১৯৭১-ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
রশীদ হায়দার
সাহিত্য প্রকাশ


রশীদ হায়দার সম্পাদিত ১৯৭১: ভয়াবহ অভিজ্ঞতা শীর্ষক বইটি পড়ার পর মনে যে তীব্র যন্ত্রণাকর অনুভূতি হয়, তা রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতার ভাষায় এ রকম: ‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই,/ আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,/ ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি তন্দ্রার ভেতরে—/ এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?’ কিংবা ‘নদীতে পানার মতো ভেসে থাকা মানুষের পচা লাশ,/ মুণ্ডুহীন বালিকার কুকুরে খাওয়া বীভৎস শরীর/ ভেসে ওঠে চোখের ভেতরে—আমি ঘুমুতে পারি না, আমি/ ঘুমুতে পারি না…’। শুধু ২৫-২৬ মার্চের মধ্যবর্তী রাতটিই নয়, তখন থেকে ১৬ ডিসেম্বর সকাল পর্যন্ত পুরো নয় মাসই যেন ছিল মুক্তিকামী বাঙালির জন্য এক দুঃস্বপ্নের কালরাত। গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নারীর সম্ভ্রমহানি, বন্দীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন-নিপীড়ন প্রভৃতির মাধ্যমে পুরো দেশটি এক আতঙ্কগ্রস্ত মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। এসবই শুরু হয়েছিল ঢাকা থেকে এবং দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। জেলা মহকুমা, থানার শহর বন্দর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ-জেন্ডার-বয়স নির্বিশেষে ওই বর্বর বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়েছে সর্বস্তরের মানুষ। শান্তি কমিটি, রাজাকার এবং আলবদর ও আল শামস বাহিনী গঠনের মাধ্যমে তাদের সহযোগিতা করেছে এ দেশের অবাঙালিরা এবং ধর্মোন্মাদ রাজনৈতিক দলগুলো। ১৯৭১-এর বাঙালি নিধন কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিটলারের ইহুদি নিধনযজ্ঞকেও হার মানিয়েছে। এ বইটির বিশেষত্ব হলো, এটি কোনো শোনা কাহিনির সংকলন নয়, এর প্রতিটি লেখাই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মর্মস্তুদ বিবরণে ভাস্বর। এতে বিধৃত হয়েছে মৃত্যুপুরী থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর গভীর মর্মবেদনার জীবন্ত ভাষ্য। এ গ্রন্থের বিবরণী থেকে পাকিস্তানি বাহিনী ও তার এ দেশীয় দোসরদের বর্বর ও পাশবিক কর্মকাণ্ড এবং বাঙালিদের প্রতি তাদের ঘৃণার পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের মনে স্বাধীনতার স্পৃহা কেন এত তীব্র হয়ে উঠেছিল, তারও স্বরূপ উপলব্ধি করা যায়।