯৭২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মীরপুর দখল করে রেখেছিল। আল শামস বাহিনীর সদস্যও ছিল এরা। ১৯৪৭ সালের পূর্ব হতেই বৃটিশদের কূটকৗশলে বিহার থেকে এরা এদেশে আসে রেলসহ অন্যান্য সেক্টরে কাজের জন্য। পাকিস্তান যুগে এদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃজনে এরাই প্রধান নৃশংস ভূমিকা রেখেছিল। প্রচ-ভাবে বাঙালি বিদ্বেষী বিহারীরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় জায়গা জমি দখল করে গোত্রভুক্ত হয়ে থাকতো। ১৯৭১ সালের মার্চে এরা বিভিন্ন স্থানে বাঙালির উপর হামলা চালায়। আর পুরো নয় মাস গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটে এরা পাকিস্তান বাহিনীর বিশ্বস্ত হিসেবে নৃশংস হয়ে ওঠেছিল। এদের একটি বড় অংশ অর্থাৎ বিত্তবানরা ডিসেম্বরের আগেই পাকিস্তান চলে যায়। দরিদ্র বিহারীরা আর পালাবার পথ পায় নি। পাকিস্তানি হানাদাররাও এদের সঙ্গে নিয়ে যায় নি। এই আটকে পড়ারা পাকিস্তান যাবার জন্য চারদশক ধরে অপেক্ষমান।

যুদ্ধাপরাধী বিচারের পথ বন্ধ করতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা এগিয়ে যেতে থাকে। ১৯৭৩ সালের ১০ জানুয়ারিতে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় লেখা হয়, ’যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন বাংলাদেশের সরকার প্রধান শেখ মুজিবকে পরামর্শদান উপলক্ষে জানিয়ে দিয়েছে যে, একটি বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবন্দি ও বেসামরিক ব্যক্তিদের বিচার করা হলে পাকিস্তানের হতোদ্যম জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে, প্রেসিডেন্ট ভূট্টো তা সামলাতে পারবে না এবং এর ফলে উপমহাদেশে শান্তি স্থাপন সম্পর্কিত আলাপ-আলোচনা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ যুদ্ধাপরাধী বিচার প্রত্যাহারের জন্য এটাই প্রথম বিদেশী চাপ তা নয়।  শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেন এ ধরনের পরামর্শ দিয়েছে,তা-ও নয়। ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানী হানাদাররা বাংলাদেশে গণহত্যায় লিপ্ত, তখন যেসব মুসলিম দেশ এসবেরও প্রতিবাদ করে নি, তারা ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের জন্য গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিশেষত: মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো। এর মধ্যে সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের ভাগ্যের সঙ্গে পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের ভাগ্য বিজড়িত। তখন ১৭ এপ্রিল, ১৯৭৩ সালে টানা চারদিনের আলোচনা শেষে বাংলাদেশ ও ভারতে যৌথ ঘোষণায় যুগপৎ প্রত্যাবাসনের প্রস্তাব রেখে বলে, যুদ্ধবন্দি,পাকিস্থানে ও বাংলাদেশে আটক সব নাগরিককে একযোগে নিজ নিজ দেশে পাঠানো হবে। তার আগে দেশ তিনটি নাগরিকদের ৭টি ক্যাটাগরি প্রণয়ন করেছিল। এই তালিকায় আটকে পড়া বাঙালি ও বিহারী ছাড়াও পাকিস্তানের যুদ্ধবন্দি ও যুদ্ধাপরাধীরা অন্তর্ভূক্ত ছিল। পাকিস্তান এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে নি। তাই প্রস্তাব অনুসারে ভারত সেদেশে আটক প্রায় ১০ হাজার বন্দিকে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করবে। বিনিময়ে পাকিস্তান সেদেশে আটকে থাকা বাঙালিদের মধ্যে দু’লাখকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে। এছাড়া বাংলাদেশ আটক প্রায় দু’লাখ ৬৩ হাজার অবাঙ্গালি তথা বিহারীকেও পাকিস্তান ফেরত নেবে। তারপরও বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি হতে সরে আসে নি। এমন কি অভিযুক্ত পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের এই প্রত্যাবাসন প্রস্তাবের বাইরে রাখে। যুগপৎ এই প্রত্যাবাসনে ভুট্টো সায় দিলেও মাত্র ৫০ হাজার বিহারীকে ফেরত নিতে রাজি হয়। তবে ভুট্টো বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাদের বিচারের তীব্র প্রতিবাদ জানায়। সদম্ভে ঘোষণা করে, ‘বাংলাদেশ যদি অভিযুক্ত পাকিস্তানিদের বিচার করে, তাহলে তিনি পাকিস্তানে আটক বাংলাদেশের নাগরিকদের একই রকম ট্রাইব্যুনালে বিচার করবেন।’ ১৯৭৩ সালের ২৭ মে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভুট্টো বলেন, ‘বাঙালিদের এখানে বিচার করার দাবী জনগণ করবে। আমরা জানি বাঙালিরা যুদ্ধের সময় তথ্য পচার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হবে। কতজনের বিচার করা হবে, তা এখনই বলতে পারছি না। বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানি সেনাদের বিচার করে, তাহলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ক্যু’র মাধ্যমে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সরকারের পতন ঘটাবে এবং দুই দেশের পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে। এই চক্রান্তের জন্য ইতোমধ্যেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

