This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Bangladesh Liberation War, Genocide of Innocent Bengali People in 1971 and contemporary political events of Bangladesh.
More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

The Exeter South Asia Centre of the College of Humanities of the University of Exeter listed ‘Muktijuddho e-Archive’ as a source for Research materials.
The University of Exeter is a public research university located in Exeter, Devon, South West England, United Kingdom. 
This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

সেই সব বাঙালি পাকসেনা - জাফর ওয়াজেদ

সেই সব বাঙালি পাকসেনা

জাফর ওয়াজেদ


প্রতীকি ছবিঃ পাকসেনাদের আত্মসমর্পণ (১৬/১২/১৯৭১) - সূত্র

বিস্ময় জাগাবেই একালে যে, একাত্তর সালে বাঙালির স্বাধীনতা ও মুক্তির চেতনার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিল এই বাংলায় জন্ম নেওয়া অনেক বাঙালি সেনা কর্মকর্তা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা হানাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল।

মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়াই করেছে। হতাহত হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। বাঙালিদের ঘরবাড়ি লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, হত্যাসহ ইত্যকার নারকীয় কাজে তারাও অবতীর্ণ হয়েছিল পাকিস্তান সেনা হিসেবেই। পাকিস্তানকে ‘মাতৃভূমি’ মেনে তা রক্ষার ব্রতে তারা প্রাণপণ লড়াই করেছে। মুক্তিযুদ্ধ তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করতে চেয়েছে। মুক্তিকামী বাঙালিদের তারা ‘ভারতীয় আগ্রাসনের’ সহায়ক হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁবেদার সেনার ভূমিকা পালন করতে দ্বিধা করেনি। এই বাঙালি সেনারা ২৫ মার্চের আগে থেকেই বাংলাদেশে অবস্থান করছিল। ১৬ ডিসেম্বরের আগে অনেকে পাকিস্তানে ফিরে যায়, বাকিরা পাকিস্তানি সেনাপ্রধান নিয়াজীর সঙ্গে রেসকোর্স ময়দানে মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণও করেছিল। এরা ভারতের ক্যাম্পে ঠাঁই পায়। পরবর্তীকালে পাকিস্তান ফেরত যায়। ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিনিময়ে পাকিস্তানে আটকেপড়া ৪ লাখের বেশি বাঙালির সঙ্গে এরা বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে। অনেকে সেনাবাহিনীতে চাকরি ফিরে পায়। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর এদের অনেকেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পায়। একাত্তরে তাদের ভূমিকার জন্য কোনো বিচার বা শাস্তির সম্মুখীন তারা হয়নি। বাঙালি সেনাদের এই অংশটি ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টসহ অন্যান্য রেজিমেন্টে কর্মরত।

