This is a Digital Library working with the 'collection, maintenance and public viewing' of the historical documents regarding the Bangladesh Liberation War, Genocide of Innocent Bengali People in 1971 and contemporary political events of Bangladesh.
More than three million Bengalis were killed and half a million Bengali women were raped by Pakistan Military Forces, Biharis, Jamat-I-Islami, Islami Chatra Shangha (Now Islam-I-Chatra Shibir), Muslim League, Nezam-I-Islami Party, Razakars, Al-Shams, Al-Badr, Peace Committee, Muzahid Bahini during the nine months long Liberation War of Bangladesh in 1971.

The Exeter South Asia Centre of the College of Humanities of the University of Exeter listed ‘Muktijuddho e-Archive’ as a source for Research materials.
The University of Exeter is a public research university located in Exeter, Devon, South West England, United Kingdom. 
This archive is absolutely NON-COMMERCIAL. All contents available here are for learning, study & research purpose only. Contents available here CANNOT be used for any kind of commercial purpose.

মুদ্রার অপর পিঠের মওলানা ভাসানী - জাফর ওয়াজেদ

মুদ্রার অপর পিঠের মওলানা ভাসানী

জাফর ওয়াজেদ

ভোরের কাগজ (বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫)



মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী দীর্ঘ জীবন লাভ করেছেন। দীর্ঘপথ পরিক্রমণ করেছেন রাজনীতি ও ধর্মের বলয় ধরে। সাধারণ বেশভূষা আর সাধারণের মতো জীবনযাপন করে গেছেন। তাঁকে কেন্দ্র করে সমাজতন্ত্রী, কমিউনিস্ট, সশস্ত্র চরমপন্থী, ফকির, দরবেশ, মোল্লাদের সমাহার ঘটেছিল। কোনো আদর্শেই তিনি ঠায় অবস্থান নিয়েছেন তা নয়। জনতার জোয়ার কোনদিকে বইছে, তা তিনি বুঝতে পারতেন, টেরও পেতেন। কিন্তু সে অনুযায়ী নিজেকে তৈরি বা এগিয়ে নিতে পেরেছেন এমনটা নয়। বরং স্রোতের বিপরীতেও তিনি অবস্থান নিয়েছেন। নিজের বক্তব্যকে নিজেই খণ্ডন করেছেন। কোনো বিশ্বাসেই স্থির ছিলেন এমনটা নয়। পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, মওলানা ভাসানী জীবনের দীর্ঘকাল ‘প্রগতিশীল’ রাজনীতির কথা বলেছেন, নির্যাতন ভোগ করেছেন, জীবন সায়াহ্নে তিনি নিজেকে একাধারে বামপন্থী, উগ্রপন্থীদের স্বঘোষিত অভিভাবক এবং চরম দক্ষিণপন্থীদের বিশ্বস্ত মুখপাত্রে পরিণত হন।

আওয়ামী মুসলীম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন সেই পঞ্চাশের দশকে। রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ বা মারপ্যাঁচে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গঠন করেন পাকিস্তানভিত্তিক নয়া দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। সমাজতন্ত্রীদের দল হিসেবে তা দ্রুত বিস্তার লাভ করে পাকিস্তানের দুই অংশে। কিন্তু এক পর্যায়ে দলটি ভেঙে যায়। বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক শিবির ভাগ হয়ে গেলে তার রেশ ধরে ন্যাপও দ্বিধাবিভক্ত হয় মস্কো ও পিকিংপন্থী হিসেবে। ভাসানী পিকিংপন্থী রাজনীতির ঝাণ্ডা উঁচু করে ধরেছিলেন। ষাটের দশকে এসে তিনি সামরিক জান্তা আইয়ুব খান দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েন। পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা বেড়ে যাওয়ায় চীনের পরামর্শে ভাসানী ঝুঁকে পড়েন আইয়ুর খানের প্রতি। আইয়ুবের স্বার্থে চীনও সফর করেন। দেখা যায়, এক পর্যায়ে তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। ১৯৬৮ সালজুড়ে প্রায় নিষ্ক্রিয় ও নির্বিকার ছিলেন। বছরের শেষদিকে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনেও অংশ নেন। অথচ আইয়ুব সরকারকে তিনি সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সরকার’ হিসেবে।
মওলানা ভাসানীর জীবন ব্রিটিশ-ভারত পর্ব, পাকিস্তান পর্ব ও বাংলাদেশ পর্ব— এই ত্রিধারায় প্রবাহিত হয়েছে। বক্ষমাণ নিবন্ধটি তার বাংলাদেশ পর্বের মূল্যায়ন বলা চলে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকায় যখন গণহত্যা শুরু হয়, ভাসানী তখন টাঙ্গাইলের সন্তোষে। এপ্রিলে হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইল আক্রমণ করলে তিনি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মেঘালয় চলে যান। যুদ্ধ চলাকালে তার দলের সেক্রেটারি মশিউর রহমান যাদু মিয়া পাকিস্তানি হানাদার ও চীনের বার্তা নিয়ে কলকাতায় যান। ভাসানীকে ফিরিয়ে নেবার প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু টের পেয়ে ভারত সরকার তাকে অন্তরীণ করে রাখে। যাদুমিয়া ফিরে এসে হানাদারদের সহযোগী হিসেবে বাঙালি নিধনে মত্ত হন। স্বাধীনতার পর বিচারে তার জেল হয়, এতে ভাসানী ক্ষুব্ধ হন। এছাড়া দালালির অভিযোগে তার দলের আরো নেতা গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি হয়। তাই স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে ভাসানী হুঙ্কার তোলেন দালাল আইন বাতিলের। এজন্য তিনি অনশন ধর্মঘটও করেন। এমনকি দেশের নাম পাল্টে ‘মুসলিম বাংলা’ রাখার দাবিটিকে সামনে তুলে আনেন। স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে মুসলিম বাংলা তিনি চেয়ে এসেছেন। তার এই দাবি ছিল মূলত আওয়ামী লীগের দাবির বিপরীতে পাকিস্তানের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করা। তাছাড়া ন্যাপের পাকিস্তান শাখা তখনো নিষ্ক্রিয় হয়নি।

যুদ্ধকালে ১৯৭১ সালের শেষদিকে ন্যাপ নেতা ভাসানী দিল্লির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেই তিনি হাসপাতাল ছেড়ে এসে উঠলেন যমুনা তীরের এক বাংলোতে। দেশে ফেরা পর্যন্ত এই বাংলোতেই ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বরের পর তিনি সরাসরি ঢাকায় ফিরেননি। প্রথমে জন্মভূমি ও একদা কর্মভূমি অসমে যান। দেশের ফেরার আগে অসমের ফকিরগঞ্জে ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি এক জনসমাবেশে ভাষণে বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ভুট্টো শেখ মুজিবকে অনুরোধ জানিয়েছে। আমি তাকে (ভুট্টোকে) বলতে চাই, বর্তমানে এটা শুধু অসম্ভব নয়, আগামী শত শত বছরেও এর পরিবর্তন হবে না। পাকিস্তানিদের বর্বরোজনোচিত অত্যাচারের কথা বাংলাদেশের জনগণ কখনো ভুলবে না।’ মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতের অন্যান্য নেতাবৃন্দকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ভাসানী বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ এই দয়াবতী মহিলা (মিসেস গান্ধী) এবং ভারতের জনসাধারণের কথা কিছুতেই ভুলতে পারে না।’ তিনি আশা করেন, ভারতের বর্তমান প্রশাসনের মতো বাংলাদেশও ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে।

১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি মেঘালয়ের ডালু থেকে নেত্রকোনার হালুয়াঘাট হয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক খায়রুজ্জামান চৌধুরী তাকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত অভ্যর্থনা জানান।

১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ইন্দিরা গান্ধী সরকারি সফরে ঢাকা আসেন। ঢাকায় পৌঁছেই তিনি টাঙ্গাইল থেকে পাঠানো ভাসানীর তার বার্তা পান। যাতে উভয় দেশের মধ্যে চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের সম্পর্ক কামনা করেন।

১৯ মার্চ বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধী ভারত ও বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি করেন ২৫ বছর মেয়াদি। ২৪ মার্চ ভাসানী এই মৈত্রী চুক্তিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকালে ভারত বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু প্রমাণ করেছে। আমি এ কথা কিছুতেই ভুলতে পারি না।’

ইতোমধ্যে বাংলাদেশের তথাকথিত বামপন্থীদের তথা চৈনিকদের কয়েকটি পত্রিকা ভারত বিরোধিতার আবরণে মুজিব সরকারের সমালোচনা করতে শুরু করে। কোনো কোনো পত্রিকায় পাকিস্তানের সমর্থনমূলক চিঠিপত্র প্রকাশিত হতে থাকে। এর মধ্যে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘হলিডে’ ও চট্টগাম থেকে প্রকাশিত ‘লাল পতাকা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ‘হককথা’, ‘মুখপত্র’ ও ‘স্পোকসম্যান’ও ছিল। যা পরে নিষিদ্ধ করা হয়। মওলানা ভাসানী স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিলেন ১৯৭০ সালে। ১৯৭১-এর ৯ মার্চ তাই দেখা যায়, পল্টন ময়দানে এক বিরাট জনসভায় তিনি পাকিস্তানকে ভাগ করে দু’টো স্বাধীন দেশ গঠন করার জন্যে ইয়াহিয়ার প্রতি আহ্বান জানান। আর শেখ মুজিবকে তিনি আখ্যা দেন নিজের পুত্র হিসেবে। কিন্তু লক্ষ করার বিষয় হলো এ দিনও তিনি ‘বাংলাদেশ’ কথাটা ব্যবহার করেননি। (গোলাম মুরশিদ : মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর)। স্বাধীনতা অর্জনের কয়েক মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ, অসম, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা নিয়ে ভাসানী তার বৃহত্তর বাংলা গঠনের দাবি উত্থাপন করতে থাকেন। অথচ মুজিবনগর সরকার আমলে ভারতে অবস্থানকালে তিনি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কনফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব করেন। বাংলাদেশের জনগণের কাছে কনফেডারশনের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হবে না বলে অনুমান করে ভাসানী ভারতের কয়েকটি অঞ্চল বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে নিয়ে আসার বিকল্প প্রস্তাব করেন। কিন্তু ভাসানী কেন এ প্রস্তাব করলেন, তার কার্যকারণ অবশ্য রয়েছে। ধারণা করা হয় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অস্থিরতার সৃষ্টি করে মুজিব সরকারকে অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া এবং ভারত-বাংলাদেশ শান্তি, সহযোগিতা ও মৈত্রী চুক্তির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার জন্য তিনি এই পন্থা বেছে নেন। সাংবাদিক আবদুল লতিফ খতিব ‘হু কিল্ড মুজিব’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, বৃহত্তর বাংলার পক্ষে ভাষ্যও মেলেছে চীনা কর্মকর্তাদের বাঙালি কূটনীতিকের সঙ্গে সংলাপে।

বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ (পি ও)-৮ এর মাধ্যমে ‘দালাল আইন’ নামে একটি গণহত্যা এ্যাক্ট প্রবর্তন করেন। এই আইনের অধীনে যখন কতিপয় চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচার চলছিল, তখন দেশের উগ্রবামপন্থী এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী মহলের অনেকেই সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা শুরু করেছিলেন। সে সময় যে সমস্ত রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী এই দালাল ও ঘাতকদের বিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ভাসানী, ড. আলীম আল রাজী, অধ্যাপক আবুল ফজলসহ সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকাগোষ্ঠী। উপরন্তু ভাসানী এক পর্যায়ে ১৯৭৩ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে দালাল আইন বাতিল করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। এছাড়া ছিল বিদেশি চাপ এবং এতো লোকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণের জন্য যথাযথ সাক্ষী-সাবুদ জোগাড়ের ক্ষেত্রে নানা দুরূহ অসুবিধা এবং সমস্যা ও প্রশাসনিক নিরতিশয় দুর্বলতা।

বঙ্গবন্ধু সরকার ৩০ নভেম্বর দালাল আইনে শর্ত সাপেক্ষে অভিযুক্ত ও আটক দালালদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এই আশায় যে, তারা অতীতের কৃত অপরাধের জন্য অনুতপ্ত ও অনুশোচনার বশবর্তী হয়ে স্বাধীন দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুসংহত করার জন্য এবং দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করবেন। এই সময়কালে ৩৪ হাজার ছয়শ জন দালাল ছাড়া পায়। এর মধ্যে রাজাকার, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলামী ও পিডিপিসহ সাম্প্রদায়িক দলগুলোর দালালরা ছাড়া পায়।

১৯৭২ সালের ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ সরকার দালাল আইন সংশোধন করে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। মওলানা ভাসানী এর বিরোধিতা করে পুরো আইন বাতিলের জন্য দাবি তোলেন।

স্বাধীনতার পর আউশ মৌসুমে অনাবৃষ্টির কারণে ব্যাপক ফসলহানি ঘটে। এছাড়া যুদ্ধে বিপর্যস্ত পরিবহনে খাদ্য সরবরাহ বিলম্বিত হওয়ার ফলে সারা দেশে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের প্রকট অভাব দেখা দেয়। দেশের এই পরিস্থিতিতে মওলানা ভাসানীর ডাকে তিন সেপ্টেম্বর ঢাকায় কিছু কিছু স্থানে ভুখা মিছিল বের করা হয়। পরে পল্টনে জনসভা হয়। সমাবেশে ভাসানী সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন।

এই সমাবেশের কয়েকদিন আগে ১৯৭২ সালের ২১ আগস্ট জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের সদস্য পদ দানের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চীন ভেটো দেয়। কয়েকটি চীনাপন্থী দল-উপদল চীনকে অভিনন্দন জানায়। বাকি চীনাপন্থীরা বিব্রত হয়। ভাসানী শুধুমাত্র একটি বিবৃতি দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন। জাতিসংঘ সদস্যপদ অর্জনের জন্য তিনি আন্দোলনের ডাক দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। ভেটো প্রদানের ৪ দিন পর ১৯৭২-এর ২৫ আগস্ট ভাসানী ভারতকে বাংলাদেশের এক নম্বর শত্রু বলে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, প্রতি দিন প্রায় ত্রিশ লাখ ভারতীয় নাগরিক স্বল্পকালীন সফর উপলক্ষে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির জন্য এরা মূলত দায়ী বলে তিনি অভিযোগ করেন। এই বিপুল সংখ্যা তার কল্পনাপ্রসূত যে, তা সে সময়ই সংবাদপত্রে সমালোচিত হয়। বাংলাদেশ সফরে ভারতীয় নাগরিকদের পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি সংগ্রহ করতে হবে বলে ভারত সরকারের নির্দেশ দেওয়ারও আগে দৈনিক ৩০ লাখ লোকের পক্ষে বাংলাদেশে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। ২৫ আগস্ট ’৭২ থেকে ভারত-বাংলাদেশে উভয় দেশে ভিসা প্রবর্তিত হয়। ফলে বাংলাদেশ সফরকারী ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা ছিটেফোঁটা বলে বিবেচিত হয় (সাংবাদিক এ এল খতিব)।

১৯৭২ সালের ২৪ আগস্ট দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে মওলানা ভাসানী বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিবিপ্লব আসন্ন।’ কোন রাজনৈতিক শক্তি এই প্রতিবিপ্লবের নেতৃত্ব দেবে, সে সম্পর্কে তিনি খোলাখুলিভাবে কিছু বলেননি। যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারণে জনসাধারণের মধ্যে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় তার সুযোগ গ্রহণ করে ভাসানী প্রতিবিপ্লবের প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন মুজিব সরকারকে। জ্যোতি সেনগুপ্ত তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘মাওবাদী ধর্মান্ধ মোল্লা ও পাকিস্তানপন্থীদের উসকে দিয়ে তিনি বাংলাদেশে প্রতিবিপ্লব ঘটাবার আয়োজন করেছিলেন।’

স্বাধীনতা লাভের পর সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধু সরকার ও আওয়ামী লীগকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করেন মওলানা ভাসানী ১৯৭২ সালের ৩ এপ্রিল পল্টনে অনুষ্ঠিত জনসভায়। গ্রামাঞ্চলে অপর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করে তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন।

এর কয়েকদিন আগে ৪ এপ্রিল ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ ও লন্ডনের ‘দি গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, ‘সিআইএ এবং চীনের সহায়তায় মওলানা ভাসানী বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন।’ ১৯৭২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পল্টনের এক জনসভায় ভাসানী বলেন, ‘জনগণের ইচ্ছায় সরকার পরিচালিত হবে। জনগণকে বাদ দিয়ে সরকার চলতে পারে না।’ তিনি দাবি করেন, ‘সর্বদলীয় সরকার চাই, অন্ন, বস্ত্র দাও, না হলে গদি ছাড়।’ ভাসানী আরো বলেন, ‘জনগণের দুঃখ-দৈন্য দূর করার ব্যাপারে মুজিব সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি গণপরিষদ ও মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে জাতীয় কনভেনশন ডেকে জাতীয় সরকার গঠন করার আহ্বান জানান। সভাশেষে একটি ১৮ দফা স্মারকলিপি পেশ করেন। (গণকণ্ঠ ৪ সেপ্টেম্ব ১৯৭২)

কিন্তু এই মওলানা ভাসানীই ভিন্ন কথা বলেছিলেন ১৯৭১ সালে মুজিবনগরে। এক বৈঠকে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের বৈধতা স্বীকার করে সর্বদলীয় সরকার গঠনের দাবি উত্থাপনকারীদের বলেন, ‘১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তারা পরাজিত হন।’ ভাসানী তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনকারী সমস্ত দল ও সংগঠনের প্রতিনিধিদের এই বৈঠকে বলেন, ‘সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছে অন্যান্য সমস্ত পার্টির প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছে বলে সঙ্গত কারণেই এসব নেতাদের নিয়ে সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠন করা সম্ভব নয়।’ এই বৈঠকে ভাসানীর প্রস্তাব অনুযায়ী মুজিবনগর সরকারের নীতিনির্ধারণ সংক্রান্ত একটি সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়। উপদেষ্টা কমিটির প্রথম বৈঠকে মুজিবনগর সরকারকে বাংলাদেশের একমাত্র বৈধ সরকার বলে মেনে নেয়া হয়। (২১ এপ্রিল ১৯৯২, আজকের কাগজ, এম আর আকতার মুকুল)। অথচ ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের বৈধতার ভিত্তি অপরিবর্তিত থাকা সত্ত্বেও ভাসানী সর্বদলীয় সরকারের দাবি উত্থাপন করেন। জনসভা, বক্তৃতা ও বিবৃতিতে ভাসানী তার ভারতবিরোধী প্রচারণা অব্যাহত রেখে বলেন, ‘বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতীয় নেতার হাতের পুতুল ছাড়া আর কিছুই নয়। ভারতের নির্দেশ অনুযায়ী তারা কাজ করে (গণকণ্ঠ, ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭২)। মাওপন্থী, স্বাধীনতাবিরোধীপন্থী ও তথাকথিত বামপন্থীদের নেতা ভাসানী শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে দাবি তোলেন বাংলাদেশের সংবিধান অবশ্যই পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ ও হাদিসকে ভিত্তি করে রচনা করতে হবে। (৮ অক্টোবর, ১৯৭২ মর্নিং নিউজ)। জামাত- মুসলিম লীগের এ নীতিকেই সামনে তুলে ধরলেন ভাসানী। ধর্মনিরপেক্ষতাকে তুলোধুনো করলেন।

