...মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে নতুনরূপে আসছে...

This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Liberation War of Bangladesh and Genocide of Innocent Bengali People in 1971. More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

ফেসবুকে আমরা

জাপানের পেমা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা - মোস্তফা হোসেইন

জাপানের পেমা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা

মোস্তফা হোসেইন



জাপানের নাগরিক তোওইন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গিয়ালপো পেমা। একাত্তরে ছিলেন দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। সেসময় জানলেন পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয়েছে যুদ্ধ। পাকিস্তানি সৈন্যরা নির্বিচারে মানুষ খুন করছে। প্রতিরোধ করতে মরিয়া বাঙালি জনগোষ্ঠী। জীবন বাঁচাতে লাখ লাখ মানুষ পাড়ি জমাচ্ছে ভারতে। সীমান্তবর্তী ভারতীয় এলাকায় বিশাল জনগোষ্ঠী অস্বাভাবিক পরিস্থিতির শিকার। পূর্ব পাকিস্তান জ্বলছে বিদ্রোহের আগুনে।

তরুণ পেমা জাপানের পত্রিকা আসাহি ইভনিং , জাপান টাইমস, ডেইলি য়োমিউরি মাধ্যমে জানলেন সেসব। নিজের প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ফ্রেন্ডশিপ ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করলেন। ক্লাবটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হান্নু হাই স্কুলের সহপাঠী ১০/১২জনকে নিয়ে। টোকিওর পাশে সাইতামা- পিফ্রেকচারে ছিল তাদের সেই স্কুল। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। এর পেছনেও কারণ ছিল। শরণার্থী জীবন যে কী দুর্বিসহ সেই অভিজ্ঞতা ছিল পেমার। কারণ তিনি নিজেও শরণার্থী হয়েছিলেন একবারে শৈশবে। মাত্র ৭ বছর বয়সে তাকে জন্মভূমি তিব্বত থেকে পালিয়ে শরনার্থী হতে হয়েছিল। শত শত উপাসনালয় জ্বালিয়ে দিয়েছিল হানাদার চীনের সৈন্যরা। শত শত মানুষ খুন করেছিল ওই আগ্রাসী বাহিনী। যাদের মধ্যে পেমার নিকটজনও ছিল অনেকে। চীনের আগ্রাসন মোকাবেলা করছিল তিব্বতের মানুষ। একসময় তিনি জাপানে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

একাত্তরে জাপানে শরণার্থীদের মানবিক সাহায্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলতে থাকে। ইতামামায় ছিলেন মুরো ইয়ামা নামে একজন চিকিৎসক। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। তাকে দেখা গেলো তিনি শরণার্থীদের চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশে নার্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ভাবছেন। এমনকী পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশ থেকে ২১জন নার্স জাপানে এনে প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করেছিলেন। 

পেমা ভাবলেন, কমিউনিস্ট পার্টি এদিকে এগিয়ে যাবে অথচ তিনি কিছু করতে পারবেন না! উপায়ও বের করলেন একটা। তিনি ভাবলেন, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গ পেলে ভালো হয়। তিনি গেলেন কয়েকজন এমপির কাছে। আদর্শগতভাবে কমিউনিস্ট বিরোধীদেরই তিনি পছন্দ করলেন। মনে হচ্ছিল তারাও এমন একটি উদ্যোগের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

তৎকালীন প্রভাবশালী এমপি হায়াকাওয়া ও হাসেগাওয়ার সমর্থন পাওয়া গেলো। আসলে এই এমপি দুইজন কমিউনিস্ট বিরোধী ছিলেন। তারা যখন দেখলেন মুরো ইয়ামা বেশ দূর এগিয়ে গেছেন তখন পেমাদের গ্রুপকেও যুক্ত করলেন এই কাজে। তারা অনেকটা সফল হলেন। কারণ একটা সাধারণ প্রচারণা চালানো হলো কমিউনিস্ট চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করছে। ভারতে আশ্রয়প্রার্থী লাখ লাখ শরণার্থী হওয়ার পেছনে তাই চীনেরও ভূমিকা আছে। এখানে রাজনৈতিক সমীকরণ আছে একটা। আর গিয়ালপো পেমা শৈশব থেকে চীনবিরোধী ছিলেন তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে।