ভূট্টোর এসব বাগাড়ম্বরের প্রতিবাদ করেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৩ সালের ৭ জুন নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ভোলা সম্ভব নয়। এই হত্যা, ধর্ষণ, লুটের কথা জানতে হবে। যুদ্ধ শেষের মাত্র তিনদিন আগে তারা আমার বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে।তারা প্রায় ২ লাখ নারীকে নির্যাতন করেছে এমনকি ১৩ বছরের মেয়েকেও। আমি এই বিচার প্রতিশোধের জন্য করছি না। আমি এটা করছি মানবতার জন্য। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে বাঙালিদের বিচারের হুমকির প্রতিবাদ করে বলেন, এটা অবিশ্বাস্য। এই মানুষগুলো চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা; যারা বাংলাদেশে ফেরত আসতে চায়, ওরা কী অপরাধ করেছে? এটা ভুট্টোর কী ধরনের প্রতিহিংসাপরায়ণতা।’ কিন্তু ভূট্টোর কুমন্ত্রণা তার আদ্যোপান্ত জীবন জুড়ে;। তিনি ষড়যন্ত্রের জাল ছড়াতে থাকেন। ১৯৫ শীর্ষ বাঙালি কর্মকর্তাকে বিচারের জন্য গ্রেফতার করে বলে ১৯৭৩ সালের ২৬ আগস্ট নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় সফরে যান যুগোশ্লাভাকিয়ায়। এ সময় পাকিস্তানি নোবেল জয়ী পরমাণু বিজ্ঞানী প্রফেসর আবদুস সালাম এক পত্রে বঙ্গবন্ধুর জামাতা ড. এম ওয়াজেদ মিয়াকে জানান, তিনি বেলগ্রেডে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ভুট্টোর একটা বৈঠকের আয়োজন করতে চান। পাকিস্তান তখনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ায় বঙ্গবন্ধু প্রস্তাব নাকচ করে দেন। প্রফেসর সালাম বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্যে পত্রে অনুরোধ জানান, ‘শেখ সাহেবের কাছে আমার বিশেষ অনুরোধ যে, তিনি যেন ৯৩ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে শুধুমাত্র ১৯৫ জন কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে বাকীদের বিনাশর্তে মুক্তি দেন। পরবর্তীতে ১৯৫ জনের বিচার করে ওদের থেকে শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের ফাঁসি দেওয়া যেতে পারে।’ বাংলাদেশ ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দেশীয় সহযোগীদের বিচারের জন্য আইন প্রণয়ন করে। রাজাকার, আলবদর, আল শামস, দালালদের বিচারের জন্য ‘বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ ১৯৭২ জারি করে। ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই বাংলাদেশের নয়া সংবিধানের প্রথম সংশোধনী আনা হয়। এতে ৪৭(৩) ধারা সংযুক্ত করা হয়। যাতে ‘গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য কিংবা যুদ্ধবন্দিকে আটক, ফৌজদারিত্বে সোপর্দ কিংবা দ-দান করার বিধান’ অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ২০ জুলাই জারি করা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩। এর ফলে মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাদের জন্য পাকিস্তানি সেনা এবং দেশীয় যুদ্ধাপরাধী রাজাকার,আলবদরদের বিচারের ব্যবস্থা নেওয়ার পথ সহজ হয়।

বাংলাদেশও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে অনড় অবস্থানে থাকে। তবে ভারতের শিবিরে থাকা অন্যান্য যুদ্ধবন্দিদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠাতে অনাগ্রহী ছিলেন না বঙ্গবন্ধু। পাশাপাশি পাকিস্তানি সেনাদের বিচারের বিপরীতে চীনের অবস্থান ভারতকে বিপাকে ফেলে। চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়াতে ভারত তখন আগ্রহী নয় পারিপারির্শ্বক অবস্থার কারণেই। আন্তর্জাতিকভাবে যেমন, তেমনি অভ্যন্তরীণভাবেও ইন্দিরা সরকারের উপর চাপ তৈরি হতে থাকে। যাতে ভারত দ্রুত সব যুদ্ধবন্দিদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সিমলা চুক্তির সূত্র ধরে ভারত-পাকিস্তান দু’দফা বৈঠকে বসে। ১৯৭৩-এর জুলাইয়ে রাওয়ালপিন্ডিতে এবং আগস্টে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইন্দিরার বিশেষ উপদেষ্টা পিএন হাকসার এবং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহমদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনার পর একটি চুক্তি সই হয়। ভারত আটক পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি, পাকিস্তান আটক বাঙালি এবং বাংলাদেশ আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের স্ব স্ব দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করা হয়। এই লোক বিনিময় শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বাকী ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিষয় চূড়ান্ত হবে। কিন্তু দুটি বৈঠকে বাংলাদেশকে আলোচনায় না রাখায় চুক্তি জোরালো হয়ে ওঠতে পারে নি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, একমাত্র সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ এ ধরনের কোন আলোচনায় বসতে পারে। ভারত পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তি সই হওয়ায় স্বভাবতই আশা করা হয়েছিল যে, অতঃপর পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু বাস্তবে স্বীকৃতিদান দূরের কথা, জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্তি ঠেকিয়ে রাখার জন্য পাকিস্তান ধরণা দেয় গণচীনের দরবারে। পাকিস্তানের প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহম্মদ পিকিং (বেইজিং) ছুটে যান এবং বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে চীনা নেতাদের সঙ্গে দেনদরবার করেন। অতপর আজিজ আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন, পাকিস্তানি ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দির বিচারের সিদ্ধান্ত বাতিল না করা পর্যন্ত পাকিস্তান ও চীন বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্য প্রাপ্তির বিরোধিতা করে যাবে।