বাঙালির স্বাধীনতা ও মুক্তি চেতনার বিপরীতে পাকিস্তানের পক্ষাবলন্বনকারী এই সেনা কর্মকর্তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য কখনও অনুশোচনা প্রকাশ যেমন করেনি, তেমনি ক্ষমাও চায়নি। বরং পঁচাত্তর-পরবর্তী পাকিস্তানযুগ বহাল করার ক্ষেত্রে এদের অনেকেই অবদান রেখেছে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের আহ্বানকে উপেক্ষা করে তারা পাকিস্তানি সেনা হিসেবে বাঙালি নিধনপর্বে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিল। একাত্তরের সেই দিনগুলোয় খুনি টিক্কাখান ও নিয়াজীর সঙ্গে এরা কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বাঙালিকে দমাতে সকল শক্তি নিয়োজিত করেছিল। তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের ‘ভারতীয় চর’ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যা দিত। তারা বিশ্বাসও করত, দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর। ইসলাম ও পাকিস্তানকে তারাও সমর্থক হিসেবে গুরুত্ব দিত। একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের মতো তারাও মনে করত, পাকিস্তান টিকে থাকলে আজ হোক, কাল হোক বাঙালি মুসলমানদের হক আদায় হবে। কিন্তু ‘আজাদী’ ধ্বংস হলে মুসলমানদের শেয়াল-কুকুরের মতো মরতে হবে। তাই তারাও ঘরে ঘরে যেসব ‘দুশমন’ রয়েছে, তাদের খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল। বাঙালির রক্তে তারা তাদের হাত রঞ্জিত করেছিল।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের জন্য ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এই রেজিমেন্টসহ অন্যান্য রেজিমেন্টে কর্মরত বাঙালি সেনা কর্মকর্তার মধ্যে দুজন অধিনায়ক মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে আত্মসমর্পণ করেছিল। তাদের এই ভূমিকায় সাড়া না দেওয়া সৈনিকসহ অন্য কর্মকর্তাদের একটা অংশ পাকিস্তানিদের হাতে নিহত হয়। বাকিরা পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর হয়ে বাঙালির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন এমন সেনা কর্মকর্তার সংখ্যা ৮০ জনের বেশি। তবে সিপাহীদের মধ্যে তেমন কেউ হানাদার বাহিনীর পক্ষে নয়, বরং বিদ্রোহ করে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দুটি রেজিমেন্টের যে ৪ জন অধিনায়ক ছিলেন, তারা মার্চেই আত্মসমর্পণ করেন। যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্নেল রেজাউল জলিল। তিনি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ দূরে থাক, বরং আত্মসমর্পণ করে বাঙালি সেনাদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেন। অনেক কর্মকর্তাসহ সাধারণ বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করে হত্যা চালানো হয়। আত্মসমর্পণের বিনিময়ে রেজাউল জলিলের জীবন রক্ষা করে হানাদাররা। জয়দেবপুরের সেনানিবাসে ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে. কর্নেল মাসুদুল হাসান খানও আত্মসমর্পণ করেন। অথচ তার নেতৃত্বে সিপাহীরা ২৫ মার্চের আগে বিদ্রোহ করেছিল। তাকে সপরিবারে বন্দি রাখা হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন আত্মসমর্পণকারী অপর লে. কর্নেল আ ফ ম আবদুর রকিব। মাসুদ হাসান পঁচাত্তরের পরে সেনা কল্যাণ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত লে. কর্নেল মইনউদ্দিন পাকিস্তানি সেনা হিসেবে ঢাকায় বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নেন। পঁচাত্তরের পর ফাইজার বাংলাদেশ লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার লে. কর্নেল খন্দকার মাহবুবুর রহমান ছিলেন ঢাকা সেনানিবাসে। একাত্তরে ছিলেন গভর্নর ভিজিটরস টিমের জিএসও-১। একাত্তরের মাঝামাঝি সময়ে মার্শাল ল’ কোর্টের প্রেসিডেন্ট। পঁচাত্তরের পর পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য হন।

সশস্ত্রবাহিনী বোর্ডের পরিচালক লে. কর্নেল ফিরোজ সালাহউদ্দিন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে থাকতেন। পাকিস্তান বাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তাকারী কর্মকর্তাটি পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে জান্তা শাসক জিয়ার সামরিক সচিব ছিলেন। রংপুর ক্যান্টনমেন্টে বিএম-২৩ ব্রিগেডের মেজর আমজাদ আহমদ চৌধুরী সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেন মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে। রংপুর সেনানিবাসে অবস্থানকালে তিনি হিন্দুদের ঘরবাড়ি লুট করার মতো কাজেও জড়িত ছিলেন। পঁচাত্তরের পর তিনি ব্যবসায় নামেন এবং মেজর জেনারেল হিসেবে অবসর নেন।

আলী আহমদ খান ছিলেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে জিএসও-২, ইস্ট জোনের মেজর। ঢাকায় বিভিন্ন অপারেশনে তাকেও যেতে হতো। পঁচাত্তরের পর সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ছিলেন তিনি। ফরিদপুরের খান বাহাদুর ইসমাইল হোসেনের পুত্র মেজর মোহাম্মদ মশিহদৌলা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের হেড কোয়ার্টারের ইস্ট জোনের স্টাফ অফিসার ছিলেন। স্বাধীন দেশে ব্রিগেডিয়ার পদে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। পঁচাত্তর পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানও ছিলেন।

