...মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে নতুনরূপে আসছে...

This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Liberation War of Bangladesh and Genocide of Innocent Bengali People in 1971. More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

ফেসবুকে আমরা

বাংলাদেশের অভ্যুদয়: যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা - ডাঃ এম এ হাসান

বাংলাদেশের অভ্যুদয়: যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা

ডাঃ এম এ হাসান

সংগ্রহঃ মাহবুবুর রহমান জালাল



বাঙালি জাতি নিজস্ব অভিন্নতা এবং অনন্য সংস্কৃতি নিয়ে অভিযাত্রা শুরু করেছিল কয়েক হাজার বছর আগে। নদীর ঢাল, সমতল ও লাল মাটিতে বেড়ে উঠা সেই সভ্যতার আকাংখাগুলো যুগে যুগে মূর্ত হয়েছে আমাদের স্থাপত্য, কলা ও সাহিত্যে। আমাদের সহনশীলতা, উদারতা, ভালবাসা এবং pluralist সমাজের প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে এই সব কর্মে। নতুন নতুন দর্শন, শিক্ষা তথা সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগী এ জাতির বিবর্তনের মাইলফলক হয়ে আছে নানা প্রাচীন বিদ্যাপীঠ ও প্রত্নতাত্মিক স্থাপনাগুলো। মহাস্থানগড় ও ওয়ারীবটেশ্বর এই জাতির মহিমান্বিত উন্মেষের কথাই বলে। মন্দির, বিহার ও প্রাচীন মসজিদগুলো- এ জাতির ধর্মীয় সহনশীলতার কথা বলে। এ দেশের প্রাচীন গড়, দূর্গ এবং লোক সাহিত্য এই গাঙ্গেয় বদ্বীপের মানুষের দ্রোহী চরিত্রের কথা বলে। এদেশের মানুষ সম্পদলোভী আগ্রাসী শক্তির নিকট সাময়িকভাবে পরাভূত হলেও, কখনও অন্তর থেকে পদানত হয়নি। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন অস্তিত্বের ঘোষণা দিয়ে শতাব্দীর শুরুতে এই জাতিসত্ত্বা ও মেধার উন্মেষ অবলোকন করেছে সমগ্র বিশ্ববাসী। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে এই বঙ্গভূমিতে ভারতের স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের প্রতি কঠিনতম অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়। সাম্রাজ্যবাদের নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সিপাহী আন্দোলনের যে অগ্নিস্ফূলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছিল এই বাংলায় তা পুনরায় আমরা দেখতে পাই ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে। পরাধীনতার শেকলভাঙা এই আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে আছেন নেতাজী সুভাষ বোস, ক্ষুদিরাম, তিতুমীরের মত ব্যক্তিবর্গ। অখন্ড ভারতের কৃষক আন্দোলনের সূতিকাগারও ছিল এই বঙ্গভূমি।

এমন ঐতিহ্যমন্ডিত, অভিন্ন সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিকগোষ্ঠীকে পদানত করে বিজাতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি চালিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র হলে, পাকিস্তান নামক কৃত্রিম রাষ্ট্রের জন্মলগ্নেই এদেশের মানুষ নতুন করে দ্রোহী হয়ে উঠে। সাধারণভাবে, জনগণের বিভ্রান্তি, রাজনীতিবিদদের ভুল এবং কতিপয় প্রতিক্রিয়াশীলের চক্রান্তের কারণে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি গঠিত হয় একটি নষ্টদর্শন ও ধর্মভিত্তিক একটি চিন্তাকে ভিত্তি করে। পূর্ববঙ্গ নামক যে ভূমির অধিবাসীরা কখনই ধর্মাশ্রয়ী চিন্তাকে প্রশ্রয় দেয়নি, তাদেরকে ধর্মের বড়ি গিলিয়ে পদানত করার চেষ্টা করে পাকিস্তানি শাসকবর্গ। এই ধর্মের কথা বলে বিশাল ভারতের দুই প্রান্তে অবস্থিত দুইটি ভিন্ন জনগোষ্ঠী ও বহুধাবিভক্ত সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্তি¡ক জনগোষ্ঠীকে একটি রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয় কেবলই ধর্মের নামে। মধ্যযুগীয় ইসলামী উন্মাদনা সৃষ্টি করে, কতিপয় দালাল ও অবাঙালিদের কর্তৃত্বে যে রাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠন করা হয় তা কখনই এদেশের জনগণ মেনে নেয়নি। বাস্তবে এ দেশ থেকে বৃটিশ শাসকরা বিদায় নিলে সাদাদের স্থানে বাদামি বর্ণের অবাঙালিরা জায়গা করে নেয়। ব্যবসা, বানিজ্য, শিল্প, চাকরি সর্বত্র কর্তৃত্ব স্থাপন করে সেই সব পাকিস্তানি যারা বাঙালিদেরকে নীচু জাত এবং অক্ষম বলে বিবেচনা করত।


শুরু থেকেই পাকিস্তানি শাসকরা এ দেশের মানুষের অন্তরে জাতিগত বিভেদ ও ঘৃণার বীজ বুনে ধর্মীয় বৈষম্যভিত্তিক নষ্ট রাজনীতির চর্চা করছিল। তারা এ অঞ্চলের জনগণ ও বাঙালি জাতিকে বিভক্ত করে তাদের শাসন ও কর্তৃত্বকে কন্টকমুক্ত রাখার চেষ্টা করে। তারা এদেশে মাদ্রাসার ব্যাপক প্রসার ঘটিয়ে তথাকথিত ধর্মভিত্তিক শিক্ষার নামে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বীজ বুনে দেয়। মসজিদগুলো একইভাবে ব্যবহৃত হয়। শুধু তাই নয়, বেসিক ডেমোক্রেসি নামক এক অদ্ভুত শাসনব্যবস্থা চালু করে দেশের ইউনিয়ন ও তৃণমূলপর্যায়ে দালাল সৃষ্টি করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী।


প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থান নেয়া কর্তাব্যক্তিসহ রাষ্ট্রের অনুগ্রহপ্রার্থী শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীর মধ্যেও এই দালাল সৃষ্টির কাজটি পাকাপোক্ত করা হয়। সেই থেকে দেশে ধর্ম, ঘৃণা ও হিংসার নীতিতে বিশ্বাসী এমন একটি স্রোতধারা তৈরি হয় যা প্রথম থেকে বাঙালির ঐতিহ্য, আদর্শ, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং অভিন্নতাকে অস্বীকার করে আসছে। এ নষ্ট কাজে তাদেরকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করে এ দেশে অনুপ্রবেশকারী অবাঙালি, বিহারী, উগ্র সা¤প্রদায়িকগোষ্ঠী, দেশীয় জোতদার এবং মৌলবাদী স¤প্রদায়। তারা প্রথম থেকে ধর্মগত ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা, ঔদ্ধত্য, সংঘাত ও নৃশংসতাকে ইসলামী জেহাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে প্রচার করে আসছে। তারা সাধারণ জনগণের অশিক্ষা, কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার সুযোগ নিয়ে জাতির আকাক্সক্ষা ও চেতনাকে আরব জাতীয়তাবাদের সাথে একীভূত করার চেষ্টা করে।


মূলত: এই গোষ্ঠী পাকিস্তানি শাসক এবং তাদের সামরিক গোয়েন্দাদের পরামর্শে, তাদের রাষ্ট্রীয় ও ভৌগলিক স্বার্থে এই অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখার কৌশল অব্যাহত রেখে আসছে। কতিপয় আরব রাষ্ট্রসহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এ ব্যাপারে সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করে আসছে প্রথম থেকে। পাকিস্তান এবং তার প্রভুদের এই নষ্টদর্শন ও কুটপরিকল্পনাকে ভেঙে চুরমার করে এদেশের মানুষ সেই ৪৮ থকে ভাষা ও কৃষ্টির দাবীতে ঐক্যবদ্ধ হয়। এক পর্যায়ে বায়ান্নতে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এই জাতি। এটাই শেষ নয়, এরপরও দেশের সাধারণ মানুষ বিভেদ ও অনৈক্যের দেয়াল ভেঙে বার বার অধিকার ও সাম্যের দাবীতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।


অতীতে বার বার যখন এ দেশে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ভেঙে দিচ্ছিল সেই ক্রান্তিকালে দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে তৈরি করে যুক্তফ্রন্ট। যুক্তফ্রন্টের বিজয়কে নস্যাৎ করে পাকিস্তানে জারী হল সামরিক শাসন। যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ঠেলে এল ইস্কান্দার মির্জা, তাঁকে হটিয়ে এল আইয়ুব খান। এই আইয়ুব খান বাঙালি জাতিকে কতটা নিকৃষ্ট ও নীচু মনে করত তা প্রকাশিত হয়েছে তার আত্মজীবনীতে। সে মনে করত- (Bengalees are lower class race, unfit to enjoy any kind of freedom, Pakistanis had every right to rule over the defeated nation- Bengalees, that was his point of view.Ó (Massacre; Robert Payne, page 30)


এটি আইয়ুব খানের একক মনোভাব ছিল না। পাকিস্তানের অধিকাংশ সামরিক বেসামরিক কর্তাব্যক্তি তথা শাসক শ্রেণীর মনোভাব এটাই ছিল। এই ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাজনীতিকে তোষণ ও সমর্থন করেছে- পাকিস্তান সমর্থক একটি মৌলবাদীগোষ্ঠী। এ প্রেক্ষিতে সমগ্র জাতিকে মিথ্যা পরিচয়ের আবরণ পরাতে চেয়েছে এই সব গণশত্রু। এখানেই শেষ নয়, এই সব মৌলবাদী শক্তি সমাজের দালাল, ফরিয়াসহ খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে যে ধর্মান্ধগোষ্ঠী সৃষ্টি করে সেটাই সমাজের মধ্যে একটি সংঘাত ও বিভক্তি সৃষ্টি করে। তারপরও গণমানুষের প্রাণের দাবীগুলোকে নিজের দাবী মনে করে ঐক্যবদ্ধ হয় সংখাগরিষ্ঠ জনগণ। এই ঐক্য ও সামগ্রিক আকাংখার প্রেক্ষাপটে বিস্ফোরিত হয় ঊনসত্তর এর ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক ও জনতার আন্দোলন।


এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নিশ্চিত হয় আইয়ুবের পতন। তারপরও মানুষের আন্দোলন ও আকাক্সক্ষা থেমে থাকেনি। স্বাধিকার ও স্বাধীনতার যে আকাংখা জনগণের হৃদয়ে প্রচ্ছন্ন ছিল তা প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এই আকাংখা ও স্বপ্নকে নস্যাৎ করার জন্য ইয়াহিয়া সরকার নির্বাচনের ফাঁদ পাতে, কিন্তু সেই ফাঁদ ছিঁড়ে বিজয় ছিনিয়ে আনে বঙ্গবন্ধু। যে জাতিকে তিনি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সেই জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পরে তাঁর পিছনে। গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবীর মধ্য দিয়ে যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল তা ‘৭১ এর ৭ই মার্চ, জনসমুদ্রের মহা মোহনায় একটি দাবীতে পরিণত হয়। জাতিগত বিদ্বেষ, দমন, পীড়ন এবং অত্যাচারের এটাই ছিল স্বাভাবিক পরিনতি।


যে কারণে পাকিস্তান ভেঙে যায় তা হল-


* ধর্মীয় আদর্শের উপর ভিত্তি করে এক হাজার মাইল দূরের একটি দেশের উপর অধিকার গ্রহণ।

* নতুন দেশটিকে উপনিবেশ হিসাবে ব্যবহার। শুরু থেকে ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিস্তার।
* বাংলাদেশের সম্পদ ও ব্যবসা বাণিজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে দেশের সামরিক বেসামরিক উচ্চপদগুলো কুক্ষিগতকরণ।
* সম্পদ ও সামগ্রিক আয়ের সিংহভাগ লুন্ঠন এবং তা পাকিস্তানে বিনিয়োগ।
* দেশের মৌলিক উন্নয়নে অনীহা।
* দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির উপর আঘাত।
* শিক্ষা সংকোচননীতিসহ সাংস্কৃতিক আগ্রাসণ।
* সামগ্রিকভাবে পুরো জাতির প্রতি অবহেলা ও বিদ্বেষ পোষণ।
* বাঙালি মুসলমানদেরকে ইতর শ্রেণী মনে করে ঘৃণা পোষণ।
* হিন্দুদেরকে ধর্মীয় কারণে ঘৃণ্য মনে করে তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ।
* হিন্দুসহ ভিন্ন মতাবলম্বীদের উপর বিরামহীন অত্যাচার এবং তাদের উৎখাতকরণ।
* সামগ্রিকভাবে দেশের গণতান্ত্রিক অধিকারহরণ এবং ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন।

এদিকে ইয়াহিয়া, পীরজাদা, মিটঠা, জানজুয়া, হামিদ-এরা সবাই মিলে আওয়ামী লীগ ও তার সমর্থকদের গুঁড়িয়ে দিতে একটি ব্যাপক গণহত্যার পরিকল্পনা করে। তাদের এই ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনার পিছনে জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ পাকিস্তানের কতিপয় রাজনৈতিক নেতা, শিল্পপতি, সামরিক বেসামরিক ও তথাকথিত এলিটরা কাজ করছিল। এ ব্যাপারে ’৭১-এর ফেব্রুয়ারিতে ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর মধ্যে সমঝোতাও হয়। এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে কিছুটা গোপনে সমরাস্ত্রসহ পাকিস্তানি সেনা সদস্যদেরকে প্রেরণ করা হয়। এর মধ্যে নিধনযজ্ঞে উৎসাহী এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমান্ডোও ছিল। গণহত্যা সংক্রান্ত প্রাথমিক পদক্ষেপ ‘অপারেশন সার্চলাইটে’র পরিকল্পনা একাত্তরের ফেব্র“য়ারি থেকেই অনেক পাকিস্তানি জেনারেলের মাথায় ছিল। তখন এ সংক্রান্ত কিছু চিঠি চালাচালিও হয়েছিল গোপনে। তবে চূড়ান্ত আঘাতের খসড়া পরিকল্পনাটি তৈরি করে জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ও জেনারেল রাও ফরমান আলী খান। তারা ঢাকা জিওসি’র অফিসে বসেই এটা প্রণয়ন করে। মূল অপারেশন পরিকল্পনাটি তৈরি করে জেনারেল ফরমান আলী খান। এই নরপশুর হাতেই তৈরি হয় পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম গণহত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনাটি।


এরপর জেনারেল খাদিম ও জেনারেল ফরমান আলী খান পূর্ব বাংলার বিভিন্ন ব্রিগেড কমান্ডার যেমন- যশোরের ব্রিগেডিয়ার দুররানী, কুমিল্লার ব্রিগেডিয়ার ইকবাল সফি, চট্টগ্রামের লে. কর্নেল ফাতিমী এবং সিলেট, রংপুর, রাজশাহীর ব্রিগেড কমান্ডারকে বিষয়টি অবহিত করে। ৫৭ ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার আরবাব ঢাকা শহর ও শহরতলী অপারেশনের দায়িত্ব গ্রহণ করে। আর মেজর জেনারেল খাদিম ঢাকার বাইরে পুরো বাংলাদেশের হত্যাযজ্ঞের দায়িত্ব পায়। ঐ সময় মেজর জেনারেল ইফতেখার জানজুয়া এবং জেনারেল মিট্ঠা গণহত্যা এবং সশস্ত্র বাঙালি দমনে সহায়তা দিতে বাংলাদেশেই ছিল। এরাও ঐ ঘৃণিত বর্বরোচিত কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে। অপারেশন সার্চলাইট নামক বাঙালি নিধনযজ্ঞ ও গণহত্যার যে পাকিস্তানি অভিযাত্রা নারকীয় কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে শুরু হয়, তাতে অংশগ্রহণ করেছিল ন’মাসে এখানে উপস্থিত প্রায় সকল পাকিস্তানি জেনারেল, ব্রিগেড কমান্ডার এবং উর্ধ্বতন অফিসাররা।


এই সব ঘটছিল পর্দার অন্তরালে। রাজনীতিবিদরা যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সৃষ্টি করে আলোচনার টেবিলে ন্যায্য সমাধান চাচ্ছিলেন এবং জনগণও যখন একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রত্যাশা করছিল তখন ভয়ংঙ্কর এক শঠতার আশ্রয় গ্রহণ করে পাকিস্তানি সামরিক শাসকচক্র। এটা কোন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল না। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তারা এদেশের রাজনীতিবিদ, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী এবং ছাত্র, কৃষকসহ যুব শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে সমগ্র জাতিকে পদানত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়।


’৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে নিরীহ, নিরপরাধ ঘুমন্ত জনগণের ওপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী শুরু করে তাদের অপারেশন সার্চলাইট। স্কুল, কলেজ, ছাত্রাবাস, শিক্ষকদের আবাসস্থলসহ ইপিআর, পুলিশ ও বাঙালি সৈনিকদের ওপর তারা চড়াও হয়। ট্যাংক ও কামানের গোলায় পাকিস্তানি বাহিনী ধ্বংস করে শিক্ষকদের আবাসস্থল, সাধারণ জনগণের ঘরবাড়ি ও বিস্তৃত জনপদ। হালকা ও ভারী মেশিনগানে ছিন্নভিন্ন করে অগুণতি বাঙালি, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও ছাত্র জনতাকে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, গণহত্যার প্রধান লক্ষ্য ছিল- * বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী * সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআর ও আনসারের বাঙালি অংশ * কথিত আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক কর্মী ও কল কারখানায় তাঁদের শ্রমজীবী সমর্থক * ব্যাপক হিন্দু সম্প্রদায় * যুব সম্প্রদায় * বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী * মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক গ্রামীণ জনগণ।


এই নির্বিচার গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ এবং সুতীব্র জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার মধ্য দিয়ে যে অপারেশন সার্চলাইটের সূচনা হয় ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ, তা অচিরেই সমগ্র দেশকে গ্রাস করে ফেলে। এই যুদ্ধ কোন সিভিল ওয়ার ছিল না, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা ও জাতিগত ধ্বংসযজ্ঞ। এ বর্বরতা, গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের তুলনা চলে শুধু ইহুদি ও রাশিয়ার যুদ্ধবন্দিদের প্রতি নাজি আচরণের সাথে।


বাংলাদেশের জনগণের উপর পাকিদের আগ্রাসন ও গণহত্যাযজ্ঞ কতটা পরিকল্পিত ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় ঐ সময়ে চট্টগ্রামের রেজিমেন্টাল সেক্টর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম. আর. মজুমদারের বক্তব্যে। তিনি গত ১৬ জুন ২০০৩ তারিখে ওয়ার ক্রাইম্স ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটিকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন যে, ৭০ এর ডিসেম্বরের শেষে বা ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে একটি চিঠি পেয়েছিলেন। ঐ চিঠিতে কর্তৃপক্ষ জানান যে, শেখ মুজিবের ছয় দফা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তান আর্মিতে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য ক্ষুন্ন হবে এবং তাদের সামরিক স্বার্থ ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হবে।


চিঠির শেষ অংশে লেখা ছিল- ‘Therefore the Army cannot allow Sheikh Mujib to become the Prime Minister of Pakistan ঐ চিঠিতে সম্ভবত Director Military Operations (DMO) অথবা Director Military Intelligence-এর স্বাক্ষর ছিল।


সেই চিঠিটার প্রসঙ্গ সিদ্দিক সালিকের বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। সিদ্দিক সালিক সেখানে বলেছেন যে, ঐ সময় একজন জেনারেল এখানে এসেছিল এবং সে গভর্নর হাউসে বলেছিল, “Don’t worry, we will not allow these black bustards to rule over us.”


পাকিস্তানি শ্বেতপত্রে উল্লেখিত বাঙালি বিহারী সংঘাতের বিষয়ে তিনি বলেন যে, মার্চের শুরুতে রেলওয়ে কলোনীতে একটি দাংগা হয়েছিল। ঐ দাঙ্গাটি পরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের কমান্ডো দ্বারা সৃষ্ট ছিল। ঐ দাঙ্গাঁয় রেলওয়ে কলোনি এলাকায় নিহতদের মধ্যে বাঙালির সংখ্যাই ছিল বেশি এবং তাদের ঘরবাড়িই বেশি পোড়ানো হয়েছিল। ঐ সময়ে রেলওয়ে কলোনিতে কর্মরত ক্যাপ্টেনটি ফাতেমির অধীনে একজন পাঞ্জাবি অফিসার ছিল।


১৯৭২ সনে ২৬ মার্চ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত “একটি জাতির জন্ম” শীর্ষক রচনায় প্রয়াত জেনারেল জিয়াউর রহমান উল্লেখ করেন- “ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বাংলাদেশে যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিস্ফোরন্মুখ হয়ে উঠছিল, তখন আমি একদিন খবর পেলাম তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটেলিয়ানের সৈনিক চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিহারীদের বাড়িতে বাস করতে শুরু করেছে। খবর নিয়ে আমি আরও জানলাম, কমান্ডোরা বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে বিহারী বাড়িগুলোতে জমা করেছে এবং রাতের অন্ধকারে বিপুল সংখ্যক তরুণ বিহারীদের সামরিক ট্রেনিং দিচ্ছে।


“ঐ সময়ে আমার ব্যাটেলিয়ানের নিরাপত্তা এনসিওরা আমাকে জানালো প্রতিদিন সন্ধ্যায় ২০ বালুচ রেজিমেন্টের জওয়ানরা বেসামরিক পোষাক পরে বেসামরিক ট্রাকে কোথায় যেন যায়। তারা ফিরে আসে আবার শেষ রাতের দিকে। আমি উৎসুক হলাম। লোক লাগালাম খবর নিতে। খবর নিয়ে জানলাম, প্রতিরাতেই তারা কতগুলি বাঙালি পাড়ায় যায়। সেখানে তারা বেছে বেছে বাঙালিদের হত্যা করেছে। এই সময় প্রতিদিনই ছুরিকাহত বাঙালিকে হাসপাতালে ভর্তি হতে শোনা যায়।” প্রকৃতপক্ষে বহু আগে থেকেই বিহারীদেরকে বাঙালিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। ’৬৯-এও এটা হয়েছিল। এ কারণে ’৭০-এর নির্বাচনের পরে অনেক স্থানে তারা দাঙ্গা বাধিয়েছে এবং আগ বাড়িয়ে আক্রমণ করেছে। ২৩ মার্চ ’৭১-এ এরা মিরপুরে এবং ২৪ মার্চ সৈয়দপুরে আক্রমণ চালায়।


জেনারেল টিক্কা ও তার সহকর্মীদের এই বীভৎস গণহত্যাযজ্ঞে শুধুমাত্র ২৫ মার্চের মধ্যরাতেই ঢাকা নগরীতে ঘুমন্ত ও হঠাৎ ঘুমভাঙা প্রায় সাত হাজার নিরীহ বাঙালি নিহত হন। ২৭ মার্চ দুপুর পর্যন্ত মাত্র আড়াই দিনেই নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় তেরো হাজার। ২৫ মার্চ থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা জেলায় নিহতদের সংখ্যা ত্রিশ হাজার পেরিয়ে যায় এবং যুদ্ধের ন’মাসে এই গণহত্যা কখনও থেমে থাকেনি।


এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের ন’মাসে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবীসহ দেশের সেরা সব বুদ্ধিজীবীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে পাকিস্তানি আর্মি।


ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ শত শত বুদ্ধিজীবী হত্যায় যারা ঘৃণ্য ভূমিকা রাখে তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি অফিসার জেনারেল টিক্কা খান, জেনারেল গুল হাসান, জেনারেল নজর হোসেন শাহ, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, লে. জেনারেল ইয়াকুব মালিক, ব্রিগেডিয়ার আবদুল আলী মালিক, ব্রিগেডিয়ার রাজা, ব্রিগেডিয়ার আসলাম, ব্রিগেডিয়ার বশির, ব্রিগেডিয়ার শরীফ, ব্রিগেডিয়ার শফি, ব্রিগেডিয়ার আব্দুল কাদির, ব্রিগেডিয়ার ইফতেখার রানা, ব্রিগেডিয়ার সাদউল্লাহ খান, কর্নেল তাজ, কর্নেল তাহের, কর্নেল বোখারী, লে. কর্নেল নাঈম, মেজর ইফতেখার আহমেদ, ক্যাপ্টেন নুরুউদ্দিন খান, ক্যাপ্টেন আজমল খান, ক্যাপ্টেন ইলিয়াস, ক্যাপ্টেন তারেক, ভিসি সাজ্জাদ হোসাইন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মতিউর রহমান, ভূগোলের সিদ্দিক প্যাটেল, রাজশাহীর শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আইনুদ্দিন, জয়পুরহাটের আব্দুল আলিম, এবিএম খালেক মজুমদার, ডা. মোহর আলী, আশরাফুজ্জামান, চৌধুরী মাঈনুদ্দীন, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, ইসলামী ছাত্রসংঘের ইমরান, ডা. এহসান, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, জলিল ও শেলী। এদের নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করে জেনারেল জাহানজেব আরবাব।


ঘর থেকে ডেকে নিয়ে শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যার বিষয়টি Crimes Against Humanity of Murder এবং তাঁদের সামগ্রিক আচরণ Crimes Against Humanity of Inhumane Acts and Degradation-এর আওতায় পড়ে। এরপরে রয়েছে অসংখ্য মানুষের গুম ও Enforced Disappearance হবার তথ্য।


একাত্তরে বাঙালি জাতিকে ঝাড়ে-মূলে চিরতরে নির্মূলের লক্ষ্যে উর্ধ্বতন পাকিস্তানি সমরনায়করা এবং তাদের অধস্তন সেনারা মানবতাবিরোধী যে অপরাধগুলো করে তা হল -


* ২৫ মার্চ থেকে শুরু করে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা শহরসহ দেশের সর্বত্র নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ, লুট ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা সাধন।

* সামরিক পদক্ষেপ শুরুর পর গ্রামাঞ্চলগুলোতে তথাকথিত দু®কৃতকারী দমনের নামে নির্বিচার হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও সাধারণের সম্পত্তি ধ্বংস সাধন;
* শুধু সামরিক অভিযানের প্রথম দিকেই নয়, একাত্তরের ডিসেম্বরে যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, প্রকৌশলী প্রভৃতি পেশাজীবীদেরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা;
* ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার ও সৈন্যদের এবং ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নিরস্ত্র করার সময় বা বিদ্রোহ দমনের অজুহাতে তাঁদেরকে শঠতামূলকভাবে হত্যা করা এবং তাঁদেরকে ঋধরৎ ঞৎরধষ এর সুযোগ না দেয়া;
* পাকিস্তানি আর্মি অফিসার ও সৈন্যদের দ্বারা প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য এবং জাতির অহংকারকে ধ্বংস করবার জন্য সাড়ে চার লাখের বেশি বাঙালি নারীকে নির্যাতন ও ধর্ষণ এবং বহুসংখ্যক নারীকে হত্যা করা;
* যুদ্ধ চলাকালীন ও যুদ্ধ শেষে অন্তত সাড়ে সাতশ’ বাঙালি নারীকে ভোগের জন্য বন্দী করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া এবং বেশ্যালয়ে আটকে রাখা;
* নির্দোষ বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানকে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা এবং ব্যাপক গণহত্যা;
* অনেক নিরপরাধ নারী পুরুষকে আইন বহির্ভূতভাবে বন্দী করে নির্যাতন ও গুম করে ফেলা;
* সংখ্যালঘু হিন্দুদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা, নির্যাতন, জাতিগত নিধন ও শুদ্ধি অভিযান।

উল্লিখিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও নারী নির্যাতন সংঘটনের দায়িত্ব একাত্তরে বাংলাদেশে যুদ্ধরত পাকিস্তানি সেনারা কিছুতেই অস্বীকার করতে পারে না। এ প্রেক্ষাপটে হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট ছাড়াও পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নালে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল তাজাম্মাল হোসেন মালিক-এর বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। তার দেয়া সাক্ষৎকারে পাকিস্তানি বাহিনীর অপরাধের প্রমাণ মেলে। তিনি বলেন-

“I took over the command of 205 Brigade on 17th of November 1971 and about 4 days later the Indians had started the attack on our position. During the period of my command, on one occasion, it was reported to me that one of my units 8 Baluch had captured about 8 civilians. The brigade headquarter was informed for their disposal. I was told that as a routine all such persons who were captured were to be shot without any investigation. I passed orders that in future no such shooting would take place unless I had seen them myself. When I visited the unit, they produced them before me. As I was meeting them, one of them fainted. The CO of that unit said, he is malingering. On further inquiry I found out that they were not in fact ‘muktis’ but were the local people working in the fields, grazing cattle. I ordered that they be released. I learnt through many other officers that during the earlier operations against the Mukti Bahinis thousands of innocent people were killed. In one of my defensive position at Santahar, large numbers of people were massacred. General Tikka Khan & Lieutenant General Jahanzeb Arbab had earned their reputation of being Butchers of East Pakistan. So were many other Brigadiers and Generals. Mukti Bahinis too, may also have done so in retaliation but it was very negligible as compared to the atrocities committed by the West Pakistani troops against the East Pakistanis.”
Maj Gen (Retd) Tajammal Hussain Malik
Remembering Our Warriors; Defence Journal – August 2001

একাত্তরের গণহত্যাযজ্ঞ যে কতটা ব্যাপক, ভয়ঙ্কর ও পরিকল্পিত ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যাবে পাকিবাহিনীর অসংখ্য গণহত্যা স্পটের কয়েকটি চিত্র দেখলেই।


বাড়িয়া গণহত্যায় একই দিনে পাকি আর্মি হত্যা করে দুশ’জন নিরীহ গ্রামবাসীকে যাঁদের মধ্যে পঁয়তাল্লিশজন ছিলেন নারী। একইভাবে তারা ছাব্বিশাতে সাতজন নারীসহ চল্লিশজন, গোলাহাটে একশ’ জন নারীসহ চারশ’ তেরজন, বানিয়াচং থানার জিলুয়া-মাকালকান্দিতে ছাব্বিশজন নারীসহ একশ’জন, কড়াইকাদিপুরে ষাটজন নারীসহ তিনশ’ একষট্টিজন, হাতিয়া-দাগারকুঠিতে চল্লিশজন নারীসহ তিনশ’জন, সিলেটের বুরুঙ্গাতে হিন্দু স¤প্রদায়ের একশ’জন, শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগানে পঞ্চাশজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। এছাড়া খুলনার চুকনগর, বরিশালের আগৈলঝাড়া, মাদারিপুরের হাওলাদার জুট মিল, বরগুনা জেলখানা, জয়পুরহাটের পাগলা দেওয়ানসহ দেশব্যাপী অসংখ্য গণহত্যা স্পটের বিবরণ ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সন্নিবেশিত হয়েছে ‘যুদ্ধাপরাধ গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ’ এবং ‘যুদ্ধ ও নারী ’গ্রন্থে।


১৯৭১ সনে কিশোরগঞ্জের বরইতলা গণহত্যার নৃশংসতার কোন তুলনা খুঁজে পাওয়া যাবে না বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে। বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের নির্মম শিকারে পরিণত হন ৩৬৬ জন গ্রামবাসী, মারাত্মক আহত হন আরও ১৩৪ জন।


এক সকালে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর সহযোগী দালালরা প্রায় পনেরো’শ পুরুষকে বরইতলা গ্রামের রেল লাইনের পাশে জড়ো করে মিটিংয়ের নাম করে। তারপর এই লোকদের প্রায় অর্ধেককে উপস্থিত দালালরা আত্মীয়, বন্ধু, পরিচিত ইত্যাদি বলে পাকিস্তানি আর্মির কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

অবশিষ্ট লোকদের একজনের বাহু অন্যের সঙ্গে বেঁধে রেল লাইনের ওপর বসিয়ে দেয়া হয় এবং ত্রিশ কেজি ওজনের বিশেষ ধরনের শাবলের আঘাতে একে একে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলা হয় প্রত্যেকের মাথা। এরপর মৃতদের ওপর ব্রাশ ফায়ার করা হয়। এত কিছুর পরও যাঁদের দেহ একটু আধটু নড়াচড়া করছিল তাঁদের ওপর বেয়নেট চার্জ করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী ও তার দোসররা সবচেয়ে বর্বরোচিত এবং নৃশংস গণহত্যা চালায় সৈয়দপুর শহরের কাছে গোলাহাটে।


১৩ জুন পাকিস্তানি আর্মি সৈয়দপুরের ১৫০ জন লোককে ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাঁদেরকে ভারতে পৌঁছে দেয়ার নাম করে স্থানীয় রেলওয়ে স্টেশনে নেয়া হয়। কৌশলে বন্দিদের পরিবারের বাকি সদস্যদেরকেও স্টেশনে আনা হয়। এই ফাঁকে চালানো হয় নির্বিচার লুটপাট।


ট্রেনের চারটি বগির পেছনের দুটোতে উঠানো হয় নারী ও শিশুদের এবং বাকি দুটোতে পুরুষদের। দু’কিলোমিটার যাবার পর রেলওয়ে ওয়ার্কশপের একটি কালভার্টে এসে ট্রেনটি থেমে যায়। তারপরই শুরু হয় বীভৎস হত্যাযজ্ঞ। একজন একজন করে নামানো হয় আর খোলা তলোয়ারের কোপে দু’খণ্ড করে ফেলা হয় তাঁদের দেহ। জানালা ভেঙে যাঁরা পালাতে চেষ্টা করেছিলেন তাঁদেরকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করা হয়। গোলাহাটে পাকিস্তানিদের এই হত্যাকাণ্ড থেকে সেদিন তেইশজন পুরুষ পালাতে সক্ষম হলেও নারী ও শিশুদের কেউ পালাতে পারেনি। উপর্যুপরি ধর্ষণ শেষে নারীদেরকে হত্যা করা হয়। ঐদিন গোলাহাটে পাকিবাহিনী ৪১৩ জনকে হত্যা করে।


ক্যাম্পে আটক নিরীহ নারীদের ওপর পাকি সেনাদের বর্বরতার বিবরণ পাওয়া যায় ঝিনাইদহের নাজিয়া খাতুনের জবানবন্দি থেকে। যুদ্ধের শুরুতে পাকিবাহিনীর আক্রমণ থেকে জীবন বাঁচাতে পরিবার নিয়ে পালিয়ে যাবার সময় ধরা পড়েন নাজিয়া খাতুন। শৈলক‚পার রাণীনগরের কাছে পাকিদের এক ক্যাম্পে তিনি বন্দী হন। দুর্বিষহ এবং ভয়ঙ্কর ছিল সেই বন্দী জীবন। আলোবাতাসহীন ছোট একটা কক্ষের মধ্যে আরও মেয়েদের সঙ্গে তাঁকে থাকতে হত। কিল, ঘুষি, লাথি এসব ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার। এর পাশাপাশি চলত পাকিদের উন্মুক্ত পাশবিক নির্যাতন। এই দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে নাজিয়াসহ অনেকেই আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু গলায় দেবার দড়ি তো দূরে থাক, কাপড়টুকু পর্যন্ত তিনি পাননি। পাকিরা তাঁদেরকে কাপড় পরতে দিত না। এভাবে নির্যাতনের এক পর্যায়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন।


পাকিদের বীভৎস পাশবিক লালসা থেকে ন’বছরের শিশু সন্ধ্যাও রেহাই পায়নি। একাত্তরের জুন মাসে ঝালকাঠির কুড়িয়ানা আক্রমণ করে পাকিরা। সন্ধ্যা, তার মা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে ছুটে পালাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁরা সবাই ধরা পড়ে আটক হন কুড়িয়ানা স্কুলে পাকিদের ক্যাম্পে। তাঁরা চারদিন ঐ ক্যাম্পে আটক ছিলেন। কিন্তু পাকিদের নির্মম নির্যাতন থেকে কেউই রক্ষা পাননি। ঐ জানোয়াররা শিশু সন্ধ্যার ওপর এমন বীভৎস নির্যাতন চালিয়েছিল যে, কষ্ট, যন্ত্রণা আর বিরামহীন রক্তপাতে সে নির্জীব ও ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। এর ক’দিন পরে সে মারা যায়।


একাত্তরে বরগুনা জেলখানায় পাকি সেনাদের নির্যাতনে পিষ্ট এক নারী মালতি রাণী রায়। সেসময় তিনি সপ্তম শ্রেণীতে পড়তেন। তিনি জানান, বর্বর পাকিরা কারাগারের অভ্যন্তরে আটক সকল মহিলাকে পালাক্রমে বীভৎসভাবে ধর্ষণ করেছে। প্রতিরাতে আটক মহিলাদের মধ্য থেকে বেছে বেছে কয়েকজনকে বের করে পাকিদের প্রমোদ কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত পার্শ্ববর্তী ডাকবাংলোতে নিয়ে যেত। সারারাত ধর্ষণ নির্যাতন শেষে পরদিন সকালে তাঁদেরকে জেলখানাতে ফিরিয়ে নিয়ে আসত। মালতি রাণী যেদিন পাকিদের হাতে ধরা পড়েন ঐদিনই মধ্যরাতে তারা তাঁকেসহ চারজন মহিলাকে পার্শ্ববর্তী ডাকবাংলোতে নিয়ে যায়। সেখানে চারজন পাকি আর্মি তাঁদের চারজনের ওপর সারারাত পাশবিক নির্যাতন চালায়। পাকিরা ধর্ষণের আগে তাঁদেরকে ভয় দেখিয়েছে, বুকের ওপর বন্দুক তাক করে ধরেছে। মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করা ছাড়া তাঁদের আর কিছুই করার ছিল না। এই চারজনের একজন ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। নির্যাতনের তিন চারদিন পরে তাঁর গর্ভপাত হয়ে যায়। এ নির্যাতনের নেতৃত্ব দেয় মেজর নাদের পারভেজ।


যুদ্ধের ন’মাস পাকিরা যে কতভাবে আমাদের নারীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে তা ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ না করলে বোঝা যাবে না। শহর ও গ্রামের যুবতী নারীদেরকে এরা কখনও বন্দী করে নিয়ে গেছে নিজেদের ক্যাম্পে ও বাঙ্কারে। দিনের পর দিন, সেখানে তাঁদেরকে আটকে রেখে যৌন নির্যাতন করেছে। তাদের ঘাঁটি ও ক্যাম্পের আশপাশের অনেককে বাধ্য করেছে দিনের পর দিন তাদের কাছে হাজিরা দিতে। কখনও স্বামীহারা মেয়েদেরকে তারা নির্দেশ দিয়েছে নিজ ঘরে থাকবার জন্য, পাহারার ব্যবস্থা করেছে যাতে তারা পালিয়ে যেতে না পারে অন্য কোথাও। এরপর এসব মেয়েদের কাউকে কাউকে পাকি সেনা সদস্যরা যৌনকর্মীর মতো ব্যবহার করেছে, ইচ্ছে মতো তাঁদেরকে এক স্থান থেকে আর এক স্থানে নিয়ে গেছে, ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরিয়েছে। ক্যাম্পের পরিবর্তন হলে তাঁদেরকে নিয়ে গেছে পরবর্তী গন্তব্যে।