১৯৭৩ সালের ২৮ আগস্ট যে দিল্লি চুক্তি সই হয়, তাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে বাংলাদেশকে ছাড় দিতে হয়। চুক্তিতে বলা হয়, পাকিস্তান বাঙালি ‘গুপ্তচরদের’ বিচার করবে না। যে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী বাংলাদেশ চিহ্নিত করেছে তাদের হবে, বাংলাদেশেই হবে। তবে এ ব্যাপারে যদি পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে, তবেই তা হবে। বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে তাদের দৃঢ় অবস্থানের কথা এরপরও উল্লেখ করতে থাকে। কিন্তু, এই চুক্তির ফলে একতরফাভাবে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ আর থাকে নি। দিল্লি চুক্তি স্পষ্ট করেছিল, যুদ্ধাপরাধীদের আর বিচার হচ্ছে না। কারণ, পাকিস্তান এ প্রশ্নে কখনোই বাংলাদেশের সঙ্গে সহমত ঘোষণা করতে চায় না। দিল্লি চুক্তিকে পাকিস্তানি সংবাদপত্রে উপমহাদেশে নতুন সম্পর্কের সূচনা করবে বলে অভিমত জানায়। নিউইয়র্ক টাইমসের ২ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় বলায় হয়, নতুন সম্পর্ক হয়তো এখনই শুরু হচ্ছে না। কিন্তু এ কথায় কোন ভুল নেই যে, এই তিন দেশের মধ্যে সম্পর্ক নতুন মোড় নিচ্ছে।

১৯৭৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনকালে সৌদী বাদশাহর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বৈঠক করেন। বাদশাহ ফয়সল দাম্ভিকতার সঙ্গে শর্তারোপ করেন যে বাংলাদেশকে সৌদী আরবের স্বীকৃতি পেতে হলে দেশটির নাম পরিবর্তন করে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ রাখতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত হলো, অবিলম্বে সমস্ত পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। বঙ্গবন্ধু বাদশাহকে কড়া জবাব দিয়ে যুদ্ধবন্দি সম্পর্কে বলেন, ‘এটাতো বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বিষয়। এই দু’টো দেশের মধ্যে এ ধরনের আরও অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েছে। যেমন ধরুন, বাংলাদেশ থেকে কয়েক লাখ পাকিস্তানি নাগরিকদের সে দেশে ফেরত নেওয়া এবং পাকিস্তানে আটকে পড়া ৫ লক্ষাধিক বাঙালিকে বাংলাদেশে পাঠানো এবং বাংলাদেশের প্রাপ্য অর্থ সম্পদ পরিশোধ করা। এমন বেশ কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েছে। আর এ সবের মীমাংসা কিছুটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। শুধুমাত্র বিনাশর্তে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা বাঞ্চনীয় হবে না। আর সৌদী আরবই বা এতো উদগ্রীব কেন?’ বঙ্গবন্ধুর কড়া ভাষ্য শুনে সৌদী বাদশা একটু রূঢ়স্বরে বলেন, ‘শুধু এটুকু জেনে রাখুন, সৌদী আরব আর পাকিস্তান একই কথা। পাকিস্তান আমাদের সবচেয়ে অকৃত্রিম বন্ধু। যা হোক, আমার শর্ত দুটি বিবেচনা করে দেখবেন। একটা হচ্ছে, বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা ও অপরটি বিনাশর্তে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি। আশা করি, এরপর বাংলাদেশের জন্য সাহায্যের কোন কমতি হবে না।’ সৌদী আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং পশ্চিমা অনেক দেশই যুদ্ধাপরাধী বিচারের বিপরীতে অবস্থান নেয়। কিন্তু বাংলাদেশ তাদের বিচারের বিষয়ে তখনো অনড় অবস্থানে। বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধী ছাড়া বাকী যুদ্ধবন্দিদের প্রত্যাবাসনে আপত্তি তোলে নি। কিন্তুু পাকিস্থান যুদ্ধাপরাধীদের ছাড়া যুদ্ধবন্দিদের ফেরত নিতে আপত্তি বজায় রাখে। ভুট্টো জানতেন, যুদ্ধবন্দিদের ভারত এমনিতে ফেরত দিতে বাধ্য হবে। কারণ বেশিদিন ভরণ পোষণ দিতে পারবে না। আর পাকিস্থানে আটকে পড়া বাঙ্গালীদের নিরাপত্তা বা সুরক্ষার দায়িত্ব তার নেই। যদিও বেশিরভাগ বাঙালিই যুদ্ধের সময় থেকেই চাকরি হারাতে থাকেন। বেকারত্বের কারণে তারা সহায়-সম্পদ সবই বিক্রি করতে বাধ্য হন। এসব তথ্য জেনে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের ৮ মার্চ জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে এই করুণ অবস্থার অবসানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। ১৯৭৩ এর ২৮ আগস্ট দিল্লীতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে  বৈঠকটি হয় বাংলাদেশের সম্মতিতেই। বৈঠকে উভয় দেশ, ‘দিল্লী চুক্তি’ সই করে। দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে যুগপৎ প্রত্যাবাসন নিয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়। অপরদিকে শর্তারোপ করা হয়, পাকিস্তান গুপ্তচর বৃত্তির দায়ে আটক বাঙালিদের বিচার করবে না। তবে বাংলাদেশ সেদেশে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর যে বিচার করতে চায় সে বিষয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ঐকমত্য হলেই তবে বিচার হবে। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য তার সরকারের দৃঢ়তার কথা বিভিন্ন পর্যায়ে তখনও বিবৃত করেছেন। কিন্তু এই চুক্তির ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। ১৯৭৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার নামে প্রথম  সপ্তাহেই ১৪৬৮ জন বাঙালি এবং ১ হাজার ৩শ‘ ৮ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দির প্রত্যাবাসন ঘটে। বাংলাদেশ ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী ফেরত না দেয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকায় পাকিস্তান দুই শতাধিক বাঙালিকে পণবন্দি হিসেবে জিম্মি করে রাখে। এই সব সিদ্ধান্তের আগে ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে ভুট্টো একটি নতুন প্রস্তাবও রেখেছিল। এতে বলা হয়েছিল, ‘পাকিস্তান তার যে কোন যুদ্ধবন্দির বিচার ঢাকায় অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করে, কারণ অভিযুক্ত অপরাধ পাকিস্তানের একটি অংশেই ঘটেছে। সুতরাং পাকিস্তান নিজে বিচার বিভাগীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এদের বিচারে আগ্রহী। যা আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে।’ (পাকিস্তান এ্যাফেয়ার্স, ১ মে ১৯৭৩)। তবে টিক্কা খান পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধান থাকাবস্থায় এসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে পাকিস্তানী প্রস্তাবে সন্দেহ পোষণ করে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশে যে বিচার করা সম্ভব হবে না তা বঙ্গবন্ধু পরিষ্কার উপলব্ধি করতে পারেন। কারণ তখন আটকে পড়া নির্যাতিতসহ সাধারণ বাঙালিদের দেশে ফেরত আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। অথচ এই বাঙালিদের ভাগ্য জড়িয়ে গেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সঙ্গে। এক দোটানায় পড়ে যায় বাংলাদেশ। তথাপি যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়ার আগে পাকিস্তানের কাছে চারটি বিষয়ে নিশ্চিত হতে চায়। প্রথমত: যুদ্ধাপরাধের জন্য বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া, দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে পাকিস্তানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ খোলা রাখা এবং তৃতীয়ত সৌদী আরব, মধ্যপ্রাচ্য, চীনসহ অন্যান্য দেশে পাকিস্তানের বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা বন্ধ করা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দান। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে ১৯৭৩ সালের ১০ জুলাই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের প্রশ্নে শর্তসাপেক্ষে ভুট্টোকে একক ক্ষমতা তুলে দেয়া হয়। ভুট্টো সংসদে বলেন, পাকিস্তানি সেনাদের বিচারের দাবি পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত কোন স্বীকৃতি নয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৭৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভুট্টো ভাষণে বলেন, ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দির মুক্তি দিয়ে পাকিস্তানে ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের শর্ত অপূর্ণই থেকে যাবে। আর জাতিসংঘের প্রস্তাব বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশকে পাকিস্তানের স্বীকৃতি এবং বাংলাদেশের পক্ষে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের প্রশ্নই উঠে না। এর ১২ দিন পর ৩ অক্টোবর চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী চিয়ান জিয়ান হুয়া অধিবেশনে বলেন, জাতিসংঘের প্রস্তাব কার্যকরী করার পরেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করতে পারে। তার আগে কোনোক্রমেই নয়।