ভাসানী কখনো মুজিবকে নিজের পুত্র বলে অভিহিত করেছেন। কখনো পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলেছেন। কখনো ইন্দিরা গান্ধীর কাছে ভারত-বাংলাদেশ কনফেডারেশন গড়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। কখনো আসামে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য জমি চেয়েছেন ইন্দিরার কাছে।

স্রোতের বিরুদ্ধে যাত্রা

পঞ্চাশের দশকে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর খুব যে সমঝোতা ছিল, তা নয়। আগাগোড়াই এদের মধ্যে নরম ও গরম লাইনের বিভেদ বিদ্যমান ছিল। সোহরাওয়ার্দী যখন উদার পন্থায় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় কর্মসূচি পালন করতে তৎপর, ভাসানী তখন চেয়েছেন ঝাঁপিয়ে পড়তে সংগ্রামে। এ সময় ভাসানীর মধ্যে অনিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পন্থা গ্রহণের প্রবণতা দেখা গেছে।

ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যায়, সোহরাওয়ার্দী-ভাসানী দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছিল ১৯৫৭-এর জানুয়ারি থেকেই। ফেব্রুয়ারিতে তার বিস্ফোরণ ঘটে। ভাসানী ১৯৫৭-এর ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারিতে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশ ডাকেন। যা ‘কাগমারী সম্মেলন’ নামে পরিচিত। সম্মেলনে আওয়ামী লীগে আশ্রয় নেয়া বামপন্থী তাত্ত্বিকরা অভিযোগ তোলেন যে, সোহরাওয়ার্দী সাম্রাজ্যবাদী নীতি সমর্থন করেছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার সংগঠনের নেতৃত্বে চলবে কিনা এটা স্পষ্ট করাই ছিল এই সম্মেলনের মুখ্য উদ্দেশ্য। পররাষ্ট্রনীতির কারণেই করাচি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বি এম কুটি পদত্যাগ করেন। বাগদাদ চুক্তির বিরোধিতা করায় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক ওসমানী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন বলে প্রচার ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী জাতিসংঘে কাশ্মির প্রসঙ্গ তোলেন এবং নিরাপত্তা পরিষদে গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মিরের ভাগ্য নির্ধারণ করার প্রস্তাবের জন্য সোহরাওয়ার্দীকে জনগণ যথেষ্টই সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু বাম তাত্ত্বিকদের অভিযোগ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দহরম-মহরম করেই সোহরাওয়ার্দী তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চান। এসব কিছুর জবাব চাইতেই কাউন্সিল অধিবেশনের আয়োজন করা হয়েছিল।

কাগমারী সম্মেলনের পূর্বদিনে ৬ ফেব্রুয়ারি সন্তোষে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীও যোগ দেন। পাকিস্তান-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল ও বাগদাদ চুক্তি সংস্থার সদস্যপদ প্রত্যাহার ইত্যাদি বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। এসব বিষয় নিয়ে দলের বাম তাত্ত্বিকরা একটি ‘বুকলেট’ও প্রচার করে। ৭ ফেব্রুয়ারি সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে মওলানা ভাসানী এসব চুক্তির সম্পর্কে ঘণ্টাব্যাপী ভাষণে নিন্দা মন্দ করেন। উপস্থিত ৮৯৬ জন কাউন্সিলরদের বড় অংশ এতে বিব্রত হন। শেখ মুজিবকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরানোর সমস্ত আয়োজনই সম্পন্ন হয়েছিল। মূলত বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে বিতর্ক ছিল উসিলা মাত্র। ভাসানী চাইছিলেন তার দিবারাত্রির সঙ্গী এবং তাত্ত্বিক অলি আহাদকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক করতে। কিন্তু সদস্যদের মনোভাব বুঝতে পেরে মওলানা ভাসানী দমে যেতে বাধ্য হন।

‘কাগমারী’ সম্মেলনে ভাসানী যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা আওয়ামী লীগের কৌশল ও কর্মসূচির প্রকৃতি স্থির করে দিয়েছিল। যদিও পরবর্তীকালে মওলানা কেবল অন্য একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বই দেননি বরং বেশির ভাগ সময়ই তিনি আওয়ামী লীগকে তার সমর্থন জানাননি। যেমন- পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে ‘জনগণের বেঁচে থাকার’ অধিকার বলে তিনি যে উল্লেখ করেন, তা ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে এই দল কর্তৃক জনগণকে সংগঠিত করার উপায় হয়ে উঠলেও মওলানা আওয়ামী লীগের সমালোচনায় মুখর ছিলেন।

১৯৫৭ সালের ২৫-২৬ জুলাই ঢাকায় এক গণতান্ত্রিক কনভেনশনের আয়োজন করেন ভাসানী। এ কনভেনশনে ন্যাপ গঠিত হয়। সভাপতি হন ভাসানী। পরের কয়েক বছর এই দল পাকিস্তানের বামপন্থীদের ছত্রছায়া হিসেবে কাজ করে। আবুল মনসুর আহমদের সন্দেহ ছিল আওয়ামী লীগ ভাঙন ও ন্যাপ গঠনের নেপথ্যে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্যা জড়িত থাকতে পারেন। মীর্যার ঘনিষ্ঠ ইস্পাহীনারা কাগমারী সম্মেলনের সংগঠক ভাসানীকে আর্থিক সহযোগিতা দেয়।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় তখন আওয়ামী লীগ ও রিপাবলিকান পার্টি। ভাসানী ৯ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় সরকারের বৈদেশিক নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি প্রদান করেন। দলের একটি অংশ ভাসানীকে সমর্থন করে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ টি এম শামসুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক ছাত্রসভায় ভাসানীর বক্তব্যের কঠোর নিন্দা জানানো হয়। সভায় ভাসানীপন্থী ছাত্ররা হট্টগোল করে। ১৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা যখন সভা করছিল, তখন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান ঘোষণা করলেন যে, ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে সরকার শহীদ মিনার নির্মাণ করবে। একই সঙ্গে ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণা করে পরদিন বিজ্ঞপ্তি জারি হয়। একই দিনে মওলানা আকরাম খাঁসহ আরো অনেকে কাগমারীতে ভাসানী প্রদত্ত ভাষণের প্রতিবাদ করেন। সোহরাওয়ার্দী এক বিবৃতিতে কাগমারী সম্পর্কে কোনো রকম অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হবার আহ্বান জানান। ষড়যন্ত্রকারীদের কারসাজি সম্পর্কে দলীয় সদস্যদেরও সাবধান করে দেন তিনি। (১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭, দৈনিক আজাদী)।

ততোদিনে শেখ মুজিব দলের মূল ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছেন। প্রচার হলো যে, মূল দ্বন্দ্বটি মূলত শেখ মুজিব ও ভাসানীর মধ্যে। বামরা ভাসানীর মাথা বিগড়ে দিয়েছে বুঝতে পেরে ১৬ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব সন্তোষ যান এবং ভাসানীর সঙ্গে দু’ঘণ্টা একান্ত বৈঠক করেন। দু’জনে একসঙ্গে মধ্যাহ্ন ভোজও সারেন। পরদিন সংবাদপত্রে যুক্তবিবৃতি প্রকাশ হয়। তারা সাধারণ মানুষের স্বার্থে আওয়ামী লীগকে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু ক’দিন পরই উল্টে গেলেন ভাসানী। এক বিবৃতিতে বলেন তিনি, আগামী অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগের কমিটিসমূহের কার্যকলাপ গঠনতন্ত্র অনুযায়ী উত্তীর্ণ হবে এবং নয়া নির্বাচন হবে। এই ঘোষণায় শেখ মুজিবসহ অন্য নেতারা বিড়ম্বিত হন।

১৯৫৭-এর ১৭ মার্চ ভাসানী কাগমারীতে বসেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। দলের সাধারণ সম্পাককে দেওয়া পত্রে উল্লেখ করা হয, ‘আরজ এই যে, আমার শরীর খারাপ হইতেছে এবং কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এইবার খুলিতে হইবে; তদুপরি আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার লিডার সদস্যদের নিকট আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির প্রস্তাব ২১ দফা অনুসারে ওয়াদা অনুযায়ী জুয়া, ঘোড়দৌড়, বেশ্যাবৃত্তি ইত্যাদি হারাম কাজ বন্ধ করতে, সামাজিক ধর্মীয় বিবাহ বন্ধনের উপর ট্যাক্স ধার্য করা জনমত অনুযায়ী বাতিল করতে আবেদন জানাইয়া ব্যর্থ হইয়াছি। ভয়াবহ খাদ্য সংকটেরও কোনো প্রতিকার দেখিতেছি না। ২১ দফার বাস্তবায়নে অর্থব্যয় যাহাতে খুব কমই হইবে তাহাও কার্যকরী করিবার নমুনা না দেখিয়া আমি আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ হইতে পদত্যাগ করিলাম।”

২১ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিব বলেন, মওলানা ভাসানী পদত্যাগ পত্র প্রত্যাহার না করলে তিনি নিজেও পদত্যাগ করবেন বলে একটি পত্রিকায় যে বিভ্রান্তিকর খবর ছাপা হয়েছে, তা সত্য নয়। ভাসানীর পদত্যাগ পত্রটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হবে। ৩০ মার্চ কেন্দ্রীয় কমিটির সভা বসে। ৩৬ জন সদস্যর মধ্যে ৩০ জন হাজির হন। ভাসানী অনুপস্থিত থাকেন। সভায় দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় অলী আহাদকে তার উপস্থিতিতে সাময়িক বরখস্ত করা হয়। আর শেখ মুজিবকে দায়িত্ব দেয়া হয়, ভাসানীর সঙ্গে যোগাযোগ করে পদত্যাগ নিয়ে কথা বলার জন্য। ১৯৫৭ সালের ১ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় অনুষ্ঠিত এক জনসভায় ভাসানী সরাসরি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তার সঙ্গে ছিলেন অলি আহাদ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, মহিউদ্দিন আহমদ, নুরুর রহমান (তখন তিনি কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী)। ভাসানী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র ও পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে আদৌ আন্তরিক নয় বলেও মন্তব্য করেন।

জনসভার পর মওলানা ভাসানী উধাও হয়ে গেলেন। কেউই আর তাকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্র থেকে তাঁকে আলোচনার আমন্ত্রণ জানালেও সে খবর তাঁকে পৌঁছানো যায়নি। ভাসানী অজ্ঞাতস্থান থেকে টেলিগ্রাম পাঠান সোহরাওয়ার্দীকে যে তিনি তার শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারছেন না। তদুপরি সোহরাওয়ার্দী আবার তাকে আলোচনার আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু ভাসানী কোনো জবাব দেননি। বরং ২২ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বললেন, ‘আমি আর এদের সাথে একসঙ্গে কাজ করতে পারি না। যারা কথা দিয়ে কথা রাখে না, যারা ক্ষমতায় গিয়ে মূল আদর্শগুলো ভুলে যায়, যারা জনতার দাবির সঙ্গে বেইমানি করে, যারা নিজেদের রচিত সংবিধান নিজেরাই মানে না। সুতরাং আওয়ামী লীগ থেকে আমার পদত্যাগের ব্যাপারটি চূড়ান্ত। আমি কোনো অবস্থাতেই মত বদলাবো না।’

ভাসানীর এই ঘোষণায় স্তম্ভিত হন সোহরাওয়ার্দী, আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিব। কেননা ভাসানী লোক মারফত ১০ এপ্রিল জানিয়েছিলেন যে, তিনি প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর সাথে আলাপ-আলোচনা করে তার পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন। কয়েকটি শর্তের কথাও তিনি উল্লেখ করেছিলেন। যা মেটানো তেমন কঠিন ছিল না।

১৭ এপ্রিল দৈনিক আজাদ ‘মওলানা ভাসানীর সন্ধানলাভ’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ‘গতকল্য সন্ধ্যায় ঢাকায় প্রাপ্ত সংবাদে জানা গিয়েছে যে, সিরাজগঞ্জ মহকুমার সোহাগপুর গ্রামের নিকট যমুনা নদীতে একটি নৌকায় পূর্ব পাক আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে, মওলানা ভাসানীর সন্ধানের জন্য গত রবিবার সিরাজগঞ্জ মহকুমা কর্তৃপক্ষের নিকট ঢাকা হইতে রেডিও প্রোগ্রাম ঘোষণা করা হয়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য যে, প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর সহিত আলাপ-আলোচনার পর মওলানা সাহেব পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করিবেন বলিয়া কিছুদিন আগে প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি যে সংবাদ প্রকাশ করিয়াছিলেন, তাহার পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ এপ্রিলের মধ্যে মওলানা সাহেবকে করাচি গমনের অনুরোধ জানাইয়া মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান ও শিল্পমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সম্প্রতি ঢাকায় যে তার প্রেরণ করিয়াছেন, মওলানা সাহেবকে তাহা পৌঁছাইয়া দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাজউদ্দিন সোহাগপুর রওয়ানা হইয়া গিয়েছেন।’ ভাসানী ঢাকায় এসে করাচি যাবার প্রস্তুতি নিলেও অলি আহাদ ও অধ্যাপক মোজাফফরের সঙ্গে আলোচনা করে যাবার আগমুহূর্তে মত পাল্টান। ২২ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগ চূড়ান্ত বলে ঘোষণা দেন। এর পর পরই সারা দেশে আওয়ামী লীগ দু’ভাগ হতে থাকে। শেখ মুজিব ভাসানীর সঙ্গে বৈঠক করেও ব্যর্থ হন ফেরাতে।

ভাসানী ১৮ ও ১৯ মে বগুড়ায় কৃষক সম্মেলনের আয়োজন করেন। এখানে তিনি আওয়ামী লীগকে ‘সাম্রাজ্যবাদের পুতুল’ বলে আখ্যায়িত করেন। আওয়ামী লীগের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ মূলত মন্ত্রীদের খপ্পরে। সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ আজ নিঃস্ব।’

১৯৫৭ সালের ১৩ ও ১৪ জুন অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে মওলানা ভাসানী উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখেন এবং হঠাৎ সভাস্থল ত্যাগ করেন। এর আগেই ভাসানী নয়া দল গঠনের প্রস্তুতি শুরু করেন কাউন্সিলে ভাসানীকে সভাপতি রেখেই নতুন কমিটি হয়। কিন্তু মওলানা আর দলে ফেরেননি। অগত্যা ২ সেপ্টেম্বর আবদুর রশিদ তর্কবাগীশকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। আর ভাসানী ২৫ ও ২৬ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত গণতন্ত্র কনভেনশনে গঠন করলেন নয়া দল ন্যাপ। স্রোতের বিপরীতে শুরু করেন তার অনন্তযাত্রা।

‘মুসলিম বাংলা’র স্বপ্নকার

অসমের ভাসান চর থেকে উঠে আসা মানুষটি সাধারণের সঙ্গে মিশে যেতেন অনায়াসে। মানুষের মঙ্গলের কথা, কল্যাণের কথা, শোষিত হবার কথা বলতেন। পশ্চাৎপদ মানুষের সঙ্গে ছিল ওঠাবসা। আর সেখান থেকে ক্রমশ তিনি বৃক্ষের মতো বেড়ে ওঠে ডালপালা ছড়াতে থাকেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষটি একসময় পরশ্রীকাতরতা, হিংসা, শাসক তোষণ, সাম্প্রদায়িতকতার ঘেরাটোপে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। নানা চেতনার মানুষরা তাঁকে কেন্দ্র করে নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধিতে নেমে পড়ে। শোষিত মানুষের যারা মুক্তি চায়, তিনি নিজেও চাইতেন, অথচ তাদের বিরুদ্ধে তিনি সহিংস পদক্ষেপ নিতেও পিছপা হননি। লাখ লাখ মানুষের আত্মদানে গড়ে ওঠা দেশের নামও পাল্টে ফেলতে চেয়েছেন। যুদ্ধবিপর্যস্ত, অভাবগ্রস্ত দেশকে উদ্ধার নয়, বরং তাকে আরো বিপর্যস্ত করে তোলায় তার ভূমিকা ছিল অত্যধিক। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতাকারীদের হয়ে উঠলেন প্রতিভূ। ‘ধংসের গর্জনে হানো’ হয়ে অরাজকতার পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বাঙালির কাছে একজন সংগ্রামী জননেতা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই পরিচিতির আড়ালে তিনি এবং তাঁকে কেন্দ্র করে বেড়ে ওঠা নানা গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়াশীল, গণবিরোধী তৎপরতা চাপা পড়ে থাকলেও ইতিহাসের পথপরিক্রমায় তা ক্রমশ উন্মোচিত হচ্ছে। স্ববিরোধিতায় আকীর্ণ মওলানা ভাসানী জনগণের ভাষা বুঝলেও, তার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেননি। তার বলয়ের নানা গোষ্ঠী নানা সময়ে নানাভাবে ব্যবহার করায় তিনি স্থির অবিচল ছিলেন না কোনো ক্ষেত্রেই। আজ যাকে প্রশংসা, অভিনন্দিত করছেন, পরদিনই তাকে নিন্দামন্দ করছেন।

মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে মওলানা ভাসানী ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। বরং ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দটি স্বাচ্ছন্দ্যে উচ্চারণ করেছেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রে তার শেষ ভাষণেও তিনি তাই করেছেন। যখন সাত কোটি মানুষ ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দটিকে দলিত মথিত করে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটিকে বুকে ধারণ করেছে। ১৯৭০ সালেও তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছেন। সামরিক শাসকদের পক্ষে নির্বাচন বর্জন করেছেন শুধু নয়, ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো’ ধ্বনি দিয়ে ‘ভোটের আগে ভাত চেয়েছেন।’ এই চাওয়াটা সামরিক জান্তার কাছে। অথচ বাংলার জনগণ ততোদিনে ৬ দফার ভিত্তিতে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর। তারা শেখ মুজিবকে নেতা মেনে সামনে অগ্রসরমান। ভাসানীর ভোটের বিরোধিতা বাংলার মানুষ স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। বরং অতীতের মতো ভাসানীর পাকিস্তানি শাসকচক্রের ক্রীড়নক আচরণ হিসেবেই মূল্যায়িত করেছে। একাত্তরের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনিও মাঠে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে বেড়িয়েছেন। জনগণের ভাষা পাঠ করে তিনিও স্বাধীনতা চেয়েছিলেন। তবে তা ‘বাংলাদেশ’ এর নয়, তিনি ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ চাইলেন। লাহোর প্রস্তাবকে সামনে রেখে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বাঙালি মুসলমানের রাষ্ট্র হিসেবে তিনি ‘পূর্ব-পাকিস্তান’ এর স্বাধীনতার কথা বললেন ৯ মার্চ পল্টন ময়দানে। জনতার সমুদ্রে দাঁড়িয়ে তিনি পাকিস্তানকে ভাগ করে দু’টো স্বাধীন দেশ গঠন করার জন্যে ইয়াহিয়ার প্রতি আহ্বান জানান। কিন্তু ভুল করেও এইদিনও তিনি ‘বাংলাদেশ’ কথাটি ব্যবহার করেননি।

পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সামরিক শাসক ইয়াহিয়াকে আশ্বস্ত করেছিল যে, ভাসানীর নির্বাচনবিরোধী আন্দোলনের ফলে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গোয়েন্দাদের এই টোপ গিলেছিলেন ভাসানী ও তাঁর দল। তারা নির্বাচন বর্জন করার হুমকি দিয়ে আগে ভাতের অধিকার চেয়ে ‘মজলুম’ জনগণের পক্ষে কথা বলছেন, এমন আচরণ করতে থাকেন। অথচ বাংলার জনগণের কাছে যে কোনো মূল্যে নির্বাচন তথা ভোটাধিকার এবং তার মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে, তখন তিনি নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার জন্য ভোটের বাক্সে লাথি মারার ঘোষণা দিয়ে সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে উসকে দিতেও চেয়েছিলেন মুজিবের বিরুদ্ধে। নির্বাচনে দেখা যায় ভাসানীর বর্জন ঘোষণা সত্ত্বেও স্থানীয় পর্যায়ে তার অনুসারীরা আওয়ামী লীগ বিরোধী প্রার্থীদের ভোট দেয়। যে কারণে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা বেশি ভোট পেয়েছে ভাসানী ন্যাপ অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলোতে। আওয়ামী লীগের ব্যাপক বিজয় ভাসানী ন্যাপ মেনে নিতে পারেনি। আওয়ামী লীগের হাতে পাকিস্তানের তথা পূর্ব বাংলার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা যাবে এমনটা ভাসানী ন্যাপের পক্ষে মেনে নেওয়া ছিল দুষ্কর ও কষ্টসাধ্য। পিকিংপন্থী দলটি ও অনুসারীদের তাই মুক্তিযুদ্ধকালে নানা ভাগে দেখা যায়। কেউ যুদ্ধে গেছে, কেউ পাকিস্তানিদের পক্ষে, কেউ দুই পক্ষেরই বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। এরা কেউই শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হবে এমন বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারেননি। চীনের বাংলাদেশ বিরোধিতার কারণে পিকিংপন্থীরা সেই নীতিই অবলম্বন করেছেন- এমনটা ধারণা করা যায় যে, ভাসানী টাঙ্গাইল না হয়ে ঢাকায় অবস্থান করলে ২৫ মার্চের পর দেশত্যাগ করার সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ। এমনকি মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করার বিষয়টিও হতো সুদূরপরাহত।

বাংলাদেশ হানাদার দখলমুক্ত হবার তিন মাসের মাথায় ভাসানী ‘জ্বালাও-পোড়াও নীতি’র পথ ধরলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ার বিপরীতে বিপর্যস্ত করে তোলায় সক্রিয় হন। এমনকি রক্তদামে কেনা দেশের নাম বদলানোর প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গেও কণ্ঠ মেলান। স্বাধীনতার পর বেআইনি ঘোষিত জামায়াত, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও পিডিপির আত্মগোপনকারী নেতাদের একটা অংশ ভাসানীর ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেয়। তারাও ভাসানী ও ভুট্টোর প্রেরণা এবং উৎসাহ পেয়ে ‘মুসলিম বাংলা’ প্রতিষ্ঠার গোপন তৎপরতায় লিপ্ত হয়। তখন লন্ডন থেকে প্রকাশিত জামায়াত সমর্থক ‘সংগ্রাম’ পত্রিকা মুসলিম বাংলা আন্দোলনের পক্ষে প্রচার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছিল। ডাকযোগে পত্রিকাটি প্রচুর সংখ্যায় বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছিল। মওলানা ভাসানী এসব অশুভ শক্তির গোপন তৎপরতার প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন দিয়ে বলেন, ‘মুসলিম বাংলার জন্য যারা কাজ করছে, তাদের আমি দোয়া করি, আল্লাহর রহমতে তারা জয়যুক্ত হবে। (গণকণ্ঠ, ১৫ জুন’১৯৭১)।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে ভাসানীর পত্র যোগাযোগ ছিল। এবং তা বাংলাদেশ সরকারেরও অজানা ছিল না। লন্ডন থেকে প্রায় একডজন পত্র বিশেষ পত্রবাহকের মাধ্যমে টাঙ্গাইলের সন্তোষে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার খবর বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ জানতে পারে। পত্রের মাধ্যমে ভুট্টো ‘মুসলিম বাংলা’র ব্যাপারে ভাসানীর সাহায্য চায়। এর বিনিময়ে তিনি ‘যা কিছু চান, তা পাবেন’ বলে আশ্বাস দেয়া হয়। (হিস্টোরি অব ফ্রিডম মুভমেন্ট ইন বাংলাদেশ : জ্যোতি সেন গুপ্ত)।

মওলানা ভাসানী ‘খোদাই খিদমতগার’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম দেন। তাঁর ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক অনুসারীরা এই সংগঠনের ছত্রছায়ায় ‘মুসলিম বাংলা’র পক্ষে তৎপরতা চালায়। এই সংগঠনে অধিকাংশই স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর সদস্যরা ছিল। এটাই হয়ে ওঠে তাদের আশ্রয়স্থল। এছাড়া ‘স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী’ নামে একটি লাঠিয়াল বাহিনীরও বিকাশ ঘটান। ১৯৭৩ সালের ১১ জানুয়ারিতে মুজিব সরকারকে উৎখাত করার জন্য এক ডজনেরও বেশি দল-উপদল গ্রুপ নিয়ে একটি ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটি ২১ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে যে জনসভা করে, তাতে ভাসানী বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে আমি ভিয়েতনামে পরিণত করবো।’ শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘মুজিব, তুমি আমার সঙ্গে পিকিং বলো, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে গণচীনের স্বীকৃতি আদায় করবো। আমেরিকা চলো, যতো সাহায্য দরকার এনে দেবো। পাকিস্তান চলো, পাঁচ লাখ বাঙালিকে মুক্ত করে আনব।’ (ইত্তেফাক, ২২ জানুয়ারি ১৯৭৩)।

পাকিস্তান ও গণচীন যেহেতু ভারত ও সোভিয়েত বিরোধী, তাদের মতবাদপুষ্ট মওলানা ভাসানীও ভারত রুশ বিরোধিতায় সোচ্চার হয়ে ওঠেন ক্রমশ। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেয় ভাসানী ন্যাপ। সব ক’টি আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি। ভাসানী নিজে নির্বাচনে অংশ না নিলেও দলীয় প্রচারণা অব্যাহত রাখেন ভারত বিরোধী স্লোগান ও জজবা তুলে। ভারত যে বাংলাদেশকে দখল করে নেবে এমন জুজুর ভয় দেখাতে থাকেন। ‘ভারতের গোলামীর জিঞ্জির’ ভেঙে বাংলাকে ‘আজাদ করাই ছিল ভাসানীর নির্বাচনী ওয়াদা। নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে তার সমর্থক প্রার্থীরাও অবাধে সাম্প্রদায়িক প্রচার ও প্ররোচনা চালায়। বরিশাল শহরের আসনে যেখানে ভাসানী ন্যাপের ডাকসাইটে তরুণ নেতা প্রার্থী ছিলেন, সেখানে ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম, মুজিববাদের অপর নাম’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে মিছিল করে। এমনকি তারা ‘হিন্দুরা যদি বাঁচাতে চাও, বাংলা ছেড়ে চলে যাও’ এমন হুমকিও প্রকাশ্যে করা হয়েছে। (৬ এপ্রিল ১৯৭৩ সাপ্তাহিক একতা)। নির্বাচনে ভাসানীর দল একটি আসনও পায়নি। বহু আসনে প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। পরাজয়ের গøানিতে ভাসানী সরকারের বিরুদ্ধে অনর্গল ভাষণ ও তৎপরতা চালাতে থাকেন। দেশ গড়া বা সমাজতন্ত্র নিয়ে কোনো ভাষ্য না দিয়ে তিনি ইসলামী জজবা তোলেন।

ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলের সন্তোষে ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল ‘মুসলিম সম্মেলনের’ আয়োজন করেন। এতে যোগদানের জন্য প্রকাশিত লিফলেটের আর্জিতে ‘খাদেমুল ইনসান’ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী উল্লেখ করেছেন, ‘যে মুসলমান সমাজ এককালে বিশ্বের সেরা জাতি ছিল, দিল্লিতে সাতশ বছর জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের ন্যায়পরায়ণ বাদশা ছিল, আজ তাহারাই পথের কাঙাল হইয়া পড়িয়াছে। বিধর্মীরা কতিপয় হিন্দুস্থান সরকারের দালাল মুসলমানদের সহায়তায় রাস্তাঘাটে যেখানে সেখানে নিরপরাধ মুসলমানদিগকে অপমান, অপদস্ত ও মারপিট করিতেছে।….. আমাদের ধর্মের বিধান ও আল্লাহর আদেশ- বিধর্মীরা যদি মুসলমানদের প্রতি অন্যায়ভাবে প্রথমে আক্রমণ না করে তাহা হইলে তাহাদের কখনও আক্রমণ করা যাইবে না। তাহাদের ধর্মের কোন প্রকার বিঘ্ন ঘটানোও যাইবে না। কিন্তু যদি তাহারা অন্যায়ভাবে মুসলমানদিগকে আক্রমণ করে, তাহা হইলে উহা কিছুতেই বরদাস্ত করিবে না, পাল্টা আক্রমণ করিয়া সমুচিত শাস্তির ব্যবস্থা করিতেই হইবে।’

মওলানার আবেদন তথা আর্জিতে আরো উল্লেখ করা হয়, ‘আমি কঠিন রোগে আক্রান্ত হইয়া অনেকদিন ঢাকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। বর্তমানে সন্তোষে ফিরিয়া আসিয়া জানিতে পারিলাম, টাঙ্গাইল জেলার এক শ্রেণীর ‘হিন্দুস্তানের দালালরা’ মুসলমানদের উপর নানাভাবে নির্যাতন চালাইতেছে। কিছু সংখ্যক উগ্রপন্থী হিন্দু আওয়ামী লীগ ইলেকশানে জয়লাভ করিবার পর হইতে মুসলমানদের উপর প্রকাশ্যভাবে নির্যাতনের স্টিম রোলার নির্বিবাদে চালাইয়া যাইতেছে। জানিতে পারিলাম, তাহারা একজন প্রবীণ মুসলমানের দাড়ি পর্যন্ত টানিয়া তুলিয়াছে।’

ভাসানীর এই আহ্বান বা আর্জি ‘জ্বেহাদ’ নামক একটি বুলেটিনে ছাপানো হয়। ১৯৭৩ সালের ২৪ মার্চ প্রকাশিত এই বুলেটিনের উপ-শিরোনাম : ‘মুসলিম জাহানের মুক্তির পথ-১’। তার নিচে লেখা প্রকাশক ও পৃষ্ঠপোষক : ‘মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।’ ঢাকার ফুটপাতের পত্রিকা ও বুকস্টলে ‘শুভেচ্ছা মূল্য ২৫ পয়সার’ বিনিময়ে অবাধে বিক্রি হয়। (৬ এপ্রিল ১৯৭৩ সাপ্তাহিক একতা)। এই মুসলমান সম্মেলনে মওলানা ‘মুসলিম বাংলা’র জিগির তোলেন। এবং মুজিব সরকারকে উৎখাত করে ইসলাম কায়েমের কথা বলেন।

খাদ্য দ্রব্যমূল্য হ্রাসসহ মওলানা ভাসানী তার তিনদফা দাবির সমর্থনে প্রস্তাবিত আমরণ অনশনের শুরুতে অনুষ্ঠিত গণসমাবেশে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বের ভুলনীতি অনুসরণ করার ফলে উক্ত পরিণতি অবশ্যম্ভাবী। তিনি আরো বলেন, ‘এই দু’টি দেশ এ দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু।’ ১৯৭৩ সালের ১৪ মে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে ভাসানী সদর্পকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘অতি শিগগিরই আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হবে এবং ঢাকার বাড়িঘরের উপর মুসলিম বাংলার পতাকা উড়বে।’ ভাসানী অভিযোগ করেন, ‘বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অত্যধিক মূল্যের জন্য ভারত দায়ী। কারণ চোরাকারবারিদের সহায়তায় তারা এ দেশ থেকে প্রায় সবকিছু নিয়ে যাচ্ছে। দুর্ভিক্ষের অবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশকে ভারতের কাছে সাহায্য চাইতে বাধ্য করাই তাদের উদ্দেশ্য। এর ফলে ভারত আমাদের দেশকে অখণ্ড ভারতের অঙ্গে পরিণত করার সুযোগ পাবে।’

গণসমাবেশে ৯১ বছর বয়সী ভাসানী এরপর ভারতের সাহায্য না চেয়ে তাঁর সঙ্গে পাকিস্তান ও চীনে যাওয়ার প্রস্তাব করে বলেন, ‘শেখ মুজিবর, আমি তোমাকে আশ্বাস দিচ্ছি; তুমি যদি আমার সঙ্গে রাওয়ালপিন্ডি ও পিকিং যাও, তাহলে আমরা শুধু পাকিস্তান ও চীনের স্বীকৃতি শুধু নয়, উদরপূর্তির জন্য চালও পাবো। ভারত ও রাশিয়া তোমাকে বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে পারবে না।’

পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের মুক্তিদানের জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর প্রতি আবেদন জানিয়ে ভাসানী গণসমাবেশে বলেন, ‘মি. ভুট্টো, আপনি কেন আমাদের স্বীকৃতি দিচ্ছেন না? আপনি যদি স্বীকৃতি দেন, তা হলে আমাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবেন। এই সে দিন পর্যন্ত এদেশ পাকিস্তানি মালপত্রের সবচেয়ে বড় বাজার ছিল এবং আবারও তাই হবে। আপনাদের মালপত্র নিয়ে এদেশে আসলে ভারতের পচা মালপত্র আসা বন্ধ হবে।’

সমাজতন্ত্রের নেতা ভাসানী বলেন, ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনের পর তিনি স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের ডাক দিয়েছিলেন। ‘বাংলাদেশ ভারতের গোলাম পরিণত হোক তা আমরা চাই না’ বলে মন্তব্য করে ভাসানী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ যদি ভারতের ক্রীড়নক থাকার নীতি অব্যাহত রাখে, তা হলে আজ যারা পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে বিচারাধীন রয়েছে, তারাই ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে তাদের বিচার করবে।’ সরকারি কার্যপরিচালনাকালে শেখ মুজিব আগের চেয়ে কম ধর্মপরায়ণ এবং সারাদিন একবারও আল্লাহর রহমত না চাওয়ার জন্য ভাসানী শেখ মুজিবের সমালোচনা করেন।

‘অসাম্প্রদায়িক’ নেতা হিসেবে একদা খ্যাত ভাসানী নিজের মুখোশ উন্মোচন করে গণসমাবেশে বাংলাদেশে বসবাসকারী হিন্দুদের সাবধান করে দিয়ে বলেন, তারা যদি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে তাদের নিরাপত্তা এবং স্বার্থরক্ষার নিশ্চয়তা পাবে বলে ভেবে থাকে, তাহলে তাদের ভাগ্য বিহারীদের মতো হবে।’ জয় বাংলা অথবা আওয়ামী লীগ তোমাদের রক্ষা করতে পারবে না, তোমাদের ভাগ্য বিহারীদের মতোই হবে।’ (১৫ মে, ১৯৭৩ দি স্টেটসম্যান, কলকাতা)।

বঙ্গবন্ধু মওলানা ভাসানীকে ‘হুজুর’ সম্বোধন করতেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভাসানীকে মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ওই উপদেষ্টা পরিষদ বিলুপ্ত করায় সম্ভবত ভাসানী মনঃক্ষুণ্ন হয়ে বঙ্গবন্ধুর বিরোধী ভূমিকা অবলম্বন করেছেন যেমন সত্য, তেমনি তাতে চীন ও পাকিস্তানের মদদ ছিল। মওলানা অসুস্থ হয়ে পড়লে বঙ্গবন্ধু তাঁকে ১৯৭৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সন্তোষ থেকে নিয়ে এসে পিজি হাসপাতালে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। ৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে অসুস্থ মওলানাকে দেখতে যান এবং তাঁর কুশলাদি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলে বেশ কিছু সময় কাটান। (৬ মার্চ ১৯৭৩ ইত্তেফাক)।

জাসদের সাধারণ সম্পাদক আসম আবদুর রব ১৯৭৩ সালে গোপনে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করে মুজিব সরকার বিরোধী আন্দোলনে তাকে নেতৃত্বদানের অনুরোধ করেন। ভাসানী তখন তাকে বলেছিলেন, ‘মুজিব বেইমান, মীরজাফর, তাঁকে উৎখাত করতে হবে।’ (১০ নভেম্বর, ১৯৮৮ সংসদে রব)।

হক কথার আড়ালে না হক বাণী

আওয়ামী মুসলীম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে সংগঠনটি বাংলার মানুষের হৃদয়াবেগে ঠাঁই পেতে শুরু করে। কিন্তু কয়েক বছরের মাথায় ভাসানী দলটি পরিত্যাগ করেন। বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মার্কিনের পক্ষ সমর্থন প্রশ্নে দল থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন বলা হলেও নেপথ্য কারণ ছিল, নেতৃত্বের প্রশ্ন। ভাসানী যাকে সাধারণ সম্পাদক করতে চেয়েছিলেন, দলীয় অবস্থানগত কারণে তাকে তা করা যায়নি। এই প্রশ্নে মন কষাকষি থেকে বিরোধিতা মাত্রা পায়। এমনটাই মেলে পুরনো ইতিহাসের খেরো খাতায়। অথচ শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর হবার কথা ছিল মওলানার। ‘মজলুম’ নেতার অনুসারীদের একটা অংশ জুলুমবাজির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে। থানা, ফাঁড়ি ও অস্ত্রলুট এবং গুপ্তহত্যার বিপরীতে ভাসানী ছিলেন নীরব, নির্বিকার। ভাসানী তার দলের সেক্রেটারি থেকে শেখ মুজিব নেতা হতে জননেতা এবং অবশেষে জাতির পিতা হলেন-ভাসানী তা মেনে নিতে পেরেছিলেন, এমনটা নয়। বরং এসব ঘটনার ব্যাপকতা বাড়ানোর পক্ষেই ছিল তার সব কর্মসাধনা।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, হতশ্রী দরিদ্র দেশ কিন্তু তাকে টানেনি, পুনর্গঠন প্রশ্নে। বরং বিধ্বস্ত দেশকে আরো বিধ্বস্ত করে তোলায় ভাসানীর অবদান সর্বাপেক্ষা বেশি। আবেগতাড়িত মওলানা আবেগাপ্লুত বাঙালি জাতিকে হ্যামিলনের বংশীবাদক হিসেবে মুক্তির পথ ধরে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি সে পথ মাড়াননি। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার সম্মোহনী শক্তিধর ছিলেন। তাই স্বাধীনতার পথে, মুক্তির রথে ভাসানীকে সর্বাগ্রে দেখার কথা। কিন্তু তিনি ভিন্ন পথ ধরলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার দলের লোকজনের অংশগ্রহণ ছিল নামমাত্র। শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা অধিকাংশ পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করেছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

মওলানা ভাসানী নিজে ভারতে অবস্থান করলেও তার দলের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও হয়নি। মূলত দলের কাউকেও তিনি পাননি পাশে। তবে তার দলছুট সাবেক অনুসারীদের একটা অংশ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।

ভারতে অবস্থানকালে মওলানা ভাসানী অধিকাংশ সময়ে হাসপাতালে কিংবা বিভিন্ন স্বাস্থ্য নিবাসে কাটান ভারত সরকারের অতিথি হিসেবে। ১৯৭২ সালের শেষ দিকে ভারতের লোকসভায় এক প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়, ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারত সরকার মওলানা ভাসানীকে ভিআইপি হিসেবে গণ্য করেন। তাঁর থাকা-খাওয়া এবং চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার ভারত সরকার বহন করে। তাছাড়া হাত খরচের জন্য তাঁকে মাসিক দু’হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হতো। শুধু চিকিৎসার জন্য ব্যয় হয় ৪৭ হাজার টাকা। (জ্যোতি সেনগুপ্ত : হিস্টোরি অব ফ্রিডম মুভমেন্ট ইন বাংলাদেশ)।

১৬ ডিসেম্বর দেশ মুক্ত হবার পর ভাসানী দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। মিসেস গান্ধী স্বহস্তে নগদ সাত হাজার টাকা একটি স্কার্ফে জড়িয়ে ভাসানীর হাতে তুলে দেন। ভাসানী স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্যদানের জন্য অশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, পাকিস্তানি সেনারা বাংলাদেশকে ধ্বংসস্তুূপে পরিণত করেছে। দেশে ফেরার পর তাঁর ভরণ-পোষণ কি করে চলবে, তিনি জানেন না। মিসেস গান্ধী তাঁকে বিমুখ করেননি। তাঁর হাতে টাকার পুঁটুলি তুলে দেওয়ার কথা মিসেস গান্ধী ১৯৭২-এর মার্চে ঢাকা সফরকালে বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে তথ্যটি পান সাংবাদিক আবদুল মতিন জেনেভাতে। ঢাকায় ফিরে মওলানা ভারতীয় হাইকমিশনারকে তাঁর বাড়ি তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় টাকার প্রথম কিস্তি হিসেবে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার অনুরোধ করেন। বলাবাহুল্য তাঁর এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়। (বাংলাদেশ ইন ব্লাড এন্ড টিয়ার্স : জ্যোতি সেনগুপ্ত)।

১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশে প্রবেশের পর ভাসানী তার দল ন্যাপকে পুনর্গঠন শুরু করেন। দলে হানাদারদের কোলাবরেটরও ছিল। এরপরই তিনি প্রকাশ করেন ‘হক কথা’ নামে একটি সাপ্তাহিক টেবলয়েড আকারের পত্রিকা। রাজনীতির ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত এক নতুন ভক্ত ইরফানুল বারীকে তিনি পত্রিকাটির সম্পাদক করেন। পত্রিকাটিতে বঙ্গবন্ধুর সরকার এবং ভারত ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে বল্গাহীন প্রচারণা চলতে থাকে। চরম ভারতবিদ্বেষী এই পত্রিকাটি নিয়মিতভাবে যে সব সংবাদ ফলাও করে প্রকাশ করে, তা জামায়াতে ইসলামীর প্রচারকাণ্ডের কার্বন কপি বলা যায়। ভিত্তিহীন, বানোয়াট এবং গুজবকে বেশ রসিয়ে চাতুরতার মোড়কে ছাপা হতো। ভারত ও রাশিয়ার সমালোচকদের উৎসাহের সঙ্গে সমর্থন করা হতো। তাদের বক্তৃতা বিবৃতি খবর হিসেবে ছাপিয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়া হয়। জামায়াত, মুসলিম লীগসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের রক্ষাকবচে পরিণত হয় কাগজটি। সাম্প্রদায়িক উসকানিদানেও প্রবৃত্ত হয়।

‘হক কথা’ পত্রিকায় মওলানা ভাসানীর একটি অভিযোগ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়। অভিযোগটি হলো- ‘কলকাতার রাস্তাঘাটে বাংলাদেশের মোটর গাড়ীতে ভর্তি হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাদের নিয়ে যাওয়া এসব মোটর গাড়ীতে পূর্ব পাকিস্তানের ‘নম্বর প্লেট’ রয়ে গেছে।’ তার অভিযোগ সম্পর্কে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমণ শুরু হওয়ার পর পরই বাংলাদেশের লোকজন তাদের নগদ সঞ্চয় স্থানান্তরযোগ্য সম্পত্তি ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেদের গাড়ি নিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। কলকাতার পুলিশ বাংলাদেশের গাড়িগুলোর জন্য একটি বিশেষ রেজিস্ট্রেশন নাম্বার (ডব্লিউজেবি) দিয়েছিল। বাংলাদেশ মুক্ত হবার ক’দিনের মধ্যেই প্রবাসী সরকারের মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা এবং অন্যান্যরা দেশে ফিরে আসতে শুরু করলে এসব যানবাহনও ক্রমশ কলকাতা থেকে সরে যায়।’

‘হক কথা’ পত্রিকাটি বাংলাদেশকে মুসলিম বাংলায় পরিণত করার পক্ষে জোরালো ভাষায় নিবন্ধও প্রকাশ করতো। ‘হক কথা’র ভূমিকা ক্রমশ দেশ, সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলে যায়। ১৯৭২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর দেশবিরোধী অপপ্রচারসহ উসকানিমূলক ভারত ও রুশ বিরোধী পত্রিকা ‘হক কথা’ নিষিদ্ধ করা হয়। দৈনিক বাংলার ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ সংখ্যায় বলা হয়, ‘রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের দায়ে সরকার ‘হক কথা’, ‘মুখপত্র’ এবং ‘স্পোকসম্যান’ নামে তিনটি সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রকাশনা নিষিদ্ধ করেছে।

হক কথার অনুরূপ প্রোপাগান্ডা চালাতো এনায়েত উল্লাহ খানের সাপ্তাহিক ‘হলিডে’র প্রকাশনায় সরকার কোনো বাধা দেয়নি। ‘হক কথা’ নিষিদ্ধ হওয়ার পর পরই ভাসানী প্রকাশ করেন ‘হক বাণী’। না-হক সব লেখায় পরিপূর্ণ থাকতো পত্রিকাটি। বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধীকে বিব্রত করার জন্য ‘হক কথা’ থেকে ‘হক বাণী’ পত্রিকার মাধ্যমে ভাসানী ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান। উদ্দেশ্য শেখ মুজিবকে ভারতের তল্পিবাহক বলে প্রমাণ করতে পারলে জনগণকে বোঝানো যাবে, বাংলাদেশ পূর্ণ স্বাধীনাত লাভ করেনি। ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দেশ। তাছাড়া ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তির বিরুদ্ধে ছিল চীন। দু’দেশের মৈত্রী বন্ধন শিথিল করা গেলে চীনের উদ্দেশ্য সফল হবে- ভাসানী এই মনোভাব পোষণ করে অব্যাহত অপপ্রচার চালান। ১৯৬৩ সালে মাও সে তুং ভাসানীকে ভারত ও রাশিয়া সম্পর্কে যে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তা তিনি ভোলেননি। তারই প্রতিফলন তার পত্রিকাতেই রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর বিপুল জনপ্রিয়তার জন্য ভাসানী হক বাণীতে নেতাকে সরাসরি আক্রমণ না করে ইন্দিরা গান্ধীকে মুজিবের পৃষ্ঠপোষক বানিয়ে দোষারোপ করার পথ বেছে নেন। সে সময় প্রচার ছিল, ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতের প্রতি তার ক্ষোভের কারণ হলো, তিনি ভারতের কাছ থেকে যে পরিমাণ আর্থিক সাহায্য আশা করেছিলেন, তা পাননি বলে ভাসানী অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। মওলানা ভাসানী সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। তার ‘হক কথা’ ও ‘হক বাণী’ পত্রিকার পাতায় পাতায় হিন্দু বিদ্বেষ প্রকটিত। পত্রিকাটি ক্রমশ বাংলাদেশকে মুসলিম বাংলা হিসেবে পরিণত করার জন্য নানা উসকানিমূলক নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।

১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশে খাদ্য বস্ত্রসহ অন্যান্য অত্যাবশকীয় দ্রব্যসামগ্রী দু®প্রাপ্যতার কারণে জনমনে অস্বস্তির ভাব পরিলক্ষিত হতে থাকে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ, কলকারখানা চালু করার পদক্ষেপ চলছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার সেতু নির্মাণ করা হচ্ছিল। কিন্তু দেশি-বিদেশি চক্রান্ত, একশ্রেণির মজুদদার, মুনাফাখোর, অসাধু চোরাচালান গোষ্ঠীর কারসািজ এবং পাকিস্তানপন্থী আমলা ও অন্যান্য শ্রেণিগোষ্ঠীর অসহযোগিতার কারণে বঙ্গবন্ধু সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা, কার্যক্রম ও ব্যবস্থা নানাভাবে বিঘ্নিত হয়েছিল। এছাড়া পাকিস্তানি দালালদের অন্তর্ঘাত ও ধ্বংসাত্মকমূলক কার্যকলাপে দেশে ক্রমান্বয়ে অবনতি হতে থাকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা। এসব কিছুর ফলে জনসমাজে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে অস্বস্তি, অসন্তোষ ও অস্থিরতা। দেশের এহেন পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তোলে মাওবাদী চরমপন্থী প্রকাশ্য রাজনৈতিক দল ও গুপ্ত সংগঠনগুলোর প্রকাশ্য ও গোপন কার্যকলাপ। এ সময় মওলানা ভাসানীর অসহযোগ ও সরকার বিরোধী উক্তি, বক্তব্য ও ভূমিকা মাওবাদী ও উগ্র বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও গুপ্ত সংগঠন এবং পাকিস্তানপন্থী দালাল ও সংগঠনগুলোর উপরোক্ত কার্যকলাপ পরিচালনার সাহস ও শক্তি সঞ্চারে সহায়ক ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে কাজ করে। চীনের অনুসারী সিরাজ সিকদারের ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’ ‘স্বাধীনতার নামে বাংলাদেশ ভারতের পদানত’ বলে উল্লেখ করে। ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলা’ কায়েমের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান জানায়। হক, তোয়াহা, মতিন, আলাউদ্দিন, দেবেন শিকদার, শান্তি সেন, অমল সেন প্রমুখের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন গণচীনমুখী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপদলও একইভাবে ভারত ও সোভিয়েত বিরোধী স্লোগান দেয় এবং সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের সংকল্প নিয়ে গোপন রাজনৈতিক তৎপরতায় লিপ্ত হয়। এদের অধিকাংশই হিংসাত্মক ও সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির পথ বেছে নেয় এবং সশস্ত্র বিপ্লব সংগঠনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। এই প্রস্তুতিরই অংশ হিসেবে তারা শুরু করেন (তাদের ভাষায়) ‘জাতীয় দুশমন’ খতমের অভিযান। মওলানা ভাসানী বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত করে ‘নতুন পতাকা ওড়াবার’ হুমকি দেন।

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয় ২২ জানুয়ারি। আর তখন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। মওলানা ভাসানীকে কেন্দ্র করে ডানপন্থী ও বামপন্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়। নিষিদ্ধ ঘোষিত ডানপন্থী সা¤প্রদায়িক ও পাকিস্তানের হানাদারদের সহযোগী দল জামায়াত, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামীও ভাসানীর নেতৃত্ব মেনে নেয়। আওয়ামী লীগকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে ভাসানীর নেতৃত্বে এক ডজনেরও বেশি দল-উপদল এবং গ্রুপ সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’। জাসদকে চেষ্টা করেও কমিটিতে ভুক্ত করা যায়নি। জাসদ তখন ‘একলা চলো’ নীতি নিয়েছে।

ভাসানীর নেতৃত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে অপপ্রচারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির চেষ্টায় লিপ্ত হয়। অতীতের পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়াশীল শাসক ও শোষকদের মতো তারাও ভারতবিরোধী প্রচারণা, ইসলামের দোহাই এবং সা¤প্রদায়িক জিগিরকেই বেছে নেয় আওয়ামী লীগকে খতম করার হাতিয়ার হিসেবে। এমন কি জাসদের কণ্ঠেও ছিল একই সুর। ১৯৭৩-এর ১৪ এপ্রিল ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ ভাসানী, জাতীয় লীগ, বাংলাদেশ জাতীয় লীগ, বাংলাদেশ গণমুক্তি ইউনিয়ন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (লেলিনবাদী), শ্রমিক কৃষক সাম্যবাদী দলের সমন্বয়ে একটি ‘যুক্তফ্রন্ট’ নামে ৬ দলীয় ঐক্যজোট গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। শেখ মুজিব সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে সর্বপ্রকার সংগ্রাম ও তৎপরতা পরিচালনার দৃঢ় সংকল্পও ব্যক্ত করা হয় এই ঘোষণায়। এরপর ২৩ এপ্রিল ভাসানীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট পল্টন ময়দানে যে জনসভা করে তাতে ভাসানী মুজিব সরকারকে উৎখাত এবং আওয়ামী লীগকে নির্মূল করার দৃঢ় সকল্প ব্যক্ত করেন।

১৯৭৩ সালের ২ মে জাতিসংঘের মহাসচিব খাদ্যশস্য ঘাটতি মোকাবেলায় বাংলাদেশকে খাদ্যশস্য দিয়ে সাহায্য করার জন্য বিশ্বের কাছে আবেদন জানান। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৩টি জেলা বন্যাকবলিত হয়। ১২ মে বঙ্গবন্ধু বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন। ১৫ মে ৩ দফা দাবিতে ভাসানী অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। ১৬ মে বঙ্গবন্ধু ভাসানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ২২ মে ভাসানী বিরোধী দলীয় নেতাদের অনুরোধে অনশন ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন।

আগস্টে সারা দেশে মারাত্মক বন্যায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অগণিত মানুষ নিপতিত হয় সীমাহীন দুঃখ কষ্ট ও অভাব-অনটনের মধ্যে। এই অবস্থায় চৈনিকপন্থী উগ্রবাম ও স্বাধীনতা বিরোধীরা তাদের পূর্ব-পরিকল্পিত অন্তুর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ অব্যাহত রাখে। জনগণের দুঃখ-দুর্দশা তাদের মধ্যে কোনো রেখাপাত করেনি। থানা, ফাঁড়ি ও অস্ত্র লুটপাট অব্যাহত রাখে। সেই সঙ্গে গুপ্তহত্যা। উগ্রজামায়াতপন্থী ও স্বাধীনতা বিরোধীদের এহেন সহিংস অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপে উৎকণ্ঠিত ও আতঙ্কগ্রস্ত তখন দেশের জনগণ। এহেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে জনগণ আরো বেশি ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে ভাসানীর বঙ্গবন্ধু সরকারবিরোধী বিভিন্ন উক্তি, বিবৃতি ও বক্তব্যে। ২৯ আগস্ট ভাসানীর ৩ দফা দাবির পক্ষে জনসমর্থন প্রদর্শনে তার অনুসারীরা সারা ঢাকা শহরে হরতাল পালন করে।

সারা দেশজুড়ে অরাজকতা। তখন ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ, চরমপন্থী গলাকাটা দলগুলো এবং এসব দলের ছত্রছায়ায় হানাদারদের সহযোগী দলগুলোর নেতাকর্মীরা তাদের দৃষ্টিতে ‘ভারত-রাশিয়ার পুতুল সরকার’ উচ্ছেদের অভিন্ন লক্ষ্যেও নিজেদের মধ্যে ‘সংগ্রামের জন্য ঐক্য মোর্চা’ গড়ে তোলার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেন।

২৭ জুন ১৯৭৪ তিনদিনের সফরে পাকি প্রেসিডেন্ট ভুট্টো ঢাকায় আসেন। সফরসঙ্গী ছিল ১০৭ জন। তার ঢাকা আসার আগেই পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা বিভাগসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি অগ্রবর্তী দল আসে। তারা জামায়াত, নেজামে, পিডিপি, মুসলিম লীগ প্রভৃতি পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা ও কর্মীদের মধ্যে প্রচুর উপঢৌকন ও অর্থকড়ি বিতরণ করে। এসব করা হয়েছিল যাতে ভুট্টো ভালো সংবর্ধনা পায়।

প্রচার ছিল যে, ভুট্টো ঢাকায় চীনপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। এর মধ্যে ভাসানী ন্যাপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ভুট্টো যেন কোনো অবস্থায় শেখ মুজিবের সঙ্গে সব বিষয়ে ফয়সালা না করে। ভুট্টো তা রক্ষা করে অমীমাংসিত বিষয়াদি ঝুলিয়ে রাখে। ভুট্টো ঢাকায় অবস্থানকালেই ২৯ জুন ভাসানীর নেতৃত্বে একটি গণমিছিল বঙ্গভবনের দিকে যাওয়ার পথে পুলিশ বাধা দেয়। অতঃপর মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। প্রতিবাদে ভাসানী ৩০ জুন ১৯৭৪ ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২৯ জুন বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণ থেকে ভাসানীর নেতৃত্বে একটি জঙ্গি মিছিল বের করার চেষ্টা চালানো হলে পুলিশের হস্তক্ষেপে তা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ৩০ জুন রাতে ভাসানীকে মগবাজারের এক বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে টাঙ্গাইলের সন্তোষের বাড়িতে নিয়ে অন্তরীণ রাখা হয়। ভাসানী গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ৬ দলীয় ঐক্যজোট ৫ জুলাই সারা দেশে হরতাল ডাকে। কিন্তু সেদিন ঢাকায় কোনো হরতাল হয়নি। পিকেটারও দেখা যায়নি।

১৯৭৪ সালে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে মন্দা চলছিল। সেই সঙ্গে দেশে মুদ্রাস্ফীতি এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। দেশকে চরম সর্বনাশের কবলে গ্রাস থেকে উদ্ধারে ব্যস্ত তখন বঙ্গবন্ধু সরকার। বিরোধী দলগুলো তখন অবাধ গণতন্ত্রের সুযোগে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের দোহাই দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ‘জেহাদে’ অবতীর্ণ হয়। ভাসানীর ন্যাপ, মাওবাদী চরম উগ্রপন্থী এবং বিভিন্ন প্রকাশ্য রাজনৈতিক দল- এমন কি বিবৃতিদানকারী দলগুলোও সরকার বিরোধী অভিযানে শামিল হয়।

বেআইনি ঘোষিত স্বাধীনতা বিরোধী পাকিস্তানি দালাল সংগঠনগুলোর সদস্য এবং সমাজ বিরোধীরাও সরকার বিরোধী এই অভিযানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যোগদান করে। নাশকতা, ব্যাংক ডাকাতি, রাহাজানিসহ ধ্বংসাত্মক ও অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ অতীতের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়। ভাসানী এই সব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নেননি। বরং আরো উসকানি দিয়েছেন। হক কথা বলতে গিয়ে ভাসানী মূলত দেশ জনগণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ভাসানী এই হত্যাকে বৈধতা দিতে নানা নাটকীয়তার অবতারণা করেছিলেন। সামরিক শাসক জিয়ার তল্পিবাহকে পরিণত হয়ে ‘ফারাক্কা লংমার্চ’ নামক সাজানো নাটক করেছিলেন। আসলে ব্যবহৃত হতে হতে ভাসানী ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর পর তাই তার দলটাকে আর পাওয়া যায় না। জান্তা শাসকরা গিলে ফেলেছে। ভাসানীর মূলত কোনো আদর্শ ছিল, বলা যায় না। তিনি নানা সময়ে নানা রূপে আবির্ভূত হয়েছেন, আবার বিলীন হয়েও গেছেন।



লেখক তালিকা