শাহবাগ থেকে হেফাজত : রাজসাক্ষীর জবানবন্দি
জিয়া হাসান
আদর্শ


'শাহবাগ থেকে হেফাজত : রাজসাক্ষীর জবানবন্দি'-কে ২০১৩ এর প্রথমভাগের সেই দহনকালের ইতিহাস হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। এটি ইতিহাসকে তুলে ধরছে না। এটিকে ঐ সময়ের একটি নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক ইস্যুর পর্যালোচনা ও যৌক্তিক ব্যবচ্ছেদ বলা যেতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত যে ব্যবচ্ছেদ এই বইতে লেখক দেখিয়েছেন সংস্লিষ্ট বিষয়ে একেবারে ব্যক্তিগত ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের মাধ্যমে, তা অনেকের কাছে যুক্তিসঙ্গত নাও মনে হতে পারে। লেখকের বক্তব্যের সাথে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ভিন্নমত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কথা বলছি এই কারণে যে বইটিতে লেখক গণজাগরণের যে বিশ্লেষণ করেছেন, তা তার নিজের চোখে দেখা উপাত্তের ওপর নির্ভর করে নয়। আর দশটা সাধারণ মানুষ মিডিয়া এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গোটা বিষয়টাকে যেভাবে প্রত্যক্ষ করেছিল, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে লেখক রাজিব হাসানও সেই একই পন্থা অবলম্বন করেছেন। তাই বইয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর ওপর লেখক যে বক্তব্য রেখেছেন, তার গোড়াতেই অনেক গলদ রয়েছে বলে অনেকে দাবি করতে পারেন। কাঁচের দেয়ালের ভেতর থেকে বাইরেটাকে স্বচ্ছভাবে দেখা গেলেও যেমন তার সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা যায় না, সেই ব্যাপারটা এই বইয়েরও কিছু কিছু জায়গায় পাঠকের কাছে দৃশ্যমান হবে। লেখক স্বশরীরে সেভাবে কোন মুভমেন্টের সাথেই জড়িত ছিলেন না। দূর থেকে বিষয়গুলোকে তিনি যতই সচেতন দৃষ্টিতে অবলোকন করেন না কেন, সেসব ব্যাপারে যতই মিডিয়া ও সংস্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্লগ, পোস্ট ইত্যাদি ঘাঁটাঘাঁটি করেন না কেন, অনেক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ই তিনি মিস করে গেছেন। এরকমটাই আসলে এধরণের কাজে হয়ে থাকে। তারপরও একটা কথা স্বীকার করতে হবে যে 'শাহবাগ থেকে হেফাজত : রাজসাক্ষীর জবানবন্দি' বইটিতে যথেষ্ট ছাপ রয়েছে লেখকের অদম্য পরিশ্রম ও গবেষণার। সাধারণত আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এত ডিটেইলসে কোন কাজ হয় না। লেখককে ধন্যবাদ যে তিনি এই বিরল কাজটি করেছেন এবং বেশ সফলভাবেই করেছেন। এইটার দরকার ছিল। কারণ লেখক এই বইয়ের যে পটভূমি, সেই সময়টাতে ব্লগ ও ফেসবুকে কি লিখছিলেন সেসব দিয়েই বইয়ের প্রায় সিংহভাগ স্থান ভরিয়েছেন। সেগুলো থেকে অবশ্যই ধারণা করা যায় ঐ সময়টায় লেখক ঠিক কি ভাবছিলেন, তার চিন্তা চেতনার গতি-প্রকৃতি কেমন ছিল। কিন্তু সেসব চিন্তা চেতনার উৎপত্তি কোন সব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ঘটেছিল, সে সম্পর্কে পাঠকের সামনে একটা স্বচ্ছ চিত্র তুলে ধরতে গেলে ওইসময়ের নানা ঘটনার উল্লেখ দেয়া আবশ্যক ছিল। সেই আবশ্যিকতাই লেখক পূরণ করেছেন বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার প্রধান শিরোনাম, ছোটখাট সংবাদ পরিবেশন, বিভিন্ন স্ক্রিনশট এবং চেনা পরিচিত অনেক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের ব্লগ বা স্ট্যাটাসের ভাষ্যের মাধ্যমে। আজকের দিনের পাঠকের হয়ত এক বছর আগের ঘটনা স্মরণে আছে কিন্তু আজ থেকে বেশ কয়েক বছর পর নতুন কোন পাঠক এ বিষয়ে পড়াশোনা করতে চাইলে ওইগুলোই মূলত তাদের প্রধান পথ প্রদর্শকের কাজ করবে। এখন বলা যাক বইটির আভ্যন্তরীণ নানা বিষয়ে। তিনটি অংশ আছে এই বইতে। কোন প্রেক্ষাপটে শাহবাগে গণজাগরণের জন্ম, অতঃপর কিভাবে শাহবাগের গণজাগরণের উত্থান ও তার সামনে পেছনের নানা ঘটনা এবং সবশেষে শাহবাগের অ্যাকশনের রিঅ্যাকশন হিসেবে হেফাজতের অবস্থান - এই তিনটি ভাগে গোটা বইটিকে বিভক্ত করেছেন লেখক। প্রথম ভাগে গণজাগরণের জন্মের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখক চমৎকারভাবে বর্তমান প্রজন্ম, তাদের মত প্রকাশের ও প্রতিবাদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে অনলাইন ভিত্তিক বিভিন্ন মাধ্যমের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। পরের পর্ব তথা গণজাগরণ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে গিয়ে সামগ্রিকভাবে গণজাগরণকে নিজের মত করে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। গণজাগরণের সাথে সম্পর্কিত এমন কোন ইস্যু নেই যার উল্লেখ এই পর্বে নেই। সেগুলোর উল্লেখ নাই বা করলাম। আর সবশেষে হেফাজত টপিকে আলোচনার জন্য লেখক যদিও শাহবাগের অ্যাঙ্গেলকে ব্যবহারের দাবি করেছেন, তারপরও আমি মনে করি তার লেখায় এবং বিভিন্ন স্ট্যাটাস, নোট ও ব্লগের লেখার যে ভাষা ছিল, তার মাধ্যমে মূলত হেফাজতের আঙ্গেলেই হেফাজতকে দেখার চেষ্টার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। প্রথম পর্বটি পড়ে অনলাইনের সাথে যুক্ত আছেন, এমন সকলেই মজা পাবেন। এই অংশটি বেশ সুখপাঠ্য। দ্বিতীয় পর্বটি এই বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষনীয় অধ্যায়। দারুণ রোমাঞ্চকর লেখনি। পাঠকের সামনে নতুন করে এক নতুন শাহবাগের চিত্র ফুটে উঠবে। শাহবাগ নিয়ে যারা ইতোমধ্যে অনেক পড়াশোনা করেছেন, তাদের সামনেও এই বইয়ের লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে শাহবাগকে চেনার সুযোগ ঘটবে। তবে শেষ অধ্যায়টি নিয়ে আমি বেশ হতাশ। হেফাজত নিয়ে লেখক যে কি ভাবতে পারেন, সেই ব্যাপারে পাঠকের আগের পর্বেই ইঙ্গিত পেয়ে যাবার কথা। ঠিক সেসব ব্যাপারেই আলোকপাত করা হয়েছে শেষ পর্বে, তাও একাধিকবার। একেবার একেক রকম স্ট্যাটাস বা নোটের মাধ্যমে লেখক সেগুলোকে প্রকাশ করতে চাইলেও, সেগুলোর মূলভাব মোটামুটি একই রকম ছিল এবং একটা পর্যায়ে এসে লেখকের একই বর্ণনা আর একই বক্তব্য পাঠকের কাছে একঘেয়েই লাগবে। লেখকের কাছে হেফাজত বিষয়েই তথ্য ছিল সবচেয়ে কম। ঠিক ততটুকু, যতটুকু পাঠক অলরেডি মিডিয়া ও ইন্টারনেটের কল্যাণে জেনেছে। তাই নতুনত্বহীন একটা বিষয়বস্তু নিয়ে অনর্থক কোন ত্যানা প্যাচানোর দরকার ছিল না। শুধু শাহবাগের সাপেক্ষে এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে লেখক হেফাজতকে কিভাবে দেখেছেন, সেটুকুই স্বল্প পরিসরে তুলে ধরা যেত। খামোকা বইয়ের পরিধি বাড়াতে গিয়ে পাঠকের বিরক্তিত উদ্রেক না ঘটালেও চলত। যাইহোক, শাহবাগ ও হেফাজতকে লেখক ঠিক এক সুতায় বাঁধতে ব্যর্থ হলেও, শাহবাগ টপিকে অনেক ডিটেইল বর্ণনা আছে বইটিতে। তাই শাহবাগের গনজাগরণের ব্যাপারে যারা আগ্রহী, তারা এই বইটি নিঃসঙ্কোচে পড়ে দেখতে পারেন।
- পাঠক রিভিউ