দিল্লীতে ১৯৭৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক বসে। বৈঠক শেষে তিন দেশীয় প্রতিনিধিরা এক যুক্ত ঘোষণায় বলেন , উপমহাদেশে স্থায়ী শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলার স্বার্থে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাতিল করে দেয়া হবে। অবশ্য এই যুক্ত ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক রেডক্রসের তত্ত্বাবধানে পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের প্রথম দলটি ১৮সেপ্টেম্বর ঢাকা যায়। কিন্তু এরপর প্রত্যাবাসন থেমে যায়। পাকিস্তান এ ব্যাপারে টালবাহানা শুরু করে। অথচ যুক্ত ঘোষণায় ত্রিমুখী লোক বিনিময় যুগপৎ পরিচালিত হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু ২২ অক্টোবর টোকিওতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে প্রতিটি বাঙালি ফেরত দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি নাগরিকদের বিপুল সংখ্যককেই পাকিস্তান নিচ্ছে না।’ এর ক’দিন পরই ভুট্টো ঘোষণা করেন যে, ‘পাকিস্তান বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানি নাগরিক বিহারীদের ফেরত নেবে না।’ অথচ প্রায় পাঁচ লাখ বিহারীর মধ্যে অধিকাংশই পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সে দেশে ফেরত যেতে আগ্রহী। বাংলাদেশের পক্ষে এদের ভরণ পোষণ ভারবাহী হয়ে দাঁড়ায় গোড়াতেই।
১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামিক শীর্ষ সম্মেলনকালে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি ও আটকে পড়া বাঙালিদের সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু ও ভুট্টোর মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা হয়। বঙ্গবন্ধু বৈঠক চলাকালে সাংবাদিকদের জানান, ‘পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং বাঙালিদের দেশে ফেরাসহ আরও অনেক বিষয়ে কথা বলার প্রয়োজন হবে। এই সম্মেলন শুরুর আগে অর্থাৎ ১৮৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো বলেন, ’আমরা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছি। আল্লাহর নামে এবং দেশের জনগণের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা করছি।... আমি বলছি না যে, এটি আমি পছন্দ করছি। আমি বলছি না আমার হৃদয় আনন্দিত। এটি আমার জন্য একটি আনন্দের দিন নয়, কিন্তু বাস্তবতাকে আমরা বদলাতে পারবো না।‘ ভুট্টোর ঘোষণার আগের রাত অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে সৌদী আরব, মিসর, ইন্দোনেশিয়াসহ ৩৭টি মুসলিম দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে উভয় দেশের উপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোন প্রতিশ্রুতি ছাড়াই পাকিস্তানের স্বীকৃতি আদায়ে সমর্থন হয়। তবে বাংলাদেশ তখনো ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর বিচার থেকে সরে আসার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় নি। লাহোর সম্মেলন থেকে ফেরার পথে বঙ্গবন্ধু জানালেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তিনি আপাতঃ স্থগিত রেখেছেন। তবে বিষয়টি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান শীগগিরই আলোচনায় বসবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় লেখা হয়, শেখ মুজিব বলেছেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পারস্পরিক স্বীকৃতির ফলে যে নতুন যুগের সূচনা হলো, তার ফলে আমাদের সব সমস্যা সমঝোতার ভিত্তিতে সমাধান সম্ভব হবে।’ যুদ্ধাপরাধী নিয়ে সম্মেলনে মুসলিম বিশ্বের চাপের পাশাপাশি অন্যান্য দেশগুলোও একদিকে চাপ প্রয়োগ এবং অপরদিকে পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালির উদ্ধার, জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ, আন্তর্জাতিক সাহায্য নিশ্চিত করার বিষয়গুলো বাংলাদেশের সামনে এসে দাঁড়ায়। দেশ তখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত । দেশের ভেতর পাকিস্তান ও চীনপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর থানা,ফাঁড়ি ও অস্ত্রলুট, গুদামে অগ্নিসংযোগ, গলাকাাটা ও শ্রেণী শত্রু খতমের সশস্ত্র তৎপরতা চলছে। নানাবিধ কারণে বাংলাদেশের তখন প্রায় একলা চলোর অবস্থা। ভারত ও আন্তর্জাতিক অভ্যন্তরীণ নানা চাপে যুদ্ধবন্দিদের ফেরত পাঠাতে চাইছিল। যে কারণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে প্রায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশ তথাপি বিচারের ব্যাপারে প্রকাশ্যে আগ্রহ ব্যক্ত করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের কারণে যুদ্ধাপরাধীরা দেশে ফিরতে পারছিল না। বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার মাসখানেকের মধ্যে ১৯৭৪ সালের ২৪ মার্চ পাকিস্তানে জিম্মি থাকা সর্বশেষ ২০৬ জন বাঙালিকে ছেড়ে দেয়। পাকিস্তানের পক্ষে তখন স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্র বাংলাদেশের নাগরিককে আটক রাখার কোনো সুযোগ ছিল না। দ্রুত সমাধানের আশায় তিনদেশে সিদ্ধান্ত নেয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের। যেখানে বিষয়গুলো আলোচনার পর সমঝোতা হবে।