রংপুর ক্যান্টনমেন্টের ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির অফিসার কমান্ডিং মেজর শরীফুল ইসলাম (পঁচাত্তর পরবর্তী ওয়াসার চেয়ারম্যান) সিগন্যাল কোম্পানির অফিসার কমান্ড মাহতাবউদ্দিন, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের সিএমএইচের মেজর মোহাম্মদ হোসেন, মেজর জয়নাল আবেদীন, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মেজর আবদুল কুদ্দুস, মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের আর্টিলারির ৩১ ফিল্ড রেজিমেন্টের মেজর ফরিদউদ্দিন। যুদ্ধে তিনি নিহত হন। তাকে শহীদের তালিকায় রাখা হয়েছে।

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ২৪ এফএফ রেজিমেন্টের টু আইসি মেজর আমজাদ হোসেন সরাসরি অস্ত্র ধারণ করেছেন। কুমিল্লাতে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ডিএএজি মেজর ইউসুফ হায়দার, এস এম ও মেজর আবুল কাশেম, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কমান্ডার মেজর আবদুল হামিদ পাকিস্তান চলে যান নভেম্বরে। পঁচাত্তরের পর সরকারি চাকরি পান। ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোয়ার্টার মাস্টার এবিএম রহমতুল্লাহ ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের সিএমএইচের মেজর এস এ কাজী পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ইএমই ওয়ার্কশপের কানাডার মেজর গোলাম মওলা পঁচাত্তর পরবর্তীকালে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের সিএমএইচের স্টাফ মমিন, মেজর হামিদুর রহমান যুদ্ধাহত পাকিস্তানি সেনাদের চিকিৎসা করতেন। পঁচাত্তরের পর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে যোগ দেন তিনি।

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের মেজর খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন আর্টিলারির ৩১ ফিল্ড রেজিমেন্টে। তিনি ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী হিসেবে আত্মসমর্পণ করেন কুমিল্লাতে। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তন করেন। ’৭৫ পরবর্তীকালে পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি ছিলেন।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ১৪ ডিভিশনের সদর দফতরের মেজর সাঈদ আহমদ (পঁচাত্তর পরবর্তী আদমজী জুট মিলসের চেয়ারম্যান) পাকিস্তানের সেবাদাসের ভূমিকায় ছিলেন। এরা সবাই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করেন। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তন করেন।

মেজর আবু লায়েস আহমদুজ্জামান ছিলেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে। তাকে পাঠানো হয় যশোর ক্যান্টনমেন্টে আর্টিলারি বাহিনীতে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নেন। ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি পেয়ে অবসরে যান।

’৯২ সালে বিএনপির মন্ত্রী ও পরে বিকল্প ধারার নেতা মেজর আবদুল মান্নান ছিলেন ৩ নং কমান্ডো ব্যাটালিয়নে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে। মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কমান্ডো হামলায় অংশ নেন। ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের পর পাকিস্তানে চলে যান। ১৯৭৩ সালে অবসর নেন। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাঙালি নিধনে সহায়তা করেন। পঁচাত্তরের পর টিসিবির চেয়ারম্যান হন।

যশোর ক্যান্টনমেন্টের আর্টিলারি রেজিমেন্টের মেজর মির্জা রকিবুল হুদা যশোর অঞ্চলে অপারেশনে জড়িত ছিলেন। ’৭৪ সালে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। পঁচাত্তর পরবর্তী পুলিশ বিভাগে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রাম গণহত্যার নির্দেশদাতা পুলিশ কমিশনার ছিলেন। অতিরিক্ত আইজি পদে উন্নীত হন। চট্টগ্রামের ঘটনায় বিচারাধীন মামলায় জেল খেটেছেন। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর মারা যান।

যশোর ক্যান্টনমেন্টের ২২ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্টের টু আইসি মেজর হিমান উদ্দিন আহমদ পাকিস্তান থেকে ফেরার পর সচিবালয়ে যোগ দেন। সচিব হয়েছিলেন পরবর্তীকালে। ঢাকা সেনানিবাসের আর্মি ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মেজর আসগর আলী খান বাঙালিদের সম্পর্কে গোপন তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করতেন পাকি সেনাদের। পরবর্তীকালে গাইবান্ধা থেকে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যও হয়েছিলেন।

চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২০ বেলুচ রেজিমেন্টের মেজর আবদুল হাকিম খান চট্টগ্রামের অপারেশনে অংশ নিতেন, ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান থেকে চলে আসেন। পরবর্তীকালে ডিআইজি ছিলেন পুলিশ সদর দফতরে।

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের দুই আবদুস সাত্তার। দুজনেই ছিলেন এএসসি। স্বাধীনতার পর একজন পরিচালক অন্যজন পাট মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ছিলেন।

যশোর ক্যান্টনমেন্টের ৬ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মেজর রুহুল কুদুস, মেজর মমতাজউদ্দিন আহমদ (পরবর্তীকালে বিজেসির চেয়ারম্যান) আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ৫৭ ব্রিগেডের মেজর শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বাংলাদেশ বিরোধিতায় পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে অপারেশনে যোগ দিতেন। পাকিস্তান থেকে ফেরার পর পুলিশ বিভাগে যোগ দেন এবং পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি ছিলেন।

মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মেজর আহমদ ফজলুল কবির ও মেজর আবদুল খালেক মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করতেন। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি হন তারা।

ময়মনসিংহে মুজাহিদ বাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট মেজর শাহ আবদুল মান্নান, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ৫৭ ব্রিগেডের জিসিও ক্যাপ্টেন এম শহীদুল্লাহ, সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টের ২৩ আর্টিলারি ফিল্ড রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আবদুল সাগস (পঁচাত্তর পরবর্তী ডিআইজি), পূর্ব পাকিস্তান রাইফেল সদর দপ্তরের ক্যাপ্টেন আল আজাদ পরবর্তীকালে কর্নেল পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। রংপুর ক্যান্টনমেন্টের ২৩ ব্রিগেডের ক্যাপ্টেন এম এ সাঈদ, ২৯ ট্যাংক রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন ওয়াহিদুল হক (পঁচাত্তর পরবর্তী ডিআইজি), একই রেজিমেন্টের শহুদুল হক (পরবর্তীকালে ডিআইজি পুলিশ) মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ করেছেন।

রংপুর ক্যান্টনমেন্টের ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের ক্যাপ্টেন সাঈদ আহমদ (’৯৮ সালে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত চিকিৎসক) ও ক্যাপ্টেন ইমদাদ হোসেন আহত পাক সৈনিকদের সেবা শুশ্রুষা দিতেন।

পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলের যশোর হেড কোয়ার্টারের ক্যাপ্টেন রহমতউল্লাহ ’৭১ সালের মে মাসে আসামের শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। পরে ফিরে এসে পাকিস্তানি বাহিনীতে যোগ দেন (পঁচাত্তর পরবর্তী দিনে পুলিশের ডিআইজি হন)।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ১০ ইস্ট বেঙ্গল স্টুডেন্ট রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন মোসলেম উদ্দিন হাওলাদার (পরে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপ-পরিচালক হন)। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের তৃতীয় কমান্ডো ইউনিটের ক্যাপ্টেন মোখলেসুর রহমান (পরবর্তীকালে ব্রিগেডিয়ার), সিএমএইচের কোয়ার্টার মাস্টার ক্যাপ্টেন মুরাদ আলী খান (পঁচাত্তরের পর বন উন্নয়ন শিল্পসংস্থার পরিচালক হন) পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেন।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ৩১ আর্টিলারি ফিল্ড রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আবদুল হাকিম ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করেন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ক্যাপ্টেন  আবদুস সালাম (পরে পুলিশের ডিআইজি), ৩১ আর্টিলারি ফিল্ড রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন খুরশিদ আহমদ নভেম্বরে পাকিস্তান চলে যান। ’৭৪ সালে ফিরে আসেন। একই ক্যান্টনমেন্টের ইস্টার্ন কমান্ডের জিএসও ক্যাপ্টেন আবদুস সালাম (পরে মেজর জেনারেল), ১৪ ডিভিশনের জিওসির এডিসি ক্যাপ্টেন শাহেদুল আনাম খান (পরে ব্রিগেডিয়ার, সিওডি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ফিরোজ, ক্যাপ্টেন আশরাফুল হুদা (পরে ডিআইজি), ১৯ সিগন্যাল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন রফিকুল আলম (পরে ডিআইজি), একই রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন এস এ এন এম ওকবা (পরে বাংলাদেশ বিমানের জিএম), সামরিক আদালতে ক্যাপ্টেন এ টি এম মনজুরুল আজিজ (পরে ডিআইজি), ক্যাপ্টেন জামিলুর রহমান খান (পরে সচিবালয়ে উপসচিব), যশোর ক্যান্টনমেন্টের ৫৫ আর্টিলারি ফিল্ড রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন ওয়ারেস তারেক এবং কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ক্যাপ্টেন এ এল এ জামান। শেষোক্ত দুজন আত্মসমর্পণ করেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে জড়িত থাকা অবস্থায় কর্নেল ও ব্রিগেডিয়ার হন। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের সিএমএইচের ক্যাপ্টেন এম আই তালুকদার (পরে ঢাকা সিএমএইচের কর্নেল), একই ক্যান্টনমেন্টের ৮৮ মর্টার রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান ভূইয়া, ৩১ ফিল্ড রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন ফখরুল আহসান, এএসসি ক্যাপ্টেন এস এম মাহবুবুর রহমান (পরে বাংলাদেশ বিমানের জিএম), পিলখানা ইপিআরের ক্যাপ্টেন দানিয়েল ইসলাম (পরে ব্রিগেডিয়ার), সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টের ২৩ আর্টিলারি ফিল্ড রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আবদুল কুদ্দুস, ইস্টার্ন কমান্ডের জিওসি জেনারেল ইয়াকুব আলী খান (পরে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব), ছুটি শেষে যোগদানকারী ক্যাপ্টেন ওসমান আলী খান (পরে ডিআইজি) ও ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন (পরে এসপি), ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোতাহার হোসেন (পরে লে. কর্নেল) পাকিস্তান বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে নস্যাৎ করতে নিবেদিত ছিলেন।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের সিওডি লেফটেন্যান্ট মাহমুদ আল ফরিদ (পরে ডিআইজি), সিওডি মোদাব্বের চৌধুরী (পরে এআইজি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা) পাকিস্তানের পক্ষে অপারেশনে অংশ নিতেন।

যশোর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের লেফটেন্যান্ট ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত বাঙালি জেনারেল খাজা ওয়াসিউদ্দিনের পুত্র শাফি ওয়াসিউদ্দিন ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করেন। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন এবং ব্রিগেডিয়ার হিসেবে অবসরে যান। খাজা ওয়াসিউদ্দিন ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে ফিরে এলেও তার পাকিস্তানপন্থি পুত্রটি ফেরেননি।

বাংলাদেশ ডকুমেন্টস ১৯৭১-এর তালিকায় দেখা যায় এই বাঙালি সেনা কর্মকর্তারা প্রায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান শুধু নয়, যুদ্ধও করেছেন। এদের কেউ পরবর্তীকালে নিজেদের একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা ও দুঃখ প্রকাশ করেননি। বরং পাকিস্তানি চেতনাকে জাগ্রত করতে সচেষ্ট ছিলেন।

লেখক তালিকা