পূর্বাপর ১৯৭১: পাকিস্তানি সেনা-গহবর থেকে দেখা
মে. জে. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান (অব.)
সাহিত্য প্রকাশ


একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি মহাযজ্ঞ। এই যজ্ঞের কুশীলব ছিলেন এই ভূখণ্ডের ভেতরের মানুষ, দেশান্তরি মানুষ। আবার যাঁরা অনেক দূরে ছিলেন, তাঁরাও নতুন দেশের জন্মযন্ত্রণা অনুভব করেছেন। পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে অনেকের পক্ষেই যুদ্ধে যাওয়া সম্ভব হয়নি, হূদয়ে-মননে তারাও স্বাধীনতাকে ধারণ করেছেন। হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, তখন বেঁচে থাকাটাই ছিল একটি যুদ্ধ।

সে সময়ে অনেক সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি পাকিস্তানে আটকা পড়েছিলেন, কেউ বন্দি ছিলেন, কেউ বা ইচ্ছের বিরুদ্ধে চাকরি করে গেছেন। তাঁদেরই একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ খলিলুর রহমান। ১৯৪৮ সালে সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর বেশির ভাগ সময়ই তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানে থাকতে হয়েছে। একাত্তরেও ছিলেন। ‘শত্রুদেশে’ বসে থেকে একজন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা কীভাবে দেশকে অনুভব করেছেন, কীভাবে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে যোগদানের জন্য ব্যাকুল ছিলেন, তারই বিবরণ আছে তাঁর পূর্বাপর ১৯৭১: পাকিস্তানি সেনা গহবর থেকে বইয়ে। 

বইটি ইতিহাস নয়। প্রতি দিনের ছোট ছোট ঘটনা ও অভিজ্ঞতার বিবরণ। তাতে ব্যক্তিগত কথা আছে, পারিবারিক কথা আছে। আছে একটি রাষ্ট্রের ভাঙন এবং আরেকটি রাষ্ট্রের উত্থানের কাহিনি। নিজের দেখা ও জানাশোনা জগত নিয়েই কথা বলেছেন তিনি। বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি তথা পাঞ্জাবিরা কী ধরনের বৈরী ও বিদ্বেষমূলক আচরণ করতেন লেখক সেসব তুলে ধরেছেন বিভিন্ন ঘটনার আলোকে। কীভাবে নানা ছলছুতায় বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের অপমান ও অপদস্ত করত তারা। যদিও একাত্তরে তার উচিত শিক্ষা পেয়েছে, যে বাঙালিকে ভিরু ও অযোদ্ধার জাতি বলে হাসিঠাট্টা করত তাদের কাছেই লজ্জাজনক পরাজয় স্বীকার করেছে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা। 

মুহাম্মদ খলিলুর রহমানের বইটি শুরু হয়েছে ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞ স্বাধীনতা সংগ্রামের খবর দিয়ে। তখন তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১ নম্বর কোর-এর সদর দপ্তর মংলায় (পশ্চিম পাকিস্তানের মংলা)। এখানে মূলত সেনাবাহিনীর কর্মকৌশল নির্ধারিত হতো। ২৫ মার্চের পর স্বভাবতই সে দায়িত্ব থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর কাজ ছিল অফিসে আসা-যাওয়া, বৈঠকে অংশ নেওয়া। এ অবস্থায় সুযোগ পেলে অন্য বাঙালি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিজেদের ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতেন, নানা সূত্রে জানতে পেরে তিনি এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে পাকিস্তানিরাই পাকিস্তানের মৃত্যু পরোয়ানা লিখে দিয়েছে।

সে ক্ষেত্রে খলিলুর রহমানের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান হলো দেশে পালিয়ে যাওয়া। সেই চেষ্টা করেও সফল হননি। ফলে ভবিতব্য মেনে নিয়ে মুক্তির অপেক্ষা করছেন। এরপর ক্রমশ ঘটনা এগোতে থাকে, যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নেয়। বাংলাদেশে এত উথালপাতাল ঘটনা ঘটছে, প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলছে বাঙালি সেনা পুলিশ ইপিআর এবং সর্বস্তরের মানুষ। বিশ্ব গণমাধ্যম যখন পাকিস্তানিদের পরাজয় অবধারিত বলে প্রচার চালাচ্ছে, তখনো তাদের ভাবখানা হলো, সব কিছু ঠিক হ্যায়। শেষ পর্যন্ত সব কিছু ঠিক হয়নি। বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানিদের লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হতে হয়েছে।

১৬ ডিসেম্বর যখন নিয়াজি আত্মসমর্পণ দলিলে সই করেন, তখন পাকিস্তানে আটকে পড়া সব বাঙালি সেনা ও বেসামরিক নাগরিককে বন্দিজীবন বেছে নিতে হয়। তাদের জীবন ছিল অসহায়, অমানবিক। তবে এই দুঃসময়ে কিছু পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার সহূদয় ব্যবহার পেয়েছেন, সে কথা বলতেও ভোলেননি খলিলুর রহমান। আবার এসময়ে বাঙালিদের মধ্যে কেউ কেউ দালালি করেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মেজর কাইউম চৌধুরী, রিয়াজ রহমান এবং বাংলাদেশ থেকে সফরে যাওয়া কাজী দীন মুহাম্মদ প্রমুখ।

জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হওয়ার কারণে ব্রিগেডিয়ার খলিল পাকিস্তানি সেনা সদর দপ্তরের হাঁড়ির খবরও পেতেন, তাদের মধ্যে দলাদলি, ঈর্ষা ও হিংসা ছিল প্রকটতর। তার চেয়ে বেশি ছিল ক্ষমতার লিপ্সা। পাকিস্তানের দুই সামরিক শাসক আইউব খান ও ইয়াহিয়া খান সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ জাগিয়ে তুলেছিলেন। সেনা কর্মকর্তারা রাজনীতিকদের ঘৃণা করলেও রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভে ছিলেন উন্মুখ।

এই বইয়ের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অধ্যায় হলো তিনজন বাঙালি সেনা কর্মকর্তার ওপর পাকিস্তানিদের বর্বর ও বীভৎস নির্যাতন। বর্তমানে গুয়ানতানামো বেতে ইরাকি ও আফগান যোদ্ধাদের ওপর যেভাবে আমেরিকান বাহিনী নির্যাতন চালিয়েছে, তার চেয়েও নৃশংস ছিল পাকিস্তানিদের আচরণ। তাদের নির্যাতনের কারণে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার, কর্নেল মাসুদ ও কর্নেল মুহাম্মদ ইয়াসিন চিরতরে পঙ্গু ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় অভিযুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়ানোর জন্যই এই নির্যাতন চালানো হয়।

এ ছাড়া বইয়ে আছে পাকিস্তানে শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে যে ষড়যন্ত্র চলছিল, তার কথা। ১৯৭১ সালে কীভাবে গুলহাসান চক্র ভুট্টোর সঙ্গে আঁতাত করেছিলেন, আবার যুদ্ধের পর সেই গুলহাসান কীভাবে সেনাবাহিনী থেকে বিতাড়িত হলেন সেসবও আমরা জানতে পারি খলিলুর রহমানের বইয়ে। যাঁদের সহায়তায় ক্ষমতায় এসেছেন প্রথম সুযোগে তাঁদের কী নির্দয়ভাবে বিদায় করেছিলেন, সেই বিবরণও আছে। ভুট্টো কখনোই প্রতিপক্ষকে সহ্য করেননি। 

নওশের মান্ডি বাহাউদ্দিনে বন্দী জীবনযাপন করেছেন ব্রিগেডিয়ার খলিলসহ আরও অনেক বাঙালি সেনা কর্মকর্তা। বন্দিজীবনে তাঁরা যেমন ভালো পাকিস্তানিদের দেখা পেয়েছেন তেমনি মন্দ পাকিস্তানিদের সংখ্যাও কম ছিল না। তবে সেটি ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ে। বাঙালিদের বঞ্চনার কথা বলতে গেলে কেউ-ই স্বীকার করেনি।

বইটি সাজানো হয়েছে আটটি অধ্যায়ে, যথাক্রমে মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিক ঘটনাবলি ও পাকিস্তানি সেনা কর্তৃপক্ষের মনোভাব, ১৯৭১ সালের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, পাকিস্তানিদের সীমাহীন অজ্ঞতা, বাঙালিদের সম্পর্কে পাকিস্তানি তথা পাঞ্জাবিদের মনোভাব, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা, পাকিস্তানিদের পরাজয় ও নতুন পরিস্থিতিতে ক্ষমতার লড়াই, বন্দিজীবন—কোহাট ও অন্যত্র, মুক্তি ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এটি ভিন্নধারার বই, যাতে অজানা এক অধ্যায় উঠে এসেছে, আমাদের ধারণা ছিল, যারা দেশ ত্যাগ করেছেন এবং দেশের ভেতরে ছিলেন তাঁরাই নির্যাতন-হয়রানির শিকার হয়েছেন। কিন্তু দেশে ফিরতে ব্যাকুল এবং পাকিস্তানে বন্দি আরেক জনগোষ্ঠী যে কি দুঃসহ যন্ত্রণা ও অপমান সহ্য করেছেন, তারই প্রামাণ্য দলিল পূর্বাপর: ১৯৭১।