দিল্লীতে তিন দেশ অবশেষে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনায় বসে। ১৯৭৪ সালের ৫ এপ্রিল থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন। বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশ একাত্তরের ঘটনার জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনার উপর চাপ দেন। ড. কামাল হোসেনের আহ্বানে আজিজ আহমদ সরকারের পক্ষ থেকে ¯্রফে ‘দুঃখ’ প্রকাশ করেন। যা যৌথ ঘোষণার শেষে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ভারতের শরণ সিংহ এ জন্য ক্ষমা চাওয়ার কথা বলেছিলেন। ৬ এপ্রিল ডক্টর কামাল ঘোষণা করেন, পাকিস্তান যদি তার একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য জনসম্মুখে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং অবাঙালি বিহারিদের প্রত্যাবাসনসহ পাকিস্তানের সম্পদ বন্টনে রাজি হয়, তাহলেই শুধু ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর উপর আনীত অভিযোগ তুলে নেওয়া যায়। জবাবে আজিজ আহমদ বলেছিলেন, সম্পদ বন্টন হলে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক দেনার ভারও নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, প্রেসিডেন্ট এছাড়া অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ বিষয়ে একাধিকবার দুঃখ প্রকাশ করেছেন, তাই ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বাংলাদেশকেও একাত্তরের মার্চপূর্ব কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। তাছাড়া, ২২ ফেব্রুয়ারিতে মিশরের রাষ্ট্রপ্রধান আনোয়ার সাদাতের মধ্যস্থতায় যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশ পাকিস্তানি বন্দিদের প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়। যৌথ ঘোষণায় পাকিস্তানের পররাস্ট্রমন্ত্রী অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন যে, পাকিস্তান সরকার মনে করে, পাকিস্তানে যে অপরাধ হয়তো সংঘটিত হয়েছে তার প্রতি নিন্দা ও গভীর দুঃখ প্রকাশ করে। ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো বাংলাদেশের জনগণের কাছে এই বলে আহ্বান করেছেন যে সমঝোতার স্বার্থে তারা যেন বিগত ঘটনা ভুলে যায় ও ক্ষমা প্রদর্শন করে। চুক্তিতে ডক্টর কামালকে উদ্ধৃত করে উল্লেখ করা হয় যে, পাকিস্তানের ওই সব বন্দি যে মাত্রাতিরিক্ত ও বহুধা অপরাধ করেছে, তা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবনা এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত এবং এই ১৯৫ জন পাকিস্তানি বন্দি যে ধরনের অপরাধ করেছে, সে ধরনের অপরাধের অপরাধিদের দায়ী করে আইনের মুখোমুখি করার বিষয়ে সার্বজনীন ক্ষমতা রয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়, স্বীকৃতিদানের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে বাংলাদেশ সফর করবেন এবং বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং অতীতের ভুলত্রুটি ভুলে যাবার জন্য আহ্বান করেছেন। এ প্রসঙ্গে ড. কামাল উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ক্ষমাশীলতার পরিচয় দিয়ে বিচার চালিয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ সম্মত হয় যে, ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে দিল্লী চুক্তির অধীন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ফেরত পাঠানো যেতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ১৯৫ জনকে ক্ষমা করেছে, তা বলে নি। শুধু ভারত থেকে পাকিস্তান ফিরে যাবার কথা বলেছে।

১৯৭৪ সালের ১১ এপ্রিল নিউইয়র্ক টাইমস শিরোনাম করেছিল, ‘বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনা‘। সাংবাদিক বার্নার্ড উইনরবের লিখেছেন, ‘যদিও পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনা সরাসরি ছিল না, যতটা সরাসরি বাংলাদেশ দাবি করেছিল। কিন্তু ভারতীয় ও বাংলাদেশী কর্মকর্তারা মনে করেন, পাকিস্তান এ কথা স্বীকার করেছে যে, তাদের সেনাবাহিনীর কেউ কেউ মাত্রাতিরিক্ত কাজ করেছে। এমনকি পাকিস্তান যে এই চুক্তি সই করে তাও এক ধরনের ক্ষমা প্রার্থনা বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। চুক্তিপত্রে এই মর্মে বাংলাদেশের একটি বিবৃতি অন্তর্ভূক্ত হয় যে, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত ১৯৫ জন সেনা নানা অপরাধ করেছে। যার অন্তর্গত হলো ‘যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যা মৈত্রীর বৃহত্তর স্বার্থে তাদের প্রতি তার দেশ ক্ষমা প্রদর্শন করেছে’ বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন জানালেন। বাংলাদেশ এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে ‘গণহত্যা’ শব্দটি অন্তর্ভূক্ত করেছিল।

১৯৭৪ সালের এপ্রিলে যখন দিল্লী চুক্তি হয়, বঙ্গবন্ধু তখন মস্কোতে চিকিৎসারত। ফেরার পথে দিল্লীতে অবস্থানকালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি জানি, আমাকে কেউ কেউ ভুল বুঝবে। কিন্তু আমি নিরুপায়। এদেরকে না ছাড়লে ভুট্টো আমার ৪ লাখ বাঙালিকে ছাড়বে না। বঙ্গবন্ধু আরো বলেন, ‘ভুট্টো লাহোরে আমাকে বলে, পাকিস্তানি সেনাদের সে দেশে ফিরিয়ে নিতে না পারলে, ভুট্টোকে সেনাবাহিনীর লোকেরা মেরে ফেলবে। (পরবর্তীকালে তা হয়েওছিল)। ভুট্টো তার জীবন বাঁচানোর জন্য ৪ লাখ বাঙালিকে ছাড়বে না। আর বাঙালিদের ফিরিয়ে আনার জন্য আমি ওয়াদাবদ্ধ। ৪ লাখ অসহায় নর-নারীর জীবন বাঁচানোর জন্যই আমাকে বাধ্য হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওদেরকে ছেড়ে দিতে হচ্ছে।

আর দিল্লীতে যখন মন্ত্রীদের বৈঠক চলছিল, ভুট্টো তখন সরকারি সফরে ফ্রান্সে। প্যারিস থেকে হুঁমকি দিয়ে ঘোষণা করলেন, এই চুক্তি সই না হলে উপমহাদেশে সমঝোতার পথ সূদুর পরাহত হবে। পাকিস্তানি কতিপয় সংবাদপত্র এই চুক্তির বিরোধিতা করে ভুট্টোকে দায়ী করেন। তিনি শক্ত অবস্থানে ছিলেন বলেই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি তুলে নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের দেশে ফেরত যাবার বিষয়ে আপত্তি প্রত্যাহার করলেও গণহত্যার অপরাধের জন্য ক্ষমা করে নি। কারণ চুক্তির ১৩ ধারায় বাংলাদেশের ভাষ্য ছিল, পাকিস্তানি বন্দিরা যে ধরনের অপরাধ করেছে, সে ধরনের অপরাধের অপরাধীদের দায়ী করে আইনের মুখোমুখি করার বিষয়ে সার্বজনীন ঐকমত্য রয়েছে। বাংলাদেশ বিচার ঢাকায় হবে বলে যে ঘোষণা দিয়েছিল, তা থেকে সরে এলেও পাকিস্তানের আদালতে বা আন্তর্জাতিক আদালতে এদের বিচার হবে চুক্তি অনুযায়ী তাই আশা করেছিল। তথাপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি বাংলাদেশ অব্যাহত রাখে।

১৯৭৪ এর ২৮ জুন ভুট্টোর ঢাকা সফরের সময় বঙ্গবন্ধু তার কাছে যুদ্ধাপরাধের বেশ কিছু ডকুমেন্টস হাজির করেছিলেন। এর মধ্যে রাও ফরমান আলীর বুদ্ধিজীবী হত্যার তালিকাও ছিল। এবং ডায়েরিতে লেখা ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ, রঙ লালে লাল করে দিতে হবে।’ বাংলাদেশের চাপে পাকিস্তান হামুদুর রহমান কমিশন গঠন করে। এই কমিশনে যুদ্ধাপরাধীরাও জবানবন্দি দেয়। কমিশন পাকিস্তানী সেনা ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদরদের নিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করে। সুপারিশে কর্তব্যে অবহেলার জন্য বেশ কিছু সামরিক কর্মকর্তার শাস্তির কথা বলা হয়। কমিশন আরো সুপারিশ করেছিল, ১৯৭১ এর মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতা, অবাধ নিষ্ঠুরতা ও অনৈতিকতা তদন্তে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন আদালত বা কমিশন গঠন করার জন্য। কমিশন প্রয়োজনীয় প্রমাণাাদির জন্য বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা চাওয়ার কথাও উল্লেখ করে। বাংলাদেশ গণহত্যার প্রমাণাদিও কমিশনে সংযুক্ত করেছিল। যা কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর অনেকের বক্তব্য কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। যেখানে পরস্পর পরস্পরকে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটের জন্য অভিযোগ করেছে। ভুট্টো এই কমিশনের প্রতিবেদনে যেমন প্রকাশ করেননি, তেমনি ১৯৫ জনকে বিচারের মুখোমুখি করেননি। কারণ প্রধান আসামী কসাই টিক্কা খান তখন ভুট্টোর সেনাপ্রধান। দিল্লী চুক্তিতে বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানি নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা থাকলেও ভূট্টো তা করে নি। অপরদিকে চুক্তিতে আটকেপড়া বাঙালিদের দেশে ফেরত পাঠানোর উল্লেখও রয়েছে। ভুট্টো চুক্তির কোনোটিই আসলে কার্যকর করে নি। কারণ ভূট্টো বলেছিল চুক্তির আগে যে, পাকিস্তান নিজে তার জাতীয় আইনের ভিত্তিতে তাদের বিচার করবে। ভুট্টো তো ’৭২ সাল থেকেই নিজে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু কথা রাখে নি। সময়টা ছিল বাংলাদেশের প্রতিকূলে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটা নাজুক ছিল। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো ছাড়া আর কেউ সাহায্যের হাত বাড়ায় নি। এমনকি মুসলিম দেশগুলোও নয়। যুদ্ধারপরাধীদের বিচার করার মত বাস্তব অবস্থা এবং উপকরণগত সহায়তাও বাংলাদেশের ছিল না।

সে সময় বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়, দ‘ুটি কারণে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দিতে রাজী হন। প্রথমতঃ পাকিস্তানে আটকে পড়া প্রায় ৪ লাখ বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিদের মধ্যে এমন অনেকেই রয়েছেন, যারা তার প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীতে ‘সম্পদ’ হিসাবে গণ্য হবেন। তাছাড়া, যুদ্ধবন্দি বিচারের উপর প্রায় ৪ লাখ আটকেপড়া বাঙালি ও তাদের আত্মীয়-স্বজনের জীবন মরণ ও সুখ দুঃখ নির্ভর করছে। দ্বিতীয়ত, যে সব দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তা করেছে এবং সাহায্য দিয়েছে, তাদের মধ্যে ভারত ছাড়া আর প্রায় সব ক’টি দেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করার অনুরোধ জানিয়েছিল।

পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালিদের ভুট্টো জিম্মি করে রেখেছিল। আন্তর্জাতিক বিশ্ব এ বিষয়ে সে ভাবে এগিয়ে আসে নি। ভারত এ ব্যাপারে পাকিস্তানের উপর চাপ বহাল রেখেছিল। কিন্তু এই বাঙালিদের ফেরত আনার জন্যই যেদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করেই ছেড়ে দিতে হয়েছিল। দিল্লী চুক্তি অনুযায়ী তাদের বিচারের পথ রুদ্ধ হয়ে যায় নি। যদিও তাদের প্রায়জনই আর জীবিত নেই। কিন্তু মরণোত্তর বিচার কাজটি পাকিস্তানের করা উচিত তাদের নিজেদের স্বার্থে যেমনি, তেমনি বিশ্বের  শান্তির স্বার্থেও।

যুদ্ধাপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার নজির বিশ্বে আর নেই। কূটনৈতিক লড়াইটায় খোদ পাকিস্তান বিজয়ী হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের একটি নির্দিষ্ট গ-ির মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। মুক্তিযুদ্ধের পর জাতিসংঘ ও শরণার্থী কমিশন এবং রেডক্রস তাদের নিয়ে কাজ করে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তাদের শরণার্থী মর্যাদা দেওয়া হয়। রেডক্রস তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টার অংশ হিসেবে নাগরিকত্ব পরিচয় লিপিবদ্ধ করলে, তারা নিজেদের পাকিস্তানী নাগরিক পরিচয় দিয়ে সে দেশে ফেরত যেতে চায়। সে সময় থেকে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিহারীদের ’আটকে পড়া পাকিস্তানি’ বলে অভিহিত করা হয়।

এদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক রেডক্রস ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের ৬৬টি ক্যাম্পে আশ্রয় দেয়। এর মধ্যে ঢাকার মীরপুরে ২৫টি, মোহাম্মদপুরে ৬টি ক্যাম্প। ১৯৭৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেডক্রস বিদায় নিলে বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি এদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নেয়। আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ফেরত নিতে জেদ্দাভিত্তিক সংগঠন রাবেতা আল আলম ইসলাম জরিপ চালায়। তারা তালিকাও প্রণয়ন করে। সর্বশেষ ২০০৩ সালে পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার উর্দূভাষি পাকিস্তানি ৮১টি ক্যাম্পে বসবাস করছে। এদের ফেরত নিতে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জিয়াউল হক সত্তর দশকে একটি তহবিল গঠন করেছিলেন, কিন্তু তা ব্যবহার করা হয় নি। অর্থাৎ পুনর্বাসন থমকে থাকায় তা ব্যয় হয় নি।। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর ক্যাম্পগুলো বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রনণালয়ের তত্ত্বাবধানে চলছে।

১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি পরিচালিত সমীক্ষা অনুযায়ী ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬৯ জন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রত্যাখান করে নিজেদের পাকিস্তানি নাগরিক দাবি করে সে দেশে ফিরে যেতে চায়। ১৯৭৩ এবং  ১৯৭৪ সালে ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ এই মানবিক সমস্যা মোকাবেলায় একাধিক চুক্তি করে। ইন্দো-পাক এগ্রিমেন্ট ১৯৭৩, জেদ ট্রাইপাটাইট এগ্রিমেন্ট অব বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, ১৯৭৫-এই চুক্তিগুলোর অন্যতম। ১৯৭৪ সালে তিন দেশের মধ্যে সম্পাদিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ মাত্র তিন শ্রেণীভুক্ত ব্যক্তিদের পাকিস্তানে ফেরত নিতে সম্মত হয়। চুক্তির আওতায় পাকিস্তান ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬শ ৩৭ জনকে ফেরত নেওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করে। তবে মাত্র ১ লাখ ২৬ হাজার ৯শ ৪১ জনকে ফেরত নেয়। বাকী ৪ লাখ ফেরত নেয়নি।
বাংলাদেশে উর্দুভাষীদের মূল সমস্যাটি নাগরিক সংক্রান্ত। তারা বাংলাদেশী না পাকিস্তানী? ব্রিটিশ শাসনামলের শেষ দশকগুলোতে ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে কাজ করার জন্য অনেক উর্দুভাষি বিহার, উড়িষ্যা ও উত্তর প্রদেশ থেকে পূর্ববঙ্গে আসে। এদের বেশীরভাগেই বিহারের। যারা প্রধানত, রেল পুলিশ, বিচার ব্যবস্থা ও অন্যান্য বেসামরিক পদগুলোতে যোগ দিয়েছিলেন। সৈয়দপুরে বৃহৎ রেল ওয়ার্কশপে কাজ করার জন্য ব্রিটিশরা বিহার থেকে ৭ হাজার জনকে নিয়ে এসেছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ ও দাঙ্গার ফলে ১৩ লাখ মুসলিম অধিবাসী পূর্ববাংলায় আসে। এর মধ্যে ১০ লাখ বিহারী। এদের মোহাজির অভিহিত করা হয়। পূর্ববঙ্গের সাংস্কৃতিক ও ভৌগলিক ভিন্নতার পাশাপাশি ভাষাগত ভিন্নতার মুখোমুখি হয় তারা। বাংলাভাষা বা লিপি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এ কারণে এবং রাজনৈতিক নীতির কারণেও এরা বাংলা ভাষা এবং বাঙালিকে এড়িয়ে চলে এবং দৃঢ় গোষ্ঠীগত বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। এমন কি বৃহত্তর জনগোষ্ঠী হতে বিচ্ছিন্ন থাকে। এরাই হিন্দুদের জমিজমা দখল করার জন্য ঢাকাসহ অন্যান্য স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঘটায়। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সহযোগী হয়ে গণহত্যায়ও  অংশ নেয়।
১৯৯২ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দেয় যে, তিনশ বিহারী পরিবারকে পাকিস্তানে ফেরত নেওয়া হবে। কিন্তু ১৯৯৩ সালে মাত্র ৫০ পরিবারকে ফেরত নেওয়ার পর প্রক্রিয়াটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রয়েছে। পরবর্তীতে বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশ বিষয়টি উত্থাপন করলেও সন্তোষজনক কোন সুরাহা হয়নি। আটকেপড়া সবাইকে ফেরত নেওয়ার বাংলাদেশের অনুরোধ পাকিস্তান উপেক্ষা করে আসছে। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারের সহযোগী বিহারীদের বাংলাদেশ জিম্মিও করে নি কিংবা যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাদের বিচারের আওতায় আনে নি। এরা ১৯৭২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মিরপুর দখলে রেখেছিল। মুখোমুখি সশস্ত্র প্রতিরোধে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তা মুক্ত করে। চিত্রনির্মাতা-সাহিত্যিক জহির রায়হান ওখানেই গুলি বিনিময়ের সময় নিহত হন।

পাকিস্তান আটকেপড়া পাকিস্তানিদের স্বদেশ প্রত্যাবাসনের জন্য যে কমিটি করেছে, তারা সম্প্রতি সুপ্রীম কোর্টে বলেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৪ থেকে ৫ লাখ পাকিস্তানি আটকে পড়ে আছে। পাকিস্তান এদের ফেরত এবং দায়-দায়িত্ব নেবে না। বাংলাদেশকেই এদের দায়-দায়িত্ব বহন করতে হবে। বাংলাদেশ অবশ্য বলে দিয়েছে, ৭১ পূর্ব সময়ে জন্মগ্রহণকারী পাকিস্তানীদের ফেরত নিতে হবে।

১৯৯২ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে গোলাম আযমের বিচার সম্পর্কে বিতর্ক হয়। বিএনপির মন্ত্রী জমিরউদ্দিন সরকার, রফিকুল ইসলাম মিয়াসহ বিএনপি সরকার পক্ষের কতিপয় সদস্য বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় রাজাকার ও পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা প্রদর্শন সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা তাদের স্মরণ করিয়ে দেন, ‘যে সব রাজাকারদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ছিল, তাদের ক্ষমা করা হয়নি। ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের কেন ছেড়ে দেয়া হয়েছিল তার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা সংসদে আরো বলেন, পাকিস্তানে আটকে পড়া ৪ লাখ বাঙালিকে ফিরিয়ে আনার জন্যই সরকারকে বাধ্য হয়ে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছিল।’ শেখ হাসিনা এমনও বলেন, ‘সেনাপতি নূরউদ্দিন খান, বিডিআর প্রধান আবদুল লতিফ, জেনারেল সালাম, মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, মাজেদুল হকসহ ৪ লাখ বাঙালি পাকিস্তানে বন্দি অবস্থায় ছিল, তাদের পরিবার পরিজনদের মাতমে সাড়া দিয়েই বঙ্গবন্ধু সেদিন যুদ্ধাপরাধী ও পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি সেনাদের ছেড়ে দিয়ে আটকে পড়া বাঙালিদের ফিরিয়ে এনেছিলেন। (সংবাদ ১৬ এপ্রিল ১৯৯১)।

পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালিরা শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে পেরেছিল। তেমনি ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীসহ ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দিও পাকিস্তান ফিরেছিল বিনিময়ের মাধ্যমে। কিন্তু বিহারীদের আর বিনিময় হয় নি। দিল্লী চুক্তি রক্ষা করে পাকিস্তান ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীকে বিচার করেনি যেমন, তেমনি বিহারীদের ছেড়ে দিচ্ছে না। বিশ্ব জনমতই পারে এ সমস্যার সমাধান করতে।



লেখক তালিকা