ওই সময় টোকিওর পাকিস্তানি দূতাবাসের কর্মকর্তা এসএম মাসউদ ( সম্ভবত তিনি সেখানে প্রেস অ্যাটাচে হিসেবে কর্মরত ছিলেন)। পাকিস্তানি পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। সেটাও জানাজানি হয়ে যায় জাপানে। গিয়ালপো পেমা এবার এসএম মাসউদের শরণাপন্ন হলেন। কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, তার কাছে পরামর্শ চাইলেন। টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাস খোলা হবে জানতে পারলেন। এও জানলেন স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। পতাকা উত্তোলন হয়েছিল আওয়ামা শহরে। এসএম মাসউদ প্রথম পতাকা উত্তোলন করলেন। একটু ব্যতিক্রমী ছিল অনুষ্ঠানটি। মাসউদ সেইসময় লুঙ্গি পরে হাজির হলেন অনুষ্ঠানে। এটা ওখানে একবারে নতুন। মাসউদ পতাকা উত্তোলন করলেন, উপস্থিত একজন স্যালুট করলেন। বাঙালি যারা ছিল তারা সমবেত কণ্ঠে জাতীয়সঙ্গীত গাইলেন। পেমার মতো যারা ছিলেন তারা মাথা নত করলেন নতুন পতাকায়। এক্ষেত্রে নাকাজিমার কথা বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয়। নাকাজিমা ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত একজন সৈনিক। তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন জাপানে বসবাসরত বাঙালি শিক্ষার্থীদের এই অনুষ্ঠানে আসার আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। তিনি প্রায় ৩০জন শিক্ষার্থীকে হাজির করেছিলেন। ওই সময় জাপানি ও বাংলাদেশি মিলে মোট শ’খানেক মানুষ উপস্থিত ছিলেন ওই ঐতিহাসিক কর্মসম্পাদন করার জন্য। কিছু ভারতীয়ও ছিলেন। তাদের অনেকেই ছিলেন শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী ও গবেষক। অনুষ্ঠানে হায়াকাওয়া এমপিও উপস্থিত ছিলেন। নাকাজিমা কিন্তু পরবর্তীকালে বাংলাদেশে এসেছিলেন।

নতুন অফিস হবে। কর্মকাণ্ড চালানো হবে সেখান থেকে। এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হলো পেমার মনে। সর্বক্ষণ তিনি মাসউদের সঙ্গে রইলেন। মাসউদ বললেন, তারা অফিসের জন্য জায়গা পেয়েছেন। ওখানকার ভারতীয় দূতাবাস বাংলাদেশ দূতাবাসের জন্য একটু জায়গার ব্যবস্থা করেছে। পেমা বললেন, সেখানে তিনি সম্ভাব্য সহযোগিতা করতে চান।

নতুন অফিস কিন্তু আলাদা বাড়ি কিংবা রুম নয়। ভারতীয় দূতাবাসের যে লাইব্রেরি ছিল, সেই লাইব্রেরির এক কোণায় শুরু হলো বাংলাদেশ দূতাবাসের কাজ। মাসউদ সাহেব কোথা থেকে কিছু আসবাবপত্র জোগাড় করলেন। কিশোরোত্তীর্ণ পেমা এগিয়ে গেলেন। তাঁর দুজন বন্ধুও ছিল সঙ্গে। সেই আসবাবগুলো বয়ে নিয়ে গেলেন দূতাবাসে। সেটাই ছিল টোকিওতে বাংলাদেশের প্রথম দূতাবাস। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেখান থেকেই সম্পন্ন হয়েছে। দূতাবাসে মাসউদ সাহেব কিংবা অন্য কেউ বিভিন্ন বিষয় ইংরেজিতে লিখতেন। অনেক সময় মুখেও বলতেন। পেমার কাজ ছিল সেটা জাপানি ভাষায় অনুবাদ করা। হাতেই লেখা হতো সেগুলো। তারপর টাইপ করে দেওয়া হতো নাকাজিমার হাতে। তিনি সেগুলো বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেতেন। বিশেষ করে এসব আহ্বান জাপানপ্রবাসী বাঙালি ছাত্র এবং জাপানে বসবাসরত কর্মজীবীদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হতো। জাপানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও যাতে জানতে পারে সেই চেষ্টা করা হতো। মূলত এই উদ্দেশেই জাপানি ভাষায় সেগুলো অনুবাদ করার দরকার ছিল।