৭১-এ সংঘটিত নিষ্ঠুর গণহত্যা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধকর্মে সর্বতোভাবে সহায়তা করেছে এ দেশীয় রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, শান্তি কমিটির সদস্যসহ তাদের সকল সহযোগী বাহিনীর (Auxiliary force) সদস্যবৃন্দ। রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ছাড়া অন্যান্য যারা এই Auxiliary বাহিনীর সদস্য ছিল তারা হ’ল ইপিসিএএফ, রেঞ্জার্স, স্কাউটস এবং পশ্চিম পাকিস্তান পুলিশ বাহিনীর সদস্য। ২৫ শে মার্চ রাতে নরমেদযজ্ঞ শুরু হওয়ার সাথে সাথে বাঙালি জাতির শত্র“-মিত্র সুচিহ্নিত হয়ে পড়ে। ৬ই এপ্রিল ’৭১-এর গণহত্যার খলনায়ক, ঢাকায় খ-অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তার সাথে দেখা করে পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী, পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামের সভাপতি গোলাম আযম, জমিয়াতে ওলামায়ে ইসলামের পূর্ব পাকিস্তানের শাখা সভাপতি পীর মোহসিন উদ্দীন আহমেদ, জনৈক এডভোকেট এ. টি. সাদীসহ আরও আটজন (সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম, ৭ই এপ্রিল ১৯৭১)। এরাই প্রথমে গণহত্যার সমর্থক হিসাবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করে।


এরপর ১০ই এপ্রিল ’৭১-এ পূর্ব পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি খাজা খয়ের উদ্দীনকে শান্তি কমিটি নামক এমন একটি কমিটির আহŸায়ক নির্বাচন করা হয় যার কাজ ছিল গণহত্যার কুশীলবদের পক্ষে কাজ করা এবং তাদের হাত শক্তিশালী করা।


এই কমিটি ১৩ই এপ্রিল, ’৭১-এ ঢাকা শহরে সামরিক জান্তার পক্ষে একটি মিছিল করে। এই মিছিলে যারা নেতৃত্ব দেয় তারা হল- পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলাম প্রধান অধ্যাপক গোলাম আযম, কাউন্সিল মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি জনাব এ কিউ এম শফিকুল ইসলাম, সাবেক জাতীয় পরিষদ সদস্য খান এ সবুর, পিডিপি’র সহ-সভাপতি মৌলভী ফরিদ আহমদ ও জনাব মাহমুদ আলী, কৃষক শ্রমিক পার্টির প্রধান জনাব এ.এস.এম সোলায়মান, জনাব আব্দুল জব্বার খদ্দর, ইসলামী সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি মওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ মাসুম, পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম প্রধান পীর মোহসেন উদ্দিন, জনাব আবুল কাসেম, সৈয়দ আজিজুল হক, ইউসুফ আলী চৌধুরী, ইসলামী ছাত্রসংঘ প্রধান জনাব মতিউর রহমান নিজামী, এডভোকেট এ. টি সাদী, কবি বেনজীর আহমদ এবং মেজর আফসার উদ্দীন।


এই শান্তি কমিটির সদস্যরা ১৬ এপ্রিল নুরুল আমিনের নেতৃত্বে টিক্কা খানের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং পাকিস্তান বাহিনীর সাথে সার্বিক সহযোগিতা নিশ্চিত করে। ১৯৭১-এর ২২ আগস্ট তারিখে পাকিস্তান সরকার ‘রাজাকার’ নামক একটি বাহিনী গঠন সম্পর্কিত অর্ডিন্যান্স জারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।


পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স, মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্স, পাকিস্তান: রাওয়ালপিন্ডি, ৭ই সেপ্টেম্বর, ১৯৭১, পাকিস্তান সরকার, নং ৪/৮/৫২/৫৪৩ পি এস-১/ক/৩৬৫৯/ডি-২ক।

১৯৫২ সালের পাকিস্তান আর্মি এ্যাক্ট (এ্যাক্ট নং ৩৯/১৯৫২) এর ৫ নং ধারার (১ এবং ৩ উপধারা) প্রদত্ত ক্ষমতাবলে কেন্দ্রীয় সরকার সন্তুষ্টির সঙ্গে নির্দেশ প্রদান করিতেছি যে,
(ক) উক্ত আইনে সমস্ত ধারাসমূহ, যতদূর সম্ভব, পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অধ্যাদেশ ১৯৭১ (পূর্ব পাকিস্তান অধ্যাদেশ নং ১০/১৯৭১) এর অধীনে সংগঠিত রাজাকারদের প্রতি প্রযোজ্য।
(খ) পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অফিসার যাহার অধীনে কোন রাজাকারকে ন্যস্ত করা হইবে, তাহার সম্পর্কে তিনি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে ন্যস্ত সদস্যদের প্রতি যে ক্ষমতা প্রয়োগ করিবার অধিকারী তদ্রƒপ ক্ষমতা প্রয়োগ করিবেন।

প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে একজন পরিচালকের অধীনে রাজাকাররা পরিচালিত হয়। রাজাকার অর্ডিন্যান্স বলে আনসারের সকল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি, তহবিল, দায়, রেকর্ডপত্র রাজাকার বাহিনীর হাতে হস্তান্তর করা হয়। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী ও সিভিল আর্মড ফোর্স সদর দপ্তর পরিচালিত এই বাহিনী থানা ও ইউনিয়ন ভিত্তিক ছিল। (সূত্র দৈনিক সংগ্রাম ২৩ আগস্ট, ১৯৭১)। এতে শান্তি কমিটি নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবীসহ জামাত নিয়ন্ত্রিত বদর বাহিনী অন্তর্ভূক্ত হয়।


এরপরও ৭১-এর শত্রু-মিত্র নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে না। যারা ৭১-এর যুদ্ধকে সিভিল ওয়ার বলে প্রচারণা করছে তারা পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের গোয়েন্দা প্রণীত শ্বেতপত্রের কথাই বলছে। এই ধিকৃত গণশত্রু তখনও পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছে, এখনও পাকিস্তানের পক্ষেই কাজ করছে।


এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধকে পাকিস্তানি বাহিনী অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং সশস্ত্র দুষ্কৃতিকারীর বিরুদ্ধে দেশরক্ষা বাহিনীর শক্তি প্রয়োগ হিসেবে দেখাতে চেয়েছিল। বাস্তবে ঘটনাটি যে ভিন্ন ছিল তা দিবালোকের মতো পরিষ্কার। ১৯৭১ সনের ২৫ মার্চ রাতে যুদ্ধ ও আক্রমণটা শুরু করে পাকিস্তান। এ যুদ্ধ তারা শুরু করে এদেশের জনগণের বিরুদ্ধে। এ কারণে অপরাধ তাদের পক্ষ থেকেই হয়েছে। ব্যপক হত্যা, নির্যাতন, ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যার পর এদেশ মুক্ত হয়; বিজয়ী হয় বাংলাদেশ। তাই বিচারের কাঠগড়াটি তৈরির অধিকার বাংলাদেশেরই হয়। এ ধরণের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বলে- IHL is applicable in times of armed conflict, whether international or non-international. International conflicts are wars involving two or more states, and wars of liberation, regardless of whether a declaration of war has been made or whether the parties involved recognize that there is a state of war. Non-international armed conflicts are those in which government forces are fighting against armed insurgents, or rebel groups are fighting among themselves. Because IHL deals with an exceptional situation– armed conflict– no derogations whatsoever from its provisions are permitted. In principle, IHRL applies at all times, i.e. both in peacetime and in situations of armed conflict. .... Certain human rights are never derogated. Among them are the right to life, prohibition of torture or cruel, inhuman or degrading treatment or punishment, prohibition of slavery and servitude and the prohibition of retroactive criminal laws. এ অবস্থাতেই একাত্তরের যুদ্ধকে একটি অভ্যন্তরীণ সংঘাত হিসেবে অভিহিত করে বিশাল গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের কলঙ্কজনক অধ্যায়কে ইতিহাসের কৃষ্ণগহŸরে নিমজ্জিত করা কোন ভাবেই সম্ভব নয়।


১৯৪৮ সনের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজ্যুলেশন ২৬০ (৩) এ-র অধীনে গণহত্যাকে এমন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় যা বিশ্বময় প্রতিরোধে সকল রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। এই গণহত্যা বলতে বুঝায় এমন কর্মকাণ্ড যার মাধ্যমে একটি জাতি, ধর্মীয় স¤প্রদায় বা নৃতাত্তি¡কগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে বা হচ্ছে।

সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যা কেবল হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২৬০ (৩) এ-র অনুচ্ছেদ-২ এর অধীনে যে কর্মকাণ্ডকে আইনগতভাবে গণহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয় তা হল -
(ক) পরিকল্পিতভাবে একটি জাতি বা গোষ্ঠীকে নির্মূল করার জন্য তাদের সদস্যদেরকে হত্যা বা নিশ্চিহ্নকরণ।
(খ) তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করবার জন্য শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতিসাধন।
(গ) পরিকল্পিতভাবে একটি জাতিকে ধ্বংসসাধনকল্পে এমন জীবননাশী অবস্থা সৃষ্টি করা যাতে তারা সম্পূর্ণ অথবা আংশিক নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
(ঘ) এমন কিছু ব্যবস্থা নেয়া যাতে একটি জাতি বা গোষ্ঠীর জীবন ধারণে শুধু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি নয়, সেই সাথে তাদের জন্ম প্রতিরোধ করে জীবনের চাকাকে থামিয়ে দেয়া হয়।
(ঙ) একটি জাতি বা গোষ্ঠীর শিশু সদস্যদেরকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে তাদের জন্মপরিচয় ও জাতিগত পরিচয়কে মুছে ফেলাকেও গণহত্যা বলা হয়।
ঐতিহাসিক কারণে এই গণহত্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায় যে দায়বদ্ধ, তার প্রমাণ পাওয়া যায় এটা প্রতিরোধকল্পে প্রণীত আইনগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
রেজ্যুলেশন ২৬০ (৩) এ-র অনুচ্ছেদ ৩ অনুযায়ী গণহত্যাসাধন শুধু শাস্তি—যোগ্য অপরাধ নয়; গণহত্যা পরিকল্পনার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ এ কাজে যারা উদ্বুদ্ধ করবে তারাও এই অপরাধের কারণে বিচারাধীন হবে। এই উদ্বুদ্ধকরণের ব্যাপারটি সরাসরি হোক, নিভৃতে হোক কিংবা জনসমক্ষে উত্তেজক বক্তব্যের মাধ্যমেই হোক তা সমভাবে গুরুতর অপরাধ। গণহত্যা সাধনে ব্যর্থ প্রয়াস বা এ জাতীয় প্রচেষ্টার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনুচ্ছেদ ৩ অনুযায়ী বিচারযোগ্য অপরাধী হবে।

এই গণহত্যা কর্মকাণ্ডে যে যেভাবেই সংশ্লিষ্ট হোক না কেন তার বিচার হবে। গণহত্যার সংগঠক হতে পারে দেশের সরকার প্রধান বা সেনা প্রধান বা তাদের অধস্তন কোন কর্মচারী। এ প্রেক্ষাপটে আমাদেরকে বুঝতে হবে ’৭১ এ বাংলাদেশে গণহত্যার ব্যাপারে কাকে দায়ী করতে পারি। আমরা যেমন দায়ী করতে পারি ইয়াহিয়া, টিক্কা, রাওফরমান আলী, জাহানজেব আরবাব প্রমুখ শীর্ষ পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের তেমনি তাদের অধস্তন সেনা অফিসার মেজর নাদের পারভেজ, শেরওয়ানি ও বোখারির মত ব্যক্তিকে। প্রধান উসকানিদাতা হিসেবে বিচার হতে পারে পাকিস্তানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর। এ ক্ষেত্রে যখন প্রশ্ন উঠবে বাংলাদেশে গণহত্যার ব্যাপারে আমরা আর কাদেরকে দায়ী করতে পারি তখন জোরের সাথেই জানিয়ে দিতে হবে যে, আমরা অবশ্যই সেই সমস্ত বেসামরিক ব্যক্তিবর্গকে বিচারাধীন করতে পারি যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ’৭১-এ গণহত্যা সাধনে সম্পৃক্ত হয়েছিল। এদের মধ্যে রয়েছে বিহারী, বিপুল সংখ্যক রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস এবং শান্তি কমিটির সদস্য।


গণহত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য প্রথম উদ্যোগটি নিতে হবে দেশের ভিতর থেকেই। এ ক্ষেত্রে আমাদের সংবিধানে ঘোষিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট-১৯ এর অধীনে বিচারের সুযোগ রয়েছে। এ বিচারকার্যে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে তাদেরকে অপরাধী হিসাবে সাব্যস্ত করার বিধান রয়েছে আন্তর্জাতিক আইনে। এই বিচারের উদ্যোগটি আসতে হবে দেশের মধ্য থেকেই। আর এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও জনগণের ইচ্ছা। আর এই শুরুটার জন্য প্রয়োজন গণহত্যাসংক্রান্ত গণসচেতনতা। এ কারণেই দেশের জনগণকে জানতে হবে গণহত্যার ইতিহাসকে।


জানতে হবে ও চিনতে হবে ’৭১ এর বধ্যভূমি ও গণহত্যা ষ্পটগুলোকে। ’৭১ এর বধ্যভূমির সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। এর অধিকাংশই বিস্মৃত বা নিশ্চিহ্ন প্রায়। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি কর্তৃক শনাক্তকৃত বধ্যভূমির সংখ্যা ৯২০টি। এ ছাড়া রয়েছে ৬৫টি ব্রিজ ও সেতু, ৮৮টি নদী যেখানে নিয়মিতভাবে বাঙালি নিধন চলেছে স্বাধীনতা যুদ্ধের ন’মাস ধরে। এ যুদ্ধে আঠারো লাখ মানুষের নিশ্চিহ্ন হবার সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এই সময় এক কোটিরও বেশি নির্যাতিত মানুষ ভীত হয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং প্রায় সাড়ে চার লাখ নারী পাকি বাহিনী ও তার দোসরগণ দ্বারা ধর্ষিত হয়। এ ছাড়া এমন অসংখ্য মানুষ চিরতরে গুম হয়ে গেছে যাদেরকে আমরা নিহতদের তালিকায় ফেলে দিয়েছি। আরও অনেক ধরণের নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে ঐ সময়ে। এসব অপরাধকর্মের স্থানগুলো চিহ্নিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তারপরও জানিয়ে রাখা প্রয়োজন যে, ৭১-এর নয় মাস পাকিস্তানি বাহিনী ও তার দোসরগণ এদেশের মাটিতে প্রায় ৫৩ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করে। মোটা দাগে তারা ১৭ ধরনের যুদ্ধাপরাধ, ১৩ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ৪ ধরনের গণহত্যাসংক্রান্ত অপরাধ ঘটায়। নারী, শিশু ও সাধারণ জনগণের উপর ঘটে যাওয়া ঐসব ঘৃণ্য অপরাধের একটিও জাতিসংঘ, মানবাধিকার হাইকমিশন বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো কর্তৃক সত্যিকার অর্থে বিশ্লেষিত হয়নি। গণহত্যার সংজ্ঞা সম্পর্কে বির্তক ও মতভেদ থাকতে পারে, তবে এটি প্রতিষ্ঠিত যে, ১৯৭১-এ এ দেশের মাটিতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডকে আমরা যে নামেই অভিহিত করি না কেন তার বিচার হতে হবে। ’৭১-এর নয় মাসে বাংলাদেশের মাটিতে সংঘটিত যাবতীয় অপরাধের জন্য আমরা দায়ী করতে পারি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ভুট্টোকে। দায়ী করতে পারি পাকিস্তানি সেবানাহিনীর অক্সিলারী ফোর্স রাজাকার, আলবদর, আলশামস, ইপিসিএফ ও রেঞ্জার্সসহ পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সের সকল সদস্য, তাদের দোসর, শান্তি কমিটির সদস্য এবং বিহারীদেরকে।


যুদ্ধাপরাধ এর বিচারের বিষয়ে আরেকটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, যুদ্ধাপরাধ আইন সেই সমস্ত অপরাধকে বিবেচনায় আনে যা কিনা যুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত হয়। এতে আক্রমণকারী ও তার সহায়ক শক্তি জেনেভা কনভেনশন ভঙ্গ করে, যুদ্ধ ও সংঘাতে প্রযোজ্য আইনের সীমা অতিক্রম করলে তা যুদ্ধাপরাধ বলে পরিগনিত হয়। উদাহরণস্বরূপ- উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যা বা বেসামরিক ব্যক্তিবর্গকে আক্রমণ করে যুদ্ধ সংগঠন বৈধ নয়।


শত্রুর দেহ খন্ডবিখন্ডকরণ, তাঁকে বন্দী করে নির্যাতন, নারী ধর্ষণ, সাধারণের সম্পত্তি লুটপাট, অগ্নিসংযোগ সবই অবৈধ। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতালসহ প্রতিরক্ষাবিহীন স্থান ও স্থাপনার উপর আঘাতও যুদ্ধাপরাধ। এমনকি লক্ষ্য বস্তুর বাইরে সীমাহীন আঘাতের মাধ্যমে ধ্বংস, হত্যা ও শারীরিক ক্ষতিসাধনও যুদ্ধাপরাধ (উদাহরণস্বরূপ; জগন্নাথ হল হত্যাকান্ড)। অন্যায়ভাবে আটকিয়ে অথবা পরিকল্পিতভাবে কষ্ট ও দুর্ভোগ সৃষ্টিও যুদ্ধাপরাধ। জেলে হত্যাসাধন ও নারী নির্যাতন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধগুলোর অন্যতম। এটা মানবতার বিরুদ্ধেও অপরাধ। এর উদাহরণ মেজর নাদের পারভেজ কর্তৃক বরগুনা জেল হত্যাকান্ড ও নারী নির্যাতন। ফরিদপুর জেলে নারী নির্যাতন আরেকটি যুদ্ধাপরাধের দৃষ্টান্ত। মানবতাবিরোধী অপরাধ আইনের পরিধি অনেক বিস্তৃত। সেখানে হত্যা, ধর্ষণ, গুম থেকে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিসাধন সব কিছুই অন্তর্ভুক্ত। ৭১-এ এদেশের মাটিতে এমন অসংখ্য অপরাধ হয়েছে।


এ প্রেক্ষাপটে ’৭১ এ গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্টদের বিচারের ব্যর্থতার বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা গিয়েছে যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বিষয়টি যথাযথ মনোযোগ পেতে ব্যর্থ হয়েছিল। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে কোন সরকারই পাকিস্তানি ও তাদের দোসরদের দ্বারা সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের গভীরতা, ব্যাপকতা প্রকৃতপক্ষে অনুধাবন করতে পারেনি। অপরাধী এবং অপরাধ চিহ্নিতকরণের অভাবে এবং সীমাহীন বিচারহীনতার প্রেক্ষাপটে, এ বিষয়টি জাতীয় চরিত্র ও সভ্যতা বিকাশে কতটা অন্তরায়, তা অনেকেই অনুমান করতে পারেননি। অনেকে আজও এগুলোকে পেছনের কথা, বিভেদের কথা, অনৈক্যের কথা বলে এড়িয়ে যেতে চান কিংবা সরাসরি বিচারের বিরোধিতা করেন। কিন্তু তাঁরা ভুলে যান আমাদের অতীতই বর্তমানকে তৈরি করেছে। পেছনের আমি সম্মুখের আমিকে ঠেলে দিচ্ছে নতুন অভিযাত্রায়। স্বাধীনতার পর মুজিব সরকারের পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়ে ওঠেনি।


পাকিস্তানে কারামুক্ত হয়ে দেশের মাটিতে নামার আগেই ৮ই জানুয়ারি লন্ডনের মাটিতে বঙ্গবন্ধু বলেন, “পাকিস্তান জঘন্য খেলায় মাতিয়াছিল। তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে যে গণহত্যা হইয়াছে তাহার বিচার হইবে।” সূত্র- ৮ই জানুয়ারি (বিএসএস পিটিআই) লন্ডন, দৈনিক ইত্তেফাক, ৯ জানুয়ারি, ৭২।


এই সময়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ৭১-এ গণহত্যা ও নারী নির্যাতন সংক্রান্ত তদন্ত চলতে থাকে এবং তৎকালীন পুলিশের ডিআইজি জনাব মঞ্জুরুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রাথমিক তদন্ত কাজ চলছিল। ’৭২-এর দৈনিক ইত্তেফাকে ৯ মে, সংখ্যার এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে- “একমাত্র ঢাকার বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে ৪২টি মামলা দায়ের হইয়াছে।”


১০ই মে এনা জানায়, “দেড় হাজার পাকিস্তানি সামরিক কর্মচারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ গঠিত হয়েছে।” এরমধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ কুয়ালালামপুরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানান যে, “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রকাশ্যে হবে।” “জনাব ভুট্টো যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দেবার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছেন। বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিতে রাজী নন” এটা তিনি জানান। সূত্র: বাসস, পিটি আই ৬ জুন ১৯৭২।


এরপরও বিচারের উদ্যোগ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অনুগত দোসর হিসাবে যারা হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগে সম্পৃক্ত হয়েছিল তাদের বিচারের উদ্যোগটি গ্রহণ করা হয় ১৯৭২-এর শুরুতে ২৪ শে জানুয়ারি তারিখে। ঐ তারিখে রাষ্ট্রপতির আদেশ ৮ এবং কলাবরেটরস অর্ডার জারী করে ক্রমান্বয়ে সাইত্রিশ হাজার চারশত একাত্তর জন দালালের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় এবং অধিকাংশকে বন্দী করা হয়। শুধু তাই নয় ১৯৭২ সালের ৪ঠা নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধানের ১২ ও ৩৮ অনুচ্ছেদ মোতাবেক ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা রহিত করা হয় এবং ৬৬ ও ১২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দালালদের ভোটাধিকার ও সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার বাতিল করা হয়। উল্লেখ্য, যাদেরকে দালাল আইনে বিচার করা হচ্ছিল তাদের কারও বিরুদ্ধেই যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগ তৈরি করা হয়নি। কেননা আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল ১৯৭৩ সালে।


বিচারহীনতার সূচনা হয় ঐ ১৯৭৩ সালে। যে সমস্ত কলাবরেটরদের বিরুদ্ধে শক্ত অভিযোগ তৈরি করা যাচ্ছিল না তাদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয় ১৯৭৩ সনের ৩০ নভেম্বর। এরপরও এগারো হাজার শীর্ষ অপরাধী সাধারণ ক্ষমার আওতার বাইরে ছিল। এরা হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ গুরুতর অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত ছিল।


১৯৭৫-এর জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় এসে ঘাতকের বিচাররোধে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন নস্যাৎ-এর লক্ষ্যে জাতির ললাটে পেরেক ঠুকে দিলেন।ঐ সময়ে যা যা করা হয় তা হল-

১৯৭৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর ’দালাল আইন‘ বাতিল করা হয়।- Ordinance No. 63 of 1975

* এর পরে ১৯৭৫ সালে ৩১শে ডিসেম্বর Second Proclamation Order No. 3 of 1975 প্রথম তফসিল থেকে বালাদেশ দালাল আইনের যে সেফগার্ড ছিল তা তুলে দেওয়া হয়।

* এরপর ১৯৭৬ সালে Second Proclamation Order No. 3 of 1976 জারি করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার লক্ষ্যে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাদি তুলে দেওয়া হয়।
* Second Proclamation(ঘোষণা) জারি করে সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদ তুলে দিয়ে দালালদের ভোটার হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়।
* Proclamation Order No. 1 of 1977 জারি করে সংসদে নির্বাচিত হওয়ার লক্ষ্যে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের কিছু অংশ তুলে দেওয়া হয়।
* ১৯৭৬ সালের ১৮ই জানুয়ারি নাগরিকত্ব ফেরত পাবার জন্য মন্ত্রণালয় হতে আবেদন করতে বলা হয়।
* Proclamation Order No. 1 of 1977 দ্বারা সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদ তুলে দেওয়া হয়।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অভাবে যা হয়েছে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল-


* বিচারের প্রতি আস্থাহীনতা।

* অপরাধ কর্মগুলোর বৈধতাকে পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দিয়ে সমাজে সীমাহীন অপরাধ ও সস্ত্রাসের বিস্তার।
* অপরাধীদের মনোজগতে নেতিবাচক পরিবর্তন।
* Arrogance of power বা সহিংসতা বৃদ্ধি।
* অপরাধীরা ধর্মান্ধ রাজনীতিতে বিশ্বাসী হওয়ায় মৌলবাদের বিকাশ ঘটেছে।
* Victim কর্তৃক অপরাধীর অপরাধ নিজ চরিত্র শোষণ। (Theory of absorption of crime) এটা মানবতাবিরোধী অপরাধ বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে সমাজে ঘৃণা, নিষ্ঠুরতা ও হীন স্বার্থপরতাসহ সমুদয় বর্বর কর্মকাণ্ডকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছে।
* সামগ্রিকভাবে নারীর মর্যাদা এবং মানুষের মর্যাদার অবনমন। অন্যায়ের প্রতি সামগ্রিক সহনশীলতার উদ্ভব।
* আত্মগ্লানিতে নিমজ্জিত জাতির সম্মানবোধে ফাটল সৃষ্টি। পরাজিত মনোবৃত্তির উদ্ভব।
* আত্মপরিচয়ের সংকট।
* শান্তি সম্পর্কিত ধারণায় বিপত্তি। (Confusion in the concept of peace)
* অন্যায় কাজে দ্বিধা সংকোচ লোপ।
* মূল্যবোধে আঘাত ও অবক্ষয়।
* জাতিসত্তা ও অহংকারে আঘাত।
* সামগ্রিকভাবে বিবেকের অবক্ষয়।

ইহজগতে ন্যায় বিচার না পেয়ে মানুষ হতাশাগ্রস্থ হয়েছে এবং এতে করে যুক্তির পথ ছেড়ে তারা অদৃষ্টবাদিতা এবং নানা ধর্মীয় কুসংস্কারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ’৭১-এ হত্যা, ধর্ষণ ও রাহাজানির মাধ্যমে বিত্তের উত্থানের বিষয়টি যথাযথ মনোযোগ না পাওয়ায় সমগ্র দেশে লুটেরা সংস্কৃতির বিস্তৃতি ঘটেছে এবং সামগ্রিকভাবে সমুদয় মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রবণতা সীমাহীনভাবে বেড়েছে। ন্যায় ও সত্যের প্রতি আস্থা হারিয়ে মানুষ জীবনের মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয়ের সম্মুখীন হয়েছে।


বিগত ৩৬ বছরে কেন বিচার হয়নি এবং কেন এখন বিচার করতে হবে এ বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে হলে প্রথমে রাষ্ট্রের দুর্বলতা, অক্ষমতা, নানাবিধ সীমাবদ্ধতা এবং সামগ্রিক অঙ্গীকার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের কথাই বলতে হবে। যে কোন মূল্যে আদর্শগত স্থানে অনড় না থাকার কারণে এবং ব্যক্তিগত সুবিধার নিকট আত্মসমর্পণের কারণেই বিচার হয়নি। এই নেতিবাচক মনোভাব ও রাজনৈতিক ফায়দা লাভের প্রবণতার কারণেই বিচারহীনতার জগদ্দল পাথর জাতির বুকের উপর চেপে বসেছে। এরপরও বিচার সম্ভব। বিচারহীনতার কারণে জাতি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তা মাথায় রেখেই সামনে এগুতে হবে।


ভারতের প্রথিতযশা কুটনৈতিক মি. ডি এন দীক্ষিত তাঁর “Liberation and Beyond” গ্রন্থের ১৫৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, “ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ফেব্র“য়ারি ’৭২ থেকে জুন ’৭২ এর মধ্যে চার দফা বৈঠক হয়। পাকিস্তানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বৈদেশিক সচিব আজিজ আহমেদ এবং ভারতের পক্ষে নেতৃত্ব দেন মি. পিএন হাকসার। এতে যুদ্ধবন্দি এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অবস্থান ও মনোভাব আলোচিত হয়। এপ্রিল নাগাদ বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবন্দির সংখ্যা ৪শ’ থেকে কমিয়ে ১৯৫ এবং অতঃপর ১১৮ তে নামিয়ে আনেন এবং এই অল্প সংখ্যক যুদ্ধবন্দির বিচারের ক্ষেত্রেও যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং দ্রুততার সাথে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে কেসগুলো দাঁড় করাতে অক্ষম হন। ।


এই অক্ষমতার পেছনে যারা কলকাঠি নাড়াচ্ছিল তারা সবাই ছিল ১৬ ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধা বনে যাওয়া আমলা। এর মধ্যে পুলিশের শীর্ষ অফিসারসহ নিম্ন পর্যায়ের এমন অনেকে ছিল যারা যুদ্ধের ন’মাস পাকিস্তানের হয়ে কাজ করেছে, এমনকি হত্যা, ধর্ষণ, লুটেও অংশগ্রহণ করেছে। এদেরকে চাকুরিতে রেখে তাজউদ্দীনের সরকারকে সরিয়ে দেয়াই ছিল রাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত ও ব্যর্থতা।


আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে র্শীষ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচারের ব্যাপারে লিখিত অঙ্গীকার ব্যতিরেকে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া, তাদের নাম প্রকাশ না করা, এ ব্যাপারে দেশের মধ্যে জনমত যাচাই না করা, পার্লামেন্টে আলোচনা না করা-এ সবই ছিল রাষ্ট্রের দুর্বলতা ও ব্যর্থতা। উল্লেখ্য, সিমলা চুক্তির ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সনের ২৮ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এমন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করা হয় যাতে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের ফেরত দেবার সময়সীমা বেধে দেয়া হয় এবং পাকিস্তানে বসবাসরত বাংলাদেশীদেরও ফেরত দেবার সময়সীমা স্থির করা হয়।


ঐ দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে এটা স্থির করা হয় যে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ পরস্পর আলোচনার ভিত্তিতে বিভিন্ন অমিমাংসিত বিষয়গুলো সুরাহা করবে। এই চুক্তি সম্পাদিত হয় ভারতের মি. পিএন হাকসা এবং পাকিস্তানের আজিজ আহমেদ এর মধ্যে।


নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে না এমন আশ্বাসের ভিত্তিতেই পাকিস্তান বন্দী বাঙালিদেরকে ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি প্রদান করে। তবে ঐ চুক্তিতে বাংলাদেশ কোন স্বাক্ষরকারী দেশ ছিল না। এটা দুঃখজনক যে, এ প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান থেকে যে সব সেনা কর্মকর্তা বা আমলারা প্রত্যাবর্তন করে তাদের অধিকাংশই পাকিস্তানি মনোভাবসম্পন্ন ছিল। এদের মধ্যে যারা জীবিত আছে তাদের অধিকাংশই আজও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। যাহোক, ’৭৩-এর চুক্তিতে ঐকমত্য হয় যে, ভারত বাংলাদেশ ও পাকিস্তান যৌথভাবে বিচারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।


১৯৭৪ সালের ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু অনেকটা চাপের মুখে সেই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুমোদন করেন যাতে পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীরা মুক্ত হয়ে ভারত থেকে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে। ভুট্টো পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীকে, নিজ দেশে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিচার করবে, এ ধরণের একটি অলিখিত অঙ্গীকার ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার অন্তর্গত ছিল। এই কারণে বিচারের ব্যাপারে পাকিস্তানের বাধ্যবাধকতা ছিল। শুধু তাই নয়, এ ব্যাপারে সমগ্র বিশ্ব ও সভ্য সমাজেরও বাধ্যবাধকতা ছিল। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু তার ভুলটি অনুধাবন করেন এবং পাকিস্তান কর্তৃক প্রতারিত হবার কথাটি জনসম্মুখে উচ্চারণ করে অনুতাপ প্রকাশ করেন।


সার্বিক বিচারে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐ চুক্তিটি বাতিল বলে গণ্য করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের ক্ষমা করার অধিকার কোন ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের না থাকায় এবং পাকিস্তান নিজে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন অনুসরণ না করায় ঐ চুক্তি বাতিল বলে গণ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ পার্লামেন্টে এটা আলোচিত না হওয়ায় এবং অনুমোদিত না হওয়ায় এটা মানতে সরকার বাধ্য নয় । আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এ ধরণের অপরাধীর বিচারের অধিকার যেমন কখনই তামদি হয় না, তেমনি এ আইনের পরিধি কোন ভৌগলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়।

এটা পুনরুল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সিমলা চুক্তি এবং ’৭৪-এর ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা এ দেশীয় যুদ্ধাপরাধী ও দেশদ্রোহীর ব্যাপারে কোন অঙ্গীকার ব্যক্ত করেনি। বিচারের ব্যাপারে কোন কিছুই আমাদের জন্য বাধা নয়।

আমাদের সংবিধানে ৪৭-এর ৩ অনুচ্ছেদ এ স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে “তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য কিংবা যুদ্ধবন্দিকে আটক, ফৌজদারীতে সোপর্দ কিংবা দন্ডদান করিবার বিধান-সংবলিত কোন আইন বা আইনের বিধান এই সংবিধানের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য বা তাহার পরিপন্থী, এই কারণে বাতিল বা বেআইনী বলিয়া গণ্য হইবে না কিংবা কখনও বাতিল বা বেআইনী হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে না। (সংবিধান, প্রথম সংশোধন, ১৯৭৩ সনের ১৫ নং আইন-এর ২ ধারাবলে সংযোজিত।)


৪৭-এর ক অনুচ্ছেদ-৩-(১) যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফার বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়, সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ, ৩৫ অনুচ্ছেদের (১) ও (৩) দফা এবং ৪৪ অনুচ্ছেদের অধীন নিশ্চয়কৃত অধিকারসমূহ প্রযোজ্য হইবে না।

(২) এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্তে¡ও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফার বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়, এই সংবিধানের অধীন কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করিবার কোন অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবে না।”

এছাড়া বিচারের ব্যাপারে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট) ১৯/৭৩ নামক যে আইনটি আমাদের হাতে রয়েছে তার পরিধি এত ব্যাপক যে এটি যথাযথভাবে প্রয়োগ করলে খুব কম ক্ষেত্রেই অপরাধী পার পেতে পারবে। যে সব আইনের ধারায় এসব অপরাধীর বিচার হতে পারে তা হল-

* হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে গণহত্যা সাধন।
* গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে গণহত্যা।
* সুপরিকল্পিতভাবে শারীরিক ধ্বংস ও জীবননাশের মাধ্যমে গণহত্যা পরিকল্পনা এবং সংঘটন যা পরিণামে মানবজীবনকে নিশ্চিহ্ন করে।
* এমন কর্ম করে গণহত্যা সাধন, যাতে অন্যের জন্মচক্র থেমে যায়।
* হত্যার মাধ্যমে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ।
* ব্যাপক নিধনযজ্ঞের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
* ধর্ষণের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
* যৌনদাসীতে পরিণতকরণের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
* যৌন নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
* জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টির মাধ্যমে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
* দাসত্বে আবদ্ধকরণের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
* জোরপূর্বক নির্বাসন, দেশান্তর এবং জনগণকে ভিটা থেকে উৎখাতের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
* আইন বহির্ভূতভাবে কারাগারে নিক্ষেপ, বন্দীকরণ এবং স্বাধীনতার অধিকার ক্ষুন্ন করার মাধ্যমে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
* অত্যাচার ও নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
* মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
* উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যার মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* নিপীড়ন ও নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* বেসামরিক ব্যক্তিবর্গের উপর আক্রমণের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* শত্রুদেহ খণ্ড বিখণ্ড ও বিকৃত করার মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* ধর্ষণের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* যৌনদাসীতে পরিণতকরণের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* যৌন নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* খুনের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* সাধারণ জনগণের উপর আক্রমণের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* অমানবিক আচরণের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
* লুটপাট, ক্ষতিসাধন ও বিনাশের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* বৈরী পরিবেশে শত্রুপক্ষের লোকজন দিয়ে জোরপূর্বক শ্রম আদায়ের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* অন্তহীন কষ্ট ও দুর্ভোগ সৃষ্টির মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* জোরপূর্বক নির্বাসন, দেশান্তর এবং জনগণকে ভিটা থেকে উৎখাতের কারণে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ।
* বেসামরিক ব্যক্তি ও স্থাপনার উপর আঘাতের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধপরাধ।
* লক্ষ্যবস্তুর বাইরে ব্যক্তি ও বস্তুর উপর সীমাহীন আঘাতের মাধ্যমে ধ্বংস, মৃত্যু ও শারীরিক ক্ষতি সাধনের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* প্রতিরক্ষাবিহীন স্থান ও স্থাপনার উপর আঘাতের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* শত্রুসম্পত্তি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ।
* ব্যক্তি মর্যাদার উপর গুরুতর আঘাতজনিত যুদ্ধাপরাধ।

জনগণের দৃঢ় অঙ্গীকার ও নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস থাকলে অপরাধীর বিচার হবেই। এ ব্যাপারে রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের রয়েছে বাধ্যবাধকতা। এ ব্যাপারে সমগ্র বিশ্বসভ্যতা আমাদের জনগণের পাশে দাঁড়াবে এটাই প্রত্যাশিত। আমরা সবাই মানবতা ও সভ্যতার জন্য লড়াই করছি। মানবতা এমন এক আলোর নদী যা অনন্ত থেকে দূর অনন্তে বয়ে গেছে।


সহায়ক গ্রন্থাবলী:


যুদ্ধাপরাধ গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ- ডা. এম এ হাসান

যুদ্ধ ও নারী- ডা. এম এ হাসান
প্রসঙ্গ ’৭১: মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ- ডা. এম এ হাসান
পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী ১৯১ জন- ডা. এম এ হাসান
Witness to Surrender; Siddique Salik.
Liberation and Beyond; D N Dixit, India
Massacre; Robert Payne
Death by Government; R. J. Rummel
Against Our Will; Browmiller
The Uppsala Progmamme for Holocaust and Genocide Studies; Uppsala University, Sweden
সহায়ক পত্রিকা:
দৈনিক সংগ্রাম
Pakistan Defence Journal– August 2001

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট