This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Bangladesh Liberation War, Genocide of Innocent Bengali People in 1971 and contemporary political events of Bangladesh.

More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.




The Exeter South Asia Centre of the College of Humanities of the University of Exeter listed ‘Muktijuddho e-Archive’ as a source for Research materials.

The University of Exeter is a public research university located in Exeter, Devon, South West England, United Kingdom.
This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

যুদ্ধাপরাধী ফজলুল কাদের চৌধুরী - সাব্বির হোসাইন

যুদ্ধাপরাধী ফজলুল কাদের চৌধুরী

সাব্বির হোসাইন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট


ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান মুসলিম লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
পাকিস্তানীদের আস্থাভাজন হিসেবে পাকিস্তান আমলে তিনি জাতীয় পরিষদের স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে তিনি ও তার সন্তান সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে ফজলুল কাদের চৌধুরী ও সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের অভিযোগে দালাল আইনে মামলা করা হয়।

ফজলুল কাদের চৌধুরী ১৯১৯ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম জেলার গহীরায় জন্মগ্রহন করেন।
পড়াশুনো করেছিলেন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ কলেজে।
১৯৪৩ সালে তিনি মুসলিম লীগের চট্টগ্রাম জেলা শাখার সেক্রেটারি নির্বাচিত হন।
পাকিস্তান গঠনের পক্ষে তিনি পূর্ববঙ্গের একজন অগ্রগামী ব্যাক্তি ছিলেন।
১৯৪৮ সালে তিনি মুসলিম লীগ চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৬২ ও ‘৬৩ সালে তিনি আইয়ুব খানের কৃষি ও পূর্তমন্ত্রী, শিক্ষা ও তথ্যমন্ত্রী এবং শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ছিলেন।
১৯৬৩ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার ছিলেন এবং একই বছর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হন।

পাকিস্তান গঠন হবার পর থেকে পাকিস্তানের পূর্ব অংশের মানুষ তথা বাঙালির জাতির চেয়ে তিনি
পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থকে বড় করে দেখতেন।
পাকিস্তান আমলে বাঙালির অধিকার আদায়ের সব আন্দোলন ও দাবির বিরোধিতায় ছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী।
বাঙালি জাতিকে ফজলুল কাদের চৌধুরী দেখতেন নিঁচুজাত হিসেবে; আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে বিচার চলাকালে তার পুত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার ও তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাঙালি বিদ্বেষ ও বাঙালি জাতির প্রতি ঘৃণার কথা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির স্বাধীনতার দাবির বিরোধিতায় তিনি শুধু করেননি, বরং পাকিস্তান বাহিনীকে সহযোগিতা করা সহ বাঙালির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছিলেন।
তিনি ও তার পুত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাকিস্তান বাহিনীর প্রধানতম দালাল হয়ে কাজ করেছিলেন; চট্টগ্রামে শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী, আলবদর ও আলশামস বাহিনী গঠনে তিনি অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন।

একাত্তরে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী বাঙালি গণহত্যা শুরু করার পর মুসলিম লীগের শীর্ষনেতা মালিক মোহাম্মদ কাসিমকে সাথে নিয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী গর্ভনর টিক্কা খানের সাথে দেখা করে কিভাবে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে সহযোগিতা করা যায় এবং বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রাম ধুলিস্মাৎ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাকিস্তানের প্রধানতম দালাল হিসেবে এই অঞ্চলে বাঙালি গণহত্যা ও নির্যাতনে তিনি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।
তার গুডসহিলের বাড়িটি চট্টগ্রামের একটি প্রধান নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
ফকা-সাকা গুডসহিলে বন্দীদের ভয়ংকর পদ্ধতিতে নির্যাতন করা হতো; পানির পিপাসায় কাতর হয়ে গেলে পান করতে বন্দীদের প্রশ্রাব দেয়া হতো।
নির্যাতন করার জন্য গুডসহিলে একটি পেরেক লাগানো টেবিল ছিল; যাতে হাত-পা বেঁধে বন্দীদের শোয়ানো হতো আর একটি তক্তা দিয়ে চেপে ধরা হতো; ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যেত এইসব দুর্ভাগা বাঙালির বন্দীদের শরীর।

মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামে সংঘটিত বাঙালি গণহত্যা ও নির্যাতনে ফজলুল কাদের চৌধুরী ও তার পুত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভূমিকা ছিল দালাল হিসেবে সর্বোচ্চ এবং মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে তিনি ও তার পুত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বাঙালির বিরুদ্ধে ভয়ংকর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছিলেন।
চট্টগ্রামে পাকিস্তানের পক্ষে বাঙালির উপর উনি যে ভয়াবহ নির্যাতন করেছিলেন, সে সময়ে চট্টগ্রামে তার সম্পর্কে প্রচলিত উক্তি শুনলেই বুঝতে পারা যায়; সে সময় তাকে বলা হতো- ইয়াহিয়া খানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল।
তাদের অপরাধের ভয়াবহতার মাত্রা বুঝবার জন্য সেক্টর’স কমান্ডার্স ফোরামের শীর্ষ পঞ্চাশ
যুদ্ধাপরাধীর তালিকাটি দেখা যেতে পারে, যাতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও ফজলুল কাদের চৌধুরীর অবস্থান যথাক্রমে ১৫ ও ১৬ নং।
বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় হতে প্রকাশিত ১৫ খন্ডের 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র' বইতে পিতা-পুত্র ফজলুল কাদের চৌধুরী ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর একাত্তরের ভূমিকা ও মুক্তিযুদ্ধের সময় ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অনেক তথ্য বর্ণিত আছে।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ফজলুল কাদের চৌধুরীর ভূমিকা সম্পর্কে আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বলেছেনঃ

‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সাকা চৌধুরী ও তাঁর বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী স্বাধীনতার
বিরোধিতা করেছিলেন।
২৫ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের অভিযানে ঢাকায় যখন পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে, তখন চট্টগ্রামে ফকা চৌধুরী ও তাঁর ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্যারা মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তোলেন।
স্বাধীনতাকামী মানুষকে প্রতিহত করার জন্যই এই বাহিনী গড়ে তোলা হয়।
তখন তাঁরা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেন।’

একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলাকালীন সময়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়া ১৫তম সাক্ষী তৎকালীন ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নিজাম উদ্দিন আহমেদ ট্রাইবুনালে বলেছেনঃ

"১৯৭১ সালে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর নির্দেশে দুই বন্ধুসহ আমাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় গুডস হিলে। জিন্নাহ টুপি পরা ফজলুল কাদের চৌধুরীর সামনে যখন আমাদের হাজির করা হয়, তখন তিনি আমাদের দেখেই উত্তেজিত হয়ে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল শুরু করে দেন এবং বলেন, ‘তোরা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছিস!’
নিজাম উদ্দিন বলেন, এরপর তিনি (ফজলুল কাদের) আমাকে জাপটে ধরে ঘুষি মেরে বলেন, ‘তোরা জয়বাংলা জয়বাংলা করছিস, আর হিন্দুরা ধুতির কোচা নাড়ছে।’ আমাদের দেখিয়ে তিনি সেখানে উপস্থিত তার লোকদের নির্দেশ দেন, ‘ওদের বানাও’।"

এরপর ফজলুল কাদের চৌধুরীর নির্দেশে তাঁদের উপর অকথ্য নির্যাতন করা হয়।

কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের কর্ণধার নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যা, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজাফফর আহমদ ও তাঁর পুত্র শেখ আলমগীরকে অপহরণ করে হত্যা এবং সুলতানপুর ও ঊনসত্তরপাড়ায় সংঘটিত গণহত্যার সাথে সরাসরি জড়িত ছিল পাকিস্তানের দালাল পিতা-পুত্র ফজলুল কাদের চৌধুরী ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।

বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে ফজলুল কাদের চৌধুরীর সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহতা বর্ণনা করে ১৯৭২ সালের ০৮ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়ঃ

‘ফজলুল কাদের চৌধুরী ২৫ শে মার্চের পর থেকে চাটগাঁয় অত্যাচারের যে স্টিমরোলার চালিয়েছিলেন,
আইকম্যান বেঁচে থাকলে এই অত্যাচার দেখে তাঁকে নিশ্চয়ই স্যালুট দিতেন।’

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী ও তার পুত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে চট্টগ্রাম শহর, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, আনোয়ারা, পটিয়া ও বোয়ালখালী সহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে বাঙালিদের খুন-ধর্ষণ-লুটপাট, মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা-নির্যাতন, হিন্দুদের বাড়ি দখল-দেশান্তরে বাধ্য করার মতো ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের পর পাকিস্তানের দালাল যুদ্ধাপরাধী ফজলুল কাদের চৌধুরী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিল।
১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রায় দেড় মণ সোনাসহ একটি নৌযানে করে পালানোর সময় ফজলুল কাদের চৌধুরী আনোয়ারা উপজেলার গহীরা উপকূলে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির বিরুদ্ধে ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে শুধু রাউজান থানাতেই ফজলুল কাদের চৌধুরীর ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাত্তরে সংঘটিত অপরাধের বিষয়ে ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়।
পরবর্তীতে দালাল আইনে ফজলুল কাদের চৌধুরী কর্তৃক সংঘটিত একাত্তরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়।

বিচারচলাকালীন অবস্থায় ১৯৭৩ সালের ১৭ জুলাই ফজলুল কাদের চৌধুরী হার্টএটাকে মারা যায়।
ফজলুল কাদের চৌধুরীর পুত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

ফজলুল কাদের চৌধুরী যে ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ একাত্তরে সংঘটিত করেছিল, সে বেঁচে থাকলে তারও হয়তো ফাঁসির রায় হতে পারতো।
তবে, এটুকু শান্তির যে, বিচার চলাকালীন সময়ে কারাগারে তার মৃত্যু হয়।

তথ্য সহায়িকাঃ

* বাংলাপিডিয়া - বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ
* যেভাবে সাকার রাজনৈতিক উত্থান প্রকাশিত-দৈনিক জনকন্ঠ-৩০ জুলাই ২০১৫
* দৈনিক জনকন্ঠ-৩১ জানুয়ারি, ২০১০ তারিখে প্রকাশিত রিপোর্ট
* দৈনিক বাংলা-০৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ তারিখে প্রকাশিত রিপোর্ট
* http://www.ntvbd.com/opinion/15924
* http://www.banglanews24.com/fullnews/bn/443135.html
* ICSF নিউজ আর্কাইভিং (http://bit.ly/1JT1BMR)