গিয়ালপো পেমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, জাপানের নাগরিক হয়েও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে কি কারণ ছিল? তিনি স্পষ্টত বললেন, আসলে তাঁর অংশগ্রহণের পেছনে কোনো রাজনৈতিক কারণ ছিল না। যেমনটা অন্য কারো ক্ষেত্রে ছিল। তিনি যখন পত্রিকায় বাংলাদেশের শরণার্থীদের কথা জানতে পারেন তখন তিনি নিজের শৈশবে ফিরে যান। তাঁর বয়স যখন মাত্র ৭ বছর তিনিও এমনি শরণার্থী হয়েছিলেন ভারতে। তিনি জন্মসূত্রে ছিলেন তিব্বতের অধিবাসী। চীন যখন তিব্বতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে তখন তারা শত শত নিরপরাধ মানুষকে খুন করে। শত শত উপাসনালয় গুড়িয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ প্রাণের মায়ায় মাতৃভূমি তিব্বত ত্যাগ করে। সেসময় তাদের শরণার্থী জীবনে যে দুর্বিসহ অবস্থা চলছিল তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন তিনি। আর একাত্তরে বাংলাদেশের শরণার্থীদের কথা ভেবে নিজেকে জড়িয়ে নেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে।

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি তথ্য জানালেন গিয়ালপো পেমা। তিব্বতের অন্তত ৮০ থেকে ১০০ জন আমাদের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। তারা সরাসরি লড়াই করেছেন পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে। এই তিব্বতিরা একাত্তরে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য হিসেবে যুদ্ধ করতে এসেছিলেন বাংলাদেশে। যাদের অধিকাংশই এখন ভারতের হিমাচল প্রদেশে বসবাস করছেন। হিমাচলে এমনই একজন চাম্পা কাল্ডেন আরেকজন রাতাকুয়া। চাম্পা কাল্ডেন রাতাকুয়ার চেয়ে বয়সে বড়। রাতাকুয়া কয়েক বছর আগে মৃত্যু বরণ করেছেন। চাম্পা কাল্ডেন এর মেয়ে ডিচেন ওয়াঙমং এখন হিমাচলের একজন এমপি।

৪ মার্চ ২০১৬ ঢাকা সফর করে গেলেন অধ্যাপক গিয়ালপো পেমা। তিনি বললেন, স্বাধীনতা লাভের পরও তাদের কাজ চলতে থাকে। তখন বাংলাদেশে হাজার হাজার যুদ্ধাহত মানুষ। সদ্য স্বাধীনতা লাভকারী দেশটিতে চিকিৎসা সুবিধা ছিল খুবই কম। এমন পরিস্থিতিতে জাপানের কিছু মানুষ চিন্তা করলেন চিকিৎসা সহযোগিতা প্রদান অত্যন্ত জরুরি। সেই উদ্দেশে ডা. মারুকি পৃষ্ঠপোষক জোগাড় করে বাংলাদেশের কিছু নার্স প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। সেই সময় পেমার স্ত্রী তাদের সহযোগিতা করেন। প্রথম দফায় বাংলাদেশ থেকে আসা ২১জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তারা বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে সেবায় নিয়োজিত হয়েছিলেন।

গিয়ালপো পেমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল বাংলাদেশ সম্পর্কে তার মূল্যায়ন কী? তিনি স্পষ্ট করে বললেন, বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের সঙ্গে সামান্য সংযোগ ছিল তার। আর সেই দেশটিতে ৪৫ বছর পর আসতে পেরে তার অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। যে দেশটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত ছিল সেই দেশটি এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আর যাবেই না কেন--এই জাতি যে লড়াকু জাতি! বিজয় ছিনিয়ে আনার গৌরব আছে তাদের। নিশ্চয়ই তারা আরও অনেকদূর এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশকে নিয়ে অধ্যাপক পেমা খুবই আশাবাদী।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক মোস্তফা হোসেইন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট